ঢাকা ১০:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধাহত বীরাঙ্গনা সরুফা বেগমের কথা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৮:৪০:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০১৫
  • ৩৬১ বার

বৃহত্তর কুমিল্লার মধ্যে একমাত্র যুদ্ধাহত বীরাঙ্গনা হচ্ছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সরুপা বেগম। জেলার অপর ১৩ জন বীরাঙ্গনার মধ্যে তাকেই একমাত্র থানায় নিয়ে শারিরীক নির্যাতন করা হয়েছে এবং থানা থেকে পালিয়ে আসার সময় পাক বাহিনীর ছুঁড়ে দেয়া গুলিতে তার বাম পা ক্ষত বিক্ষত হয়। সেই ক্ষত নিয়ে বিশেষ এক ধরনের জুতা পড়ে গত ৪৪ বছর ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে তার মানবেতর জীবন। পঙ্গু পা নিয়ে গৃহকর্মীরা কাজ করে জীবন ধারণ করা এই বীর নাড়ির ক্ষেদোক্তি, বাবা, কুমিল্লার ডিসি স্যার , অন্যদের নিয়ে অনেক সম্মান করেছে, জমি দিয়েছে , স্বীকৃতি দিয়েছে ভাল কথা , কিন্ত আমি কি অপরাধ করলাম ? ভাইয়ের জায়গায় ছোট একটি ছাবরার মতো ঘরে বসে এই বীরাঙ্গনার বেদনার কথা গুলো শুনার আগে জেনে নেই তার পরিচয়টুকু।
সরুপা বেগম, পিতা মো. ছফিউল্লাহ, মাতা মেহেরুন নেছা। পিতা মাতার ৪ মেয়ে ও ২ ছেলের মধ্যে তার অবস্থান ৪র্থ। চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের নোয়াপাড়া গ্রামে তার জন্ম। দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে প্রাইমারীর গন্ডি পেরুবার আগেই বাবা-মা চৌদ্দগ্রাম বাজার সংলগ্ন কিং শ্রীপুর গ্রামের ডা. নূর আহমেদের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে পাঠিয়ে দেন। মাসিক সামান্য মজুরী এবং তিন বলা খাবার পেতেন তিনি যা দিয়ে দরিদ্র পরিবারের সংসারে সহায়ক ভুমিকা পালন করতো। তখন তার বয়স ১০/১১ বছর ছিল। বয়সে ছোট হলেও তার ব্যবহার ও কাজে পারদর্শীতা ছিল বলে অল্প সময়ের মধ্যেই গৃহকর্তাসহ সকলের সুনজরে পরে যান। পরিবারের সবাই তাকে অত্যান্ত আদর করত। সরুপা বেগমের এই বাড়িতে চাকরির বছর খানেকের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা সংগ্রাম। কিংশ্রীপুর গ্রামটি ছিল একেবারেই চৌদ্দগ্রাম থানা সংলগ্ন। তাই এই গ্রামের মানুষ সর্বদাই ভীত সন্ত্রস্ত থাকত। সরুপা বেগমের মতে, চৌদ্দগ্রাম থানায় যখনি চাল ঢাল তরিতরকারীর প্রয়োজন হতো তখনি ৪/৫ জন পাঞ্জাবী অস্ত্রসহ বেরিয়ে পড়তো গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় মহড়া দিত। উদ্দেশ্য ছিল মহাড়া দেয়ার নামে তারা দেখতো কোন বাড়িতে হাস মুরগী আছে, সুন্দরী মেয়ে বা মহিলা আছে। এমনও দেখেছি এই কিংশ্রীপুর গ্রাম থেকে তারা ঘরে ঢুকে ড্রাম থেকে চাউলও নিয়েছে। যারা ক্ষেতে খামারে সবজী লাগিয়েছে তাদের বলত, সবজী গুলো থানায় নিয়ে এসো। কোন দিন কোন কারণে না দিতে পারলে বাড়ি এসে গৃহকর্তাকে মারধর করত কিংবা গালাগলি করে যেতো। এ কাজে রাজাকাররাও সহায়তা করতো।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া তার উপর নির্মম নির্যাতনের কাহিনী জানতে চাইলে, কাপড়ের আচল দিয়ে চোখ মুছেন বৃহত্তর কুমিল্লার একমাত্র যোদ্ধাহত বীরাঙ্গনা সরুপা বেগম। কান্না জর্জরিত কন্ঠে মাটির দিকে তাকিয়ে পাশবিক নির্যাতনের কথা বলতে থাকেন সরুপা বেগম। তিনি জানান, মাসটির নাম খেয়াল নেই। আগষ্ট বা সেপ্টেম্বর মাস হবে। আছর নামাজের আযান হয়েছে। এমন সময় গ্রামের মানুষ কিছু বুঝে উঠার আগেই পাঞ্জাবীরা সারা গ্রামে আক্রমন শুরু হরে। গ্রামের মানুষরা ছোটাছুঁটি শুরু করেছে। আমি সবে মাত্র ঘর ঝাড়ু দিয়ে দড়জার সামনে দাঁড়িয়েছি ঠিক তখনি দেখি ৩/৪ জন পাক আর্মি আমার দিকেব এগিয়ে আসছে। মনে মনে ভাবলাম আগের দিন যে, ডাক্তার নুর আহাম্মেদ খালুকে মারধর করেছে এ জন্য হয়তো আবার কোন ঝামেলা হয়েছে তাই আবার আসছে। এতে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্ত আমার ভুল ভাঙ্গতে দেরি হল না। তারা ঘরের পিড়ায় উঠেই আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই চুলের মুঠি ধরে পাকিস্তানী ভাষায় কথা বলে আমাকে হাঁটিয়ে থানায় নিয়ে গেল। থানায় নিয়ে রাত ১০ টা পর্যন্ত একটি কক্ষে আটকিয়ে আমাকে নির্যাতন করল। কত যে বাবা ডেকে ডেকে কেঁদেছি তার কোন হিসেব নেই। কিন্ত তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়নি। এ দিকে কিংশ্রীপুর গ্রামে আক্রমণ হয়েছে বলে বিক্ষুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধারা রাতে থানায় পাল্টা আক্রমণ করে বসল। পাঞ্জাবীরাও মুহুর্তেই থানার ভিতর থেকে এলোপাতারী গুলি চালাতে লাগল। আর এ সময় আমার রুমে মেজর আকবর নামে থানার এক বড় অফিসার ছিল।
সে অন্য সময়ের মত দড়জা বাহির থেকে না লাগিয়েই রুম থেকে দ্রুত বাহির হয়ে গেল। আমিও সুযোগ বুঝে রুম থেকে দিলাম এক দৌঁড়। কিন্ত দৌঁড় দিয়ে বাহির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার বা পায়ের হাঁটুর নিচে একটি বন্ধুকের বুলেট এসে বিদ্ধ হলো। একে তো প্রায় ৫/৬ ঘন্টার পাক বাহিনীর শারিরীক নির্যাতন তার উপর গুলি আামি সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। তিন দিন পর আমার জ্ঞান ফিরে আসার পর দেখি আমি একটি হাসপাতালে শুয়ে আছি এবং সেখানে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কথা শুনতে পাই। আমার বাম পা খানা কাঁটা দেখতে পেয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলে বাহিরে কথা বলা লোক গুলো ভিতরে এসে আমাকে শান্তনা দিয়ে বলে, এখন আর তোমার কোন ভয় নেই। আমরা মক্তিযোদ্ধা । তোমাকে আমরা আহত অবস্থায় চৌদ্দগ্রাম থেকে এখানে নিয়ে এসে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করছি। এই জায়গার নাম বিলুনিয়া। তুমি কান্না করবে না । তোমাকে আমরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত পাঠবো। পরে মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে ভারতের ত্রিপুড়ায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। সেই থেকে বিজয়ের আগ পর্যন্ত আমি ভারতে ছিলাম। ডিসেম্বর মাসের ২২ বা ২৩ তারিখে পায়ে বেন্ডিজ নিয়ে দেশে আসি। এই বা পায়ে গত ৪৪ বছর ধরে এই ফিতাওয়ালা বিশেষ ভাবে তৈরী বুট জুতা পড়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছি। বছরে একবার ঢাকা গিয়ে জুতা পরিবর্তন করে আনতে হয়।
সরুপা বেগম ৭১’র স্মৃতি বলতে গিয়ে আরো জানান, একদিন আমার গৃহকর্তা ডা. নুর আহাম্মদসহ আরো ৭/৮ জনকে ঘর থেকে ধরে এনে তার উঠানো লাইন ধরায় মারার জন্য। তখন আমাদের বাড়িসহ আশেপাশের কয়েক বাড়ির মহিলারা উচ্চস্বরে যখন কান্না কাটি শুরু করে দিল তখন তারা লাঠি দিয়ে বাড়ি দিয়ে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা না কি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছে।
সরুপা বেগম আরো জানায়, বাবারে , আমার চোখের সামনে কিংশ্রীপুর গ্রাম থেকে ৭/৮ জন যুবতী মহিলাকে চৌদ্দগ্রাম থানায় নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছে। আমার জানামতে এই গ্রামের মাত্র একজন বিবাহিত সুন্দরী মহিলাকে থানায় না নিয়ে জোড় করে ঘরেই নির্যাতন করে। সেদিন তাদের জন্য অনেক কান্না করেছি। কোন দিন কল্পনা করি নাই আমার মত কম বয়েসের মেয়েকে তারা ধরে নিবে। আমার অভিশাপের কারনেই তাদের উপর আল্লাহর গজব পড়েছে – এ কথা বলেই কেঁদে দেন সরুপা বেগম।
সরুপা বেগম জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বাড়ি আসি তখন মা বলেছিল, আর মানুষের বাড়িতে কাজ করব না। বিয়ে দিয়ে দিমু। কিন্ত দূর্ভাগ্য আমার একে তো ৭১’র নির্যাতনের ঘটনা তার উপর আমার এক পা প্রায় পঙ্গুর মত। কাজেই বিয়ে আসে বিয়ে যায় কিন্ত গায়ে হলুদ আর আমার গায়ে দেয়ার কপালে জুটে না। ভঙ্গুর পা নিয়ে আবার শুরু করি মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝি এর কাজ। এমনি করে কেটে যায় ১৭ টি বছর।
১৯৮৮ সালে একই উপজেলার পাঁচোরা গ্রামের কবির আহাম্মেদের সঙ্গে বিয়ে হয় সরুপা বেগমের । নানা কারনে ২ বছরের মধ্যেই ভেঙ্গে যায় সেই বিয়ে। সরুপা-কবির দম্পত্তির ঘরে একটি মেয়ে হয়। জন্মের কিছু দিনের মধ্যেই মারা যায় সেই মেয়ে। বর্তমানে স্বামী সন্তান বিহীন একাকিত্ব জীবন ধারণ করছেন এই বীরাঙ্গনা ।
বাবা ভাঙ্গা ঘরটি যে দেখছেন এই জায়গায়টি আমরা না। অন্যের জায়গায় এই ভাঙ্গা ঘর তুলে থাকতেছি। তিনি দুঃখ করে বলেন, শুনেছি, কুমিল্লার বর্তমান জেলা প্রশাসক না-কি এবার বীরাঙ্গনাদের কুমিল্লায় নিয়ে সম্মান জানিয়েছে এবং জমি দিয়েছে। ও বাবা, তাহলে আমি কি অপরাধ করলাম ? আমি তো শুধু নির্যাতন সহ্য করেছি তা নয়, সারা জীবনের জন্য একটা পা হারালম। বুলেট বিদ্ধ পা নিয়ে মানুষের ধারে ধারে এক মুঠ ভাত খাওয়ার জন্য কাজ করছি। আমার কপালে কি তাহলে কুমিল্লার ডিসি স্যারের সম্মানটাও জুটবে না।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আবুল হাসেম জানান, সরুপা বেগম শুধু বীরাঙ্গনা তা নয়, সে একজন যোদ্ধাহত বীরাাঙ্গনা। সরুপা বেগমকে বীরাঙ্গনা সম্মান জানাতে ২১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বরাবর করা একটি আবেদনে তিনি সুপারিশ করেছেন বলে জানান।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

যুদ্ধাহত বীরাঙ্গনা সরুফা বেগমের কথা

আপডেট টাইম : ০৮:৪০:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০১৫

বৃহত্তর কুমিল্লার মধ্যে একমাত্র যুদ্ধাহত বীরাঙ্গনা হচ্ছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সরুপা বেগম। জেলার অপর ১৩ জন বীরাঙ্গনার মধ্যে তাকেই একমাত্র থানায় নিয়ে শারিরীক নির্যাতন করা হয়েছে এবং থানা থেকে পালিয়ে আসার সময় পাক বাহিনীর ছুঁড়ে দেয়া গুলিতে তার বাম পা ক্ষত বিক্ষত হয়। সেই ক্ষত নিয়ে বিশেষ এক ধরনের জুতা পড়ে গত ৪৪ বছর ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে তার মানবেতর জীবন। পঙ্গু পা নিয়ে গৃহকর্মীরা কাজ করে জীবন ধারণ করা এই বীর নাড়ির ক্ষেদোক্তি, বাবা, কুমিল্লার ডিসি স্যার , অন্যদের নিয়ে অনেক সম্মান করেছে, জমি দিয়েছে , স্বীকৃতি দিয়েছে ভাল কথা , কিন্ত আমি কি অপরাধ করলাম ? ভাইয়ের জায়গায় ছোট একটি ছাবরার মতো ঘরে বসে এই বীরাঙ্গনার বেদনার কথা গুলো শুনার আগে জেনে নেই তার পরিচয়টুকু।
সরুপা বেগম, পিতা মো. ছফিউল্লাহ, মাতা মেহেরুন নেছা। পিতা মাতার ৪ মেয়ে ও ২ ছেলের মধ্যে তার অবস্থান ৪র্থ। চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের নোয়াপাড়া গ্রামে তার জন্ম। দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে প্রাইমারীর গন্ডি পেরুবার আগেই বাবা-মা চৌদ্দগ্রাম বাজার সংলগ্ন কিং শ্রীপুর গ্রামের ডা. নূর আহমেদের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে পাঠিয়ে দেন। মাসিক সামান্য মজুরী এবং তিন বলা খাবার পেতেন তিনি যা দিয়ে দরিদ্র পরিবারের সংসারে সহায়ক ভুমিকা পালন করতো। তখন তার বয়স ১০/১১ বছর ছিল। বয়সে ছোট হলেও তার ব্যবহার ও কাজে পারদর্শীতা ছিল বলে অল্প সময়ের মধ্যেই গৃহকর্তাসহ সকলের সুনজরে পরে যান। পরিবারের সবাই তাকে অত্যান্ত আদর করত। সরুপা বেগমের এই বাড়িতে চাকরির বছর খানেকের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা সংগ্রাম। কিংশ্রীপুর গ্রামটি ছিল একেবারেই চৌদ্দগ্রাম থানা সংলগ্ন। তাই এই গ্রামের মানুষ সর্বদাই ভীত সন্ত্রস্ত থাকত। সরুপা বেগমের মতে, চৌদ্দগ্রাম থানায় যখনি চাল ঢাল তরিতরকারীর প্রয়োজন হতো তখনি ৪/৫ জন পাঞ্জাবী অস্ত্রসহ বেরিয়ে পড়তো গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় মহড়া দিত। উদ্দেশ্য ছিল মহাড়া দেয়ার নামে তারা দেখতো কোন বাড়িতে হাস মুরগী আছে, সুন্দরী মেয়ে বা মহিলা আছে। এমনও দেখেছি এই কিংশ্রীপুর গ্রাম থেকে তারা ঘরে ঢুকে ড্রাম থেকে চাউলও নিয়েছে। যারা ক্ষেতে খামারে সবজী লাগিয়েছে তাদের বলত, সবজী গুলো থানায় নিয়ে এসো। কোন দিন কোন কারণে না দিতে পারলে বাড়ি এসে গৃহকর্তাকে মারধর করত কিংবা গালাগলি করে যেতো। এ কাজে রাজাকাররাও সহায়তা করতো।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া তার উপর নির্মম নির্যাতনের কাহিনী জানতে চাইলে, কাপড়ের আচল দিয়ে চোখ মুছেন বৃহত্তর কুমিল্লার একমাত্র যোদ্ধাহত বীরাঙ্গনা সরুপা বেগম। কান্না জর্জরিত কন্ঠে মাটির দিকে তাকিয়ে পাশবিক নির্যাতনের কথা বলতে থাকেন সরুপা বেগম। তিনি জানান, মাসটির নাম খেয়াল নেই। আগষ্ট বা সেপ্টেম্বর মাস হবে। আছর নামাজের আযান হয়েছে। এমন সময় গ্রামের মানুষ কিছু বুঝে উঠার আগেই পাঞ্জাবীরা সারা গ্রামে আক্রমন শুরু হরে। গ্রামের মানুষরা ছোটাছুঁটি শুরু করেছে। আমি সবে মাত্র ঘর ঝাড়ু দিয়ে দড়জার সামনে দাঁড়িয়েছি ঠিক তখনি দেখি ৩/৪ জন পাক আর্মি আমার দিকেব এগিয়ে আসছে। মনে মনে ভাবলাম আগের দিন যে, ডাক্তার নুর আহাম্মেদ খালুকে মারধর করেছে এ জন্য হয়তো আবার কোন ঝামেলা হয়েছে তাই আবার আসছে। এতে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্ত আমার ভুল ভাঙ্গতে দেরি হল না। তারা ঘরের পিড়ায় উঠেই আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই চুলের মুঠি ধরে পাকিস্তানী ভাষায় কথা বলে আমাকে হাঁটিয়ে থানায় নিয়ে গেল। থানায় নিয়ে রাত ১০ টা পর্যন্ত একটি কক্ষে আটকিয়ে আমাকে নির্যাতন করল। কত যে বাবা ডেকে ডেকে কেঁদেছি তার কোন হিসেব নেই। কিন্ত তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়নি। এ দিকে কিংশ্রীপুর গ্রামে আক্রমণ হয়েছে বলে বিক্ষুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধারা রাতে থানায় পাল্টা আক্রমণ করে বসল। পাঞ্জাবীরাও মুহুর্তেই থানার ভিতর থেকে এলোপাতারী গুলি চালাতে লাগল। আর এ সময় আমার রুমে মেজর আকবর নামে থানার এক বড় অফিসার ছিল।
সে অন্য সময়ের মত দড়জা বাহির থেকে না লাগিয়েই রুম থেকে দ্রুত বাহির হয়ে গেল। আমিও সুযোগ বুঝে রুম থেকে দিলাম এক দৌঁড়। কিন্ত দৌঁড় দিয়ে বাহির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার বা পায়ের হাঁটুর নিচে একটি বন্ধুকের বুলেট এসে বিদ্ধ হলো। একে তো প্রায় ৫/৬ ঘন্টার পাক বাহিনীর শারিরীক নির্যাতন তার উপর গুলি আামি সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। তিন দিন পর আমার জ্ঞান ফিরে আসার পর দেখি আমি একটি হাসপাতালে শুয়ে আছি এবং সেখানে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কথা শুনতে পাই। আমার বাম পা খানা কাঁটা দেখতে পেয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলে বাহিরে কথা বলা লোক গুলো ভিতরে এসে আমাকে শান্তনা দিয়ে বলে, এখন আর তোমার কোন ভয় নেই। আমরা মক্তিযোদ্ধা । তোমাকে আমরা আহত অবস্থায় চৌদ্দগ্রাম থেকে এখানে নিয়ে এসে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করছি। এই জায়গার নাম বিলুনিয়া। তুমি কান্না করবে না । তোমাকে আমরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত পাঠবো। পরে মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে ভারতের ত্রিপুড়ায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। সেই থেকে বিজয়ের আগ পর্যন্ত আমি ভারতে ছিলাম। ডিসেম্বর মাসের ২২ বা ২৩ তারিখে পায়ে বেন্ডিজ নিয়ে দেশে আসি। এই বা পায়ে গত ৪৪ বছর ধরে এই ফিতাওয়ালা বিশেষ ভাবে তৈরী বুট জুতা পড়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছি। বছরে একবার ঢাকা গিয়ে জুতা পরিবর্তন করে আনতে হয়।
সরুপা বেগম ৭১’র স্মৃতি বলতে গিয়ে আরো জানান, একদিন আমার গৃহকর্তা ডা. নুর আহাম্মদসহ আরো ৭/৮ জনকে ঘর থেকে ধরে এনে তার উঠানো লাইন ধরায় মারার জন্য। তখন আমাদের বাড়িসহ আশেপাশের কয়েক বাড়ির মহিলারা উচ্চস্বরে যখন কান্না কাটি শুরু করে দিল তখন তারা লাঠি দিয়ে বাড়ি দিয়ে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা না কি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছে।
সরুপা বেগম আরো জানায়, বাবারে , আমার চোখের সামনে কিংশ্রীপুর গ্রাম থেকে ৭/৮ জন যুবতী মহিলাকে চৌদ্দগ্রাম থানায় নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছে। আমার জানামতে এই গ্রামের মাত্র একজন বিবাহিত সুন্দরী মহিলাকে থানায় না নিয়ে জোড় করে ঘরেই নির্যাতন করে। সেদিন তাদের জন্য অনেক কান্না করেছি। কোন দিন কল্পনা করি নাই আমার মত কম বয়েসের মেয়েকে তারা ধরে নিবে। আমার অভিশাপের কারনেই তাদের উপর আল্লাহর গজব পড়েছে – এ কথা বলেই কেঁদে দেন সরুপা বেগম।
সরুপা বেগম জানান, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বাড়ি আসি তখন মা বলেছিল, আর মানুষের বাড়িতে কাজ করব না। বিয়ে দিয়ে দিমু। কিন্ত দূর্ভাগ্য আমার একে তো ৭১’র নির্যাতনের ঘটনা তার উপর আমার এক পা প্রায় পঙ্গুর মত। কাজেই বিয়ে আসে বিয়ে যায় কিন্ত গায়ে হলুদ আর আমার গায়ে দেয়ার কপালে জুটে না। ভঙ্গুর পা নিয়ে আবার শুরু করি মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝি এর কাজ। এমনি করে কেটে যায় ১৭ টি বছর।
১৯৮৮ সালে একই উপজেলার পাঁচোরা গ্রামের কবির আহাম্মেদের সঙ্গে বিয়ে হয় সরুপা বেগমের । নানা কারনে ২ বছরের মধ্যেই ভেঙ্গে যায় সেই বিয়ে। সরুপা-কবির দম্পত্তির ঘরে একটি মেয়ে হয়। জন্মের কিছু দিনের মধ্যেই মারা যায় সেই মেয়ে। বর্তমানে স্বামী সন্তান বিহীন একাকিত্ব জীবন ধারণ করছেন এই বীরাঙ্গনা ।
বাবা ভাঙ্গা ঘরটি যে দেখছেন এই জায়গায়টি আমরা না। অন্যের জায়গায় এই ভাঙ্গা ঘর তুলে থাকতেছি। তিনি দুঃখ করে বলেন, শুনেছি, কুমিল্লার বর্তমান জেলা প্রশাসক না-কি এবার বীরাঙ্গনাদের কুমিল্লায় নিয়ে সম্মান জানিয়েছে এবং জমি দিয়েছে। ও বাবা, তাহলে আমি কি অপরাধ করলাম ? আমি তো শুধু নির্যাতন সহ্য করেছি তা নয়, সারা জীবনের জন্য একটা পা হারালম। বুলেট বিদ্ধ পা নিয়ে মানুষের ধারে ধারে এক মুঠ ভাত খাওয়ার জন্য কাজ করছি। আমার কপালে কি তাহলে কুমিল্লার ডিসি স্যারের সম্মানটাও জুটবে না।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আবুল হাসেম জানান, সরুপা বেগম শুধু বীরাঙ্গনা তা নয়, সে একজন যোদ্ধাহত বীরাাঙ্গনা। সরুপা বেগমকে বীরাঙ্গনা সম্মান জানাতে ২১ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বরাবর করা একটি আবেদনে তিনি সুপারিশ করেছেন বলে জানান।