হাওর বার্তা ডেস্কঃ বাহ্যিক অঙ্গগুলোকে গোনাহ থেকে পাকসাফ রাখতে হবে। হাতের গোনাহ, পায়ের গোনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। চোখের গোনাহ, কানের গোনাহে পরিত্যাগী হতে হবে। মধ্যবর্তী ক্ষুদ্র অঙ্গটির অপব্যবহার পরিহার করতে হবে
হাদিসের বিশাল ভা-ারে ‘হাদিসে জিবরিল’ অভিধায় সুপ্রসিদ্ধ দীর্ঘ একটি হাদিস আছে। আবু হোরায়রা (রা.) থেকে হাদিসটি বর্ণিত। জিবরাইল (আ.) এক ব্যক্তির ছদ্মবেশে এসে রাসুল (সা.) কে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। হাদিসটি এমনÑ
জিবরাইল : ঈমান কী?
রাসুল (সা.) : ঈমান হলো, তুমি আল্লাহ, ফেরেশতাকুল, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাঁর নবীদের প্রতি ঈমান আনবে। আরও ঈমান আনবে পুনরুত্থানের প্রতি।
জিবরাইল : ইসলাম কী?
রাসুল (সা.) : ইসলাম হলো, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। নামাজ আদায় করবে, ফরজ জাকাত দেবে এবং রমজানের রোজা পালন করবে।
জিবরাইল : ইহসান কী?
রাসুল (সা.) : ইহসান হলো, আল্লাহর ইবদত তুমি এমনভাবে করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তাকে দেখতে না পারো, তবে (মনে করবে) আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।’ (দীর্ঘ হাদিসটির চুম্বকাংশ)।
আলোচ্য হাদিসে জিবরাইল (আ.) প্রথম প্রশ্ন ঈমান আর দ্বিতীয় প্রশ্নটি করেছেন ইসলাম বিষয়ে। পরবর্তী প্রশ্নটি করেছেন ইহসানবিষয়ক। খোলা চোখে ভাবনা আসতে পারে, প্রথম দুটি প্রশ্নেই তো গোটা দ্বীন-শরিয়ত পরিবেষ্টিত হয়ে আছে। তৃতীয় প্রশ্নটির কী প্রয়োজন? ঈমান হলো আকিদা আর ইসলাম হলো বিধিবিধানের অপর নাম। আকিদা আর বিধিবিধান দ্বারাই তো দ্বীন-শরিয়ত পূর্ণতা লাভ করে। এ সত্ত্বেও তৃতীয় প্রশ্নটি ওঠানোর কী হেতু থাকতে পারে? এক্ষেত্রে স্বচ্ছ বিবেকে বোঝার বিষয় হলো, প্রথম দুটি প্রশ্নে গোটা শরিয়ত পরিবেষ্টিত হওয়ার পর, আল্লাহ কাউকে শিখিয়ে দেওয়া ব্যতীত ভিন্ন কেউ এ ধরনের প্রশ্ন করতেই পারে না!
জিবরাইল (আ.) রাসুল (সা.) কে প্রশ্ন করলেন ইহসান কী? অর্থাৎদ্বীনকে পূর্ণতায় ঢেলে সাজাতে হলে ঈমান ও ইসলামের পর আরও একটি বিষয়ও প্রয়োজন। সেটা হলো ইহসান। ইহসান ধাতুর আভিধানিক অর্থ হলো, সুন্দর করা, চমৎকার করা। রাসুল (সা.) উত্তরে বললেন, ‘ইহসান হলো, এভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পারো, তবে (মনে করবে) আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।’ রাসুল (সা.) এ বাক্যে দ্বীনের সর্বোচ্চ মাপকাঠি বলে দিয়েছেন।
বান্দার অবশ্যকর্তব্য হলো আল্লাহর আরাধনা করা। আর আরাধনার সর্বোচ্চ মাপকাঠি হলো, বান্দা আল্লাহর ইবাদত এভাবে করবে যেন সে তার মাবুদ তার উপাস্যকে স্বচক্ষে দেখছে। যদি বান্দা এ স্তরে উন্নীত না হতে পারে, তবে অন্তত এতটুকু অবশ্যই মনে করবে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন।
রাসুল (সা.) ইহসানের ভেতর দিয়ে গোটা দ্বীনের মাপকাঠি নির্ণয় করে দিয়েছেন। দ্বীনদারির মাপকাঠি অনেক হতে পারে। তন্মধ্যে ইহসান হলো উঁচু স্তরের মাপকাঠি। একজন মানুষ যখন ঈমান আনবে, মানসিকভাবে ভেতরে ভেতরে সে মুসলমান হলো। আর যখন নামাজ-রোজা-হজ-জাকাত ইত্যাকার অবশ্যপাল্য বিধিবিধান পালন করবে, তখন বাহ্যিকভাবেও সে মুসলমান হয়ে গেল, দ্বীনদার হয়ে গেল। জিবরাইল (আ.) এর তৃতীয় প্রশ্নটি ছিলো দ্বীনদারির পরবর্তী স্তরের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, প্রশ্নের মর্ম হলো, এ দ্বীনদারিকে সুন্দর থেকে সুন্দর, পরিপাটি করার মাপকাঠি কী?
