,

জিয়া এক অমর কাব্য! মেজর (অব.) মো. আখতারুজ্জামান

জিয়াউর রহমান দেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। নামটির সঙ্গে এ দেশের জনগণের প্রথম পরিচয় হয় যখন তিনি ‘৭১-এর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’ বলে স্বাধীনতার ডাক দেন। এরপর জনগণ তাকে চেনে ‘৭৫-এর ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের পরে। জিয়া আজ নেই। আজ ৩০ মে তার শাহাদাতবার্ষিকী।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ঢাকায় অনুষ্ঠিত জিয়ার নামাজে জানাজা এখনো স্মরণকালের সর্ববৃহৎ নামাজে জানাজা। জিয়ার মৃত্যুর খবর শুনে খুলনায় জীবন দিয়েছিলেন এক যুবক। জিয়া হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন শুনে ‘জিয়া যখন নেই তখন আমার বেঁচে থেকে কী লাভ’ বলে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার করে শিরোমণির কাছে ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে সেই যুবক। জিয়ার লাখো প্রেমিক ও পাগল এখনো বাংলার মাটিতে বেঁচে আছে।

জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত বলছে ষড়যন্ত্রকারীরা। তাদের এ অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা। ‘৭৫-এর ১৫ আগস্টের আগে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান। সেনাবাহিনী সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা সবাই জানতেন সেনাবাহিনীতে তখন জিয়াউর রহমানের কোনো ক্ষমতা বা দায়িত্ব ছিল না। জিয়ার নির্দেশ মানা তো দূরের কথা শোনার জন্যও একজন সেপাই ছিল না। সেনাবাহিনীতে যৌথ কমান্ডের কোনো সুযোগ ছিল না এবং এখনো নেই। তবে জিয়া হয়তো ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জেনে থাকতে পারেন, যা তখনকার আওয়ামী লীগ, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টির বড় বড় নেতারা সবাই কম-বেশি জানতেন এবং বক্তৃতা-বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর পতন চাইতেন। যেহেতু জিয়া তৎকালীন সরকারের আস্তাভাজন ছিলেন না তাই হয়তো ষড়যন্ত্রের আগাম খবর প্রকাশ করতে সাহস পাননি; তার পক্ষে প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা। তবে বর্তমানের কয়েকজন মন্ত্রীর পক্ষে বঙ্গবন্ধুর হত্যা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল বলে অনেকে মনে করেন। বর্তমান সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে তখন গণবাহিনী, রক্ষীবাহিনী, মুজিববাহিনী ইত্যাদি নামে অনেক সরকারি-বেসরকারি বাহিনী যে ছিল সে খবর বর্তমান প্রজন্ম হয়তো জানেই না। জিয়া কিন্তু খুনি মোশতাকের সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতিতে জিয়াকে সেনাপ্রধান পদে নিয়োগ দান ছাড়া খুনি মোশতাকের হাতে কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু জিয়া বা তৎকালীন সেনা কমান্ড খুনি মোশতাকের বশ্যতা স্বীকার করেননি, যে কারণে ‘৭৫-এর নভেম্বরে জিয়া বরখাস্ত ও গ্রেফতার হয়েছিলেন। জিয়াকে গ্রেফতারকারী ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল তার বইতে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর জিয়াকে জানালে তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি না থাকলে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেবেন এবং সেনাবাহিনী উপরাষ্ট্রপতির অধীনে তার দায়িত্ব পালন করবে। জিয়ার এই কথার মাধ্যমে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রথমত, জিয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং দ্বিতীয়ত, জিয়া খুনি মোশতাক চক্রের সঙ্গেও ছিলেন না। ইতিহাসে অসংখ্য প্রমাণ আছে যে জিয়া বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না যা বিশ্বাস করার মতো অনেক মানুষ এখনো বেঁচে আছেন। পিতাহারা সন্তানদের কাছে মায়াকান্না করে অনেক ফায়দা নেওয়া যায় কিন্তু সত্যকে মুছে দেওয়া যায় না।

জিয়া এ দেশের জনগণের একটি অংশের অবিসংবাদিত নেতা। কোনো ষড়যন্ত্র করেই তার নাম বাংলাদেশের জনগণের বিশেষত ইসলামী মূল্যবোধের অনুসারী কোটি কোটি মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়া যাবে না। জিয়া একটি ইতিহাসের নাম। জিয়া একটি বিশ্বাস, একটি আদর্শ। আমরা হয়তো অনেকে হারিয়ে যাব কিন্তু যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন জিয়া থাকবেন। জিয়া সংবিধানে সংযোজন করেছেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষেও স্থাপন করেছেন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’, যা কোনো শক্তিই কোনো দিন মুছতে পারবে না। এ ছাড়াও জিয়ার অসংখ্য অবদান রয়ে গেছে বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও তার ইতিহাসের মধ্যে; যা তাকে অমর করে রাখবে।

তার অসংখ্য কাজের মধ্যে অন্যতম হলো- কারিগরি শিক্ষার প্রসার, রঙিন টেলিভিশনের যুগ শুরুর সূচনা, নতুন কুঁড়ি নামে টেলিভিশনে শিশু-কিশোর প্রতিভার বিকাশ সাধন, শিশু সংগঠন প্রতিষ্ঠা, মেডিকেল শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিভাগীয় শহরগুলোয় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা, মেট্রোপলিটন পুলিশের সূচনা, গ্রাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, উন্নয়নে যুবশক্তির অংশগ্রহণ, ছাত্রদের শিক্ষা সফরের মাধ্যমে মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টিকরণ, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের যাত্রা শুরুকরণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে জাতীয় অগ্রাধিকার প্রদান, কৃষিতে বৈপ্লবিক উন্নয়ন, খাল কাটা কর্মসূচির মাধ্যমে পানিসম্পদ উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি, কৃষি সেচে গভীর নলকূপ স্থাপন ও আধুনিক যান্ত্রিক কৃষি চাষের প্রবর্তন, কৃষি অর্থনীতির যাত্রা শুরু, ঢাকার সড়ক প্রশস্তকরণ, ভারতের সঙ্গে সমসম্পর্ক উন্নয়ন, ‘৭৭ সালের ১৬-১৮ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের বাংলাদেশ সফর, একই বছরে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সংস্থা সার্ক গঠন, ভারতের সঙ্গে ফারাক্কা চুক্তি সম্পাদন, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান, বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের সপরিবারে দেশে ফিরে আসার ব্যবস্থাকরণ, সংসদ ভবন ও ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের কাজ সমাপন, বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন, ধর্মীয় চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্ব প্রদান, সশস্ত্রবাহিনীর আধুনিকায়ন, ইসলামী উম্মাহর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক স্থাপন, চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, জনগণের মতামত গ্রহণে গণভোট প্রবর্তন, দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিতকরণ ও দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। এসব কর্মসূচির দ্বারা অনেক জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তার সবচেয়ে বড় ও মহান অবদান একটি রাজনৈতিক আদর্শের প্রবর্তন। তার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তার মৃত্যুর ৩৫ বছর পরও রাজনীতির মূলধারায় এখনো টিকে আছে। জিয়া একটি অমর কাব্যের নাম। জিয়া আছে, জিয়া থাকবে আবহমান বাংলার মানুষের হৃদয়ে ও চেতনায়।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর