ঢাকা ০৮:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালুরঘাট নতুন সেতুর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৫৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০১৮
  • ৩৯২ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালী-কালুরঘাট অংশে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) এই সেতু নির্মাণে অর্থের জোগান দেবে। এ জন্য বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ১১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট বোয়ালখালী অংশে রেললাইন কাম সড়কসেতু নির্মাণ করা হবে। আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ দৃশ্যমান হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এই সেতুর দাবিতে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন বোয়ালখালীর কিছু স্বপ্নবাজ তরুণ। তাঁরা রাজপথে মানববন্ধন থেকে শুরু করে তৎপর ছিলেন সরকারের প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তরে ধর্নার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদানসহ নানাবিধ কর্মতৎপরতায়। তারুণ্যের এই সঞ্চিত সাহসে ভর করে সমগ্র বোয়ালখালীর বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের দাবি শুধু একটাই ‘বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু চাই’ এই স্লোগানকে ধারণ করে নানা আন্দোলনে শরিক হন।

নতুন সেতু নির্মাণ হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার এলাকার সাথে চট্টগ্রাম নগরীর যোগাযোগ আরো সহজ হবে। কালুরঘাট বোয়ালখালী সেতু নির্মাণের উদ্যোগে নদীর দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। এই সেতু নির্মিত হলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া অংশের প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত ভোগান্তি অনেক কমবে। বোয়ালখালী উপজেলার জৈষ্ঠ্যপুরা ও দক্ষিণ

রাঙ্গুনিয়ার মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে যে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে তাতে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সঙ্গেও যাতায়াত সহজতর হবে। চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়াসহ বান্দরবান জেলার বড় একটি অংশের দূরত্ব অনেক কমবে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন উন্নয়নে বিশেষ করে কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ, মিরসরাই ও আনোয়ারা উপজেলায় বিশেষ শিল্প এবং ইকোনমিক জোন তৈরি, নগরীতে যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মাণসহ নানাবিধ কর্মতৎপরতা চলছে। চট্টগ্রামের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা এবং তাঁর নির্দেশে উন্নয়নের যে কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে সেই কারণে বোয়ালখালী ও পটিয়া উপজেলার পূর্বাংশের লক্ষ লক্ষ মানুষের দৃঢ বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সময়েই বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতুর দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু হবে।

ইতোমধ্যে গত ৪ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) এই অর্থের জোগানের জন্য বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তির আওতায় কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালী-কালুরঘাট অংশে নতুন সেতু নির্মাণে ১১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে রেললাইন কাম সড়কসেতু নির্মাণ করা হবে। এই চুক্তির কারণে সেতুর বিষয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের লালিত একটি স্বপ্নপূরণের পথে একধাপ এগিয়ে গেছে। বর্তমান কালুরঘাট রেলসেতুর বয়স ৮৫ বছর। ১৯৩০ সালে এই সেতু নির্মিত হয়। জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে টিকিয়ে রাখা হয়েছে এই সেতু। এরপরও এই সেতুতে যানবাহন চলাচল বাড়ছে দিন দিন। এতে ঝুঁকিও বাড়ছে। ২০০১ সালে রেলওয়ে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে চরম ঝুঁকিতে যানবাহন চলাচল করছে মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতু দিয়ে। রেল কাম সড়কসেতুটি এক লাইন বিশিষ্ট হওয়ায় ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এছাড়া একদিক থেকে গাড়ি এলে অন্যদিক থেকে বন্ধ রাখতে হয়। সেতুটির ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীকে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আবার সেতুর স্থানে স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি পচে নষ্ট হয়ে গেছে সেতুর দুই পাশের গাছের তৈরি বেশকিছু সাইড চ্যানেলও। সেতু পারাপারে মানুষ যখন চরম দুর্ভোগের মুখে, তখনই নতুন সেতু নির্মাণে অর্থ সংকট নিরসনের সুখবরটি এলো।

২০১০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী সেতুর (শাহ আমানত সেতু) উদ্বোধন শেষে শিকলবাহায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এর আগে বিএনপি ক্ষমতা থাকাকালীন সময়েও কালুরঘাট এলাকায় রেল কাম সড়কসেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এবার প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিতে বোয়ালখালী পটিয়ার পূর্বাংশের মানুষ আশাবাদী হয়ে ওঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কিছু নড়াচড়া হলেও সেতু নির্মাণের চূড়ান্ত কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান হচ্ছিল না। এর পরিপ্রেক্ষিতে বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের নাম দিয়ে দ্বিমুখী সড়কসেতু নির্মাণের দাবিতে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন চট্টগ্রাম নগরে বসবাসকারী বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত একদল তরুণ। এই দাবির সমর্থনে তাঁরা নগরী ছাড়াও বোয়ালখালীর সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে এলাকায় পথসভা, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখেন। সেতু বাস্তবায়নের দাবিতে জনমত সৃষ্টিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক পেশাজীবী ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

এঁদের মধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ, বোয়ালখালী সংসদীয় আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মঈন উদ্দিন খান বাদল, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহাবুব আলম উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের নেতারা। এ সময় তাঁরা সেতু নির্মাণের আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরে মুখ্য সচিবের মাধ্যমে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দেন। পরবর্তীতে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করে কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালী কালুরঘাট এলাকায় সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক গুরুত্বসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন পরিষদের নেতারা। বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের প্রতিনিধিদল গত ৪ ডিসেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর সঙ্গে নগরীর পাথরঘাটায় তাঁর বাসভবনে দেখা করেন। এ সময় পরিষদ নেতারা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ফজলে করিম চৌধুরীর হাতে হস্তান্তর করেন।

ফজলে করিম চৌধুরী এমপি কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণে অর্থ সহায়তা দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার এগিয়ে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘অর্থ সংকটের কারণে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণ এতদিন ধরে আটকে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া ঋণ সহায়তা দিতে সম্মত হওয়ায় সেতু নির্মাণে বড় ধরনের সমস্যা দূর হয়েছে। সেতু নির্মাণে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম দ্রুত শুরু হবে।’

বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আবদুল মোমিন বলেন, ‘বোয়ালখালী-কালুরঘাট অংশে নতুন সেতু নির্মাণের দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। এরই অংশ হিসেবে আমরা রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ৫শ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির মধ্যে ১১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে কালুরঘাট সেতু নির্মাণে। বাকি অর্থ সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অন্যান্য প্রকল্পে খরচ করা হবে।’

বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের সদস্য সচিব সাংবাদিক রমেন দাশগুপ্ত বলেন, ‘কালুরঘাট সেতুটি রেল ও অন্যান্য ভারী যানবাহন চলার কারণে খুবই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন পারাপার হচ্ছে। এতদিন প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ থমকে ছিল। এখন দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ইডিসিএফ’ নতুন সেতু নির্মাণে ঋণ সহায়তা দেওয়ায় আমরা এখন সেতুটি নিয়ে আশাবাদী।’

সর্বশেষ ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক কোটি টাকা ব্যয়ে কালুরঘাট সেতু মেরামত করা হয়। এর আগে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বড় ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়। এ সময় ১১ মাস সেতুর উপর যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। ১৯৮৬ ও ১৯৯৭ সালেও দুই দফায় সংস্কার হয় সেতুটি। এছাড়া প্রতিনিয়ত ছোটখাটো মেরামত কাজ করা লাগে বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই সেতুর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা ফ্রন্টের সেনা চলাচলের জন্য কর্ণফুলী নদীতে একটি আপৎকালীন সেতু তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৩০ সালে ‘ব্রুনিক অ্যান্ড কম্পানির ব্রিজ কম্পানি ব্রিজ বিল্ডার্স-হাওড়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ সেতু তৈরি করে। জরুরিভিত্তিতে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে নির্মিত ৭০০ গজ লম্বা সেতুটিতে ছয়টি ব্রিক পিলার, ১২টি স্টিল পিলার, দুটি অ্যাবটমেন্ট ও ১৯টি স্প্যান রয়েছে। সেতুটি উদ্বোধন করা হয় ১৯৩০ সালের ৪ জুন। পরে ২য় বিশ্বযুদ্ধে শুরু হলে পুনরায় বার্মা ফ্রন্টের যুদ্ধ মোটরযান চলাচলের জন্য ডেক বসানো হয়। দেশ বিভাগের পর ডেক তুলে ফেলা হয়। এই একমুখী যুদ্ধসেতুটিতে সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ১৯৫৮ সালে।

 

নির্মাণ কার্যক্রম দ্রুত দৃশ্যমান হবে

এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি

সভাপতি, রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণে অর্থ সহায়তা দিতে দক্ষিণ কোরিয়া এগিয়ে এসেছে। অর্থ সংকটের কারণে ওই সেতু নির্মাণ এতদিন আটকে ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

কালুরঘাট সেতু নির্মাণে ওই চুক্তির ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। নির্মাণ কার্যক্রম দ্রুত দৃশ্যমান হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

কালুরঘাট নতুন সেতুর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

আপডেট টাইম : ১০:৫৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০১৮

হাওর বার্তা ডেস্কঃ অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালী-কালুরঘাট অংশে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) এই সেতু নির্মাণে অর্থের জোগান দেবে। এ জন্য বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ১১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট বোয়ালখালী অংশে রেললাইন কাম সড়কসেতু নির্মাণ করা হবে। আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ দৃশ্যমান হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এই সেতুর দাবিতে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন বোয়ালখালীর কিছু স্বপ্নবাজ তরুণ। তাঁরা রাজপথে মানববন্ধন থেকে শুরু করে তৎপর ছিলেন সরকারের প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তরে ধর্নার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদানসহ নানাবিধ কর্মতৎপরতায়। তারুণ্যের এই সঞ্চিত সাহসে ভর করে সমগ্র বোয়ালখালীর বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের দাবি শুধু একটাই ‘বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু চাই’ এই স্লোগানকে ধারণ করে নানা আন্দোলনে শরিক হন।

নতুন সেতু নির্মাণ হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজার এলাকার সাথে চট্টগ্রাম নগরীর যোগাযোগ আরো সহজ হবে। কালুরঘাট বোয়ালখালী সেতু নির্মাণের উদ্যোগে নদীর দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। এই সেতু নির্মিত হলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া অংশের প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত ভোগান্তি অনেক কমবে। বোয়ালখালী উপজেলার জৈষ্ঠ্যপুরা ও দক্ষিণ

রাঙ্গুনিয়ার মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে যে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে তাতে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সঙ্গেও যাতায়াত সহজতর হবে। চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়াসহ বান্দরবান জেলার বড় একটি অংশের দূরত্ব অনেক কমবে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন উন্নয়নে বিশেষ করে কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ, মিরসরাই ও আনোয়ারা উপজেলায় বিশেষ শিল্প এবং ইকোনমিক জোন তৈরি, নগরীতে যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মাণসহ নানাবিধ কর্মতৎপরতা চলছে। চট্টগ্রামের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা এবং তাঁর নির্দেশে উন্নয়নের যে কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে সেই কারণে বোয়ালখালী ও পটিয়া উপজেলার পূর্বাংশের লক্ষ লক্ষ মানুষের দৃঢ বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সময়েই বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতুর দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু হবে।

ইতোমধ্যে গত ৪ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) এই অর্থের জোগানের জন্য বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তির আওতায় কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালী-কালুরঘাট অংশে নতুন সেতু নির্মাণে ১১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে রেললাইন কাম সড়কসেতু নির্মাণ করা হবে। এই চুক্তির কারণে সেতুর বিষয়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের লালিত একটি স্বপ্নপূরণের পথে একধাপ এগিয়ে গেছে। বর্তমান কালুরঘাট রেলসেতুর বয়স ৮৫ বছর। ১৯৩০ সালে এই সেতু নির্মিত হয়। জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে টিকিয়ে রাখা হয়েছে এই সেতু। এরপরও এই সেতুতে যানবাহন চলাচল বাড়ছে দিন দিন। এতে ঝুঁকিও বাড়ছে। ২০০১ সালে রেলওয়ে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে চরম ঝুঁকিতে যানবাহন চলাচল করছে মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতু দিয়ে। রেল কাম সড়কসেতুটি এক লাইন বিশিষ্ট হওয়ায় ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এছাড়া একদিক থেকে গাড়ি এলে অন্যদিক থেকে বন্ধ রাখতে হয়। সেতুটির ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীকে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আবার সেতুর স্থানে স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি পচে নষ্ট হয়ে গেছে সেতুর দুই পাশের গাছের তৈরি বেশকিছু সাইড চ্যানেলও। সেতু পারাপারে মানুষ যখন চরম দুর্ভোগের মুখে, তখনই নতুন সেতু নির্মাণে অর্থ সংকট নিরসনের সুখবরটি এলো।

২০১০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী সেতুর (শাহ আমানত সেতু) উদ্বোধন শেষে শিকলবাহায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এর আগে বিএনপি ক্ষমতা থাকাকালীন সময়েও কালুরঘাট এলাকায় রেল কাম সড়কসেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এবার প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিতে বোয়ালখালী পটিয়ার পূর্বাংশের মানুষ আশাবাদী হয়ে ওঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কিছু নড়াচড়া হলেও সেতু নির্মাণের চূড়ান্ত কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান হচ্ছিল না। এর পরিপ্রেক্ষিতে বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের নাম দিয়ে দ্বিমুখী সড়কসেতু নির্মাণের দাবিতে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন চট্টগ্রাম নগরে বসবাসকারী বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত একদল তরুণ। এই দাবির সমর্থনে তাঁরা নগরী ছাড়াও বোয়ালখালীর সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে এলাকায় পথসভা, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখেন। সেতু বাস্তবায়নের দাবিতে জনমত সৃষ্টিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক পেশাজীবী ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

এঁদের মধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ, বোয়ালখালী সংসদীয় আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মঈন উদ্দিন খান বাদল, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহাবুব আলম উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের নেতারা। এ সময় তাঁরা সেতু নির্মাণের আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরে মুখ্য সচিবের মাধ্যমে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দেন। পরবর্তীতে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করে কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালী কালুরঘাট এলাকায় সেতু নির্মাণের অর্থনৈতিক গুরুত্বসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন পরিষদের নেতারা। বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের প্রতিনিধিদল গত ৪ ডিসেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর সঙ্গে নগরীর পাথরঘাটায় তাঁর বাসভবনে দেখা করেন। এ সময় পরিষদ নেতারা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ফজলে করিম চৌধুরীর হাতে হস্তান্তর করেন।

ফজলে করিম চৌধুরী এমপি কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণে অর্থ সহায়তা দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার এগিয়ে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘অর্থ সংকটের কারণে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণ এতদিন ধরে আটকে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া ঋণ সহায়তা দিতে সম্মত হওয়ায় সেতু নির্মাণে বড় ধরনের সমস্যা দূর হয়েছে। সেতু নির্মাণে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম দ্রুত শুরু হবে।’

বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আবদুল মোমিন বলেন, ‘বোয়ালখালী-কালুরঘাট অংশে নতুন সেতু নির্মাণের দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। এরই অংশ হিসেবে আমরা রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ৫শ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির মধ্যে ১১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে কালুরঘাট সেতু নির্মাণে। বাকি অর্থ সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অন্যান্য প্রকল্পে খরচ করা হবে।’

বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের সদস্য সচিব সাংবাদিক রমেন দাশগুপ্ত বলেন, ‘কালুরঘাট সেতুটি রেল ও অন্যান্য ভারী যানবাহন চলার কারণে খুবই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন পারাপার হচ্ছে। এতদিন প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ থমকে ছিল। এখন দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ইডিসিএফ’ নতুন সেতু নির্মাণে ঋণ সহায়তা দেওয়ায় আমরা এখন সেতুটি নিয়ে আশাবাদী।’

সর্বশেষ ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক কোটি টাকা ব্যয়ে কালুরঘাট সেতু মেরামত করা হয়। এর আগে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বড় ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়। এ সময় ১১ মাস সেতুর উপর যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। ১৯৮৬ ও ১৯৯৭ সালেও দুই দফায় সংস্কার হয় সেতুটি। এছাড়া প্রতিনিয়ত ছোটখাটো মেরামত কাজ করা লাগে বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই সেতুর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা ফ্রন্টের সেনা চলাচলের জন্য কর্ণফুলী নদীতে একটি আপৎকালীন সেতু তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৩০ সালে ‘ব্রুনিক অ্যান্ড কম্পানির ব্রিজ কম্পানি ব্রিজ বিল্ডার্স-হাওড়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান এ সেতু তৈরি করে। জরুরিভিত্তিতে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে নির্মিত ৭০০ গজ লম্বা সেতুটিতে ছয়টি ব্রিক পিলার, ১২টি স্টিল পিলার, দুটি অ্যাবটমেন্ট ও ১৯টি স্প্যান রয়েছে। সেতুটি উদ্বোধন করা হয় ১৯৩০ সালের ৪ জুন। পরে ২য় বিশ্বযুদ্ধে শুরু হলে পুনরায় বার্মা ফ্রন্টের যুদ্ধ মোটরযান চলাচলের জন্য ডেক বসানো হয়। দেশ বিভাগের পর ডেক তুলে ফেলা হয়। এই একমুখী যুদ্ধসেতুটিতে সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ১৯৫৮ সালে।

 

নির্মাণ কার্যক্রম দ্রুত দৃশ্যমান হবে

এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি

সভাপতি, রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণে অর্থ সহায়তা দিতে দক্ষিণ কোরিয়া এগিয়ে এসেছে। অর্থ সংকটের কারণে ওই সেতু নির্মাণ এতদিন আটকে ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

কালুরঘাট সেতু নির্মাণে ওই চুক্তির ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। নির্মাণ কার্যক্রম দ্রুত দৃশ্যমান হবে।