আচ্ছা ভেবেচিন্তে নিজেদের প্রশ্ন করি তো! পার্থিব কার্য সম্পাদনে আমাদের অভিরুচিটা কী? উত্তর আসবে, পার্থিব কর্মযজ্ঞে আমাদের রুচি হলো ‘ইহসানের’।
কেননা পোশাক-আশাক ভালোটা পরিধান করি। ঘরবাড়ি দৃষ্টিনন্দন করে নির্মাণ করি। কোনো কিছু উন্নততরটা নির্বাচন করেই খরিদ করি। এটাই তো ইহসান! মোটা দাগের কথা হলো, পার্থিব সর্বক্ষেত্রেই আমরা আভিজাত্য ও ইহসানের প্রত্যাশী। তাই শরিয়তের আবেদন হলো, দ্বীনের বিষয়েও আমরা যেন অভিজাত ও ইহসানময় অভিরুচির অধিকারী হই এবং এ পথেই পরিচালিত হতে হতে এমন দ্বীনদারে এসে উন্নীত হই, যাতে আমাদের ইবাদত ‘ইহসান’ রাসুলের এ বাক্যের মূর্ত আদর্শে পর্যবসিত হয়।
আলোচ্য হাদিসের ইবাদত শব্দটিতে, পূর্বাপর বিবেচনায় নামাজই হলো তার প্রথম ক্ষেত্র। এবং বর্ণনাশৈলীতেও নামাজই উদ্দেশ্য। এখানে ছোট্ট একটি জিজ্ঞাসার অবতারণা করা যেতে পারে শুধু নামাজের বদৌলতেই কি দ্বীনদারি ও ঈমান এরূপ আদর্শ মাপকাঠিতে উন্নীত হতে পারে? তার সরল উত্তর হলো, হ্যাঁ, হতে পারে। তবে এমন নামাজ পরিপূর্ণ দ্বীনদারি ব্যতীত আদায় করা কিছুতেই সম্ভব নয়। পীর জুলফিকার আলী নকশবন্দি স্বরচিত ‘পবিত্রতার গুরুত্ব’ গ্রন্থে আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেন ইহসানের এ আসনে সমাসীন হওয়াটা সম্ভব। তবে পূর্বশর্ত হিসেবে পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। আর পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করার স্তর চারটি
১. দেহাবয়বকে বাহ্যিক অপবিত্রতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র করতে হবে। নামাজের স্থান, পোশাক-পরিচ্ছদ ও শরীরকে পবিত্র করতে হবে। বলাবাহুল্য, শরীরের ক্ষেত্রে হারাম আহার অবশ্যবর্জনীয়। আল্লাহ না করুন, কারও উপার্জন যদি হারাম হয়, আহার্য কোনো না কোনো পন্থায় যদি অবৈধ হয় এবং সে আহার্য আহার করে নামাজে দাঁড়ায়, তবে কি তার শরীরকে পবিত্র বলা যায়? হারাম আহারের ফলে পবিত্রতার প্রথম স্তরটিই ত্রুটিযুক্ত রয়ে যায়। মোদ্দাকথা হলো, শরীরকে সব ধরনের অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করতে হবে।
২. বাহ্যিক অঙ্গগুলোকে গোনাহ থেকে পাক রাখতে হবে। হাতের গোনাহ, পায়ের গোনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। চোখের গোনাহ, কানের গোনাহে পরিত্যাগী হতে হবে। মধ্যবর্তী ক্ষুদ্র অঙ্গটির অপব্যবহার পরিহার করতে হবে।
৩. মনকে অভ্যন্তরীণ গোনাহ থেকে পবিত্র রাখতে হবে। মন থেকেই অসংখ্য গোনাহের উৎপত্তি হয়। অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও রিয়াসহ বড় অনেক কবিরা গোনাহ মন থেকেই সৃষ্টি হয়।
৪. দেমাগ-বিবেককে গোনাহের চিন্তা-ভাবনা থেকে স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কেননা, গোনাহের ভাবনা প্রথমে দেমাগেই কশাঘাত করে। পর্যায়ক্রমে মনে সংক্রামিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে আত্মপ্রশংসা ও আত্মগরিমা থেকেও নিবৃত্ত হতে হবে। এগুলোই হলো পূর্ণ পবিত্রতা অর্জনের সারবিবরণ। প্রত্যেকেই যেন এ কথাটা হৃদয়ে দৃঢ় বদ্ধমূল করে নেয় এ চারটি শর্ত পূরণ করে যদি কেউ নামাজে দাঁড়ায়, সে তার মাবুদকে-আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখতে পারবে, ইনশাল্লাহ।
আলোচ্য বিষয়ের যোগসূত্রটা শুধু নামাজের সঙ্গেই বিশিষ্ট নয়, নামাজকে তার একটি নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে মাত্র। অর্থাৎ কেউ যদি এতটা সুন্দর করে নামাজ আদায় করতে পারে, তবে সে তাবৎ ইবাদতই ইহসানের আদলে সুন্দর করে আদায় করতে সক্ষম হবে। তখন তার জীবন অকল্যাণকর হতেই পারে না। আর এভাবে নামাজ ওই ব্যক্তিই আদায় করতে পারে, যার জীবন অতিশয় পবিত্র ও পুণ্যময়।
Reporter Name 

























