ঢাকা ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কৃষকরা খাচ্ছে কি খাচ্ছে না, সেটা দেখা দরকার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৪:৪১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুন ২০১৬
  • ৪৪৪ বার

গড়পড়তা বাজেটে যেটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় সেটা হলো—জাতীয় অর্থনীতিটা চাঙ্গা হয় সাধারণভাবে। সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখা উচিত—যে বিরাটসংখ্যক মানুষ আছে যারা নিরক্ষরই হোক আর যাই হোক না কেন, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাটা দরকার। প্রতিবছরই আমি দেখছি বাজেট দেওয়া হয় বটে কিন্তু কই নতুন কর্মসংস্থান হয় না তো! কর্মসংস্থান হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষিত মহলেও দেখছি আমি, যারা উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছে তারাও কিন্তু সেই অর্থে কর্মসংস্থানের খবর পাচ্ছে না। এটা বলা যায় খুব দুর্বল জায়গা। এই কর্মসংস্থানের ব্যাপারে বাজেট দেওয়ার পরে বা আগে ভাবনাচিন্তা আছে বলে মনে হয় না। এসব জিনিস খুব ভালো যে দেশের খাদ্যশস্য যা আছে তা নাকি স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাইরে থেকে খাদ্যশস্য আনতে গেলে তার ওপর কর বসানো হবে। হতে পারে, সেটা দরকার; কারণ নিজের দেশে উৎপাদন যখন যথেষ্ট পরিমাণ হয়। তারপর সুদের হার যে কমাচ্ছে, সুদের হার কমানোর ফলে আমাদের দেশে যারা অনেক টাকা ব্যাংকে রাখেন, তাঁদের যে সুদ দেওয়া হয় সেটা যদি কম দেওয়া হয় তাহলে গভর্নমেন্টের সামর্থ্য তো বেড়েই যাবে আর কি।

কই বাংলাদেশে তেমন তো ইন্ডাস্ট্রি দেখি না, ইনফ্রাস্ট্রাকচার সেভাবে নেই। পোশাকশিল্প তো সেই অর্থে মৌলিক শিল্পও নয়। এখন শুনছি, পোশাকশিল্পের প্রতিও সরকারের ঠিক যতটা মনোযোগ দরকার ততটা দিচ্ছে না বাজেটে। রাজস্ব আদায়টা প্রতিবছরই বলা হয়, এত লোককে রাজস্ব আদায়ের আওতায় আনা হয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় রাজস্ব আদায়ে প্রথম দুই-তিন মাসে যে কর্মতত্পরতা বেড়ে যায়, পরে আর থাকে না।

দেশটা চালাতে গেলে যে অর্থ লাগবে জনগণ তো সেই অর্থটা দেয় আর কি। এর মধ্যে যারা উচ্চস্তরে আছে, তাদের হাতে বেশির ভাগ সম্পদ কুক্ষিগত আছে। তারা যদি রাজস্ব ফাঁকি দেয়, তাহলে সরকার তো একেবারে শূন্য হয়ে যাবে। গরিব মানুষের তো অত কর দেওয়ার সাধ্য নেই, সামর্থ্যও নেই। গরিব মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় যে বস্তুগুলো আছে, সেগুলোর কর আরো কমিয়ে দেওয়া উচিত। যে জন্য দেশের বাজারের দিকে তাকাতে হবে। বাজারের দ্রব্যগুলোকে বিভিন্নভাবে ভাগ করে যেটির দাম একটু বাড়লে প্রচুরসংখ্যক মানুষের অসুবিধা হবে, তার দাম কমাতে পারলে ভালো। এটা যদি করতে পারা যায় অনেক ভালো। আর যেসব দ্রব্যের প্রয়োজন সীমিত, খুব কম এবং মোটামুটিভাবে উচ্চবিত্ত মানুষের ব্যবহার্য সেগুলোর কর একটু বাড়তেও পারে। আর একটা কথা, সিনিয়র সিটিজেন বলে আমাদের এখানে সেভাবে কোনো ব্যবস্থা নেই। কতগুলো আছে ওই দরিদ্র, বৃদ্ধ হেনতেন তাঁদের জন্য কিছু ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু সিনিয়র সিটিজেন বলে একটা জিনিসই থাকা উচিত। সব দেশেই আছে। যেমন অন্যান্য দেশে দেখি, তাঁরা অগ্রাধিকার পান সর্বত্রই। তাঁরা ট্রেনের টিকিট পান অর্ধেক দামে, প্লেনের টিকিট পান অর্ধেক দামে, ওষুধের দাম পান, চিকিৎসা ফ্রি—এসব নানা সুবিধা আছে। যাঁদের বয়স ৬৫ হয়ে গেছে, তাঁদের জন্য এগুলো করা উচিত।

সুদের হার কমানোর ফলে যাঁরা পেনশনভোগী তাঁরা বিপদে আছেন। এঁদের ওপর যদি নতুন করে করারোপ করা হয়, তাহলে দুরবস্থা বেড়ে যাবে। সিনিয়র সিটিজেনের প্রস্তাবটা কে দেবেন জানি না, তবে বাজেটে এই ভাবনাগুলো থাকা দরকার। এ ব্যবস্থার জন্য যে কমতি হবে, সেটা অন্য খাত থেকে মানে চাপটা উচ্চবিত্ত যাদের বেশি উদ্বৃত্ত থাকে, সেখানে যদি বেশি হয় তাহলে আমার আপত্তি থাকবে না। চাপ যদি নিম্নমধ্যবিত্ত এবং জনগণের ওপর হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আগের চেয়ে বেশি হয়, সেটা ঠিক হবে না। এর সঙ্গে দেশের জনগণের জন্য ভেজালমুক্ত খাবার, দূষণমুক্ত বাতাস, দূষণমুক্ত পানীয়—এগুলো তো সম্পূর্ণ দেখার দায়িত্ব আছে। জনকল্যাণের জন্য বাজেটে এসব বিষয় থাকা জরুরি।

বাজেটে যেন ভারসাম্য নষ্ট না হয়, বড় বাজেট হোক আর ছোট বাজেট হোক। বড় বাজেট হলে বিদেশি সাহায্য-ঋণের প্রতি নির্ভরশীল হতে হয়। বিদেশিরা যে সাহায্য দেয়, তা আমাদের দয়া করে দেয় না, তারা যা দেয় তার চাইতে অনেক বেশি নিয়ে নেয়। আমাদের সে চেষ্টাই দরকার যাতে বিদেশি সাহায্য বেশি নিতে না হয়। দেশের সম্পদের ওপরই নির্ভর করে বাজেট হওয়া উচিত। সাধারণভাবে বাজেট হওয়া উচিত ১৬ কোটি মানুষকে সামনে রেখে।

বাজেটে বড়লোকদেরও সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। যে যে জায়গায় তাদের সুবিধা দিলে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হবে না সেখানে দেওয়া যায়। খুব জরুরি জিনিস যেমন নতুন ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া যায়। মনে রাখা দরকার, কৃষক যেন না ঠকে, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু কৃষক কে—জমির মালিক নাকি ভাগচাষি (বর্গাচাষি)? আমরা গড়পড়তা ‘কৃষকদের’, ‘কৃষকদের’ বলি—এই কৃষকদের বলতে কাদের বোঝায়? জমির মালিক যারা চাষাবাদ করে সেই কৃষক নাকি বহুলোক যারা পানি, মেশিন কেনে, অন্যের জমিতে ভাগচাষ করে? এখন এসব ভাববার সময় এসেছে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান বারবার আমাদের বলতেন, আরে বাবা দেশ আছে তো কৃষকদের ওপর, ওরা খেতে দেয় বলেই আমরা খেতে পারি। যারা আমাদের খেতে দিচ্ছে তারা নিজেরা খাচ্ছে কি খাচ্ছে না—সেটাও তো দেখার দরকার আছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

কৃষকরা খাচ্ছে কি খাচ্ছে না, সেটা দেখা দরকার

আপডেট টাইম : ০৪:৪১:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুন ২০১৬

গড়পড়তা বাজেটে যেটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় সেটা হলো—জাতীয় অর্থনীতিটা চাঙ্গা হয় সাধারণভাবে। সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখা উচিত—যে বিরাটসংখ্যক মানুষ আছে যারা নিরক্ষরই হোক আর যাই হোক না কেন, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাটা দরকার। প্রতিবছরই আমি দেখছি বাজেট দেওয়া হয় বটে কিন্তু কই নতুন কর্মসংস্থান হয় না তো! কর্মসংস্থান হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষিত মহলেও দেখছি আমি, যারা উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছে তারাও কিন্তু সেই অর্থে কর্মসংস্থানের খবর পাচ্ছে না। এটা বলা যায় খুব দুর্বল জায়গা। এই কর্মসংস্থানের ব্যাপারে বাজেট দেওয়ার পরে বা আগে ভাবনাচিন্তা আছে বলে মনে হয় না। এসব জিনিস খুব ভালো যে দেশের খাদ্যশস্য যা আছে তা নাকি স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাইরে থেকে খাদ্যশস্য আনতে গেলে তার ওপর কর বসানো হবে। হতে পারে, সেটা দরকার; কারণ নিজের দেশে উৎপাদন যখন যথেষ্ট পরিমাণ হয়। তারপর সুদের হার যে কমাচ্ছে, সুদের হার কমানোর ফলে আমাদের দেশে যারা অনেক টাকা ব্যাংকে রাখেন, তাঁদের যে সুদ দেওয়া হয় সেটা যদি কম দেওয়া হয় তাহলে গভর্নমেন্টের সামর্থ্য তো বেড়েই যাবে আর কি।

কই বাংলাদেশে তেমন তো ইন্ডাস্ট্রি দেখি না, ইনফ্রাস্ট্রাকচার সেভাবে নেই। পোশাকশিল্প তো সেই অর্থে মৌলিক শিল্পও নয়। এখন শুনছি, পোশাকশিল্পের প্রতিও সরকারের ঠিক যতটা মনোযোগ দরকার ততটা দিচ্ছে না বাজেটে। রাজস্ব আদায়টা প্রতিবছরই বলা হয়, এত লোককে রাজস্ব আদায়ের আওতায় আনা হয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় রাজস্ব আদায়ে প্রথম দুই-তিন মাসে যে কর্মতত্পরতা বেড়ে যায়, পরে আর থাকে না।

দেশটা চালাতে গেলে যে অর্থ লাগবে জনগণ তো সেই অর্থটা দেয় আর কি। এর মধ্যে যারা উচ্চস্তরে আছে, তাদের হাতে বেশির ভাগ সম্পদ কুক্ষিগত আছে। তারা যদি রাজস্ব ফাঁকি দেয়, তাহলে সরকার তো একেবারে শূন্য হয়ে যাবে। গরিব মানুষের তো অত কর দেওয়ার সাধ্য নেই, সামর্থ্যও নেই। গরিব মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় যে বস্তুগুলো আছে, সেগুলোর কর আরো কমিয়ে দেওয়া উচিত। যে জন্য দেশের বাজারের দিকে তাকাতে হবে। বাজারের দ্রব্যগুলোকে বিভিন্নভাবে ভাগ করে যেটির দাম একটু বাড়লে প্রচুরসংখ্যক মানুষের অসুবিধা হবে, তার দাম কমাতে পারলে ভালো। এটা যদি করতে পারা যায় অনেক ভালো। আর যেসব দ্রব্যের প্রয়োজন সীমিত, খুব কম এবং মোটামুটিভাবে উচ্চবিত্ত মানুষের ব্যবহার্য সেগুলোর কর একটু বাড়তেও পারে। আর একটা কথা, সিনিয়র সিটিজেন বলে আমাদের এখানে সেভাবে কোনো ব্যবস্থা নেই। কতগুলো আছে ওই দরিদ্র, বৃদ্ধ হেনতেন তাঁদের জন্য কিছু ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু সিনিয়র সিটিজেন বলে একটা জিনিসই থাকা উচিত। সব দেশেই আছে। যেমন অন্যান্য দেশে দেখি, তাঁরা অগ্রাধিকার পান সর্বত্রই। তাঁরা ট্রেনের টিকিট পান অর্ধেক দামে, প্লেনের টিকিট পান অর্ধেক দামে, ওষুধের দাম পান, চিকিৎসা ফ্রি—এসব নানা সুবিধা আছে। যাঁদের বয়স ৬৫ হয়ে গেছে, তাঁদের জন্য এগুলো করা উচিত।

সুদের হার কমানোর ফলে যাঁরা পেনশনভোগী তাঁরা বিপদে আছেন। এঁদের ওপর যদি নতুন করে করারোপ করা হয়, তাহলে দুরবস্থা বেড়ে যাবে। সিনিয়র সিটিজেনের প্রস্তাবটা কে দেবেন জানি না, তবে বাজেটে এই ভাবনাগুলো থাকা দরকার। এ ব্যবস্থার জন্য যে কমতি হবে, সেটা অন্য খাত থেকে মানে চাপটা উচ্চবিত্ত যাদের বেশি উদ্বৃত্ত থাকে, সেখানে যদি বেশি হয় তাহলে আমার আপত্তি থাকবে না। চাপ যদি নিম্নমধ্যবিত্ত এবং জনগণের ওপর হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আগের চেয়ে বেশি হয়, সেটা ঠিক হবে না। এর সঙ্গে দেশের জনগণের জন্য ভেজালমুক্ত খাবার, দূষণমুক্ত বাতাস, দূষণমুক্ত পানীয়—এগুলো তো সম্পূর্ণ দেখার দায়িত্ব আছে। জনকল্যাণের জন্য বাজেটে এসব বিষয় থাকা জরুরি।

বাজেটে যেন ভারসাম্য নষ্ট না হয়, বড় বাজেট হোক আর ছোট বাজেট হোক। বড় বাজেট হলে বিদেশি সাহায্য-ঋণের প্রতি নির্ভরশীল হতে হয়। বিদেশিরা যে সাহায্য দেয়, তা আমাদের দয়া করে দেয় না, তারা যা দেয় তার চাইতে অনেক বেশি নিয়ে নেয়। আমাদের সে চেষ্টাই দরকার যাতে বিদেশি সাহায্য বেশি নিতে না হয়। দেশের সম্পদের ওপরই নির্ভর করে বাজেট হওয়া উচিত। সাধারণভাবে বাজেট হওয়া উচিত ১৬ কোটি মানুষকে সামনে রেখে।

বাজেটে বড়লোকদেরও সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। যে যে জায়গায় তাদের সুবিধা দিলে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হবে না সেখানে দেওয়া যায়। খুব জরুরি জিনিস যেমন নতুন ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়া যায়। মনে রাখা দরকার, কৃষক যেন না ঠকে, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু কৃষক কে—জমির মালিক নাকি ভাগচাষি (বর্গাচাষি)? আমরা গড়পড়তা ‘কৃষকদের’, ‘কৃষকদের’ বলি—এই কৃষকদের বলতে কাদের বোঝায়? জমির মালিক যারা চাষাবাদ করে সেই কৃষক নাকি বহুলোক যারা পানি, মেশিন কেনে, অন্যের জমিতে ভাগচাষ করে? এখন এসব ভাববার সময় এসেছে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান বারবার আমাদের বলতেন, আরে বাবা দেশ আছে তো কৃষকদের ওপর, ওরা খেতে দেয় বলেই আমরা খেতে পারি। যারা আমাদের খেতে দিচ্ছে তারা নিজেরা খাচ্ছে কি খাচ্ছে না—সেটাও তো দেখার দরকার আছে।