র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপনস ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে—নতুন বাহিনী আসলে কতটা আলাদা হবে র্যাবের থেকে?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে খসড়াটির ওপর বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ভেটিং প্রক্রিয়া শেষ হলে বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংসদে পাস হয়ে আইন কার্যকর হওয়ার পরই র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময়ে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে র্যাব গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল পর্যন্ত র্যাবের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩৮০ জন নিহত হন।
পরবর্তী সময়ে এসব অভিযোগ আরও বাড়ে। কক্সবাজারের একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের পর র্যাবের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। এরপর র্যাবের পরিবর্তে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ সামনে আসে।
এসআরবির খসড়ায় কী থাকছে?
প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এসআরবি গঠন করা হবে। নির্ধারিত শর্তে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও প্রেষণে বা অস্থায়ীভাবে এই ইউনিটে সংযুক্ত করা যাবে।
নতুন ইউনিটের দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে—
- অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা
- গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ
- অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার
- মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও মাদকবিরোধী অভিযান
- সাইবার অপরাধ দমন
- মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন
- নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপহরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
- সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন
- গুম, খুন ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
- প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা
এ ছাড়া প্রচলিত আইন অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ইউনিটটিকে।
গ্রেফতার বা কোনো আলামত জব্দ করা হলে তা অবিলম্বে নিকটস্থ থানায় হস্তান্তর করতে হবে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
থাকছে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি
নতুন আইনের খসড়ায় নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের জন্য একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কমিটির প্রধান হবেন ইউনিটের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক।
প্রয়োজনে অভিযোগ তদন্তের জন্য নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে অনুসন্ধান দল গঠনের সুযোগও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। জব্দ করা মালামাল আদালতের আদেশ বা সরকারি বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
র্যাবের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?
মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটনের মতে, নাম পরিবর্তন হলেও প্রস্তাবিত এসআরবির সঙ্গে র্যাবের মৌলিক পার্থক্য খুব বেশি নেই। তার ভাষায়, এটি অনেকটা ‘নতুন মোড়কে পুরনো জিনিস’।
তার আপত্তি, র্যাবের মতো নতুন বাহিনীতেও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তার মতে, অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমনে পুলিশের বিশেষায়িত টিম থাকাই বেশি যৌক্তিক।
তার আরও অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থার বিষয়টি খসড়ায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
অন্যদিকে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুকের মতে, নতুন প্রস্তাবিত আইনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন রয়েছে। বিশেষ করে এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা আগের ব্যবস্থায় ছিল না।
তার মতে, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বিষয়টিও খসড়ায় গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের ক্ষমতা যদি মূলত বাহিনীর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকে, তাহলে সেটি কতটা স্বাধীন ও কার্যকর হবে?
নাম বদল, নাকি কাঠামোগত পরিবর্তন?
সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত এসআরবিতে র্যাবের মতোই অভিযান, গ্রেফতার, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও অপরাধ দমনের ক্ষমতা থাকছে। পাশাপাশি নতুন করে তদন্তের ক্ষমতা এবং নাগরিক অভিযোগ প্রতিকারের ব্যবস্থাও যুক্ত হচ্ছে।
তবে মানবাধিকার সুরক্ষা, স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির কাঠামো কতটা কার্যকর হবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খসড়ার ওপর পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে আইনটি আরও পরিমার্জনের জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। ফলে চূড়ান্ত আইনে এসআরবির কাঠামো ও ক্ষমতায় আরও পরিবর্তন আসতে পারে।
Reporter Name 



















