ঢাকা ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

ভোটের মাঠে জেন-জি: বাংলাদেশের নির্বাচনে নতুন অধ্যায়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৩০:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫০ বার

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচনের সময় রাজপথে বিরোধী দলগুলোর উপস্থিতি ছিল প্রায় অনুপস্থিত। কখনো নির্বাচন বর্জন, কখনো শীর্ষ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিরোধীদের কোণঠাসা করা হতো। তবে, আসন্ন বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় নির্বাচনে সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ। এ প্রেক্ষাপটে অনেক তরুণ—যারা ওই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল—মনে করছে, ২০০৯ সালের পর এবারই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন একটি জোট শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ৩০ বছরের নিচের জেন-জি কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি নতুন রাজনৈতিক দল—যারা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল—স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনী ভিত্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যুক্ত হয়েছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তার দল এবং সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তারা আত্মবিশ্বাসী।

বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী রায় পাওয়া দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের প্রধান শিল্পখাত—বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত—গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বাংলাদেশে আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারতের প্রভাবের ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, “মতামত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এখনো বিপুলসংখ্যক ভোটার অনিশ্চিত। বিশেষ করে জেন-জি ভোটাররা—যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ—ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।”

দেশজুড়ে এখন চোখে পড়ছে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার ও ব্যানার। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় কার্যালয় থেকে ভেসে আসছে প্রচারসংগীত। অতীতে যেখানে আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক সর্বত্র আধিপত্য বিস্তার করত, এবার তার অনুপস্থিতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে।

একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেতে পারে বলে জরিপে ইঙ্গিত মিলছে, যদিও দলটি এককভাবে সরকার গঠনে নাও আসতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দলটি এখন তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে ভোটারদের একটি অংশের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের ভারতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির কারণে তার পতনের পর ভারতের প্রভাব কিছুটা কমেছে এবং সেই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এসেছে চীন। বিএনপিকে তুলনামূলকভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী মনে করা হলেও, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার এলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জামায়াতের জেন-জি মিত্র দল ইতোমধ্যে ‘নয়া দিল্লির আধিপত্য’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তাদের নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। যদিও জামায়াত দাবি করছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকতে চায় না।

অন্যদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তার দল ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।

১৭৫ মিলিয়ন মানুষের দেশ বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট ও বিনিয়োগ হ্রাসের চাপে রয়েছে। এসব কারণে ২০২২ সাল থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর এক জরিপে দেখা গেছে, ১২৮ মিলিয়ন ভোটারের প্রধান উদ্বেগ দুর্নীতি, এরপর মূল্যস্ফীতি। ধর্মীয় ইস্যুর তুলনায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটাররা।

প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব বলেন, “মানুষ আওয়ামী লীগে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ভোট দেওয়ার অধিকারই ছিল না। আমি আশা করি, নতুন সরকার—যেই আসুক—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে কুপিয়ে হত্যা, আহত আরও একজন

ভোটের মাঠে জেন-জি: বাংলাদেশের নির্বাচনে নতুন অধ্যায়

আপডেট টাইম : ১১:৩০:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচনের সময় রাজপথে বিরোধী দলগুলোর উপস্থিতি ছিল প্রায় অনুপস্থিত। কখনো নির্বাচন বর্জন, কখনো শীর্ষ নেতাদের গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিরোধীদের কোণঠাসা করা হতো। তবে, আসন্ন বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় নির্বাচনে সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ। এ প্রেক্ষাপটে অনেক তরুণ—যারা ওই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল—মনে করছে, ২০০৯ সালের পর এবারই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন একটি জোট শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ৩০ বছরের নিচের জেন-জি কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি নতুন রাজনৈতিক দল—যারা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল—স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনী ভিত্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যুক্ত হয়েছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তার দল এবং সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তারা আত্মবিশ্বাসী।

বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী রায় পাওয়া দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের প্রধান শিল্পখাত—বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত—গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বাংলাদেশে আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারতের প্রভাবের ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, “মতামত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এখনো বিপুলসংখ্যক ভোটার অনিশ্চিত। বিশেষ করে জেন-জি ভোটাররা—যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ—ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।”

দেশজুড়ে এখন চোখে পড়ছে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ ও জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার ও ব্যানার। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় কার্যালয় থেকে ভেসে আসছে প্রচারসংগীত। অতীতে যেখানে আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক সর্বত্র আধিপত্য বিস্তার করত, এবার তার অনুপস্থিতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে।

একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেতে পারে বলে জরিপে ইঙ্গিত মিলছে, যদিও দলটি এককভাবে সরকার গঠনে নাও আসতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দলটি এখন তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে ভোটারদের একটি অংশের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের ভারতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির কারণে তার পতনের পর ভারতের প্রভাব কিছুটা কমেছে এবং সেই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এসেছে চীন। বিএনপিকে তুলনামূলকভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী মনে করা হলেও, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার এলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জামায়াতের জেন-জি মিত্র দল ইতোমধ্যে ‘নয়া দিল্লির আধিপত্য’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তাদের নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। যদিও জামায়াত দাবি করছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকতে চায় না।

অন্যদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তার দল ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।

১৭৫ মিলিয়ন মানুষের দেশ বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট ও বিনিয়োগ হ্রাসের চাপে রয়েছে। এসব কারণে ২০২২ সাল থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা নিতে বাধ্য হয়েছে।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর এক জরিপে দেখা গেছে, ১২৮ মিলিয়ন ভোটারের প্রধান উদ্বেগ দুর্নীতি, এরপর মূল্যস্ফীতি। ধর্মীয় ইস্যুর তুলনায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটাররা।

প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব বলেন, “মানুষ আওয়ামী লীগে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ভোট দেওয়ার অধিকারই ছিল না। আমি আশা করি, নতুন সরকার—যেই আসুক—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।”