আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট তাকে এ পদে নিয়োগ দেবেন।
২৫তম বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিচারপতি হিসেবে ৬৭ বছর পূর্ণ করে আগামী ২৮ ডিসেম্বর স্বাভাবিক অবসরে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে। শপথ গ্রহণের পর থেকে তার এ নিয়োগ কার্যকর হবে। বঙ্গভবন এবং আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ১৯৬১ সালের ১৮ মে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আবদুর রহমান চৌধুরীও ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি। তার সন্তান জুবায়ের রহমান চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি অনার্স ও এলএলএম ডিগ্রি লাভ করেন। পরে যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক আইনের ওপর আরেকটি মাস্টার্স করেন। পরে তিনি আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে ১৯৮৫ সালে ঢাকা জজ কোর্টে ও ১৯৮৭ সালের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অ্যানরোলড হন। ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট জুবায়ের রহমান চৌধুরী হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে স্থায়ী হোন। এক বর্ণাঢ্য উত্তরাধিকার বহন করলেও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার আমলে তাকে নানাভাবে কোণঠাঁসা করে রাখা হয়। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর গত বছর ১২ আগস্ট তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। একই বছর ১৩ আগস্ট আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।
কর্মজীবনে তিনি বেলজিয়াম সফর করেন। এছাড়া উচ্চশিক্ষা এবং বিভিন্ন ট্রেনিং প্রোগ্রামে প্রিন্স অ্যাডওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি, কানাডা, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর এবং নেপাল সফর করেন তিনি।
সরকারি কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা প্রদান সংক্রান্ত রায়, নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার অধিকার সংক্রান্ত রায়, সরকারি কর্মকর্তাদের ১৫০ দিনের বেশি অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) রাখা অবৈধ ঘোষণা, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর আলোচিত রায়।
বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে সিনিয়র হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। সিনিয়র হিসেবে তার ওপরে রয়েছেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম। কিন্তু সম্প্রতি আশফাকুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। অভিযোগটি কাউন্সিলের বিবেচনাধীন থাকায় বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ‘যোগ্য’ বিবেচিত হয়েছেন। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর ৬৭ বছর পূর্ণ হবে ২০২৮ সালের ১৭ মে। অর্থাৎ প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি একটি দীর্ঘ সময় পাচ্ছেন।
কে এই বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী? : বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর রয়েছে বর্ণাঢ্য পারিবারিক ঐতিহ্য। তার পিতা আব্দুর রহমান চৌধুরী (১৯২৬-১৯৯৪) ছিলেন একাধারে একজন বিচারপতি, ভাষাসৈনিক, সমাজসেবক, সুবক্তা এবং সংগঠক। আব্দুর রহমান চৌধুরী ১৯২৬ সালের ২৫ নভেম্বর বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা (বিচারপতি জুবায়ের রহমানের পিতামহ) ছিলেন খান বাহাদুর আব্দুল লতিফ চৌধুরী, মাতা-দুরদানা চৌধুরী। জমিদার পরিবারের সন্তান আব্দুর রহমান চৌধুরী ১৯৪২ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইএ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৪ মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন ছাত্রসমাজ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ভাষা আন্দোলনের স্থপতি অধ্যাপক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র নেতৃবৃন্দের মধ্যে এ সভার অন্যতম বক্তা ছিলেন আবদুর রহমান চৌধুরী। ১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলে তার সঙ্গে ছাত্র নেতৃবৃন্দের যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় তাতে আবদুর রহমান চৌধুরী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেন। এ সময় তিনি ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নির্বাচিত ভাইস-প্রেসিডেন্ট। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে ছাত্রদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন তিনি। পুনর্গঠিত ও সম্প্রসারিত প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রনায়ক। আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলে সুপ্রিম কোর্ট বারের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬৭-১৯৬৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইনজীবী সমিতির মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের পরিচালক নির্বাচিত হন। ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্দুর রহমান চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ বসনিয়া সলিডারিটি ফ্রন্টের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৩ সালে তিনি ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব আরবিট্রেশন’-এ আরবিট্রেটর নিযুক্ত হন। ১৯৭৭-৭৮ সালে তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকার আমলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৪ সালের ১১ জানুয়ারি ইন্তেকালের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আব্দুর রহমান চৌধুরী বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। সমকালীন জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সাহসী ও সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখতেন। এ কারণে সব শ্রেণির মানুষের কাছে বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী ছিলেন গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধাভাজন।
বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীই উত্তরাধিকার বহন করছেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তারা দুই ভাই-দুই বোন। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর অনুজ ড. রিয়াজুর রহমান চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। মা বেগম সিতারা চৌধুরী চলতি বছর ৬ আগস্ট বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন।
Reporter Name 






















