,

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর স্নেহধন্য স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কূটনৈতিক  জীবনের শুরুতে জাতির পিতার সান্নিধ্য:
মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তাঁর কূটনৈতিক জীবনে জাতির পিতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সুযোগ লাভ করেন। ইতালির রাজধানী  রোমে দ্বিতীয় সচিব বা সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালে সরকারি কাজে ইতালি সফরে যান। তাঁর সাথে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা জহির উদ্দিন। তারা দুজন তখন পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য। সেসময় পাকিস্তান সরকার উচ্চমূল্যে ইতালি থেকে চাল কেনার জন্য চুক্তি করতে যাচ্ছিল। শ্রীলঙ্কা ইতালি থেকে অপেক্ষাকৃত কমদামে চাল কিনছে বলে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু পার্লামেন্টে হৈচৈ করলে পাকিস্তান সরকার চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
যুদ্ধজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ে কূটনীতিক তৎপরতা শুরু করেন। তাঁর বিচক্ষণতায় ৩৪টি দেশ স্বল্প সময়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে।” (উদ্ধৃতি শেষ)
নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হিসেবে তিনি প্রবাসী মুজিবনগর সরকার এবং ভারতীয় সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন। তিনি প্রায়শঃ মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন পরিদর্শনে যেতেন এবং জাতির পিতার পক্ষ থেকে একদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দিতেন, অন্যদিকে যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে কূটনৈতিক কোরের সহকর্মীদের আপডেট করতেন।
সে সময় তিনি খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চলমান একটি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে অবহিত করেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সন্দেহ ছিল পররাষ্ট্র সার্ভিসের কুচক্রী কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম চাষী ও অন্যান্যরা খন্দকার মোশতাককে নিয়ে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশনের ষড়যন্ত্র করতে পারে। তার ধারণা সত্য হবার প্রমাণ পেলে তিনি তা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন। যার ফলে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মোশতাক গংদের ষড়যন্ত্র বানচাল করতে সক্ষম হন।
মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত জয়লাভের পর হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ভারতীয় পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে বক্তৃতা প্রদানের বিরল সম্মান অর্জন করেন। তিনি অধিবেশনকক্ষে পৌঁছার পর উভয় কক্ষের সদস্যদের তুমুল করতালির মধ্যে  লোকসভার স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে সকলের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন।
বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, একদিন সাক্ষাৎ করতে গেলে আরও কয়েকজন অভ্যাগতের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্রশ্ন করেন: চৌধুরী সাহেব, আপনি তো ভারতে থাকাকালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে সফলভাবে দেশ পরিচালনা করতে দেখেছেন। বলুন তো, মিসেস গান্ধীর সাফল্যের ম্যাজিক কি? জবাবে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বলেছিলেন: বঙ্গবন্ধু, মিসেস গান্ধী বিভিন্ন বিষয়ে তাঁকে পরামর্শ প্রদানের জন্য একদল অত্যন্ত সুযোগ্য উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। তারাই তাঁকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এবং সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে থাকেন। বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন বলে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী অনুমান করেন। তিনি আরও বলেন, আশু রোগমুক্তির জন্য বিশ্রামে থাকার সময়ও বঙ্গবন্ধু সারাক্ষণ দেশ নিয়ে ভাবতেন। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, জাতিসংঘের সদস্য হওয়া, পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের প্রত্যাবাসন, উন্নত বিশ্বের দেশগুলো থেকে সহযোগিতা অর্জন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করতেন। দেশে ফেরার আগে তিনি ইউরোপে নিযুক্ত সকল রাষ্ট্রদূতদের বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন। জেনেভায় থাকাকালে তিনি জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রধান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সাথে সাক্ষাৎ দেন।
পিতাকে নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করতেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আক্ষেপ করতেন, যে নেতার জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না, বাংলাদেশে স্বাধীন সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠিত হতো না, সেই মহান নেতাকে নিয়ে কোনো ধরনের অহেতুক বিতর্ক হোক তা কাম্য নয়। স্পিকার এ ধরনের বিতর্ককে অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বিবেচনা করতেন বিধায় তিনি আইনগতভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি নিরসনের উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সাংবিধানিকভাবে জাতির পিতা সে বিষয়ে একটি রুলিং প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এজন্যে তিনি বাংলাদেশ সংবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেন। তিনি পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করেন যে, পঁচাত্তর পরবর্তী সরকারগুলো সকলের অগোচরে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জাতির পিতা সম্পর্কিত বিধানগুলো বাদ দিয়ে সংবিধানের নতুন সংস্করণ মুদ্রণ করেছে। এ ব্যাপারে তাঁকে তৎকালীন মাননীয় ডেপুটি স্পিকার (বতর্মান মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব  মোঃ আব্দুল হামিদ), মাননীয় চিফ হুইপ (জনাব আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ্ এমপি), আইন মন্ত্রী  জনাব আব্দুল মতিন খসরু এবং প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান এডভোকেট রহমত আলী এমপি এবং সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে পঁচাত্তর পরবর্তী সরকারসমূহের অপপ্রয়াসের বিষয় তুলে ধরতে এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখেছি। তিনি আমাদের নির্দেশ  দেন অবিলম্বে পঁচাত্তর ট্র্যাজেডিপূর্ব সংবিধানের সকল সংস্করণ সংগ্রহের যা তিনি তাঁর চেম্বারে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার পর স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ তারিখের বৈঠকে তাঁর ঐতিহাসিক রুলিং প্রদান করেন:
নবজাগরণ চলছিল এবং দুটি সংস্থা যথা: ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) এবং কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এসোসিয়েশন (সিপিএ)-এর আওতায় নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক সংসদীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মাননীয় স্পিকার ও মাননীয় ডেপুটি স্পিকার পালাক্রমে দুটি ফোরামে সংসদীয় প্রতিনিধিদলসহ অংশগ্রহণ শুরু করেন। তাঁরা এসব ফোরামে জাতির পিতার রাজনৈতিক আদর্শ, তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, ১৯৭৫ সালের শোকাবহ আগস্টের  নারকীয় হত্যাকান্ড এবং দীর্ঘ ২১ বছর পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার   নেতৃত্বে সরকার গঠন করে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের প্রয়াস সম্পর্কে বিশ্ব সম্প্রদায়কে অবহিত করেন।
এ সময় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ও অন্যান্য পার্লামেন্টের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত এবং সংসদীয় প্রতিনিধিদল বিনিময় হয়। এসব প্রতিনিধিদলের সাথে সাক্ষাৎকালেও মাননীয় স্পিকার জাতির পিতার আদর্শ, বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা এবং নিপীড়িত জনগণের মুক্তির জন্য স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও সাফল্য সম্পর্কে অবহিত করতেন।
ঢাকাস্থ বিদেশি রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনাররাও নিয়মিতভাবে মাননীয় স্পিকারের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন। মাননীয় স্পিকার তাদের কাছেও জাতির পিতার রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পটভূমি তুলে ধরতেন। তাঁর অসাধারণ বাচনভঙ্গি ও বিশুদ্ধ ইংরেজিতে জাতির পিতার গৌরবগাঁথা কূটনীতিকরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকতেন।
আলোচ্য নিবন্ধে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে মরহুম স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত হৃদ্যতা, জাতির পিতার আদর্শের প্রতি তাঁর দৃঢ় সমর্থন, জাতির পিতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, যুদ্ধ শেষে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য ৩৪টি দেশের স্বীকৃতি আদায় এবং জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও অষ্ট্রিয়ায় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকালে বৈদেশিক সহযোগিতা প্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে চলমান প্রয়াসকে সার্থক করে তুলেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির পিতার সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের পর তাঁর দুই কন্যাকে  জার্মানিতে আশ্রয়দান ও তাঁদের নিরাপত্তা বিধান করেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। পরবর্তী জীবনে  জাতির পিতার আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য তিনি তাঁরই কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার পদে অধিষ্ঠিত হন। স্পিকার হিসেবে তিনি জাতির পিতার সাংবিধানিক মর্যাদা সমুন্নত করতে প্রয়াসী হন। তাঁর সভাপতিত্বে ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর মহান জাতীয় সংসদে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হলে জাতির পিতার হত্যাকান্ডের বিচারের পথ প্রশস্ত এবং পরবর্তীতে খুনিদের বিচার নিশ্চিত হয়।
লেখক: সাবেক মুখ্য সচিব ও স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাবেক একান্ত সচিব। বতর্মানে সভাপতি, স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী স্মৃতি পরিষদ।
Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর