ঢাকা ০৪:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কেমন ছিল একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:২৫:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯
  • ১৮৩ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কেমন ছিল একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর? সেদিন মিত্রবাহিনীর হামলা ও আক্রমনে কাঁপছিল ঢাকা। ঢাকা বিজয়ে প্রচন্ড হামলা চলতে থাকে রাজধানীর চারদিকে।

অন্যদিকে নিয়াজিদের হৃৎকম্প তখন তুঙ্গে। ১৩ ডিসেম্বর রাত থেকে ১৪ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে মিত্রবাহিনীর কামান অবিরাম গোলা ছুড়ে চলেছে।

গভর্নর মালিকের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে আশ্রয় নেয় রেডক্রসে। এতে নিয়াজির অবস্থা আরও করুণ হয়ে ওঠে। জেনারেল নিয়াজি বারবার নিরাপদ আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে ভারতের সেনাপ্রধান মানেকশ’র সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। আত্মসমর্পণের পর জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত হতে চাইছেন পাকিস্তানি জেনারেলরা।

এই আগুনে মুহূর্তে মিত্রবাহিনীর কামানের গোলা গিয়ে পড়ল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেও। সে গোলার আওয়াজে কাঁপল গোটা শহর। ঢাকার সবাই বুঝল, আর রক্ষা নেই। গভর্নর মালিক সেদিন সকালেই পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য গভর্নর হাউসে মন্ত্রিসভার এক জরুরী বৈঠক ডাকলেন। বৈঠক বসল বেলা ১১টা নাগাদ। মিত্রবাহিনীও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেনে গেল এই বৈঠকের খবরটা।কয়েক মিনিটের মধ্যেই একঝাঁক ভারতীয় জঙ্গী বিমান গভর্নর হাউসের ওপর রকেট ছুড়ল। গোটা পাঁচেক গিয়ে পড়ল গভর্নর হাউসের ছাদের ওপর। মালিক ও তার মন্ত্রীরা ভয়ে কেঁপে উঠল। মিটিংয়ে উপস্থিত  চীফ সেক্রেটারি, আইজি পুলিশসহ বড় বড় অফিসাররা ভয়ে যে যেমনি পারল পালাল।

মালিক সাহেব পাকিস্তানী মিত্রদের সঙ্গে আবার বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন। ঢাকার আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির প্রতিনিধি রেনডের কাছে আশ্রয় চাইলেন। রেনড ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলকে রেডক্রসের অধীনে ‘নিরাপদ এলাকা’ করে নিয়েছেন। বহু বিদেশী এবং পশ্চিম পাকিস্তানী আশ্রয় নেয় ওই হোটেলে।

মার্কিন সপ্তম নৌবহর যে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছে এ খবর চার-পাঁচদিন আগে থেকেই জানা ছিল। গোটা দুনিয়ায় তখন সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে আগমন নিয়ে জোর জল্পনা-কল্পনা চলছে। মার্কিন সরকার যদিও ঘোষণা করল যে, কিছু আমেরিকান নাগরিক অবরুদ্ধ, বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্যই সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করল না। সবার মনে তখন প্রশ্ন, প্রেসিডেন্ট নিক্সন কী ইয়াহিয়াকে রক্ষার জন্য মার্কিন নৌবহরকে যুদ্ধের মাঠে নামাবেন? ঠিক কি উদ্দেশ্যে মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে এসেছিল এবং কেনইবা তারা কিছু না করে (বা করতে না পারে) ফিরে গেল তা আজও রহস্যাবৃত।

মিত্রবাহিনী তখন ঢাকার ভেতরের অবস্থাটা কী, বোঝার চেষ্টা করছিল। মিত্রবাহিনী ভাবল, ঢাকার ভেতরে লড়াই করার জন্য যদি সৈন্যদের এগিয়ে দেয়া হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে যদি বিমান আক্রমণ চালানো হয়, তবে লড়াইয়ে সাধারণ মানুষও মরবে। তাই এটা কিছুতেই করতে চাইছিল না মিত্রবাহিনী। তাই ওইদিনই তারা ফের পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহবান জানালেন এবং অন্যদিকে ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের অনুরোধ করলেন, আপনারা শহর ছেড়ে চলে যান। উত্তর এবং পূর্ব- রাজধানীর দুদিকেই তখন আরও বহু মিত্রসেনা এসে উপস্থিত।

পাকিস্তানী হানাদার ও তাদের দোসররা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটায় একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর। এদিনটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক বেদনা বিধুর দিন। মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে বাঙালি জাতিকে চিরতরে মেধাশূন্য ও পঙ্গু করে দেয়ার লক্ষ্যে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, আইনজীবী ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি পেশাজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়ে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়।

১৪ ডিসেম্বর দখলদার বাহিনী যখন ঢাকায় নির্দয়ভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা করছে, ঠিক তখন যৌথ বাহিনী ঢাকার উপকণ্ঠে তুরাগ নদীর পশ্চিম পাড়ে পৌঁছে গেছে। পশ্চিম ও পশ্চিম-উত্তর দিক থেকে ঢাকাকে ঘিরে ফেলে মুক্তিবাহিনী তৈরি করে কালিয়াকৈর-সাভার-মিরপুর-ঢাকা বেষ্টনী। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের যোদ্ধারা ১৪ ডিসেম্বর রাতে পৌঁছে যায় ঢাকার বাসাবোতে এবং দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি দল ডেমরায়।

এদিনই সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান পূর্বাঞ্চলীয় দখলদার বাহিনী প্রধান নিয়াজী ও গভর্নর ড. মালিকের কাছে যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দিয়ে এক তার বার্তা পাঠালে চূড়ান্তভাবে ভেঙ্গে পড়ে দখলদার বাহিনীর মনোবল। তখন সামনে পড়ে থাকে শুধু আত্মসমর্পণের আুষ্ঠানিকতা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

কেমন ছিল একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর

আপডেট টাইম : ১১:২৫:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কেমন ছিল একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর? সেদিন মিত্রবাহিনীর হামলা ও আক্রমনে কাঁপছিল ঢাকা। ঢাকা বিজয়ে প্রচন্ড হামলা চলতে থাকে রাজধানীর চারদিকে।

অন্যদিকে নিয়াজিদের হৃৎকম্প তখন তুঙ্গে। ১৩ ডিসেম্বর রাত থেকে ১৪ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে মিত্রবাহিনীর কামান অবিরাম গোলা ছুড়ে চলেছে।

গভর্নর মালিকের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে আশ্রয় নেয় রেডক্রসে। এতে নিয়াজির অবস্থা আরও করুণ হয়ে ওঠে। জেনারেল নিয়াজি বারবার নিরাপদ আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে ভারতের সেনাপ্রধান মানেকশ’র সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। আত্মসমর্পণের পর জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত হতে চাইছেন পাকিস্তানি জেনারেলরা।

এই আগুনে মুহূর্তে মিত্রবাহিনীর কামানের গোলা গিয়ে পড়ল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেও। সে গোলার আওয়াজে কাঁপল গোটা শহর। ঢাকার সবাই বুঝল, আর রক্ষা নেই। গভর্নর মালিক সেদিন সকালেই পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য গভর্নর হাউসে মন্ত্রিসভার এক জরুরী বৈঠক ডাকলেন। বৈঠক বসল বেলা ১১টা নাগাদ। মিত্রবাহিনীও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেনে গেল এই বৈঠকের খবরটা।কয়েক মিনিটের মধ্যেই একঝাঁক ভারতীয় জঙ্গী বিমান গভর্নর হাউসের ওপর রকেট ছুড়ল। গোটা পাঁচেক গিয়ে পড়ল গভর্নর হাউসের ছাদের ওপর। মালিক ও তার মন্ত্রীরা ভয়ে কেঁপে উঠল। মিটিংয়ে উপস্থিত  চীফ সেক্রেটারি, আইজি পুলিশসহ বড় বড় অফিসাররা ভয়ে যে যেমনি পারল পালাল।

মালিক সাহেব পাকিস্তানী মিত্রদের সঙ্গে আবার বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন। ঢাকার আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির প্রতিনিধি রেনডের কাছে আশ্রয় চাইলেন। রেনড ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলকে রেডক্রসের অধীনে ‘নিরাপদ এলাকা’ করে নিয়েছেন। বহু বিদেশী এবং পশ্চিম পাকিস্তানী আশ্রয় নেয় ওই হোটেলে।

মার্কিন সপ্তম নৌবহর যে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছে এ খবর চার-পাঁচদিন আগে থেকেই জানা ছিল। গোটা দুনিয়ায় তখন সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে আগমন নিয়ে জোর জল্পনা-কল্পনা চলছে। মার্কিন সরকার যদিও ঘোষণা করল যে, কিছু আমেরিকান নাগরিক অবরুদ্ধ, বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্যই সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করল না। সবার মনে তখন প্রশ্ন, প্রেসিডেন্ট নিক্সন কী ইয়াহিয়াকে রক্ষার জন্য মার্কিন নৌবহরকে যুদ্ধের মাঠে নামাবেন? ঠিক কি উদ্দেশ্যে মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে এসেছিল এবং কেনইবা তারা কিছু না করে (বা করতে না পারে) ফিরে গেল তা আজও রহস্যাবৃত।

মিত্রবাহিনী তখন ঢাকার ভেতরের অবস্থাটা কী, বোঝার চেষ্টা করছিল। মিত্রবাহিনী ভাবল, ঢাকার ভেতরে লড়াই করার জন্য যদি সৈন্যদের এগিয়ে দেয়া হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে যদি বিমান আক্রমণ চালানো হয়, তবে লড়াইয়ে সাধারণ মানুষও মরবে। তাই এটা কিছুতেই করতে চাইছিল না মিত্রবাহিনী। তাই ওইদিনই তারা ফের পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহবান জানালেন এবং অন্যদিকে ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের অনুরোধ করলেন, আপনারা শহর ছেড়ে চলে যান। উত্তর এবং পূর্ব- রাজধানীর দুদিকেই তখন আরও বহু মিত্রসেনা এসে উপস্থিত।

পাকিস্তানী হানাদার ও তাদের দোসররা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটায় একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর। এদিনটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক বেদনা বিধুর দিন। মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে বাঙালি জাতিকে চিরতরে মেধাশূন্য ও পঙ্গু করে দেয়ার লক্ষ্যে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, আইনজীবী ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি পেশাজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়ে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়।

১৪ ডিসেম্বর দখলদার বাহিনী যখন ঢাকায় নির্দয়ভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা করছে, ঠিক তখন যৌথ বাহিনী ঢাকার উপকণ্ঠে তুরাগ নদীর পশ্চিম পাড়ে পৌঁছে গেছে। পশ্চিম ও পশ্চিম-উত্তর দিক থেকে ঢাকাকে ঘিরে ফেলে মুক্তিবাহিনী তৈরি করে কালিয়াকৈর-সাভার-মিরপুর-ঢাকা বেষ্টনী। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের যোদ্ধারা ১৪ ডিসেম্বর রাতে পৌঁছে যায় ঢাকার বাসাবোতে এবং দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি দল ডেমরায়।

এদিনই সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান পূর্বাঞ্চলীয় দখলদার বাহিনী প্রধান নিয়াজী ও গভর্নর ড. মালিকের কাছে যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দিয়ে এক তার বার্তা পাঠালে চূড়ান্তভাবে ভেঙ্গে পড়ে দখলদার বাহিনীর মনোবল। তখন সামনে পড়ে থাকে শুধু আত্মসমর্পণের আুষ্ঠানিকতা।