,

আমরা গাও গেরামের মানুষ 

 ড. গোলসান আরা বেগমঃ আমরা গাও গেরামের মানুষ কিচির মিচির পাখীর ডাক শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি। আবার কাঁচা রোদ ছড়িয়ে সুর্য ওঠার আগেই জেগে ওঠি। মাটির ক্যানভাসে ওল্টাই নিত্যদিনে চাদর। ভাত, ডাল, তেল,লবণ, লংকা যোগার করতে করতেই সারা দিনের জীবন শেষ হয়ে যায়। বাড়তি চিন্তা করার সময় পাই না।।
শীত কালে কুয়াশার চাদর মাথায় নিয়ে কৃষক ভাইয়েরা নেমে য়ায় কৃষি কাজে হাঁটু পানির কাদা মাঠে। কেউ রোপন করে বোর ধান, কেউবা অন্য ফসলী জমিতে কাজ করে। কৃষানী বোনেরা সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার নিয়ে আসে,যা জমির কিনারে বসে খায়।এসি ঘরে বড় হওয়া শিশুটি কোন দিন কি এ দৃশ্য কল্পনা করতে পারবে। তারা শ্বেত পাথরের টেবিলে বসে খায় সকালের ব্যাকফাষ্ট,দুপুরের লাঞ্চ, রাতের ডিনার।
গাও গেরামের মানুষরা ব্যাকফাষ্ট,লাঞ্চ,ডিনার, ফাস্ট ফুড, রিচফুড শব্দগুলোর মানেও জানে না। অনেকেই হয়তোবা জীবনে এই শব্দগুলো শোনে নাই।এই হলো আমাদের গাও গেরামের মানুষ ও শহরের জীবনে আঁকা বৈষ্যমের সীমা রেখা।
আমরা গাও গেরামের মানুষ নানা যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে বসবস করি। কোলের শিশু বড় হলে তাকে কোথায় পড়া শোনা করাবো, কি পড়ারো, তা ভালো ভাবে বুঝি না। পাশের বাড়ীর মসজিদের হুজুর আসে ঘন ঘন। ছেলেমেয়ের বাবা মাকে বলে  আমাদের হেফজ খানায় তোমাদের সন্তাকে দিয়ে দাও। খাওয়া দাওয়া, পড়া শোনার সব দায়িত্ব আমরা বহন করবো। তোমাদের কোন টেনশান করতে হবে না। তোমার সন্তান হাফেজ হলে তোমাদের সাত পুরুষ বেহেশত পাবে।
বাবা মা কতক্ষণ নীরবে ভাবে আর মনে মনে বলে মন্দ নয় তো হুজুরের পরামর্শ। আমরা তিন বেলা খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারি না, সন্তানের পড়শোনা করাবো কি ভাবে।তাছাড়া জেনে বা না জেনে জীবনে অনেক পাপই তো করেছি। সন্তান হাফেজ হলে যদি আল্লাহ র দরবারে অর্থ্যাৎ জান্নাতে যেতে পারি তাহলে, হেফজখানায় পড়ানো তো উত্তম কাজ। দেরী না করে পর দিনই সন্তানকে হুজুরের কাছে নিয়ে যায়।সেই থেকে কোরআন শরিফ মুখস্থ করার বিদ্যায় লেগে যায় সন্তারা। টুপি পাঞ্জাবি পড়ায় অব্যস্থ হয়। শুক্রবার দিন ছুটিতে বাড়ি এলে খুব আদর যত্ন করে ভালো মন্দ খাওয়ায়ে,আবার  দিয়ে আসে হেফজ খানায়।
আমাদের দেশে ধর্ম প্রিয় মানুষরা অলিতে গলিতে গড়ে তুলছে হেফজখানা। প্রায় অধিকাংশ অভিভাবকরা তাদের শিশুকে আরবী লাইনের শিক্ষায় ভর্তি করছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যহত ধাকলে, আগামী দশ পনের বছর পর, সাধারন লাইনে পড়ার শিক্ষার্থীর সংখা কাম্য হারেরও অত্যান্ত নীচে নেমে আসবে। শিক্ষার্ক্ষীর অভাবে সরকারী বেসরকারী ভাবে গড়ে ওঠা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু কিছু ডিপার্টমেন্ট হা হা কার করবে। যা জাতীয় উন্নয়নে বিরুপ প্রভাব ফেলবে। এখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে চিন্তা করা ও সিদ্বান্ত নেয়া দরকার।
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম — এই গানে টান দিলে বুঝা যায়া আগেকার গ্রাম্য জীবন ব্যবস্থা ছিলো কতো মধুর ও সাম্যের। হিংসা,বিদ্বেস,,বৈষস্য,ভেদাভেদ ছিলো  না।একের দুঃখে বা বিপদে অপরে এগিয়ে রাখতো হাত পা।আর এখনকার কথা নাইবা বললাম। শিক্ষার হার বেড়েছে, মানুষ পৌঁছে গেছে চাঁদে,।পাড়ি জমাচ্ছে মহশুণ্যে।তন্ন তন্ন করে খোঁজছে সৃস্টির রহস্য। আর এ যুগেও আমাদের গাও গেরামের মানুষ তাবিজ, কবজ, ঝার,ফু, দরগার, কবিরাজি তুক ফুকে,ভাগ্য রেখায় বিশ্বাস করে।
