ঢাকা ০৫:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

মিরপুর মুক্তি দিবস ও শহিদ লে. সেলিম

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০২:৩১:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২১
  • ২৪৯ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ প্রতিবছর ৩০ জানুয়ারি মিরপুর মুক্তি দিবস পালিত হয়ে আসছে। ১৯৭২-এর এই দিনে মিরপুরকে মুক্ত করতে গিয়ে লে. সেলিম ৪১ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য, শতাধিক পুলিশ ও মুক্তিযোদ্ধা জীবন উৎসর্গ করেন। জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে লে. সেলিমই যুদ্ধ পরিচালনা করে মুক্ত করেন অবরুদ্ধ মিরপুর।

৩০ জানুয়ারি ’৭২-এর সারাটা দিন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজের শেষ রক্তবিন্দুটুকু ঝরিয়ে যুদ্ধ করে বিজয়ের পথ খুলে দেন সেলিম। এভাবেই ৩১ জানুয়ারি প্রভাতে মুক্ত হয় অবরুদ্ধ মিরপুর। ৪ ডিসেম্বর (১৯৭১) আখাউড়া যুদ্ধে লে. বদি শহিদ হলে লে. সেলিম দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্রাভো কোম্পানির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আখাউড়া যুদ্ধজয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। অতঃপর শত্রুসেনাদের ঘাঁটির পর ঘাঁটি চুরমার করে ঢাকার কাছে ডেমরায় আসেন সেলিম। ১৬ ডিসেম্বর পড়ন্ত বেলায় তিনি বীর বাংলার মাটিতে প্রবেশ করেন।

বঙ্গবন্ধু হুকুম করেছিলেন অবরুদ্ধ মিরপুরে অবাঙালি এবং লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানিদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করার। ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ, লে. সেলিম, ডিএসপি লোদীসহ ৩০০ পুলিশ এবং ১৪০ সৈনিক মিরপুরে প্রবেশ করে ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ।

মেজর জেনারেল মঈনুল ভোরের কাগজে দেওয়া তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি লে. সেলিমকে মিরপুরে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন ওইদিন। ৩০ জানুয়ারি বেলা ১১টায় ঘটনাস্থলে সেলিম পৌঁছানো মাত্রই গোলাগুলি শুরু হয়। ওই সময় ১২ নম্বর পানির ট্যাংকের পেছন থেকে প্রথম গুলি ছোড়া হয়। রাস্তার অপর পাশে কাঁঠাল গাছের ফাঁক দিয়ে একটা গুলি এসে সেলিমের বুকের ডান পাশে লাগে। সেলিম প্রথমটায় লুটিয়ে পড়লে তাকে একটি ঘরে নিয়ে যান হেলাল মোর্শেদ। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে এলে উঠে দাঁড়ান সেলিম। কিংবদন্তি বীরদের মতো নিজের শার্ট দিয়ে বেঁধে ফেলেন তার বুক। ঐশ্বরিক শক্তি যেন ভর করে তার দেহে।

সৈন্যদের তিনি জানান, ‘আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না।’ ঠা-ঠা গুলিতে লাল হয়ে ওঠে তার স্টেনগান। মুক্ত হয় মিরপুর।

বিকালের দিকে জীবিত সেনাদের নিয়ে কালাপানির ঢালের কাছে তিনি দাঁড়ান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ফ্যাকাশে ও ক্লান্ত সেলিম। তবু তিনি সবাইকে উৎসাহ জুগিয়েছেন বিল পার হয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যেতে। নিজে পানিতে নামেননি; বুকের ক্ষত পানিতে ডুবে যাবে এ কারণে।

ক্লান্ত শরীরটা একটি গাছের আড়ালে রেখে একটা একটা করে গুলি চালাচ্ছিলেন ঘাতকের দিকে। কভার ফায়ার দিয়ে সহযোদ্ধাদের সরে যেতে সাহায্য করছিলেন তিনি। হয়তো ভাবছিলেন সাহায্য আসবে। সেদিন রাতে চাঁদ ছিল মেঘে ঢাকা। ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছিল। না, কেউ তাকে উদ্ধার করতে যায়নি। একসময় আকাশের ফ্যাকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বীরনক্ষত্র সেলিম চিরবিদায় নেন পৃথিবী থেকে।

সেলিমের মৃত্যুর পর আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি, স্তুতি এবং অনেক কিছু ছিল; কিন্তু এর কিছুই যেমন শহিদ সেনাদের ছুঁতে পারেনি, তেমনি তা তাদের পরিবারের ধরাছোঁয়ায় আসেনি। সেলিমের মৃত্যুর পর কয়েক টুকরা হাড় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার পরিবারকে। চেনা যায় না, বোঝা যায় না এমন হাড়ের স্তূপ দেখতে চাননি লে. আনিস (ডা. এম এ হাসান)। ক্যান্টনমেন্টের দাফনকৃত ওই হাড়ের নমুনার সঙ্গে বাবার দাঁত, মায়ের রক্ত ও চুলের ডিএনএর মিল পাননি ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে কাজ করা ডা. হাসান। (সংক্ষেপিত)

ডা. এম এ হাসান : চেয়ারপারসন, ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, বাংলাদেশ

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জনসচেতনতা বাড়লে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

মিরপুর মুক্তি দিবস ও শহিদ লে. সেলিম

আপডেট টাইম : ০২:৩১:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২১

হাওর বার্তা ডেস্কঃ প্রতিবছর ৩০ জানুয়ারি মিরপুর মুক্তি দিবস পালিত হয়ে আসছে। ১৯৭২-এর এই দিনে মিরপুরকে মুক্ত করতে গিয়ে লে. সেলিম ৪১ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য, শতাধিক পুলিশ ও মুক্তিযোদ্ধা জীবন উৎসর্গ করেন। জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে লে. সেলিমই যুদ্ধ পরিচালনা করে মুক্ত করেন অবরুদ্ধ মিরপুর।

৩০ জানুয়ারি ’৭২-এর সারাটা দিন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজের শেষ রক্তবিন্দুটুকু ঝরিয়ে যুদ্ধ করে বিজয়ের পথ খুলে দেন সেলিম। এভাবেই ৩১ জানুয়ারি প্রভাতে মুক্ত হয় অবরুদ্ধ মিরপুর। ৪ ডিসেম্বর (১৯৭১) আখাউড়া যুদ্ধে লে. বদি শহিদ হলে লে. সেলিম দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্রাভো কোম্পানির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আখাউড়া যুদ্ধজয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। অতঃপর শত্রুসেনাদের ঘাঁটির পর ঘাঁটি চুরমার করে ঢাকার কাছে ডেমরায় আসেন সেলিম। ১৬ ডিসেম্বর পড়ন্ত বেলায় তিনি বীর বাংলার মাটিতে প্রবেশ করেন।

বঙ্গবন্ধু হুকুম করেছিলেন অবরুদ্ধ মিরপুরে অবাঙালি এবং লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানিদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করার। ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ, লে. সেলিম, ডিএসপি লোদীসহ ৩০০ পুলিশ এবং ১৪০ সৈনিক মিরপুরে প্রবেশ করে ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ।

মেজর জেনারেল মঈনুল ভোরের কাগজে দেওয়া তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি লে. সেলিমকে মিরপুরে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন ওইদিন। ৩০ জানুয়ারি বেলা ১১টায় ঘটনাস্থলে সেলিম পৌঁছানো মাত্রই গোলাগুলি শুরু হয়। ওই সময় ১২ নম্বর পানির ট্যাংকের পেছন থেকে প্রথম গুলি ছোড়া হয়। রাস্তার অপর পাশে কাঁঠাল গাছের ফাঁক দিয়ে একটা গুলি এসে সেলিমের বুকের ডান পাশে লাগে। সেলিম প্রথমটায় লুটিয়ে পড়লে তাকে একটি ঘরে নিয়ে যান হেলাল মোর্শেদ। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে এলে উঠে দাঁড়ান সেলিম। কিংবদন্তি বীরদের মতো নিজের শার্ট দিয়ে বেঁধে ফেলেন তার বুক। ঐশ্বরিক শক্তি যেন ভর করে তার দেহে।

সৈন্যদের তিনি জানান, ‘আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না।’ ঠা-ঠা গুলিতে লাল হয়ে ওঠে তার স্টেনগান। মুক্ত হয় মিরপুর।

বিকালের দিকে জীবিত সেনাদের নিয়ে কালাপানির ঢালের কাছে তিনি দাঁড়ান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ফ্যাকাশে ও ক্লান্ত সেলিম। তবু তিনি সবাইকে উৎসাহ জুগিয়েছেন বিল পার হয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যেতে। নিজে পানিতে নামেননি; বুকের ক্ষত পানিতে ডুবে যাবে এ কারণে।

ক্লান্ত শরীরটা একটি গাছের আড়ালে রেখে একটা একটা করে গুলি চালাচ্ছিলেন ঘাতকের দিকে। কভার ফায়ার দিয়ে সহযোদ্ধাদের সরে যেতে সাহায্য করছিলেন তিনি। হয়তো ভাবছিলেন সাহায্য আসবে। সেদিন রাতে চাঁদ ছিল মেঘে ঢাকা। ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছিল। না, কেউ তাকে উদ্ধার করতে যায়নি। একসময় আকাশের ফ্যাকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বীরনক্ষত্র সেলিম চিরবিদায় নেন পৃথিবী থেকে।

সেলিমের মৃত্যুর পর আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি, স্তুতি এবং অনেক কিছু ছিল; কিন্তু এর কিছুই যেমন শহিদ সেনাদের ছুঁতে পারেনি, তেমনি তা তাদের পরিবারের ধরাছোঁয়ায় আসেনি। সেলিমের মৃত্যুর পর কয়েক টুকরা হাড় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার পরিবারকে। চেনা যায় না, বোঝা যায় না এমন হাড়ের স্তূপ দেখতে চাননি লে. আনিস (ডা. এম এ হাসান)। ক্যান্টনমেন্টের দাফনকৃত ওই হাড়ের নমুনার সঙ্গে বাবার দাঁত, মায়ের রক্ত ও চুলের ডিএনএর মিল পাননি ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে কাজ করা ডা. হাসান। (সংক্ষেপিত)

ডা. এম এ হাসান : চেয়ারপারসন, ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, বাংলাদেশ