সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে আনা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে ১৪ বছর আগে যে রায় দেয়া হয়েছিল, তার পুরোটাই বাতিল করেছেন আপিল বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে পুনরায় ফিরলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর এবং এ সংক্রান্ত রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন নিষ্পত্তি করে বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরার রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।তবে এবার কার্যকর হচ্ছে না
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কার্যকর হচ্ছে না এই সরকারব্যবস্থা। আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনে ফিরবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। তার মানে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই হচ্ছে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে আপিল শুনানিতে আপিলকারী বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন আয়োজনের পক্ষের কথা বলেছিল।
বিএনপির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে জানিয়েছিলেন, আসন্ন নির্বাচন যেন বর্তমান সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে কোনও আইন বা রায় সবসময় পরবর্তী সময় থেকে কার্যকর হয়।
একই সুরে কথা বলেছিলেন অন্য আপিলকারীর আইনজীবীরাও।
যে পথ ধরে এসেছিল তত্ত্ববধায়ক সরকার
নব্বইয়ে সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অনানুষ্ঠানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল।
তখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল না। মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা হয়েছিল। তখন দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার মডেলের সাথে পরিচয় হয়।
তত্ত্বাবধায়কের অধীনে প্রথম নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি, ১৯৯১ সালে। এরপর তিন বছরের মাথায় ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ পরিস্থিতি পাল্টে দেয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো আন্দোলন শুরু করে।
কিন্তু বিএনপি এই দাবি না মেনে বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ১৯৯৬ সালে দলীয় সরকারের অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে, তাতে নিজেরা ফের ক্ষমতায় আসে।
তবে এই সংসদ স্থায়ী ছিল মাত্র ১২দিন। দলগুলোর আন্দোলনের চাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান এনে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংসদে পাস করে তৎকালীন বিএনপি সরকার।
সেই বিধান অনুসারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১-এ অষ্টম এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু ভোটের পর পরাজিত দলকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে দেখা গেছে।
এছাড়া, তত্ত্বাধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক ওঠে। ২০০৬ সালে এ নিয়ে বেশ উত্তপ্ত হয় দেশের রাজনীতির মাঠ।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী ওই সময়ের সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে মেনে নিতে রাজি ছিল না আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট সঙ্গীরা।
এ নিয়ে তখন দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।
কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তাদের অধীনে আওয়ামী লীগ ও জোট সঙ্গীরা নির্বাচন বয়কটের ডাক দিলে। একইসঙ্গে ভোট প্রতিহত করার ঘোষণা এসেছিল।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু এর এগার দিন আগে সব হিসাব-নিকাষ উল্টে যায়। আসে এক-এগারো। যেটিকে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করতে দেখা গেছে রাজনৈতিক দলগুলোকে।
এই এক-এগারো হলো, ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার শপথ নেয়া।
তারা আগেরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো ৩ মাসের মধ্যে ভোট দিয়ে বিদায় নেয়নি। ক্ষমতায় থাকে প্রায় দুই বছর। এই বাড়তি মেয়াদও পরে সংবিধানে বৈধতা দেয়া হয়।
সেনাসমর্থিত এই সরকারের আমলে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বেশ দৌড়-ঝাপটা চলে। কারাগারের যেতে হয় সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে। এই অধ্যায় দলগুলোর জন্য সুখকর হয়নি।
শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর তারা অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে, তাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট জয়লাভ করে।
এরপর অষ্টম জাতীয় সংসদের সময়ই আদালতের নির্দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। এ নিয়ে কম বিতর্ক নেই।
এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যায়নি বিএনপি ও দলটির মিত্ররা। এতে ১৫৪ জনকে বিনাভোটে জয়ী হন।
পরের নির্বাচনও হয় শেখ হাসিনার অধীনে, ২০১৮ এর ৩০ ডিসেম্বর। যা ‘রাতের’ ভোট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সেবার বিরোধী দল বিএনপি ও ছোট কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট। তারা ভোটে গিয়ে ‘প্রতারিত’ হওয়ার অভিযোগ এনেছিল। এই নির্বাচনের গল্প দেশের মানুষের জানা।
চব্বিশের ভোটের আগে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরানোর দাবিতে জোরালোভাবে মাঠে নামে। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে প্রর্যায়ক্রমে ঢাকা চলো সমাবেশ করে। কিন্তু তাদের সব আয়োজন শেষ হয়ে যায় তেইশের ২৮ অক্টোবর। রাজধানীতে তাদের সমাবেশে আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলায়। এরপর চব্বিশের ৭ জানুয়ারি দেশ দেখলো তত্ত্বাবধায়কহীন ‘ডামি’ নির্বাচন। তার কয়েকমাসের মাথায় তো পতন হলো টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক রিভিউ আবেদন জমা পড়ে আপিল বিভাগে। সেই আবেদনেই ফিরলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
যেই পথে ‘বাতিলের’ খাতায় ওঠে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারের আমলে ১৯৯৮ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলে তিনজন আইনজীবী। যা ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট খারিজ করে দেন আদালত। কিন্তু হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে পরের বছর আপিল করেন রিট আবেদনকারীরা।
এক-এগারোর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ২০১০ সালের ১ মার্চ আপিল বিভাগে এর শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে আপিল আবেদনকারী, রাষ্ট্রপক্ষ এবং অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শীর্ষস্থানীয় ৮ জন আইনজীবী বক্তব্য দেন।
অ্যামিকাস কিউরিরা শুনানিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এমনকি তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও এর পক্ষে মত দেন।
তবে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে (৪:৩) ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন।
ওই রায়ে বলা হয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অর্থাৎ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন অগণতান্ত্রিক এবং তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এরপর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়।
ফিরলেও ‘গঠন প্রক্রিয়া’ জানতে অপেক্ষা করতে হবে গণভোট পর্যন্ত
ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১১ সদস্যের বেশি হবে না৷ এর মধ্যে একজন প্রধান উপদেষ্টা এবং অনধিক ১০ জন উপদেষ্টা থাকবেন৷ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেবেন।
নিয়োগকৃত উপদেষ্টা কোনও রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোনও সংগঠনের সদস্য হবেন না; পরের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার লিখিত সম্মতি দেবেন এবং তার বয়স ৭২ বছরের বেশি হবে না।
সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি হবেন এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। যদি সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি যদি দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে তার ঠিক আগে অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করা হবে।
যদি কোনও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি যদি দায়িত্ব নিতে অসম্মতি জানান, তাহলে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের মধ্যে যিনি সর্বশেষে অবসরে গেছেন, তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
আপিল বিভাগের কোনও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে পাওয়া না গেলে, বা তারা কেউ প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি না হলে রাষ্ট্রপতি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে কোনও ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব দেবেন।
সেভাবেও যদি কাউকে না পাওয়া যায়, তাহলে রাষ্ট্রপতি তার স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বভার নেবেন৷
এদিকে, রিভিউতে ফেরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেহেতু কার্যকর হবে আগামী সংসদ থেকে, তাই জুলাই সনদ পাস হলে এই সরকারের কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী হতে যাওয়া আসন্ন গণভোটে প্রথম প্রশ্নটিতেই রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গ। প্রশ্নটি হচ্ছে— নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
যদি ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে মত দেন, তাহলে ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে না।
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গঠনের প্রক্রিয়াটি বেশ ‘দীর্ঘ’। সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বলা হয়েছে—
সংবিধান সংশোধন করে নিম্নরূপ বিধান সংযুক্ত করা হবে:
(১) মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনও কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
(২) সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮খ সংশোধনপূর্বক সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ১৫ দিন আগে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনও কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
(৩) মেয়াদ অবসানের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ৩০ দিন আগে আইনসভার নিম্নকক্ষের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায়— (১) প্রধানমন্ত্রী, (২) বিরোধীদলীয় নেতা, (৩) স্পিকার, (৪) ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) এবং (৫) সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি— (যদি সংসদে আসন সংখ্যার বিবেচনায় একাধিক দল দ্বিতীয় বৃহত্তমবিরোধী দলের অবস্থানে থাকে তাহলে সেসব দলের মধ্য থেকে নির্বাচনে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোটপ্রাপ্ত দলটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত হবে) মোট ৫ সদস্য সমন্বয়ে একটি ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ গঠিত হবে। কমিটির যেকোনো বৈঠক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদের স্পিকার সভাপতিত্ব করবেন।
(৪) কমিটি গঠিত হওয়ার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো এবং জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র সদস্যদের কাছ থেকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮গ(৭)-এ বর্ণিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির নাম প্রস্তাবের আহ্বান করবে এবং এক্ষেত্রে প্রতিটি দল একজন এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য একজন মাত্র ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে পারবেন।
(৫) রাজনৈতিক দলগুলো এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে তাদের প্রস্তাবিত নাম দাখিল করবে। কমিটি নিজ উদ্যোগেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তির নাম অনুসন্ধান ও অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
(৬) পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটির সদস্যরা সভায় মিলিত হয়ে নিজেদের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলো ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে প্রস্তাবিত নামগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করত বাংলাদেশের যেসব নাগরিক সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮গ(৭)-এর অধীনে উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য তাদের মধ্য হতে একজনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবেন এবং তিনি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন।
(৭) বাছাই কমিটি গঠিত হওয়ার পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার মধ্যে এ পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে চূড়ান্ত করা সম্ভব না হলে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য অনুচ্ছেদ ৫৮গ-এ বর্ণিত শর্ত অনুসরণপূর্বক সংসদের সরকারি দল/জোট ৫ জন উপযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে এবং প্রধান বিরোধী দল/জোট ৫ জন উপযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে।
