মৌলভীবাজারের পৌর শহরস্থ বড়হাট ও সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের সরকার বাজারের কাছে নাসিরপুর গ্রামের একটি ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযান শুরু হয়েছে। বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরই অভিযানে নামে পুলিশের বিশেষ বাহিনী (সোয়াত)। সন্ধ্যা ছয়টা ১৮ মিনিট থেকে গোলাগুলি শুরু হয়েছে।
জঙ্গি আস্তানার খবরে আতঙ্ক-উত্কণ্ঠায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দুটি জঙ্গি আস্তানা এলাকায় দুপুরে ১৪৪ ধারা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম বাড়ি দুটিকে ঘিরে ১৪৪ ধারা জারি করার বিষয়টি ইত্তেফাককে চিশ্চিত করেছেন।
এর আগে মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে শহরের বড়হাট ও নাসিরপুর গ্রামের ওই দুটি জঙ্গি আস্তানা ঘেরাও করে রাখে পুলিশ। বড়হাটের আস্তানাটি একটি ডুপ্লেক্স বাড়িতে, আর নাসিরপুরের আস্তানাটি একটি একতলা বাড়িতে। দুটি বাড়িই লন্ডন প্রবাসী সাইফুর রহমানের মালিকানাধীন। তিনি সপরিবারে লন্ডনে থাকেন। বাড়ি দু’টি দেখভাল করেন জুয়েল মিয়া নামে সাইফুরের এক নিকট আত্মীয়। কিন্তু তার কাছ থেকে (জুয়েল মিয়ার) কারা ওই দু’টি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলো তা তাত্ক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, বেসরকারি একটি কোম্পানির ম্যানেজার পরিচয়ে তারা এই বাড়ি দুইটি বাড়া নেয়। তিন মাস আগে মৌলভীবাজার পৌরসভার বড়হাট এলাকার বাসাটি ৬ হাজার ৪০০ টাকায় ভাড়া নেয়া হয়। পরে নাসিরপুর গ্রামের একই মালিকের একটি বাড়ি ৭ হাজার ২০০ টাকায় ভাড়া নেয় জঙ্গিরা। এলাকাবাসীর অভিমত বাড়ির মালিক ও কেয়ারটেকার প্রবাসে থেকে নিষিদ্ধ সংগঠরে সাথে জড়িত রয়েছেন।
মৌলভীবাজারের সহকারী পুলিশ সুপার রাশেদুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, দু’টি আস্তানাতেই জঙ্গিরা অবস্থান নিয়েছে। পুলিশ রাত থেকেই আস্তানা দু’টি ঘেরাও করে রাখে। ভোররাতের দিকে অভিযান শুরু করলে জঙ্গিরা গুলি করতে থাকে। সকালে একের পর এক গ্রেনেড ছুড়েও মারে তারা।
সকাল সাতটা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যেও দু’টি জঙ্গি আস্তানায় বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। সাড়ে ১০টার দিকে বড়হাটের আস্তানার ভেতরে বিকট শব্দে তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। তারপরও কয়েক দফায় বড়হাট ও নাসিরপুরে গুলি এবং বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
বাড়ির মালিক সাইফুল লন্ডনে ট্যাক্সি চালান: সন্ধান পাওয়া দু’টি জঙ্গি আস্তানার বাড়ি দু’টির মালিক নাসিরপুর গ্রামের মৃত আছদ্দর আলী লন্ডনির একমাত্র ছেলে সাইফুর রহমান লন্ডনে ট্যাক্সি চালান বলে জানা গেছে। তার বয়স ৩৩ থেকে ৩৫ বছর। বাবা থেকে পাওয়া সম্পত্তির বর্তমান মালিক তিনিই। টিনশেডের বাড়িটি প্রায় তিন একর জায়গার উপর নির্মিত। বড়হাটার বাড়িটি ডুপ্লেক্স। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সাইফুর সর্বশেষে দেশে আসেন বছরখানেক আগে।
থেমে থেমে গুলি ছুড়ে জঙ্গিরা: নাসিরপুর গ্রামের আস্তানা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রথম দফায় থেমে থেমে গুলি ছুড়ছে জঙ্গিরা। জঙ্গিদের পাকড়াও করতে দু’টি বাড়ির আস্তানায় দিনভর ঘিরে রাখে র্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মৌলভীবাজার শহরস্থ বড়হাট এলাকার ঘিরে রাখা বাড়িটি থেকে কিছুক্ষণ পরপরই গুলি ছুড়ছে জঙ্গিরা।
দিনের বেলা বাড়িতে দেখা যেতো না কাউকে: ঘিরে রাখা দু’টি জঙ্গি আস্তানার একটি টিনশেড বাড়িতে থাকতো তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ। মাঝে-মধ্যে দেখা যেতো একটি শিশুকে। তবে দিনে ওই বাড়ির কাউকে যেতো না। এমনটি জানান স্থানীয় ইউপি সদস্য (সংরক্ষিত) রাহেলা বেগম। এলাকার অধিকাংশ বাড়ির মালিক লন্ডনপ্রবাসী হওয়ায় তাদের বাড়িগুলো ভাড়া দেয়া। এলাকাবাসী ভাড়াটিয়াদের নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখায় না বলেই স্থানীয়দের মত। স্থানীয় বাসিন্দা মুন্না ও মেহেদী হাসান জানান, বাড়ির দু’একজন পুরুষকে রাতে বের হতে দেখা যেতো। একটি শিশু মাঝে-মধ্যে ওই বাড়ির বাইরে বের হতো। এছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি কোনোদিন।
রেকি করে শনাক্ত জঙ্গি আস্তানা: সিলেটের শিববাড়ির আতিয়া মহলে যখন জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলছে, তারই একটি সময়ে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ মৌলভীবাজার জেলা সদরের বড়হাট এলাকার একটি জঙ্গি আস্তানার খবর পায়। সর্বোচ্চ গোপনীয়তায় কয়েকদিন দিন ধরে রেকি করে জঙ্গিদের যাওয়া আসাসহ অন্যান্য কার্যক্রমের ওপর কড়া নজর রাখতে থাকে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের। শহরের প্রধান সড়ক থেকে প্রায় ৫০০ গজ ভেতরে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। কাছেই বড়হাট আবুশাহ (রঃ) দাখিল মাদ্রাসা। বাড়িটির ওপর কড়া নজর রাখতে থাকে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর সকল ব্যবস্থা নিয়ে এগুতে থাকে মৌলভীবাজার পুলিশ ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা। দিনগত মধ্য রাতের পর ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলার সকল প্রস্তুতি নেওয়ার সময়টিতেই খবর আসে আরেকটি জঙ্গি আস্তানার। জানা যায় সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের সরকার বাজারের কাছে নাসিরপুর গ্রামে আরেকটি আস্তানাতেও রয়েছে বেশ কয়েকজন জঙ্গি। একটিতে অভিযান চললে অপরটি তত্পর হয়ে উঠতে পারে এই ধারনা থেকেই দ্রুত সিদ্ধান্ত হয়, দুটি আস্তানাতেই একযোগে অভিযান চালাবে পুলিশ। খবর পেয়ে নাসিরপুরেও পাঠানো হয় পুলিশের ইউনিট। সেখানে গিয়ে দ্রুত আশেপাশের সাধারণ বাসিন্দাদের দূরে সরিয়ে নিতে শুরু করে পুলিশ। জঙ্গিদের কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুটি আস্তাানারই আশেপাশের বাসিন্দাদের রাতেই সরিয়ে ফেলে পুলিশ। এরপর দুটি আস্তানা রাতেই ঘিরে ফেলা হয়। নাসিরপুরের আস্তানায় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ভোররাতেই গুলি ও গ্রেনেড ছোড়ে জঙ্গিরা। পুলিশও আশেপাশে শক্ত অবস্থান নিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে। এদিকে সকালে সদরের বড়হাটের আস্তানার জঙ্গিরাও তাদের ঘিরে রাখা অবস্থায় দেখতে পেয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। সেখানেও গ্রেনেড ছুড়ে মারে জঙ্গিরা। তবে এতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানা যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সারা জেলার পুলিশ ছাড়াও র্যাব পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, ডিজিএফআই পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। শহরের প্রতিটি প্রবেশ মুখে পুলিশের চৌকি বসানো হয়েছে। শহরে প্রবেশমূখী যানবাহনে তাল্লাশী করা হচ্ছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি। পুরো শহর জুড়ে শুরু হয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি নজরদারী। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও প্রবেশ দ্বার গুলোতে মোতায়ন করা হয় পুলিশ ও র্যাব। সন্দেহ হলে চালানো হচ্ছে তল্লাশি। শহরের ঢাকা সিলেট সড়কের দু’পাশের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধ রয়েছে। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে বাসার লোকজন যেন নিরাপদে বাসার ভিতরে অবস্থান করেন এবং বাসার ছাদে যাতে না উঠেন।
Reporter Name 





















