ঢাকা ১১:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ার অহেতুক মাতামাতির প্রয়োজন নেই

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:০৯:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
  • ১ বার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে গেছেন। তার এ সফর নিয়ে ভারতীয় মিডিয়াগুলোতে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তবে তারেক রহমানের সফর নিয়ে ভারতে এত মাতামাতির প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করেছে চীনের সরকারি মিডিয়া গ্লোবাল টাইমস।

গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, তারেক রহমান কেন তার প্রথম সরকারি সফরে ভারতে গেলেন না, সেটি নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া সরগরম। কিন্তু এমনটি হওয়া উচিত নয়। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে চীন সফর করেছেন মিয়ানমার, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপ্রধানরা। তারেক রহমানের সফরও এটির অংশ।

এছাড়া চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক, ভারত-চীনের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলা হয়েছে নিবন্ধে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, তারেক রহমান ভারত না গিয়ে চীনে গিয়ে ভারতকে উপেক্ষা করেছেন— কিছু ভারতীয়ের এমন মন্তব্য তাদের দাদাগিরি বা বড় ভাইসুলভ আচরণ প্রকাশ করে।

নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশ চীনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে চায়। বাংলাদেশও একই পথে হাঁটছে। তাই তারেক রহমান চীন সফর করছেন। এছাড়া তার এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিচে গ্লোবাল টাইমসের নিবন্ধটি হুবহু তুলে ধরা হলো—

“গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চীনে একটি সরকারি সফর করবেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম চীন সফর। সফরকালে তিনি ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৭তম ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ (সামার ডাভোস ফোরাম)-এ অংশ নেবেন। তার এই ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সফরসূচি থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের নতুন সরকার চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই সফরে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সহযোগিতা চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। এটি দুই দেশের মধ্যকার গভীর রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনাকে পুরোপুরিভাবে প্রমাণ করে।”

“২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাইরের আঞ্চলিক সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য প্রধান অগ্রাধিকারগুলো হলো—আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থান তৈরি করা, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি দূর করা।”

“গত ১৬ বছর ধরে চীন ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। যা কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চীন বাংলাদেশের জন্য শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে, যা চীনে বাংলাদেশের কৃষি রপ্তানি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।”

“বাংলাদেশি মিডিয়ার খবর অনুযায়ী—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপ করা।”

 বহু দেশ চীনের উন্নয়ন সুযোগকে কাজে লাগাতে চায়, তারেক রহমানের সফর তারই অংশ

“এই সফরটি আসলে চীনের সাথে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর গভীর সম্পর্কের একটি ছোট প্রতিফলন মাত্র। চলতি মাসেই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাই চীনে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন। বেইজিং, সাংহাই এবং হাংঝু সফরের পর দুই দেশ একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে তারা দুই দেশের স্বার্থে কাজ আরও দ্রুত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। গত মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চীন সফর করেন এবং দুই দেশের নেতারা সম্পর্ক আরও গভীর করার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হন।”

“এছাড়াও তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন এবং ব্রুনাইয়ের যুবরাজ হাজি আল-মুহতাদী বিল্লাহ পরপর চীন সফর করে জ্বালানি ও ডিজিটাল অর্থনীতি খাতে সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছেন। গত এপ্রিল মাসে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি ও প্রেসিডেন্ট তো লাম চীন সফর করেন। সে সময় দুই দেশ আন্তঃসীমান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং ডিজিটাল শিল্পের মতো বিষয়ে বেশ কিছু সমঝোতায় পৌঁছায়।”

“ডালিয়ানে গ্রীষ্মকালীন ডাভোস সম্মেলনে চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতারা একত্রিত হবেন। উচ্চপর্যায়ের নেতাদের চীন সফর বার্তা দেয় যে— বহু দেশ চীনের উন্নয়নের সুযোগকে কাজে লাগাতে কতটা আগ্রহী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরও সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।”

ভারতের দাদাগিরির মনোভাব

“বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের সাথে চীনের সম্পর্ক উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়, কিংবা এটি কোনো তৃতীয় পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হওয়াও উচিত নয়। এটি সবসময়ই চীনের একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট অবস্থান। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের নেতার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে বাদ দিয়ে চীনকে বেছে নেওয়ায় কিছুটা অসন্তুষ্ট। কিছু ভারতীয় বিশ্লেষক দাবি করেছেন যে, দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে ‘প্রতিবেশী ভারতকে এড়িয়ে চীন যাচ্ছেন’। তারা বাংলাদেশ ভারতকে অগ্রাধিকার না দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। অন্য কয়েকজন আবার সতর্ক করে বলেছেন যে, তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা ‘নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল’।

এই ধরনের মন্তব্যগুলোর পেছনে কিছু ভারতীয়দের মধ্যে কাজ করা ‘দাদাগিরি’ বা ‘বড় ভাই সুলভ’ মানসিকতা ফুটে ওঠে। তারা মনে করেন, প্রতিবেশী দেশের কোনো নেতার প্রথম বিদেশ সফর মানেই তা আঞ্চলিক অভিভাবকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের একটি মাধ্যম। তারা অন্য দেশের স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে নিজেদের জন্য একটি অপমান হিসেবে গণ্য করেন।

“প্রকৃতপক্ষে চীন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে যেমন অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, তেমনি ভারতের সাথেও বাস্তবমুখী সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। চীন ও ভারতের উচিত একে অপরের বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং অংশীদার হওয়া, যা তাদের একে অপরকে সফল হতে সাহায্য করবে। একে প্রায়শই চীন ও ভারতের যৌথ উন্নয়ন বলা হয়ে থাকে। একই সাথে, ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করার প্রচেষ্টাকে চীন স্বাগত জানায়। এই সম্পর্কগুলো একে অপরের পরিপন্থী নয়। বরং এগুলো একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। পুরো দক্ষিণ এশিয়াই এমন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম, যা সব পক্ষের জন্য সুফল বয়ে আনবে।”

“চীন সবসময় একটি উন্মুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতিতে বিশ্বাসী। চীন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা চীন-বাংলাদেশ কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব হোক— এইসব ব্যবস্থার কোনোটিই কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়। এগুলো এই অঞ্চলের সবার জন্য উন্মুক্ত ও পারস্পরিক সুবিধাজনক বহুপাক্ষিক সহযোগিতা হিসেবে মনে করে বেইজিং।”

“উদাহরণস্বরূপ তিস্তা নদী প্রকল্পের সহযোগিতার কথাই ধরা যাক। ভারত ও বাংলাদেশ হলো এই নদীর উজান ও ভাটির দেশ। অন্যদিকে চীন ও বাংলাদেশ পানি সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। আবার চীন ও ভারতের মধ্যে বয়ে নদীর পানির অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার মতো বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। এটি দেখায় যে এই ক্ষেত্রে তিন দেশের সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।”

দেশ বড় বা ছোট হোক, সবাই সমান— এ নীতিতে বিশ্বাসী চীন

আজকের দিনে নিজেদের উন্নয়নের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মূল অগ্রাধিকার হলো—মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ শক্তিশালী করা। চীন সবসময় ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতি’ এবং ‘দেশ বড় হোক বা ছোট, সবাই সমান’—এই নীতিতে বিশ্বাসী। যা দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মঙ্গলের জন্য সহযোগী হবে।”

সূত্র: গ্লোবাল টাইমস

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকার নারীর স্বাস্থ্যকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে

তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ার অহেতুক মাতামাতির প্রয়োজন নেই

আপডেট টাইম : ১০:০৯:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে গেছেন। তার এ সফর নিয়ে ভারতীয় মিডিয়াগুলোতে বেশ আলোচনা হচ্ছে। তবে তারেক রহমানের সফর নিয়ে ভারতে এত মাতামাতির প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করেছে চীনের সরকারি মিডিয়া গ্লোবাল টাইমস।

গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, তারেক রহমান কেন তার প্রথম সরকারি সফরে ভারতে গেলেন না, সেটি নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া সরগরম। কিন্তু এমনটি হওয়া উচিত নয়। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে চীন সফর করেছেন মিয়ানমার, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপ্রধানরা। তারেক রহমানের সফরও এটির অংশ।

এছাড়া চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক, ভারত-চীনের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলা হয়েছে নিবন্ধে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, তারেক রহমান ভারত না গিয়ে চীনে গিয়ে ভারতকে উপেক্ষা করেছেন— কিছু ভারতীয়ের এমন মন্তব্য তাদের দাদাগিরি বা বড় ভাইসুলভ আচরণ প্রকাশ করে।

নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশ চীনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে চায়। বাংলাদেশও একই পথে হাঁটছে। তাই তারেক রহমান চীন সফর করছেন। এছাড়া তার এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গুরুত্ব ফুটে উঠেছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিচে গ্লোবাল টাইমসের নিবন্ধটি হুবহু তুলে ধরা হলো—

“গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চীনে একটি সরকারি সফর করবেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম চীন সফর। সফরকালে তিনি ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৭তম ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ (সামার ডাভোস ফোরাম)-এ অংশ নেবেন। তার এই ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সফরসূচি থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের নতুন সরকার চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই সফরে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সহযোগিতা চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। এটি দুই দেশের মধ্যকার গভীর রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনাকে পুরোপুরিভাবে প্রমাণ করে।”

“২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাইরের আঞ্চলিক সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য প্রধান অগ্রাধিকারগুলো হলো—আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থান তৈরি করা, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি দূর করা।”

“গত ১৬ বছর ধরে চীন ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। যা কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চীন বাংলাদেশের জন্য শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে, যা চীনে বাংলাদেশের কৃষি রপ্তানি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।”

“বাংলাদেশি মিডিয়ার খবর অনুযায়ী—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপ করা।”

 বহু দেশ চীনের উন্নয়ন সুযোগকে কাজে লাগাতে চায়, তারেক রহমানের সফর তারই অংশ

“এই সফরটি আসলে চীনের সাথে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর গভীর সম্পর্কের একটি ছোট প্রতিফলন মাত্র। চলতি মাসেই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাই চীনে রাষ্ট্রীয় সফর করেছেন। বেইজিং, সাংহাই এবং হাংঝু সফরের পর দুই দেশ একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে তারা দুই দেশের স্বার্থে কাজ আরও দ্রুত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। গত মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চীন সফর করেন এবং দুই দেশের নেতারা সম্পর্ক আরও গভীর করার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হন।”

“এছাড়াও তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন এবং ব্রুনাইয়ের যুবরাজ হাজি আল-মুহতাদী বিল্লাহ পরপর চীন সফর করে জ্বালানি ও ডিজিটাল অর্থনীতি খাতে সহযোগিতা আরও বাড়িয়েছেন। গত এপ্রিল মাসে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির জেনারেল সেক্রেটারি ও প্রেসিডেন্ট তো লাম চীন সফর করেন। সে সময় দুই দেশ আন্তঃসীমান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং ডিজিটাল শিল্পের মতো বিষয়ে বেশ কিছু সমঝোতায় পৌঁছায়।”

“ডালিয়ানে গ্রীষ্মকালীন ডাভোস সম্মেলনে চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতারা একত্রিত হবেন। উচ্চপর্যায়ের নেতাদের চীন সফর বার্তা দেয় যে— বহু দেশ চীনের উন্নয়নের সুযোগকে কাজে লাগাতে কতটা আগ্রহী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরও সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।”

ভারতের দাদাগিরির মনোভাব

“বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের সাথে চীনের সম্পর্ক উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়, কিংবা এটি কোনো তৃতীয় পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হওয়াও উচিত নয়। এটি সবসময়ই চীনের একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট অবস্থান। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের নেতার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে বাদ দিয়ে চীনকে বেছে নেওয়ায় কিছুটা অসন্তুষ্ট। কিছু ভারতীয় বিশ্লেষক দাবি করেছেন যে, দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে ‘প্রতিবেশী ভারতকে এড়িয়ে চীন যাচ্ছেন’। তারা বাংলাদেশ ভারতকে অগ্রাধিকার না দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। অন্য কয়েকজন আবার সতর্ক করে বলেছেন যে, তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা ‘নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল’।

এই ধরনের মন্তব্যগুলোর পেছনে কিছু ভারতীয়দের মধ্যে কাজ করা ‘দাদাগিরি’ বা ‘বড় ভাই সুলভ’ মানসিকতা ফুটে ওঠে। তারা মনে করেন, প্রতিবেশী দেশের কোনো নেতার প্রথম বিদেশ সফর মানেই তা আঞ্চলিক অভিভাবকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের একটি মাধ্যম। তারা অন্য দেশের স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে নিজেদের জন্য একটি অপমান হিসেবে গণ্য করেন।

“প্রকৃতপক্ষে চীন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে যেমন অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, তেমনি ভারতের সাথেও বাস্তবমুখী সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। চীন ও ভারতের উচিত একে অপরের বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং অংশীদার হওয়া, যা তাদের একে অপরকে সফল হতে সাহায্য করবে। একে প্রায়শই চীন ও ভারতের যৌথ উন্নয়ন বলা হয়ে থাকে। একই সাথে, ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করার প্রচেষ্টাকে চীন স্বাগত জানায়। এই সম্পর্কগুলো একে অপরের পরিপন্থী নয়। বরং এগুলো একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। পুরো দক্ষিণ এশিয়াই এমন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম, যা সব পক্ষের জন্য সুফল বয়ে আনবে।”

“চীন সবসময় একটি উন্মুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতিতে বিশ্বাসী। চীন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা চীন-বাংলাদেশ কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব হোক— এইসব ব্যবস্থার কোনোটিই কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়। এগুলো এই অঞ্চলের সবার জন্য উন্মুক্ত ও পারস্পরিক সুবিধাজনক বহুপাক্ষিক সহযোগিতা হিসেবে মনে করে বেইজিং।”

“উদাহরণস্বরূপ তিস্তা নদী প্রকল্পের সহযোগিতার কথাই ধরা যাক। ভারত ও বাংলাদেশ হলো এই নদীর উজান ও ভাটির দেশ। অন্যদিকে চীন ও বাংলাদেশ পানি সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। আবার চীন ও ভারতের মধ্যে বয়ে নদীর পানির অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং বন্যার পূর্বাভাস দেওয়ার মতো বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। এটি দেখায় যে এই ক্ষেত্রে তিন দেশের সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।”

দেশ বড় বা ছোট হোক, সবাই সমান— এ নীতিতে বিশ্বাসী চীন

আজকের দিনে নিজেদের উন্নয়নের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মূল অগ্রাধিকার হলো—মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ শক্তিশালী করা। চীন সবসময় ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতি’ এবং ‘দেশ বড় হোক বা ছোট, সবাই সমান’—এই নীতিতে বিশ্বাসী। যা দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মঙ্গলের জন্য সহযোগী হবে।”

সূত্র: গ্লোবাল টাইমস