মানুষ এখনও বিশ্বাস করে দরগায়,মসজিদে,হুজুরের নামে মানত করলে মনোবাসনা পূর্ণ হবে,কঠিন দুরারোগ্য ব্যাধি ভালো হয়ে যাবে।।এ কারনেই কিশোরগঞ্জ জেলার সদর থানার পাগলা মসজিদের দান বাক্সে বিভিন্ন মানুষরা মানত করে কোটি কোটি জমা দিয়ে যায়। প্রতি তিন মাস অন্তর দান বাক্সের তালা খুললে তিন কোটি টাকার বেশী পরিমান মানত টাকা পাওয়া যায়। আদিকালের কুসংস্কার ক্রমাগত হারে কমে আসলেও পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারছে না মানুষ।
আমাদের গ্রাম্য সংস্কৃতিতে এসেছে  আমূল পরিবর্তন। অনলাইনের গ্লোবাল বিশ্বের রিমুটে চাপ দিলে যে কোন দেশের বিনোদন  উপভোগ করা যায়। রোগ বালাই সম্পর্কেও ধারনা পেতে পারে।কৃষক তার ক্ষেতের কিনারে বসে মোবাইলে জানতে পারে কোন ফসলে কোন কিটনাশক ব্যবহার করবে,চাষাবাদ কিভাবে করবে।উৎপাদিত কোন সবজি কোন দেশে রপ্তানি করবে। আরো কতো সুবিধাদি পৌঁছে গেছে গ্রামের মানুষের নখের দোর গোড়ায়।
গাও গেরামে আজকাল (২০২২ সালের কথা বলছি) কাঁচা রাস্তা নেই বললেই চলে।ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে পল্লী,সৌর বিদুৎ।গড়ে ওঠেছে হাঁসমুরগী,গরুছাগলের খামার। মাছ চাষের খামার করে চাষীরা হচ্ছে অথর্নৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী। কুটির শিল্পের প্রসারও বেড়েছে পল্লী অঞ্চলে। মেয়েরা দল বেঁধে চলে আসছে শহরের পোশাক শিল্পে কাজ করতে। বাড়িতে গড়ে তুলছে বুটিক শিল্পের কারখানা। প্রতিটি গ্রামে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিকা বিদ্যালয়,  সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, কৃষি অফিস, গ্রাম্য আদালত, তথ্য অফিস কেন্দ্র। গ্রামে বসে আউট সোর্সিং পদ্ধিতে দেশ বা বিদেশ থেকে করছে অর্থ উপার্জন।আশে পাশের প্রতষ্ঠানে পড়াশোনা করে ছেলেমেয়েরা গ্রহন করছে উচ্চ শিক্ষা। অঞ্জতা, কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসছে গ্রাম্য সংস্কৃতি ও জীবন যাত্রা।গ্রামে গড়ে ওঠছে ইট সিমেন্টের ভৌত অবকাঠামো।গ্রাম পরিনত হচ্ছে শহরের আদলে মিনি শহরে।
গ্রামের হাট বাজারে বা টং দোকানে চলে গভীর রাত অবধি চায়ের আড্ডা ও গল্পের আসর। তারা টেলিভিশান দেখে ও রাজনীতি গোষ্ঠি ইদ্ধার করে।কোন দল বা সরকার কি করছে তা বলতে বলতে তুনা ধূলা করে ফেলে। সরকারকে প্রতিদিন এক বার ক্ষমতা থেকে নামায় ও ওঠায়। কথায় কথায় এর মাধায় ওভাঙ্গে কাঁঠাল। সরকার,মেম্বার,চেয়ারম্যান নিবর্চনেও রাখে অগ্রনী ভূমিকা।এ পক্ষ ও পক্ষ দুই পক্ষকে ভোট দেয়ার ওয়াদা করে।কিন্তু যে পক্ষ বেশী তৈল মর্দন করে, তাকেই ভোট দেয়।
আমরা গাও গেরামের মানুষ সাদা ফর্সা পূর্ণিমার চাঁদকে বুকে নিয়ে ঘুমাই। অমাবষ্যার রাতে জোনাক ধরে আনন্দ পাই।আকাঁ বাকাঁ নদীর বুকে পাল তুলা নাও হেলে দোলে চলে। গভীর রাতে বউ কথা কও পাখী, হুক্কা হুয়া শিয়ালের কান্না,দুধেল গাইয়ের বাছুরের লেজ উছিয়ে দৌঁড় খুব ভালো লাগে। আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করি না কেন, শস্য শ্যামল কারুকার্যময় গ্রামই আমাদের প্রিয় প্রাণ।
লেখকঃ উপদেষ্টা সদস্য, বাংলাদেশ কৃষকলীগ,কেন্দ্রীয় কমিটি।
Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর