ঢাকা ১১:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে ‘গণমাধ্যম সম্মিলন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০৩:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২০ বার

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে গতকাল শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে গণমাধ্যম সম্মিলন-২০২৬।

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ কেআইবি মিলনায়তনে সকাল ১০টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত এই সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, নোয়াব এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে এই সম্মিলনের আয়োজন করে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারাবাহিকভাবে সংগঠিত সহিংসতা ও মব ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছে। এই ধরনের হামলাকে নজিরবিহীন আখ্যা দিয়ে বক্তারা বলেন, এটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। সম্মিলনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়ে সাংবাদিক নেতারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। শুভেচ্ছা বক্তব্যে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির বলেন, যারা দু’টি পত্রিকা অফিসে আগুন দিয়েছে, তারা জুলাইয়ের মৌল চেতনাকে ব্যবহার করে ধ্বংসের চেষ্টায় লিপ্ত।

তিনি বলেন, সমাজে ভিন্নমত, ভিন্ন কণ্ঠ থাকবে; এই বৈচিত্র্য জারি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা কোনো অপরাধের আকাক্সক্ষা নয়। এই গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে সেগুলোকে রাষ্ট্র, সরকার, আইনগতভাবে কিংবা পেশিশক্তির মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এর জন্য নিজেদের মধ্যে একদিকে যেমন এই সংঘবদ্ধতার প্রয়োজন, তেমনি সম্মিলিত প্রয়াসগুলো গ্রহণ করার প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, সব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে গোটা সমাজের মধ্যে আমাদের এই চিন্তার সঞ্চার করতে হবে যে, সংবাদপত্র অপরাপর গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ২০০, ৫০০ কিংবা ১০ হাজার সাংবাদিকের মনের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করারই একমাত্র হাতিয়ার নয়। এগুলো যদি সচল না থাকে, সক্রিয় না থাকে, এগুলো যদি উচ্চকণ্ঠ না হতে পারে, তবে গোটা সমাজের মধ্যেই নানা ধরনের অধিকার ব্যাহত হতে বাধ্য।

গণমাধ্যমে হামলা প্রসঙ্গে নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক বলেন, গণমাধ্যমে এই হামলা এক ধরনের ট্রমা। হয়তো আমার মধ্যে সারাজীবন কাজ করবে। এই যে আক্রমণের ব্যাপারটা, বিশেষ করে ডেইলি স্টারের অফিসে যে আক্রমণটা, তা মোটেও একটা ভবনের ওপর আক্রমণ ছিল না। কারো যদি ক্ষোভ থেকে থাকে, তার কারণে সেই ভবন ভাঙা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর বিকাশের, সভ্যতার বিকাশের এই পর্যায়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় কয়েকজন সাংবাদিককে ভেতরে রেখে চারদিকে আগুন দেয়া, দমকল বাহিনী আসতে বাধা দেয়ার অর্থ হচ্ছেÑ তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার মধ্যযুগীয় বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ এটি। আজকে এই দুই পত্রিকায় হামলা হয়েছে, কালকে অন্য কোথাও হবে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, আমাদের এই সংঘবদ্ধতা অত্যন্ত জরুরি।

নিউএজ সম্পাদক বলেন, যেকোনো দেশে গণমাধ্যমের বিকাশ এবং সেই সমাজের সার্বিক গণতান্ত্রিক বিকাশ একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকে। পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় এই ঘটনা সত্য যে, সবচাইতে বড় একটি বৈপ্লবিক পরিস্থিতির মধ্যেও এই মানুষের কণ্ঠস্বরকে বন্ধ করবার একটি প্রবণতা থাকে। দু’টি পত্রিকা অফিসের মধ্যে একটিকে ভাঙচুর, আরেকটির মধ্যে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু কীসের নামে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো? দেড় বছর আগে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা স্বৈরতন্ত্রকে পরাজিত করলাম।

নূরুল কবির বলেন, একটি রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য যখন আমরা লড়াই করছি, তখন এই গণমাধ্যমগুলো আক্রান্ত হয়েছে। এই ঘটনার মধ্যে যারা ছিলেন, তারা জুলাইকে ব্যবহার করে জুলাইয়ের মূল চেতনা, জুলাইয়ের গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ফলে এরকম একটি সময়ের মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের সংঘবদ্ধতা দরকার।

সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, সাংবাদিকতা বাংলাদেশে এখনো সম্মানজনক পেশায় পরিণত হয়নি, তবে সাংবাদিকদের সম্মানজনক অবস্থায় যেতে হবে। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়Ñ সাংবাদিকতা এখনো বাংলাদেশে সম্মানজনক পেশা হয়নি, আপনারা (সাংবাদিক) যে সম্মানজনক অবস্থায় আছেন তা নয়। অথচ, আপনাদের সম্মানজনক অবস্থায় যেতে হবে।

শফিক রেহমান বলেন, সাংবাদিকদের আমি বলব, আপনারা একটি বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখুন। আমি নিজে সঙ্গীত দিয়ে সাংবাদিকতার শুরু করি। আমার কাগজে সঙ্গীতের জন্য আয়োজন থাকে। আপনাদেরও বিকল্প পেশা রাখতে হবে। আপনি যদি শুধু সাংবাদিকতার ওপরই নির্ভর করেন, আপনি ভবিষ্যতে দালাল উপাধি পেতে পারেন।

একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সরকারকে সত্য কথা বলেÑ বলে মন্তব্য করেছেন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, সরকারে যারা আছেন তাদেরকে বলি আপনারা মনে রাখবেন আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকেরা বলবে না ভয়ে এবং আপনার সরকারের ব্যুরোক্রেসি বলবে না। আপনার সরকারের ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি বলবে না। তারা সবসময় আপনাকে প্রশংসার মধ্যে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান, আপনাকে (সরকার) সত্য কথা বলে। তিনি বলেন, একটি সরকার সত্যিকার অর্থে যদি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে সত্যিকার অর্থে সেই উদারপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। ডেইল স্টার সম্পাদক বলেন, আমি প্রথমে যে অ্যাপিলটা করতে চাইÑ আমার সহকর্মীদের কাছে, আমরা যারা সাংবাদিকতায় এসেছি তারা কেন এসেছি? চাকরি! অবশ্যই। কিন্তু তার ঊর্ধ্বে একটা চিন্তা আছে, সমাজসেবা। অন্য অনেক পেশাও সমাজের সেবা করে; কিন্তু আমাদের একমাত্র অস্তিত্ব হচ্ছে সমাজসেবা। সমাজসেবার মধ্যে আছে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার বৈষম্য সরিয়ে দেয়া এবং ব্যক্তিগতভাবে সমষ্টিগতভাবে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোক বিভিন্ন গোষ্ঠীÑ সবারই অধিকার গণতন্ত্র। সেটিই হচ্ছে আমাদের পেশার মূলমন্ত্র।

সহকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের কাছে বলব, আপনারা কি অবগত আছেন যে, কনস্টিটিউশনে শুধু দুটি পেশাকে কনস্টিটিউশনাল ধারা দিয়ে প্রটেক্ট করা হয়েছে। একটি হচ্ছে জুডিশিয়ারি, স্বাধীন জুডিশিয়ারি কনস্টিটিউশনে বলে গেছে এবং স্বাধীন গণমাধ্যম কনস্টিউটিউশনে বলে দিয়েছে। তার মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে আমি স্বীকার করি। কিন্তু কনস্টিটিউশনলি দুটো পেশা হচ্ছে প্রটেক্টেড, কেন? জুডিশিয়ারি তো আমরা বুঝতে পারছি স্বাধীন জুডিশিয়ারি দরকার। স্বাধীন মিডিয়া কেন ইনস্টিটিউশনালি প্রটেক্টেড হয়। কেননা, অভিজ্ঞতা বলে দিয়েছেÑ যে সমাজে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিচরণ খুব বলিষ্ঠ, সেই সমাজ গণতান্ত্রিক হয়। সেই সমাজ বৈষম্যহীন হয়। সেই সমাজ অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি নিদর্শন হয়। তিনি বলেন, আমি মনে করি আমরা যারা সাংবাদিকতায় এসেছি এই উপলব্ধি আমাদের থাকতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে, আমাদের সামাজিক জীবনে সততা-নিষ্ঠা এবং সঠিক স্বাধীন সাংবাদিকতা করার যে মৌলিক এথিক্যাল ভ্যালুসÑ অনুরোধ করব আপনারা সেটিকে নিজের জীবনে, নিজের চেতনায় সবসময় ধরে রাখবেন।

এই সম্মিলনে নোয়াব, সম্পাদক পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম, ফটো জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা অংশ নেন। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে কর্মরত সাংবাদিক, গণমাধ্যমের সম্পাদক, প্রকাশক, আমন্ত্রিত গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং কলাম লেখকরাও সম্মিলনে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নোয়াব সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে ‘গণমাধ্যম সম্মিলন

আপডেট টাইম : ১২:০৩:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে গতকাল শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে গণমাধ্যম সম্মিলন-২০২৬।

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ কেআইবি মিলনায়তনে সকাল ১০টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত এই সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, নোয়াব এবং সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে এই সম্মিলনের আয়োজন করে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারাবাহিকভাবে সংগঠিত সহিংসতা ও মব ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছে। এই ধরনের হামলাকে নজিরবিহীন আখ্যা দিয়ে বক্তারা বলেন, এটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। সম্মিলনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়ে সাংবাদিক নেতারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। শুভেচ্ছা বক্তব্যে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির বলেন, যারা দু’টি পত্রিকা অফিসে আগুন দিয়েছে, তারা জুলাইয়ের মৌল চেতনাকে ব্যবহার করে ধ্বংসের চেষ্টায় লিপ্ত।

তিনি বলেন, সমাজে ভিন্নমত, ভিন্ন কণ্ঠ থাকবে; এই বৈচিত্র্য জারি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা কোনো অপরাধের আকাক্সক্ষা নয়। এই গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে সেগুলোকে রাষ্ট্র, সরকার, আইনগতভাবে কিংবা পেশিশক্তির মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এর জন্য নিজেদের মধ্যে একদিকে যেমন এই সংঘবদ্ধতার প্রয়োজন, তেমনি সম্মিলিত প্রয়াসগুলো গ্রহণ করার প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, সব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে গোটা সমাজের মধ্যে আমাদের এই চিন্তার সঞ্চার করতে হবে যে, সংবাদপত্র অপরাপর গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ২০০, ৫০০ কিংবা ১০ হাজার সাংবাদিকের মনের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করারই একমাত্র হাতিয়ার নয়। এগুলো যদি সচল না থাকে, সক্রিয় না থাকে, এগুলো যদি উচ্চকণ্ঠ না হতে পারে, তবে গোটা সমাজের মধ্যেই নানা ধরনের অধিকার ব্যাহত হতে বাধ্য।

গণমাধ্যমে হামলা প্রসঙ্গে নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক বলেন, গণমাধ্যমে এই হামলা এক ধরনের ট্রমা। হয়তো আমার মধ্যে সারাজীবন কাজ করবে। এই যে আক্রমণের ব্যাপারটা, বিশেষ করে ডেইলি স্টারের অফিসে যে আক্রমণটা, তা মোটেও একটা ভবনের ওপর আক্রমণ ছিল না। কারো যদি ক্ষোভ থেকে থাকে, তার কারণে সেই ভবন ভাঙা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর বিকাশের, সভ্যতার বিকাশের এই পর্যায়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় কয়েকজন সাংবাদিককে ভেতরে রেখে চারদিকে আগুন দেয়া, দমকল বাহিনী আসতে বাধা দেয়ার অর্থ হচ্ছেÑ তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার মধ্যযুগীয় বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ এটি। আজকে এই দুই পত্রিকায় হামলা হয়েছে, কালকে অন্য কোথাও হবে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, আমাদের এই সংঘবদ্ধতা অত্যন্ত জরুরি।

নিউএজ সম্পাদক বলেন, যেকোনো দেশে গণমাধ্যমের বিকাশ এবং সেই সমাজের সার্বিক গণতান্ত্রিক বিকাশ একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকে। পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় এই ঘটনা সত্য যে, সবচাইতে বড় একটি বৈপ্লবিক পরিস্থিতির মধ্যেও এই মানুষের কণ্ঠস্বরকে বন্ধ করবার একটি প্রবণতা থাকে। দু’টি পত্রিকা অফিসের মধ্যে একটিকে ভাঙচুর, আরেকটির মধ্যে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু কীসের নামে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো? দেড় বছর আগে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা স্বৈরতন্ত্রকে পরাজিত করলাম।

নূরুল কবির বলেন, একটি রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য যখন আমরা লড়াই করছি, তখন এই গণমাধ্যমগুলো আক্রান্ত হয়েছে। এই ঘটনার মধ্যে যারা ছিলেন, তারা জুলাইকে ব্যবহার করে জুলাইয়ের মূল চেতনা, জুলাইয়ের গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ফলে এরকম একটি সময়ের মধ্যে আমাদের প্রত্যেকের সংঘবদ্ধতা দরকার।

সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, সাংবাদিকতা বাংলাদেশে এখনো সম্মানজনক পেশায় পরিণত হয়নি, তবে সাংবাদিকদের সম্মানজনক অবস্থায় যেতে হবে। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়Ñ সাংবাদিকতা এখনো বাংলাদেশে সম্মানজনক পেশা হয়নি, আপনারা (সাংবাদিক) যে সম্মানজনক অবস্থায় আছেন তা নয়। অথচ, আপনাদের সম্মানজনক অবস্থায় যেতে হবে।

শফিক রেহমান বলেন, সাংবাদিকদের আমি বলব, আপনারা একটি বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখুন। আমি নিজে সঙ্গীত দিয়ে সাংবাদিকতার শুরু করি। আমার কাগজে সঙ্গীতের জন্য আয়োজন থাকে। আপনাদেরও বিকল্প পেশা রাখতে হবে। আপনি যদি শুধু সাংবাদিকতার ওপরই নির্ভর করেন, আপনি ভবিষ্যতে দালাল উপাধি পেতে পারেন।

একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সরকারকে সত্য কথা বলেÑ বলে মন্তব্য করেছেন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, সরকারে যারা আছেন তাদেরকে বলি আপনারা মনে রাখবেন আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকেরা বলবে না ভয়ে এবং আপনার সরকারের ব্যুরোক্রেসি বলবে না। আপনার সরকারের ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি বলবে না। তারা সবসময় আপনাকে প্রশংসার মধ্যে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান, আপনাকে (সরকার) সত্য কথা বলে। তিনি বলেন, একটি সরকার সত্যিকার অর্থে যদি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে সত্যিকার অর্থে সেই উদারপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি রাখে, তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। ডেইল স্টার সম্পাদক বলেন, আমি প্রথমে যে অ্যাপিলটা করতে চাইÑ আমার সহকর্মীদের কাছে, আমরা যারা সাংবাদিকতায় এসেছি তারা কেন এসেছি? চাকরি! অবশ্যই। কিন্তু তার ঊর্ধ্বে একটা চিন্তা আছে, সমাজসেবা। অন্য অনেক পেশাও সমাজের সেবা করে; কিন্তু আমাদের একমাত্র অস্তিত্ব হচ্ছে সমাজসেবা। সমাজসেবার মধ্যে আছে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার বৈষম্য সরিয়ে দেয়া এবং ব্যক্তিগতভাবে সমষ্টিগতভাবে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোক বিভিন্ন গোষ্ঠীÑ সবারই অধিকার গণতন্ত্র। সেটিই হচ্ছে আমাদের পেশার মূলমন্ত্র।

সহকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের কাছে বলব, আপনারা কি অবগত আছেন যে, কনস্টিটিউশনে শুধু দুটি পেশাকে কনস্টিটিউশনাল ধারা দিয়ে প্রটেক্ট করা হয়েছে। একটি হচ্ছে জুডিশিয়ারি, স্বাধীন জুডিশিয়ারি কনস্টিটিউশনে বলে গেছে এবং স্বাধীন গণমাধ্যম কনস্টিউটিউশনে বলে দিয়েছে। তার মধ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে আমি স্বীকার করি। কিন্তু কনস্টিটিউশনলি দুটো পেশা হচ্ছে প্রটেক্টেড, কেন? জুডিশিয়ারি তো আমরা বুঝতে পারছি স্বাধীন জুডিশিয়ারি দরকার। স্বাধীন মিডিয়া কেন ইনস্টিটিউশনালি প্রটেক্টেড হয়। কেননা, অভিজ্ঞতা বলে দিয়েছেÑ যে সমাজে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিচরণ খুব বলিষ্ঠ, সেই সমাজ গণতান্ত্রিক হয়। সেই সমাজ বৈষম্যহীন হয়। সেই সমাজ অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি নিদর্শন হয়। তিনি বলেন, আমি মনে করি আমরা যারা সাংবাদিকতায় এসেছি এই উপলব্ধি আমাদের থাকতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে, আমাদের সামাজিক জীবনে সততা-নিষ্ঠা এবং সঠিক স্বাধীন সাংবাদিকতা করার যে মৌলিক এথিক্যাল ভ্যালুসÑ অনুরোধ করব আপনারা সেটিকে নিজের জীবনে, নিজের চেতনায় সবসময় ধরে রাখবেন।

এই সম্মিলনে নোয়াব, সম্পাদক পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স, ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার, জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম, ফটো জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা অংশ নেন। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে কর্মরত সাংবাদিক, গণমাধ্যমের সম্পাদক, প্রকাশক, আমন্ত্রিত গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং কলাম লেখকরাও সম্মিলনে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নোয়াব সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।