,

IMG_20210721_085901

প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের মৃত্যুতে সর্বত্র শোকের ছায়া

হাওর বার্তা ডেস্কঃ চলে গেলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। শুক্রবার (১৬ জুলাই) রুমানিয়ার একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাহসী এই সাংবাদিক। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সরজমিনে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, শরণার্থী শিবিরে, প্রতিবাদে বা জনমত গঠনের কঠিন সময়ে অনন্য ভূমিকা রাখা এই মানুষটির মৃত্যুতে সর্বত্র বইছে শোকের ছায়া।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা কথা লিখছেন বিভিন্ন সর্বমহলের মানুষ। নানান ভাষায় তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাচ্ছে এবং তাঁর পরকালীন শান্তি কামনা করছে নেটিজেনরা।

সাইমন ড্রিংকে নিয়ে জনপ্রিয় উপস্থাপক, পরিচালক, লেখক ও প্রযোজক হানিফ সংকেত তার ফেইসবুকে লিখেন, ‘আমার অত্যন্ত প্রিয় আর একজন মানুষ চলে গেলেন। সাইমন ড্রিং। আমাদের দেশের আধুনিক টিভি সাংবাদিকতার পথিকৃত। ছিলেন একাধারে একজন সাংবাদিক, তথ্যচিত্র নির্মাতা, টিভি উপস্থাপক। এদেশে বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেলে আমরা যে সংবাদ উপস্থাপনা দেখি এসবই মূলতঃ সাইমন ড্রিংয়ের অবদান। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ছিলো অসাধারণ ভূমিকা। আর সেজন্যেই তাকে বলা হয় বাংলাদেশের বন্ধু।

গত শুক্রবার রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর মৃত্যু হয়। খবরটা আজ জানলাম সংবাদ মাধ্যমে। ভীষণ কষ্ট পেলাম। বলা যায় তাঁর সঙ্গে আমার ছিলো আত্মিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন একুশে টিভি’র যাত্রা শুরু হয়েছিলো এই সাইমন ড্রিংয়ের হাত ধরেই। এখানে কাজ করতে এসেই সাইমনের সাথে আমার যোগাযোগ। বয়সে বড় হলেও ফজলে লোহানীর মতো তিনিও ছিলেন আমার বন্ধুর মতো। তাঁর সঙ্গে আমার রয়েছে অনেক স্মরণীয় স্মৃতি। একুশে টেলিভিশনে কাজ করার সময় বলতে গেলে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তাঁর সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো।

সাইমন ছিলেন ইত্যাদির প্রায় নিয়মিত দর্শক। অনুষ্ঠান দেখে প্রায়ই ফোন করতেন। বাংলা বলতে না পারলেও বিষয়বস্তু বুঝতে পারতেন। আর তখন থেকেই একুশে টেলিভিশনের অনেক কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন আমাকে। দিনের পর দিন তাঁর সঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি। অনুষ্ঠান সংক্রান্ত মিটিং করেছি। একুশের ভবন ছাড়াও কখনও কখনও তাঁর বাসায় আড্ডা হতো। কখনও বা একটা ফোন করে চলে আসতেন আমার বাসায়। ডাল খুব পছন্দ করতেন। তাই আমার ওখানে আসার আগে ডালের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। বিদেশ থেকে এলে সবসময় কোন না কোন উপহার সামগ্রী নিয়ে আসতেন। কখনও কোন দুর্লভ সিডি, কখনও ক্যামেরা, কখনও বা বিবিসির দুর্লভ কোন তথ্যচিত্র। তখন এই অনলাইনের যুগ ছিলো না। তাঁর উপহার দেয়া একটি ভিডিও ক্যামেরা স্মৃতি হিসাবে এখনও অনেক যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সাইমন ড্রিংয়ের কারণেই একুশের যাত্রা শুরুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি করেছি। জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে উন্মুক্ত মঞ্চে ধারণ করা হয় সেই অনুষ্ঠান। দেশের ইতিহাসে প্রথম চার হাজার শিশু-কিশোর একসঙ্গে সংসদ ভবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করে সেই অনুষ্ঠানে। গানটি গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন ও প্রয়াত বন্ধু এন্ড্রু কিশোর। অনুষ্ঠান ধারণের পুরোটা সময় সাইমন আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন। ধারণকালে বার বার কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলতেন, ‘কোন হেল্প লাগবে?’, ‘সব ঠিক আছে?’, ‘কিছু খাবেন?’। একুশের প্রথম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানটিও করেছিলাম তাঁর কারণেই, নাম ছিলো ‘একুশের পাল তুলে’। যেখানে একুশে টিভির সমালোচনা করে, এর ভুলত্রুটি তুলে ধরেছিলাম। কারো কারো আপত্তি থাকলেও সাইমন ড্রিং বলেছিলেন, ‘গঠনমূলক সমালোচনা অনুষ্ঠানের মান বাড়াবে’। সারা রাত সম্পাদনা করেছিলাম অনুষ্ঠানটির। রাত জেগে সম্পাদনা করার সময় রাত ১২ টার পর প্রতিদিন আমার জন্য ফ্ল্যাক্সে করে কফি বা শুকনো খাবার নিয়ে আসতেন। যাওয়ার সময় বলে যেতেন, ‘ক্লান্ত লাগলে বিশ্রাম নিবেন’। শুধু তাই নয়, আমি এবং সহকারীদের জন্য তিনটি ভাঁজ করা খাটেরও ব্যবস্থা রেখেছিলেন। তাঁর এই ভালোবাসার কারণেই একুশের জন্য সে সময় বেশকিছু অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছিলাম। অসম্ভব বন্ধুবৎসল একজন মানুষ ছিলেন সাইমন ড্রিং। এ দেশ ছেড়ে গেলেও তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হতো ইমেইলে। দেশে এলে দেখা হতো। হঠাৎ সাইমন ড্রিংয়ের এই মৃত্যু সংবাদ, শুনে প্রচণ্ড আঘাত পেলাম। এদেশের মিডিয়া জগৎ তাঁর কাছে ঋণী। সাইমন আমরা কখনো তোমাকে ভুলবো না। সাইমন ড্রিংয়ের আত্মার শান্তি কামনা করছি।’

সাংবাদিক জ.ই. মামুন লিখেন, ‘বিদায় সায়মন ড্রিং, বাংলাদেশের জন্মের বন্ধু, আমার পিতার অধিক পিতা! শুক্রবার রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৫ বছর। স্ত্রী ফিয়োনা, দুই জমজ কন্যা ইন্ডিয়া রোজ এবং আভা রোজকে রেখে চির বিদায় নিলেন সায়মন। তাঁর মাধ্যমেই বিশ্ব প্রথম জানতে পারে ৭১ এর ২৫ মার্চে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার কথা। ২০০০ সালে তাঁর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় একুশে টেলিভিশন। তিনিই গড়ে তোলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের পেশাদার টিভি সাংবাদিকদের। আমি জীবনে যে ক’জন মানুষের কাছে চিরঋণী, সায়মন ড্রিং তাদের অন্যতম। তাঁর মৃত্যুশোক আমার কাছে পিতৃশোকের সমান। তাঁর স্নেহ, ভালোবাসা এবং শিক্ষা আমি আজীবন মনে রাখবো।’

আবদুল লতিফ খান লিখেন, ‘ইনি একজন প্রকৃত সাংবাদিক, নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষে পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একুশে টিভিকে সবার কাছে অনন্যভাবে তুলে ধরে ছিলেন। বাঙ্গালী জাতি হিসাবে আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি যথাযথ সন্মান জ্ঞাপন করছি। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে আপনি অমর হয়ে থাকবেন।’

শ্রদ্ধা জানিয়ে জাহিদ হাসান লিখেন, ‘বাঙ্গালির স্বাধীনতার ইতিহাস অস্তিত্ব থাকবে যতদিন, সাইমন ড্রিংক এর অবদানও অমর থাকবে ততদিন। পাকিস্তানি বাহিনীর মানবতাবিরোধী গণহত্যা বহির্বিশ্বকে জানানোর নায়ক আর ভিয়েতনাম যুদ্ধের মার্কিন বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার প্রতিবেদনকারী সাইমন ড্রিংকের মৃত্যুতে গভীর বিনম্র শ্রদ্ধা।’

এমডি জাহাঙ্গিরের প্রশ্ন, ‘বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু এই সাহসী সাংবাদিককে কি কোন সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল? তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।’

দুঃখ প্রকাশ করে রাজিব রায় লিখেন, ‘বিদায় বাংলাদেশের আজন্ম বন্ধু! আপনার যেমন সম্মান পাওয়ার কথা ছিলো, তেমনটা আমরা করতে পারিনি। আমাদের ক্ষমা করবেন। ওপারে ভালো থাকবেন।’

তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে এম এম হাফিজুর রহমান লিখেন, ‘কিংবদন্তী সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। উনার আত্মার শান্তি কামনা করি।’

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর