ঢাকা ০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬, ৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সিদ্ধান্ত কেবিনেটে নয়, বাইরে নেওয়া হতো: এম সাখাওয়াত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:২১:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৭ বার

সরকারের বড় বড় সিদ্ধান্ত কেবিনেটে নয়, বরং কেবিনেটের বাইরে নেওয়া হতো বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, যারা ভিন্নমত পোষণ করতেন, তাদের মতামত সাধারণত ছোটখাটো বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকত।

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার পর বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা যারা দ্বিমত করেছি, সেগুলো ছোটখাট বিষয় ছিল। যেমন সূচি বাদ দেওয়া ইত্যাদি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বড় সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটে হতো না। এগুলো কেবিনেটের বাইরে আলোচনা হতো।’

তিনি বলেন, সব সরকারেরই একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকে- এমন মন্তব্য তিনি শুনেছেন। তবে সেখানে কারা ছিলেন, তা তিনি জানেন না।

‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, আমি সেখানে ছিলাম না,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘হয়তো ওই মনোভাবের লোক আমি ছিলাম না। তারা ধরে নিয়েছে, আমি তাদের সঙ্গে একমত হতে পারব না। যারা এসব করেছে, তারা পরিচিত। আমি শুধু নাম শুনেছি। তারা আমার সহকর্মী ছিলেন।’

পুলিশ পুনর্গঠন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পুলিশের পুনর্গঠনই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।

তার ভাষ্য, সে সময় পরিস্থিতি এমন ছিল যে, পুলিশ মাঠে নামতে চাইছিল না। অনেক থানা লুট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক।

তিনি বলেন, ‘পুলিশের কিছু দাবি-দাওয়া ছিল। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। পরে অনেক বোঝাপড়ার মাধ্যমে পুলিশ মাঠে নামে। ট্রাফিক পুলিশও দাঁড়াতে চাইছিল না। তাদের উৎসাহ দেওয়া হয়।’

তিনি জানান, সে সময় প্রায় চার হাজার রাইফেল লুট হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু উদ্ধার করা গেলেও প্রায় এক হাজারের বেশি রাইফেল ও পিস্তল তখনও নিখোঁজ ছিল।

তার মতে, এসব অস্ত্র বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি।

কেন দায়িত্ব ছাড়লেন
কেন তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো- এ বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সে সময় তিনি কিছু বক্তব্য দিয়েছিলেন, যা তখনকার প্রেক্ষাপটে সঠিক মনে হয়নি।

‘আমি যে কথাটা বলেছিলাম, তা খণ্ডিতভাবে গণমাধ্যমে এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি তার চেয়েও বেশি খারাপ হয়েছে,’ বলেন তিনি।

তিনি জানান, নিজে দায়িত্ব ছাড়তে চাইলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তখন তাকে অনুমতি দেননি। তার ভাষায়, ‘৭–৮ দিনের মধ্যে চলে গেলে খারাপ বার্তা যাবে- এই কথা বলে আমাকে থাকতে বলা হয়েছিল।’

৭.৬২ বুলেট ও অস্ত্র বিতর্ক
৭.৬২ বুলেট ও চাইনিজ টাইপ-৩৯ রাইফেল প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিষয়টির এখনো সমাধান হয়নি। তিনি জানান, আনসার সদস্যদের ওপর হামলার ভিডিওতে দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তি পুলিশের রাইফেল নিয়ে গুলি চালাচ্ছে। ‘এগুলো খুব মারাত্মক অস্ত্র, যা সাধারণত সমরাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পুলিশের কাছে এসব থাকার কথা নয়,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, কবে ও কেন এসব অস্ত্র পুলিশের কাছে দেওয়া হলো, তা তদন্ত করা প্রয়োজন ছিল। তবে দায়িত্বে না থাকায় তিনি সে উদ্যোগ নিতে পারেননি।

তিনি আরও জানান, তার কাছে কিছু সন্দেহজনক ছবি রয়েছে, যেখানে দেখা যায় কয়েকজনের চেহারা ও গঠন স্থানীয়দের মতো নয়। কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে ওঠাতেও দেখা গেছে।

নির্বাচন প্রসঙ্গ
নির্বাচন প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো নির্বাচনই শতভাগ নিখুঁত হয় না। তার ভাষায়, ‘পৃথিবীর কোথাও একশ ভাগ খাঁটি নির্বাচন হয় না। আমাদের দেশেও হয় না।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পেয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ঘটনা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে টানা তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি।’

চুক্তি ও বিনিয়োগ
বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো গোপন চুক্তি হয়নি। তার মতে, এসব চুক্তি সাধারণত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পিপিপি অথরিটি বাংলাদেশ–এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

তিনি বলেন, এসব চুক্তিতে সাধারণত ‘নন-ডিসক্লোজার ক্লজ’ থাকে, যা প্রকাশ করা যায় না।

আমেরিকান কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের ৫ শতাংশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল।

বিদেশি প্রভাব ও পররাষ্ট্রনীতি
বিদেশি প্রভাব প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সব ক্ষেত্রে নয়, তবে কিছু বিষয়ে চাপ ছিল। বিশেষ করে বাণিজ্য আলোচনায় বড় ধরনের চাপ ছিল বলে তিনি মনে করেন।

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তিনি বলেন, আগের সময়ে নীতিনির্ধারণ ছিল অনেকটাই দিল্লিকেন্দ্রিক। তার মতে, রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পেছনেও এই প্রভাব স্পষ্ট।

তিনি বলেন, ‘সবাই সেখানে গিয়ে উঠছে। সেখান থেকেই সব পরিচালনা হচ্ছে। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।’

পুরো সাক্ষাৎকারে এম সাখাওয়াত হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অস্ত্র লুট, নির্বাচন, বিনিয়োগ ও বিদেশি প্রভাব নিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সিদ্ধান্ত কেবিনেটে নয়, বাইরে নেওয়া হতো: এম সাখাওয়াত

আপডেট টাইম : ০১:২১:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সরকারের বড় বড় সিদ্ধান্ত কেবিনেটে নয়, বরং কেবিনেটের বাইরে নেওয়া হতো বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, যারা ভিন্নমত পোষণ করতেন, তাদের মতামত সাধারণত ছোটখাটো বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকত।

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার পর বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা যারা দ্বিমত করেছি, সেগুলো ছোটখাট বিষয় ছিল। যেমন সূচি বাদ দেওয়া ইত্যাদি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বড় সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটে হতো না। এগুলো কেবিনেটের বাইরে আলোচনা হতো।’

তিনি বলেন, সব সরকারেরই একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ থাকে- এমন মন্তব্য তিনি শুনেছেন। তবে সেখানে কারা ছিলেন, তা তিনি জানেন না।

‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, আমি সেখানে ছিলাম না,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘হয়তো ওই মনোভাবের লোক আমি ছিলাম না। তারা ধরে নিয়েছে, আমি তাদের সঙ্গে একমত হতে পারব না। যারা এসব করেছে, তারা পরিচিত। আমি শুধু নাম শুনেছি। তারা আমার সহকর্মী ছিলেন।’

পুলিশ পুনর্গঠন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পুলিশের পুনর্গঠনই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।

তার ভাষ্য, সে সময় পরিস্থিতি এমন ছিল যে, পুলিশ মাঠে নামতে চাইছিল না। অনেক থানা লুট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক।

তিনি বলেন, ‘পুলিশের কিছু দাবি-দাওয়া ছিল। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। পরে অনেক বোঝাপড়ার মাধ্যমে পুলিশ মাঠে নামে। ট্রাফিক পুলিশও দাঁড়াতে চাইছিল না। তাদের উৎসাহ দেওয়া হয়।’

তিনি জানান, সে সময় প্রায় চার হাজার রাইফেল লুট হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু উদ্ধার করা গেলেও প্রায় এক হাজারের বেশি রাইফেল ও পিস্তল তখনও নিখোঁজ ছিল।

তার মতে, এসব অস্ত্র বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি।

কেন দায়িত্ব ছাড়লেন
কেন তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো- এ বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সে সময় তিনি কিছু বক্তব্য দিয়েছিলেন, যা তখনকার প্রেক্ষাপটে সঠিক মনে হয়নি।

‘আমি যে কথাটা বলেছিলাম, তা খণ্ডিতভাবে গণমাধ্যমে এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি তার চেয়েও বেশি খারাপ হয়েছে,’ বলেন তিনি।

তিনি জানান, নিজে দায়িত্ব ছাড়তে চাইলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তখন তাকে অনুমতি দেননি। তার ভাষায়, ‘৭–৮ দিনের মধ্যে চলে গেলে খারাপ বার্তা যাবে- এই কথা বলে আমাকে থাকতে বলা হয়েছিল।’

৭.৬২ বুলেট ও অস্ত্র বিতর্ক
৭.৬২ বুলেট ও চাইনিজ টাইপ-৩৯ রাইফেল প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিষয়টির এখনো সমাধান হয়নি। তিনি জানান, আনসার সদস্যদের ওপর হামলার ভিডিওতে দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তি পুলিশের রাইফেল নিয়ে গুলি চালাচ্ছে। ‘এগুলো খুব মারাত্মক অস্ত্র, যা সাধারণত সমরাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পুলিশের কাছে এসব থাকার কথা নয়,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, কবে ও কেন এসব অস্ত্র পুলিশের কাছে দেওয়া হলো, তা তদন্ত করা প্রয়োজন ছিল। তবে দায়িত্বে না থাকায় তিনি সে উদ্যোগ নিতে পারেননি।

তিনি আরও জানান, তার কাছে কিছু সন্দেহজনক ছবি রয়েছে, যেখানে দেখা যায় কয়েকজনের চেহারা ও গঠন স্থানীয়দের মতো নয়। কয়েকজনকে হেলিকপ্টারে ওঠাতেও দেখা গেছে।

নির্বাচন প্রসঙ্গ
নির্বাচন প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো নির্বাচনই শতভাগ নিখুঁত হয় না। তার ভাষায়, ‘পৃথিবীর কোথাও একশ ভাগ খাঁটি নির্বাচন হয় না। আমাদের দেশেও হয় না।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পেয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ঘটনা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে টানা তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি।’

চুক্তি ও বিনিয়োগ
বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো গোপন চুক্তি হয়নি। তার মতে, এসব চুক্তি সাধারণত বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পিপিপি অথরিটি বাংলাদেশ–এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

তিনি বলেন, এসব চুক্তিতে সাধারণত ‘নন-ডিসক্লোজার ক্লজ’ থাকে, যা প্রকাশ করা যায় না।

আমেরিকান কোম্পানির শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের ৫ শতাংশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ নিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল।

বিদেশি প্রভাব ও পররাষ্ট্রনীতি
বিদেশি প্রভাব প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সব ক্ষেত্রে নয়, তবে কিছু বিষয়ে চাপ ছিল। বিশেষ করে বাণিজ্য আলোচনায় বড় ধরনের চাপ ছিল বলে তিনি মনে করেন।

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তিনি বলেন, আগের সময়ে নীতিনির্ধারণ ছিল অনেকটাই দিল্লিকেন্দ্রিক। তার মতে, রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পেছনেও এই প্রভাব স্পষ্ট।

তিনি বলেন, ‘সবাই সেখানে গিয়ে উঠছে। সেখান থেকেই সব পরিচালনা হচ্ছে। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।’

পুরো সাক্ষাৎকারে এম সাখাওয়াত হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অস্ত্র লুট, নির্বাচন, বিনিয়োগ ও বিদেশি প্রভাব নিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন।