চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের কাছে দীর্ঘ মেয়াদী ইজারা দেয়ার সরকারি প্রচেষ্টার ওপর ‘বিচারিক প্রলেপ’ দিতেই এ রিট করা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীরা। বিদেশিদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিকে ‘বৈধতা’ দিতেই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ আদালতের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্ন করছেন আইনজীবীরাই। তাদের মতে, একটি অনির্বাচিত সরকারের কোনো আইনি এখতিয়ার নেই এ ধরনের চুক্তি সম্পাদনের। যে কারণে এ সরকার আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের জন্য ‘মানবিক করিডোর’ চালু করতে পারেনিÑ একই কারণে চট্টগ্রাম কিংবা অন্যকোনো বন্দর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে পারে না।
গতকাল বুধবার ইনকিলাব প্রতিবেদকের কাছে তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের কাছে ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথম যে প্রশ্নটি আসে, সেটি হচ্ছে আইনগত। আইনের কথা বললে আসে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতার প্রশ্ন। আমাদের বুঝতে হবেÑ এ সরকারের ক্ষমতার উৎস কিন্তু জনগণ নন। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে সুপ্রিমকোর্টের কনসার্নে গঠিত হয়েছে এ সরকার। ইলেকশন নয়Ñ সিলেকশনে গঠিত হয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। তাদের কাজ শুধু রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করা। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ, বিশেষতঃ যেসব কাজে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সম্পর্কিতÑ সেই কাজ করার লিগ্যাল রাইটস এ সরকারের নেই।
সুপ্রিমকোর্টের এ আইনজীবী বলেন, এখন হয়তো সরকার ক্ষমতার জোরে যা তাদের জুরিসডিকিশনে নেই সেগুলোও গায়ের জোরে নিজেদের মতো কাজ-কর্ম করে নিচ্ছে। কিন্তু ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর যে পার্লামেন্ট আসবে সেখানে কিন্তু প্রশ্ন উঠবে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ইজারা চুক্তিতে কী আছে আমরা এখনো জানি না। পার্লামেন্টে কিন্তু বিষয়টি উঠবে বৈধতা দেয়ার প্রশ্নে। তখন হয়তো জানা যাবে, চুক্তিতে কী রয়েছে। তখনকার সংসদ যদি এটিকে বৈধতা না দেয় তাহলে এ চুক্তি ঝুঁকিতে পড়বে।
মনজিল মোরসেদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয়। সমুদ্র বন্দরগুলো বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়া হবে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে পরাশক্তির ঘাঁটি গাড়ার মতলব রয়েছেÑ ইত্যাদি ধরনের কথাবার্তা কিন্তু আমরা দীর্ঘ দিন ধরেই শুনছি। এ কারণে চট্টগ্রাম পোর্টের ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কিন্তু ভালোই চলছিলো। এটি একটি লাভজনক বন্দর। প্রফিটে থাকা এই বন্দর নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিলো না। ফলে বন্দর বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়ার আগে স্থানীয় স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। কোন্ অজুহাতে বন্দরটি চুক্তি করে বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে দেয়া হচ্ছেÑ এমন প্রশ্ন অধিকাংশ মানুষের মনেই রয়েছে। এর পেছনে অন্যকোনো মতলব থাকতে পারে। কী মতলব রয়েছে সেটি হয়তো ভবিষ্যতে জানা যাবে। ততোক্ষণে হয়তো আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের বড় একটি অংশ কিন্তু বিদেশি লোকজন। তারা বিদেশি পাসপোর্ট হোল্ডার। বিদেশি কোম্পানির হাতে পোর্ট তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি কোনো প্রভাব কিংবা বিদেশি কোম্পানির প্রতি তাদের কমিটমেন্ট আছে কি নাÑ এ প্রশ্ন মানুষের মনে উত্থাপিত হয়েছে। মানুষ জানে না এ চুক্তির ভেতর কী রয়েছে। নির্বাচিত সরকার এলে হয়তো এ চুক্তি প্রকাশিত হবে। তখন হয়তো জানতে পারবো কারা কি উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম পোর্ট বিদেশিদের হাতে তুলে দিয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো: শাহজাহান সাজু বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিলে ফিউচারে নিশ্চিতভাবেই জটিলতা সৃষ্টি হবে। যারা এখন সরকার পরিচালনা করছেন তারা হয়তো এক ধরনের চিন্তা, বিবেচনা থেকে এটি করছেন। তারাও হয়তো জনস্বার্থ চিন্তা করছেন বটে। কিন্তু এ চুক্তিতে কি কি ক্লজ বা শর্তাদি রয়েছে জাতিকে জানানো উচিৎ। জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। এই চুক্তির মধ্যে জাতীয় স্বার্থ কতটা সংরক্ষিত হয়েছেÑ তা উন্মুক্ত করে দেয়া উচিৎ। সাবেক এই সিনিয়র জজের মতে, উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। হয়তো রায়ও হবে। কিন্তু যেহেতু আদালত এখন পর্যন্ত চুক্তি সম্পাদন প্রক্রিয়ার ওপর কোনো ধরনের স্থগিতাদেশ দেননিÑ সেহেতু চুক্তি সম্পাদনে কোনো বাধাও নেই।
এ দিকে সরকারের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নকে জাস্টিফায়েড করতেই উচ্চ আদালতে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা প্রদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলাটি করা হয়েছে কি নাÑ এমন সংশয়ও প্রকাশ করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি, জনমতের বিপক্ষে যায়Ñ এমন এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার আইনগত বৈধতা নিতে উচ্চ আদালতকে ব্যবহার করেছে। এই রিট তেমনই কোনো ‘বৈধতা’ প্রদানের জন্য করা হয়েছে কি নাÑ এমনটি মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আদালত রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেছেন। রায় দেখেই বিষয়টি বোঝা যাবে।
প্রসঙ্গতঃ চট্টগ্রাম নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’কে নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি হয়েছে। বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের ডিভিশন বেঞ্চে গত ২৫ জানুয়ারি শুনানি নিয়ে আগামী ৪ ডিসেম্বর রিটটির রায়ের তারিখ ধার্য করেন।
চট্টগ্রাম নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা এই রিটের শুনানি শেষে গত ৩০ জুলাই রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট।
এ ধারাবাহিকতায় এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তি সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় স্থিতাবস্থা চেয়ে সম্পূরক আবেদন দাখিল করেন রিটকারী পক্ষ। এ আবেদনর শুনানিতে ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল শুনানির জন্য ১৯ নভেম্বর তারিখ ধার্য রাখেন। রুলের ওপর গত ১৯, ২০ ও ২৩ নভেম্বর শুনানি হয়। রিটের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, আহসানুল করিম ও কায়সার কামাল শুনানি করেন। সরকারপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
চট্টগ্রাম নিউমুরিং টার্মিনাল নির্মিত হয় ২০০৭ সালে। মোট ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা খরচে নির্মাণ করা হয় এ টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কনটেইনারের বেশির ভাগ এই টার্মিনাল দিয়ে পরিবহন হয়। এটি পরিচালনা করছিল ‘সাইফ পাওয়ারটেক’। তাদের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত ৬ জুলাই। এরপর নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ‘চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড’ এটি পরিচালনার দায়িত্ব পায়।
টার্মিনাল পরিচালনায় ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। এখন বিদেশি এই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া বন্দর কর্তৃপক্ষ এগিয়ে নিতে চাইলে তার বৈধতার প্রশ্নে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন রিট করেন।
হাইকোর্টের জারিকৃত রুলে দেশি অপারেটরদের (প্রতিষ্ঠান) অনুমতি না দিয়ে পিপিপি আইন ও নীতি লঙ্ঘন করে এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে নাÑ তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে যেকোনো অপারেটরকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব (নিযুক্ত) দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি অনুসারে ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক বিডিং (দরপত্র আহ্বান) নিশ্চিত করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে নাÑ রুলে সেটিও জানতে চাওয়া হয়।
নৌসচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। জবাব দাখিলের পর শুনানি হয়। এ ধারাবাহিকতায় আগামী ৪ ডিসেম্বর রিটটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম নিউমুরিং বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে বন্দর সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, বিএনপি-জামায়াতসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুরুত্বপূর্ণ এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন নির্বাচিত সরকার।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই এক ফেসবুক পোস্টে গত ২৫ নভেম্বর বলেছেন, বন্দর-এলডিসি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের বন্দর কিংবা এলডিসি থেকে উত্তরণের মতো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, একটি দেশ যেই সরকারকে নির্বাচিত করেনি, সেই সরকার দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে না।
ফেসবুক পোস্টে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরো বলেন, দুটি টার্মিনাল নিয়ে চুক্তির পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের জনগণের ওপর এসব সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। অথচ এমন একটি সরকার এসব কৌশলগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যাদের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নেই। বন্দরের বিষয়ে সাম্প্রতিক দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তগুলো নিয়মিত কাজের (রুটিন ওয়ার্ক) অংশ নয়। এগুলো একটি জাতীয় সম্পদ নিয়ে কৌশলগত প্রতিশ্রুতি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বেঁধে ফেলার এসব সিদ্ধান্ত এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে, যাদের কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নেই।
Reporter Name 





















