ঢাকা ০২:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

পপগুরুর জন্মদিন আজ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:০২:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬
  • ২৯৮ বার

আজম খান। একজন গায়ক, মুক্তিযুদ্ধা, জীবন সংগ্রামের এক নির্লোভ সৈনিক। তিনি ভক্তদের কাছে পরিচিত ছিলেন পপগুরু আজম খান নামে। তার হাত ধরেই বাংলা গানে পাশ্চাত্যের ঢং লেগেছিল, বিশ্ব সঙ্গীতে বাংলা গান খুঁজে পেয়েছিল নতুন মাত্রার আশ্রয়। তাই তাকে বাংলাদেশের পপ সংগীতের অগ্রদূত হিসেবে ‘পপগুরু’ বলা হয়।

তিনি দেশীয় ফোক ফিউশনের সাথে প্রাশ্চাত্যের যন্ত্রপাতির ব্যবহার করে বাংলা গানের এক নতুন ধারা তৈরি করেন। অনেকে তাকে বাংলাদেশের বব মার্লি বা বব ডেলান বলেও সম্মানিত করে থাকেন।

পপগুরুর আজ ৬৬তম জন্মবার্ষিকী। প্রিয় মানুষটির আগমনী দিনে তাকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে তার ভ্ক্ত ও অনুরাগীরা।

১৯৫০ সালে ২৮শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন আজম খান। তার পুরো নাম মাহবুবুল হক খান। বাবার নাম আফতাব উদ্দিন আহমেদ ও মা জোবেদা খাতুন। তার শৈশবের পাঁচ বছর কাটে আজিমপুর কলোনিতে। তারা ৪ ভাই ও এক বোন ছিল।

১৯৫৫ সালে তিনি প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তার বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানালে সেখানে চলে যান পরিবারসহ। কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাইমারিতে এসে ভর্তি হন। তারপর ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন তিনি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসংগীত প্রচার করেন।

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ২নং সেক্টরে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তার মুক্তিযুদ্ধের একান্ত সহযোদ্ধা ছিলেন সাবেক ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র জনাব সাদেক হোসেন খোকা।

পপগুরু আজম খান ১৯৭০ সালে ‘উচ্চারণ’ নামে একটি ব্যান্ড দল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৭২ সালে প্রথম ষ্ট্রেজ প্রোগ্রাম করেন নটরডম কলেজে এবং একই সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম টেলিভিশন অনুষ্ঠান করেন। তবে ১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল ওয়াপদা মিলনায়তনের অনুষ্ঠানই তাকে খ্যাতিমান করে তোলেন।

১৯৮২ সালে প্রকাশিত প্রথম একক এ্যালবাম ’এক জনম’। তিনি একে একে ১৬৮টি একক গান ৩০টি মিক্সস গান সহ ১৪টি এ্যালবামের মাধ্যমে শ্রোতাদেরকে অসংখ্যা জনপ্রিয় গান উপহার দেন।

আজম খান একাধারে ছিলেন সঙ্গীত শিল্পী, গিটারিস্ট ও গীতিকার। আজম খানের জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে-‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল দুলাল’, ‘অনামিকা চুপ’, ‘সারা রাত’ ইত্যাদি।

শিল্পী চরিত্রের পাশাপাশি আজম খান স্বনামধন্য ছিলেন একজন খেলোয়ার হিসেবেও। তিনি নিজে সাঁতার কাটতেন এবং নতুন সাতারুদের মোশারফ হোসেন জাতীয় সুইমিং পুলে সপ্তাহে ৬ দিন সাতার শিখাতেন। ক্রিকেট ও ফুটবল খেলোয়াড় হিসাবে ছিলেন খুবই পারদর্শী।

এই প্রতিভাবান সাহসী, নিরহঙ্কার, গুনী মুক্তিযোদ্ধা, সংগীত শিল্পী ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে পরাজিত হন গত ২০১১ সালের ৫ই জুন। ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৬১ বছর।

তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবর স্থানে সমাহিত করা হয়। পারিবারিক জীবনে তিনি ২ কন্যা ইমা এবং রিমা ও পুত্র হৃদয়ের জনক।

দেখতে দেখতে কেটে গেল পাঁচটি বছর। তবু না কমেছে তার জনপ্রিয়তা, না কমেছে তার প্রতি শ্রোতা-ভক্তদের ভালবাসা। এটােই যেন নতুন করে প্রমাণ করছে- সব চলে যাওয়াই প্রস্থান নয়।

অদেখা ভুবনের নন্দিত জগতে ভালো থাকুন আমাদের শিল্পী, আমাদের পপগুরু আজম খান। তার প্রতি আমাদের ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে কুপিয়ে হত্যা, আহত আরও একজন

পপগুরুর জন্মদিন আজ

আপডেট টাইম : ০৯:০২:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

আজম খান। একজন গায়ক, মুক্তিযুদ্ধা, জীবন সংগ্রামের এক নির্লোভ সৈনিক। তিনি ভক্তদের কাছে পরিচিত ছিলেন পপগুরু আজম খান নামে। তার হাত ধরেই বাংলা গানে পাশ্চাত্যের ঢং লেগেছিল, বিশ্ব সঙ্গীতে বাংলা গান খুঁজে পেয়েছিল নতুন মাত্রার আশ্রয়। তাই তাকে বাংলাদেশের পপ সংগীতের অগ্রদূত হিসেবে ‘পপগুরু’ বলা হয়।

তিনি দেশীয় ফোক ফিউশনের সাথে প্রাশ্চাত্যের যন্ত্রপাতির ব্যবহার করে বাংলা গানের এক নতুন ধারা তৈরি করেন। অনেকে তাকে বাংলাদেশের বব মার্লি বা বব ডেলান বলেও সম্মানিত করে থাকেন।

পপগুরুর আজ ৬৬তম জন্মবার্ষিকী। প্রিয় মানুষটির আগমনী দিনে তাকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে তার ভ্ক্ত ও অনুরাগীরা।

১৯৫০ সালে ২৮শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন আজম খান। তার পুরো নাম মাহবুবুল হক খান। বাবার নাম আফতাব উদ্দিন আহমেদ ও মা জোবেদা খাতুন। তার শৈশবের পাঁচ বছর কাটে আজিমপুর কলোনিতে। তারা ৪ ভাই ও এক বোন ছিল।

১৯৫৫ সালে তিনি প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তার বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানালে সেখানে চলে যান পরিবারসহ। কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাইমারিতে এসে ভর্তি হন। তারপর ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ে আজম খান পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখন তিনি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গণসংগীত প্রচার করেন।

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ২নং সেক্টরে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তার মুক্তিযুদ্ধের একান্ত সহযোদ্ধা ছিলেন সাবেক ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র জনাব সাদেক হোসেন খোকা।

পপগুরু আজম খান ১৯৭০ সালে ‘উচ্চারণ’ নামে একটি ব্যান্ড দল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৭২ সালে প্রথম ষ্ট্রেজ প্রোগ্রাম করেন নটরডম কলেজে এবং একই সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম টেলিভিশন অনুষ্ঠান করেন। তবে ১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল ওয়াপদা মিলনায়তনের অনুষ্ঠানই তাকে খ্যাতিমান করে তোলেন।

১৯৮২ সালে প্রকাশিত প্রথম একক এ্যালবাম ’এক জনম’। তিনি একে একে ১৬৮টি একক গান ৩০টি মিক্সস গান সহ ১৪টি এ্যালবামের মাধ্যমে শ্রোতাদেরকে অসংখ্যা জনপ্রিয় গান উপহার দেন।

আজম খান একাধারে ছিলেন সঙ্গীত শিল্পী, গিটারিস্ট ও গীতিকার। আজম খানের জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে-‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল দুলাল’, ‘অনামিকা চুপ’, ‘সারা রাত’ ইত্যাদি।

শিল্পী চরিত্রের পাশাপাশি আজম খান স্বনামধন্য ছিলেন একজন খেলোয়ার হিসেবেও। তিনি নিজে সাঁতার কাটতেন এবং নতুন সাতারুদের মোশারফ হোসেন জাতীয় সুইমিং পুলে সপ্তাহে ৬ দিন সাতার শিখাতেন। ক্রিকেট ও ফুটবল খেলোয়াড় হিসাবে ছিলেন খুবই পারদর্শী।

এই প্রতিভাবান সাহসী, নিরহঙ্কার, গুনী মুক্তিযোদ্ধা, সংগীত শিল্পী ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে পরাজিত হন গত ২০১১ সালের ৫ই জুন। ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৬১ বছর।

তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবর স্থানে সমাহিত করা হয়। পারিবারিক জীবনে তিনি ২ কন্যা ইমা এবং রিমা ও পুত্র হৃদয়ের জনক।

দেখতে দেখতে কেটে গেল পাঁচটি বছর। তবু না কমেছে তার জনপ্রিয়তা, না কমেছে তার প্রতি শ্রোতা-ভক্তদের ভালবাসা। এটােই যেন নতুন করে প্রমাণ করছে- সব চলে যাওয়াই প্রস্থান নয়।

অদেখা ভুবনের নন্দিত জগতে ভালো থাকুন আমাদের শিল্পী, আমাদের পপগুরু আজম খান। তার প্রতি আমাদের ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’।