,

image-484340-1636229125

কৃষকের বাড়তি ব্যয় হবে ২ হাজার কোটি টাকা

হাওর বার্তা ডেস্কঃ চলতি রবি মৌসুমের শুরুতেই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এতে ফসলের উৎপাদন খরচ গড়ে ৪০ শতাংশ বেড়ে যাবে। জমিতে হালচাষ, সেচ দেওয়া, মাড়াই, পরিবহণসহ সংশ্লিষ্ট খাতে এসব অর্থ ব্যয় হবে। বাড়তি খরচ করে উৎপাদনের পর ন্যায্য দামে বিক্রি করা যাবে কিনা সে নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক। ফসল উঠার পর অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়ে কমে পণ্য বিক্রি করতে হয়।

কৃষকরা বলেছেন, এমনিতেই সেচ সৌসুমের শুরুতে কৃষি যন্ত্রপাতি ওভারহোলিং করতে তাদের বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। সেখানে সেচ খরচ বেড়ে গেলে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তারা বলেন, মাসখানেক পরই ঘরে তুলবেন সোনালি ধান। তাই উৎসবের আমেজ চলছিল কৃষকের ঘরে ঘরে। সেই আমেজে গুড়েবালি দিতে হাজির ডিজেলের বাড়তি দাম। তাদের বক্তব্য, কিছুদিনের মধ্যে বোরো আর রবিশস্যের জন্য মাঠ প্রস্তুত করবেন তারা। সেজন্য ব্যবহার হবে সেচ পাম্প-পাওয়ারটিলার। কিন্তু হঠাৎ করেই ডিজেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তাদের।

বুধবার রাতে হঠাৎ করে সরকার ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৬৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা করেছে। বৃদ্ধির হার ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। জ্বালানি তেলে মোট চাহিদার ২১ দশমিক ১৫ শতাংশই ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সেচ খাতে। এছাড়া হালচাষ, মাড়াই ও পরিবহণ খাতসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক খাতে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে ডিজেল ব্যবহৃত হয়েছে ৯ লাখ ৭২ হাজার ৫৩৯ টন। যা মোট চাহিদার ২১ দশমিক ১৫ শতাংশ। প্রতি লিটার ৬৫ টাকা হিসাবে এ খাতে কৃষকের খরচ হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে গত অর্থবছরের চেয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে এ খাতে ডিজেলের চাহিদা ধরা হয়েছে ১১ লাখ টন। ৮০ টাকা হিসাবে এ খাতে কৃষকের খরচ হবে ১০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ বাড়ছে। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা বাড়ায় ১ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে। শুধু মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষি খাতে কৃষককে বাড়তি ২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে।

যদিও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও দাম কমানো হবে। ২০১৬ সালেও জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস করা হয়েছিল। জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও পাচার রোধে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। শনিবার যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোতে অবস্থানকালে অনলাইনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি একথা বলেন।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সরকার ৪ নভেম্বর দেশে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করেছে। যদিও আশপাশের অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের মূল্য এখনো কম। তিনি বলেন, শনিবার ভারতের কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ছিল ৮৯.৭৯ রুপি বা ১০৪ টাকা। ২৬টি স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে ঢোকে, তাও বিবেচনার বিষয়। আর পাচারের আশঙ্কা তো আছেই।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সূত্র জানায়, কৃষির সবচেয়ে বেশি ফলন হয় রবি মৌসুমেই। এ মৌসুম শুরু হয়েছে নভেম্বর থেকে, চলবে মে পর্যন্ত। এই সময়েই জ্বালানির চাহিদার বড় অংশ ব্যবহৃত হবে। এর মধ্যে নভেম্বরে ৫ শতাংশ, ডিসেম্বরে ১০ শতাংশ, জানুয়ারিতে ১২ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে ২৪ শতাংশ, মার্চে ২৬ শতাংশ, এপ্রিলে ১৮ শতাংশ এবং মে মাসে ৫ শতাংশ। বাকি সময়ে সেচ ও হালচাষ খাতে জ্বালানির ব্যবহার হয় না বললেই চলে। তবে পরিবহণ খাতে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। বিএডিসির হিসাবে সারা দেশে প্রতি বছর কৃষি জমিতে ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৬২৭টি সেচ যন্ত্র চলে। এর মধ্যে ডিজেলে চলে ১২ লাখ ৬২ হাজার ৮৫১টি। বাকি ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৭৬টি চলে বিদ্যুতে। প্রতি বছরই কৃষি খাত যান্ত্রিকীকরণ করা হচ্ছে। এ কারণে ডিজেলের ব্যবহার বাড়ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি এমন একটা পণ্য যার মূল্য বাড়লে মূলত সবকিছুর দামই বেড়ে যাবে। সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে। পণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও বিপণন খরচ বেড়ে যাবে। বাড়তি দামে পণ্য উৎপাদন করে আবার বাড়তি দামেই বিক্রি করতে না পারলে কৃষক ব্যয় সামলাতে পারবে না। তখন তারা চাষাবাদ কমিয়ে দেবে। এতে উৎপাদন কমে যাবে। সরবরাহ সংকট দেখা দেবে। এতে বাজার অস্থির হয়ে উঠবে। সব মিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরকারের অনুকূলে আসবে না।

বিচার-বিবেচনা ছাড়া তেলের দাম বৃদ্ধিকে হটকারি সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি বলেন, বোরো ধান চাষ অধিকাংশই সেচনির্ভর। শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি পানি সেচ দেওয়া হয় ডিজেল দিয়ে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি আমাদের কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পরামর্শ দেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএডিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ডিজেলের সঙ্গে কৃষি খাতের একটি গভীর সম্পর্ক আছে। সব মিলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য কয়েক হাত ঘুরে সর্বশেষ খুচরা পর্যায়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে দাম আরও বাড়বে। সে ক্ষেত্রে পরিবহণ খরচসহ প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ ব্যয় বাড়বে।

এদিকে মৌসুমের শুরুতে সবজি, ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সরিষা, পেঁয়াজসহ নানা পণ্য উৎপাদনে হালচাষের জন্য কৃষককে আগাম অর্থ দিতে হয়। সেচেও একই অবস্থা। এগুলোর জন্য আগাম বাড়তি অর্থ দিতে হবে। চলতি অর্থবছরের জন্য যে কৃষি ও পল্লি ঋণ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে তাতে ডিজেলের মূল্য লিটারে ৬৫ টাকা ধরেই একরপ্রতি ঋণ সীমা নিরূপণ করা হয়েছে। বাড়তি দামের কারণে যে খরচ বাড়বে, তার জন্য কৃষক বাড়তি ঋণ পাবে না। এ কারণে কৃষিঋণ নীতিতে সংশোধনী আনার কথাও বলেছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে বাড়তি খরচে উৎপাদিত পণ্য যাতে তারা নায্যমূল্যে বা উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন সে নিশ্চয়তা চেয়েছেন।

কৃষিযন্ত্র চালক আরমান বলেন, আগে এক বিঘা জমি চাষে তেল খরচ হতো ১৮০ টাকা। এখন সেখানে খরচ হচ্ছে ২৮০ টাকা। আরেকজন বলেন, আমি আগে ৩০০ টাকায় প্রতি বিঘা জমি চাষ করতাম। এখন তা করতে পারছি না। তাই ট্রাক্টর বন্ধ। এর ওপর যোগ হলো ডিজেলের বাড়তি দাম।

নওগাঁর কৃষক মো. আবু আলী যুগান্তরকে জানান, এক বিঘা আলু চাষ করতে খরচ হয় ১০-১২ হাজার টাকা। ডিজেলের দাম বাড়াতে সেই খরচে আরও যোগ হলো বিঘাপ্রতি ৫-৬ হাজার টাকা। পাশাপাশি জমি হাল দিতে এখন লাঙ্গলের পরিবর্তে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সেই যন্ত্র চালাতেও ডিজেল ব্যবহার হয়। সেখানেও খরচ বাড়বে। এ ছাড়া ফসল উত্তোলনেও যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়। সেখানেও খরচ বাড়বে। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে আলু ছাড়াও সরিষা, পেঁয়াজ, গম ও শাকসবজির চাষ হচ্ছে। তাই উৎপাদন খরচ বাড়াতে প্রথমেই মূলধনের অভাব দেখা দিয়েছে। তাই অসহায় লাগছে।

ময়মনসিহং জেলার ৪নং পরানগঞ্জ এলাকার কৃষক সিদ্দিক জানান, সরিষা উৎপাদনে মৌসুমে যদি ৬ হাজার টাকা সেচ দিতে হয়, তেলের দাম বাড়ার কারণে আরও ৩ হাজার টাকা বেশি খরচ করতে হবে। যন্ত্র দিয়ে হালের কাজ করতেও দাম বাড়বে। এতে গরিব কৃষকদের পক্ষে চাষাবাদ করা খুব কঠিন হবে। আবার চাষাবাদ না করলে দেশে খাবারের সংকট দেখা দেবে। নিজেরা চলতে পারব না। এসব মিলে কৃষক প্রচণ্ড চাপে আছে।

নওগাঁর কৃষি বিশ্লেষক ও ক্ষেতমজুর আদিবাসী সমিতি সভাপতি জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, যন্ত্রিক কৃষি অনেকটাই নির্ভর করে ডিজেলের ওপর। তেলের দামের কারণে বাড়বে সেচ, হালচাষ ও পরিবহণ খরচ। সব মিলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্য বাড়তি দরে বিক্রি করার নিশ্চয়তা নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার ডিজেল এবং ২ লাখ ৭০ হাজার বৈদ্যুতিক পাম্প রয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ১০ থেকে ১৬ লাখ টন ডিজেল সেচে ব্যবহার করা হয়। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে ডিজেলের দাম বাড়ে। ডিজেল ও সার পাচার হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একজন উপপরিচালক বলেন, চলতি মৌসুমে সার ও ডিজেল সংকট নিরসনে সরকার বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সার ও ডিজেলের ব্যাপক মজুদ রয়েছে। এসবের চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, কৃষি খাতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৫ হাজার ৬২৩ টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়েছে। যা ওই সময়ে মোট জ্বালানি চাহিদার ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যবহৃত হয়েছে ১০ লাখ ৯০ হাজার ৯০৩ টন। যা ওই বছরের চাহিদার ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে ডিজেলের ব্যবহার ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৩২৬ টন। যা ওই সময়ের চাহিদার ১৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যবহার কমে দাঁড়ায় ৯ লাখ ৯০ হাজার ৭৫২ টন। যা ওই বছরের চাহিদার ১৮ শতাংশ।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর