,

ক্ষমতানির্ভর আওয়ামী লীগ! পীর হাবিবুর রহমান!

নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে তারুণ্যনির্ভর করে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার কথা বলা হলেও লক্ষ্য অর্জনের ফলাফল নিয়ে দলের অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের ক্ষমতানির্ভর হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ নামের তৃণমূল বিস্তৃত দলটি। প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির করুণ পরিণতি, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ফাঁসির দড়িতে ঝোলা এবং ওই জোটের নেতাকর্মীদের ওপর জেল-জুলুম নির্যাতনের চিত্রপট দেখে দেখে ভোগবিলাসের রাজনীতিতে ডুবন্ত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নিজেদের সাংগঠনিক নড়বড়ে অবস্থা দেখছেন না।
দলের লাখ লাখ নেতাকর্মী এখনো আদর্শনির্ভর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সক্রিয় করতে চাইলেও ক্ষমতা ঘিরে নানা সিন্ডিকেট তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে না। তারুণ্যনির্ভর যে সাংগঠনিক সম্পাদকদের দিয়ে আওয়ামী লীগের জেলায় জেলায় রাজনীতিকে চাঙ্গা করতে বিভাগীয় দায়িত্ব দিয়ে দলে রক্ত সঞ্চালনের চেষ্টা হয়েছে সেটি সফল হয়নি। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে জেলা সম্মেলন শেষ হলেও বাকি বিভাগের জেলাগুলোতে চিত্র ভিন্ন। সারা দেশের আওয়ামী লীগ কোথাও মন্ত্রী, কোথাও এমপি, কোথাও বা জেলা পরিষদ প্রশাসক ঘিরে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। রাজনীতিবিদের চেয়ে প্রশাসননির্ভরতা কোথাও কোথাও মন্ত্রী-এমপিদের এপিএসদের ক্ষমতা চোখে পড়ার মতো।

ক্ষমতানির্ভর আওয়ামী লীগআওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলের অতীত ইতিহাস শুধু বর্ণাঢ্যই নয়, নিয়মিত জাতীয় কাউন্সিল ও সম্মেলনের মাধ্যমে এমনকি সদস্য সংগ্রহ অভিযানে সংগঠনকে গতিশীল করা হতো। একেকটি জেলা রয়েছে যেখানে সংগঠন ভঙ্গুর রূপ নিলেও দুই দশকেও সম্মেলন হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম শেরপুর জেলা সম্মেলন করতে গিয়ে রীতিমতো আর্তনাদ করেছেন। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও শেখ হাসিনার প্রতিটি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীর এলাকা হলেও সেখানে প্রায় এক যুগ পর সম্মেলন হয়েছে। তিন বছর পরপর জেলা সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও কেউ মানছেন না সেটি। দলের পদ-পদবি  ক্ষমতার রাজনীতিতে এতটাই শক্তিশালী যে, এর প্রভাবে মন্ত্রী-এমপিদের ছায়া থাকলেই স্থানীয় প্রশাসন ও প্রকৌশল দফতরগুলোসহ নানা সংস্থায় পা ফেলে রাতারাতি টাকা কামানোর মহোৎসবে মেতে ওঠা যায়। অধিকাংশ জেলায় পদ-পদবি চলে যাওয়ার ভয়ে অনেকে সম্মেলন করতে নারাজ। অনেক জেলায় কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রবীণ ও পোড়খাওয়া নেতারা।

তাদের ওপর বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদকরা প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন না। টেন্ডারবাজি হাট মাঠ ঘাট ইজারা, বালুমহাল, পাথরমহাল, তদ্বির বাণিজ্যের পথে হাঁটতে গিয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড দূরে থাক জাতীয় ও দলীয় দিবসগুলো পর্যন্ত পালন করতে ভুলে যান। সভা-সমাবেশ জনসংযোগের মাধ্যমে সংগঠনকে সুসংগঠিত রাখার পথ অনেক জেলায় হারিয়ে গেছে। ষাটের দশকে প্রতি বছর ছাত্রলীগের সম্মেলন নিয়মিত হয়েছে। স্বাধীনতাউত্তরকালে দু’বছর পরপর সম্মেলন হয়েছে। আওয়ামী লীগের দুঃসময়েও জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে মূল দল এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন নিয়মিত হয়েছে। ’৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনিয়মিত হওয়ার সূচনা ঘটে। তারপরও কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে নেতৃত্বের মানে বিপর্যয় দেখা দেয়নি। ওয়ান ইলেভেনের পর সংস্কারবাদীদের দলের নেতৃত্ব থেকে দূরে রেখে তারুণ্যনির্ভর নবীন-প্রবীণের সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে দুই দফায় জাতীয় কাউন্সিল হলেও সংগঠনে প্রাণের সঞ্চার ঘটেনি।
বিগত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা প্রার্থী বিপুল ভোটে হেরে গেলে অনেকে মনে করেছিলেন, এবার বোধহয় দলের ঘুম ভাঙল। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে দল গুরুত্ব দিয়ে নামলেও পরাজয় ঠেকাতে পারেনি। সেই সময় দলের শীর্ষ পর্যায়ে অনেক আলাপ-আলোচনাও হয়েছিল। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অনেক বিতর্কের ঢেউ তুলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে অবস্থা সুসংহত করে ফেলায় নেতা-কর্মীরা ফের ভুলে যান সাংগঠনিক দুর্বলতা ও জনপ্রিয়তার বিষয়টি। অথচ ৫ জানুয়ারি সেই জাতীয় নির্বাচনের আগে অনেকে দেশ ত্যাগের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। মন্ত্রীরাও মুখের লাগাম টেনেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি আবার মন্ত্রী নেতা এমপিরা ক্ষমতার দম্ভে বেহুঁশ হয়ে কথা বলছেন বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
ক্ষমতানির্ভর আওয়ামী লীগনৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান রাজনীতির দায়িত্বে না থাকলেও দুই মাস পর সন্ধান পাওয়া বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে নজরকাড়া মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, সরকার নিয়ে থাকলে তিনি আর ফেরত আসতেন না। সমালোচকরা বলছেন, তবে কি, যারা ফিরে আসেনি তাদেরকে সরকার নিয়েছে? ফ্রি স্টাইলে চলছে মন্ত্রীদের অতিকথন। আবার মাঠ পর্যায়ে এমপি নেতাকর্মীর সিন্ডিকেট বেপরোয়া। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর জেলা সম্মেলনের তাগিদ দেন ওয়ার্কিং কমিটিতে বসলেই। নেতারাও নড়েচড়ে বসেন। তবুও তার নির্দেশ কার্যকর হয় না। ছাত্রলীগের সম্মেলনের তারিখ তিনি তিন দফা নির্দেশ দিয়ে আদায় করেছেন। আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল ৩ বছর পর হলেও জেলা সম্মেলন হয়ে ওঠে না স্থানীয় সুবিধাবাদী কেন্দ্রীয় কিছু মন্ত্রী নেতার কারণে। তারুণ্যের দোহাই দিয়ে কেউ কেউ আবার কোনো কোনো জেলায় জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক, একই সঙ্গে যুবলীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়ে বসে আছেন। অথচ বিক্ষুব্ধ যুবলীগের অধিকাংশ নেতা-কর্মী আলাদা অবস্থান নিয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড করলেও রহস্যজনকভাবে দু’পদেই তিনি থেকে যান। কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেয়া দলীয় এমপি প্রার্থী বা জেলা পরিষদ প্রশাসক একই ব্যক্তিকে করায় কোথাও কোথাও সংগঠনের নেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
সংগঠনে দেখা দিচ্ছে অচলাবস্থা। মাঠ পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিভক্তি এতটাই তীব্র যে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলের হাইকমান্ড তার চিত্র দেখতে পেয়েছেন। সিলেট বিভাগের মতো জেলা সদরে ইফতেখার হোসেন শামীমের অকাল মৃত্যুতে তার শূন্য স্থান এখনো পূরণ হয়নি। জেলা সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ জহির চৌধুরী সুফিয়ান কঠিন রোগে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন। কর্মীবান্ধব সাবেক জেলা সাধারণ সম্পাদক আ ন ম শফিকুল হক মৃত্যুর মুখোমুখি। সাবেক মেয়র বদরুদ্দিন আহমদ কামরান ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরীই দলের সবেধন নীলমণি। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব জেলায় জেলায় তৈরি হচ্ছে না। যে আওয়ামী লীগ ছিল গরিবের দল, যে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকলেও আত্মার বাঁধনে বাঁধা থেকে ত্যাগের মহিমায় আদর্শ বুকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দলের জন্য কাজ করেছেন, বৈরী স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটেছেন সেই দলটিতে এখন নানা স্তরে কমিটি পদবাণিজ্য হয়। বিগত উপজেলা নির্বাচনে এবং সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদেও রমরমা বাণিজ্যের ঘটনা ঘটেছে।

যুবলীগে কী ঘটেছে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মুখে মুখে শোনা যায়। দলের অনেক মহিলা কর্মীরা তদ্বির বাণিজ্যে এগিয়ে। ছাত্রলীগে একটি কথা প্রচলিত- কমিটি ভাঙতেও অনুদান দিতেও অনুদান। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা পর্যন্ত যুবলীগ ছাত্রলীগের হাল-হকিকতে অসহায়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে মন্ত্রণালয়ে যান না, দলীয় কার্যালয়ে বসেন না। রাত নামলেই তিনি নিখোঁজ। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৎ পিতার সৎ সন্তান হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। তার আড্ডার আসরে যারা যান, কোনো মতলব নিয়ে কথা বলতে পারেন না। তিনি শেরপুরের সম্মেলনে বলেছেন, গঠনতন্ত্র রেখে লাভ কী? ছিঁড়ে ফেলুন। আওয়ামী লীগ নির্ভর করে সংগঠন ও জনগণের ওপর। আগামী নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তার বক্তব্য হৃদয় থেকেই আসেনি; ইঙ্গিতবহও। বর্তমানে দলের যে সাংগঠনিক অবস্থা, কখনো ক্ষমতার বাইরে গেলে রুখে দাঁড়াবার মতো অবস্থা থাকবে না।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে দলের ভেতরে-বাইরে একটি কথা প্রচলিত যে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রমী এই রাজনীতিবিদ নেতা-কর্মীদের যেমন সাক্ষাৎ দেন; দলের খবরও রাখেন। সংবাদপত্র খুঁটিয়ে পড়েন। টিভি টকশোও ছাড়েন না। জেলা নেতাদের খবরও তার নজরে। মন্ত্রী-এমপিদের আমলনামাও তার হাতে। গভীর বেদনার সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের সবাইকে কেনা যায়, শেখ হাসিনাকে কেনা যায় না।’ পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এটি তিনি দলের লাখ লাখ ত্যাগী নেতা-কর্মীকে বলেননি। বলেছেন সেই সব মন্ত্রী-এমপিকে যারা দুর্নীতির গন্ধ গায়ে মেখে হাঁটেন। যারা বড় লোকের হয়ে তদবির করেন, সুবিধা দেন। লোভ, মোহ আর বিলাসিতা যাদের রাজনীতিকে কলঙ্কিত করেছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে আদর্শবাদী নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা সাংগঠনিকভাবে দলকে ঢেলে সাজানোর এখনই সময়। আদর্শবাদ নেতাকর্মীদের নেতৃত্বের সামনে নিয়ে আসা সময়ের দাবি। উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া নয়; তৃণমূলের মতামতেই সেই নেতৃত্ব খুঁজে বের করা। বিতর্কিতদের দূরে রাখা। আওয়ামী লীগের বিগত জাতীয় কাউন্সিলে অনেক বিতর্কিতরা প্রেসিডিয়াম থেকে বাদ পড়েছেন। অনেকে মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি প্রশংসিত হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর