ঢাকা ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য লাঙ্গলের হালচাষ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৪৮:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭
  • ৩৮৪ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য “লাঙ্গলের হালচাষ” দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। কাক ডাকা ভোরে কৃষকরা লাঙ্গল কাঁধে এক জোড়া গরু/মহিষ নিয়ে বেরিয়ে যেত মাঠের জমিতে হাল-চাষ করার জন্য। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমিতে কৃষকের লাঙ্গল দিয়ে হাল-চাষ, সঙ্গে ভাটিয়ালি-পল্লীগীতি গানের মধুর সুর মাতিয়ে রাখতো হাট-ঘাট ও মাঠ। কৃষাণীরা সাজিয়ে নিয়ে যেত সকালের নাস্তা পিয়াজ কাঁচা মরিচ দিয়ে পান্তাভাত ও দুপুরে গরম ভাত। কৃষাণীদের সকালের পান্তাভাত নিয়ে যেতে দেরী করলে কৃষকেরা রসিকতার গান ধরতো ‘এতো বেলা হয় ভাবীজান পান্তা নাই মোর পেটে রে’। এটাই ছিল গ্রামবাংলার কৃষাণ-কৃষাণীর চিরাচরিত অভুতপূর্ব দৃশ্য। এখন এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়েনা বললেই চলে।

দিন বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে মানুষের জীবনধারার মান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে পাল্টে যাচ্ছে সব কিছুই। আধুনিকতার স্পর্শে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে কৃষকদের জীবনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের ছোঁয়াও লেগেছে কৃষিতে। তাইতো কাঠের লাঙ্গলের পরিবর্তে এসেছে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাঙ্গল-জোয়াল। চিরায়ত বাংলার রূপের সন্ধান করতে গেলে এই দুই কৃষি উপকরণের কথা যেমন অবশ্যই আসবে, তেমনি আসবে হালের গরুর কথাও।

আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে হাল চাষের পরিবর্তনে এখন ট্রাক্টর অথবা পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করা হয়। এক সময় দেশের বিভিন্ন জেলার উপজেলায় বাণিজ্যিক ভাবে কৃষক গরু পালন করতো হাল চাষ করার জন্য। আবার কিছু মানুষ গবাদিপশু দিয়ে হাল চাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলেন। আবার অনেকে তিল, সরিষা, কালাই, আলু চাষের জন্য ব্যবহার করতেন। নিজের সামান্য জমির পাশাপাশি অন্যের জমিতে হাল চাষ করে তাদের সংসারের ব্যয়ভার বহন করত। হালের গরু দিয়ে দরিদ্র মানুষ জমি চাষ করে ফিরে পেত তাদের পরিবারের সচ্ছলতা। আগে দেখা যেত কাক ডাকা ভোরে কৃষক গরু, লাঙ্গল, জোয়াল নিয়ে মাঠে বেরিয়ে পড়তো। এখন আর চোখে পড়ে না গরুর লাঙ্গল দিয়ে চাষাবাদ। জমি চাষের প্রয়োজন হলেই অল্প সময়ের মধ্যেই পাওয়ার টিলারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চলাচ্ছে চাষাবাদ। তাই কৃষকরা এখন পেশা বদলি করে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে গরু দিয়ে হাল চাষ।

করজগ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানায়, ছোটবেলায় হাল চাষের কাজ করতাম। বাড়িতে হাল চাষের বলদ গরু ২-৩ জোড়া থাকত। চাষের জন্য দরকার হতো ১ জোড়া বলদ, কাঠ লোহার তৈরি লাঙ্গল, জোয়াল, মই, পান্টি (বাঁশের তৈরি গরু তাড়ানোর লাঠি), গরুর মুখের লাগাম ইত্যাদি। আগে গরু দিয়ে হাল চাষ করলে জমিতে ঘাস কম হতো। অনেক সময় গরুর গোবরের জৈব সার জমিতে পড়ত। এতে করে ক্ষেতে ফলন ভালো হতো। এখন নতুন নতুন মেশিন এসেছে সেই মেশিন দিয়ে এখানকার লোকজন জমি চাষাবাদ করে। আমাদের তো টাকা নাই মেশিন কিনে জমি চাষ করার তাই এখনো গরু, লাঙ্গল, জোয়াল নিয়ে জমিতে হাল চাষ করি। লাঙ্গল দিয়ে হালচাষ কমে যাওয়ায় এখন সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।

এছাড়াও আব্দুর রহিম, জয়নাল হোসেনসহ আরো কৃষকরা জানান, গরুর লাঙ্গল দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৪ শতাংশ জমি চাষ করা সম্ভব। আধুনিক যন্ত্রপাতির থেকে গরুর লাঙ্গলের চাষ গভীর হয়। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি ও ফসলের চাষাবাদ করতে সার, কীটনাশকের সাশ্রয় হয়। কষ্ট হলেও গরু দিয়ে হাল চাষ করতে খুব ভাল লাগত। এখন মনে পড়লেই কষ্ট হচ্ছে। ফিরে পাবনা আর সেই পুরনো দিনগুলো। এভাবেই ধিরে ধিরে হারিয়ে যাবে আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জনসচেতনতা বাড়লে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য লাঙ্গলের হালচাষ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে

আপডেট টাইম : ১১:৪৮:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য “লাঙ্গলের হালচাষ” দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। কাক ডাকা ভোরে কৃষকরা লাঙ্গল কাঁধে এক জোড়া গরু/মহিষ নিয়ে বেরিয়ে যেত মাঠের জমিতে হাল-চাষ করার জন্য। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমিতে কৃষকের লাঙ্গল দিয়ে হাল-চাষ, সঙ্গে ভাটিয়ালি-পল্লীগীতি গানের মধুর সুর মাতিয়ে রাখতো হাট-ঘাট ও মাঠ। কৃষাণীরা সাজিয়ে নিয়ে যেত সকালের নাস্তা পিয়াজ কাঁচা মরিচ দিয়ে পান্তাভাত ও দুপুরে গরম ভাত। কৃষাণীদের সকালের পান্তাভাত নিয়ে যেতে দেরী করলে কৃষকেরা রসিকতার গান ধরতো ‘এতো বেলা হয় ভাবীজান পান্তা নাই মোর পেটে রে’। এটাই ছিল গ্রামবাংলার কৃষাণ-কৃষাণীর চিরাচরিত অভুতপূর্ব দৃশ্য। এখন এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়েনা বললেই চলে।

দিন বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে মানুষের জীবনধারার মান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে পাল্টে যাচ্ছে সব কিছুই। আধুনিকতার স্পর্শে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে কৃষকদের জীবনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের ছোঁয়াও লেগেছে কৃষিতে। তাইতো কাঠের লাঙ্গলের পরিবর্তে এসেছে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাঙ্গল-জোয়াল। চিরায়ত বাংলার রূপের সন্ধান করতে গেলে এই দুই কৃষি উপকরণের কথা যেমন অবশ্যই আসবে, তেমনি আসবে হালের গরুর কথাও।

আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে হাল চাষের পরিবর্তনে এখন ট্রাক্টর অথবা পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করা হয়। এক সময় দেশের বিভিন্ন জেলার উপজেলায় বাণিজ্যিক ভাবে কৃষক গরু পালন করতো হাল চাষ করার জন্য। আবার কিছু মানুষ গবাদিপশু দিয়ে হাল চাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলেন। আবার অনেকে তিল, সরিষা, কালাই, আলু চাষের জন্য ব্যবহার করতেন। নিজের সামান্য জমির পাশাপাশি অন্যের জমিতে হাল চাষ করে তাদের সংসারের ব্যয়ভার বহন করত। হালের গরু দিয়ে দরিদ্র মানুষ জমি চাষ করে ফিরে পেত তাদের পরিবারের সচ্ছলতা। আগে দেখা যেত কাক ডাকা ভোরে কৃষক গরু, লাঙ্গল, জোয়াল নিয়ে মাঠে বেরিয়ে পড়তো। এখন আর চোখে পড়ে না গরুর লাঙ্গল দিয়ে চাষাবাদ। জমি চাষের প্রয়োজন হলেই অল্প সময়ের মধ্যেই পাওয়ার টিলারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চলাচ্ছে চাষাবাদ। তাই কৃষকরা এখন পেশা বদলি করে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে গরু দিয়ে হাল চাষ।

করজগ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানায়, ছোটবেলায় হাল চাষের কাজ করতাম। বাড়িতে হাল চাষের বলদ গরু ২-৩ জোড়া থাকত। চাষের জন্য দরকার হতো ১ জোড়া বলদ, কাঠ লোহার তৈরি লাঙ্গল, জোয়াল, মই, পান্টি (বাঁশের তৈরি গরু তাড়ানোর লাঠি), গরুর মুখের লাগাম ইত্যাদি। আগে গরু দিয়ে হাল চাষ করলে জমিতে ঘাস কম হতো। অনেক সময় গরুর গোবরের জৈব সার জমিতে পড়ত। এতে করে ক্ষেতে ফলন ভালো হতো। এখন নতুন নতুন মেশিন এসেছে সেই মেশিন দিয়ে এখানকার লোকজন জমি চাষাবাদ করে। আমাদের তো টাকা নাই মেশিন কিনে জমি চাষ করার তাই এখনো গরু, লাঙ্গল, জোয়াল নিয়ে জমিতে হাল চাষ করি। লাঙ্গল দিয়ে হালচাষ কমে যাওয়ায় এখন সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।

এছাড়াও আব্দুর রহিম, জয়নাল হোসেনসহ আরো কৃষকরা জানান, গরুর লাঙ্গল দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৪ শতাংশ জমি চাষ করা সম্ভব। আধুনিক যন্ত্রপাতির থেকে গরুর লাঙ্গলের চাষ গভীর হয়। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি ও ফসলের চাষাবাদ করতে সার, কীটনাশকের সাশ্রয় হয়। কষ্ট হলেও গরু দিয়ে হাল চাষ করতে খুব ভাল লাগত। এখন মনে পড়লেই কষ্ট হচ্ছে। ফিরে পাবনা আর সেই পুরনো দিনগুলো। এভাবেই ধিরে ধিরে হারিয়ে যাবে আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য।