এছাড়া, সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল ২ জন উপযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে। যদি সংসদে আসন সংখ্যার বিবেচনায় একাধিক দল দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের অবস্থানে থাকে তাহলে সেসব দলের মধ্যে নির্বাচনে সর্বোচ্চ পরিমাণ ভোটপ্রাপ্ত দলটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত হবে। উপর্যুক্ত প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত নামগুলো স্পিকার জনসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করবেন।
(৮) উপর্যুক্ত দফা (৭)-এ বর্ণিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি দল/জোটের প্রস্তাবিত ৫ জন ব্যক্তির নামের তালিকা হতে প্রধান বিরোধী দল/জোট যেকোনো একজনকে বেছে নেবে; অনুরূপভাবে প্রধান বিরোধী দল প্রস্তাবিত ৫ জন ব্যক্তির নামের তালিকা থেকে সরকারি দল যেকোনো একজনকে বেছে নেবে। দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রস্তাবিত মোট ২ জনের নামের তালিকা থেকে সরকারি দল/জোট যেকোনো একজনকে বেছে নেবে এবং প্রধান বিরোধী দল/জোট যেকোনো একজনকে বেছে নেবে। এই পদ্ধতিতে প্রাপ্ত নামগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একজনের ব্যাপারে যদি প্রস্তাবকারী দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তিনিই পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত হবেন। অথবা কোনও একজনের ব্যাপারে কমিটির ৫ জন সদস্যের মধ্যে যদি ৪ জন সদস্য একমত হন তাহলে তিনিই পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হবেন।
(৯) যদি উপর্যুক্ত পদ্ধতিতে কোনও একজনের বিষয়ে প্রস্তাবকারী পক্ষগুলো একমত হতে না পারে তাহলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার বিভাগের দুইজন প্রতিনিধি বাছাই কমিটিতে সদস্য হিসেবে যুক্ত হবেন; তবে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কারও নাম প্রস্তাব করতে পারবেন না। উক্ত দুইজন প্রতিনিধির মধ্যে একজন আপিল বিভাগের বিচারপতি হবেন এবং একজন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হবেন। উক্ত দুইজন বিচার বিভাগীয় প্রতিনিধিকে মনোনীত করার জন্য— (১) সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, (২) কর্মরত প্রধান বিচারপতি এবং (৩) আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি সমন্বয়ে ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠিত হবে।
(১০) এই পর্যায়ে ৭ সদস্যবিশিষ্ট উক্ত বাছাই কমিটির সদস্যরা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্পিকারের তত্ত্বাবধানে গোপন ব্যালটে ‘র্যাংকড চয়েজ’ বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে উক্ত সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে যেকোনো একজনকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবেন।
(১১) উপর্যুক্ত যেকোনো পদ্ধতিতে মনোনীত ব্যক্তিকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রপতি পরবর্তী ৯০ দিনের জন্য প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেবেন; তবে শর্ত থাকে যে, সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় তিনি শপথ গ্রহণ করবেন না।
(১২) উপর্যুক্ত পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমেও যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেওয়া সম্ভব না হয় তাহলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণ করতে হবে; তবে শর্ত থাকে যে, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বেছে নেয়া যাবে না।
(১৩) কোনও কারণে প্রধান উপদেষ্টার পদ শূন্য হলে রাষ্ট্রপতি অবিলম্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য পূর্ববর্তী র্যাংকড চয়েজ বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বয়সে জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেবেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বয়সে জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি জানালে অথবা দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে র্যাংকড চয়েজ বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতিতে পরবর্তী স্থানে থাকা ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য নিযুক্ত হবেন। এই পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা পদে পরিবর্তন হলেও উপদেষ্টা পরিষদ বহাল থাকবে। তবে উপদেষ্টা পরিষদের কোনও পদ শূন্য হলে নবনিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টা সেই শূন্য পদ পূরণের অধিকার রাখবেন।
(১৪) নিয়োগলাভের পর প্রধান উপদেষ্টা উপর্যুক্ত বাছাই কমিটির সঙ্গে পরামর্শক্রমে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮গ(৭)-এ বর্ণিত উপযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে অনধিক ১৫ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের জন্য বেছে নেবেন এবং রাষ্ট্রপতি তাদের নিয়োগ দেবেন।
(১৫) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনও কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় বিলুপ্ত সংসদের একই ধরনের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ গঠিত হবে এবং উক্ত কমিটি পরবর্তী ১৪ দিন তথা ৩৩৬ ঘণ্টার মধ্যে উক্তরূপ অভিন্ন পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবে এবং তিনি অবিলম্বে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হবেন।
(১৬) সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮গ(৭)(ঘ) সংশোধনপূর্বক ‘বাহাত্তর বৎসরের অধিক বয়স্ক নহেন’ শব্দগুলো পরিবর্তে ‘পঁচাত্তর বৎসরের অধিক বয়স্ক নহেন’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে।
(১৭) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন এবং উপদেষ্টারা মন্ত্রীর পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।
(১৮) সংবিধানে বর্ণিত বিধানাবলি সাপেক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব, কর্তব্য, এখতিয়ার ও অবসানের সময়সীমা নির্ধারিত হবে।
(১৯) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ হবে অনধিক ৯০ দিন। তবে দৈব-দুর্বিপাকের কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আরও সর্বোচ্চ ৩০ দিন দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
(২০) নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী যে তারিখে তার পদের কার্যভার গ্রহণ করবেন সেই তারিখে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হবে।
(২১) ত্রয়োদশ সংশোধনীর অনুচ্ছেদ ৫৮গ(২)-এর বিধানে উল্লিখিত ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
Reporter Name 



















