সৌদি আরবের কারাগারে মৃত্যুর ২৮ দিন পর অবশেষে নিজ জন্মভূমিতে ফিরল কিশোরগঞ্জের প্রবাসী যুবক শাকিল মিয়ার মরদেহ। কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এবং সরকারি সহযোগিতায় তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
আজ শনিবার ভোর ৫টার দিকে শাকিলের (২৮) মরদেহটি কিশোরগঞ্জের নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গতকাল শুক্রবার রাত ১২টার দিকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে শাকিলের মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরব থেকে শাকিলের মরদেহ দেশে আনতে প্রায় ৮ হাজার সৌদি রিয়াল প্রয়োজন ছিল, যা বাংলাদেশের হিসেবে প্রায় আড়াই লাখ টাকার সমপরিমাণ। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবারটির পক্ষে এত বিপুল অর্থের ব্যবস্থা করা অসম্ভব ছিল। এমন সংকটময় সময়ে বিষয়টি কিশোরগঞ্জ জেলা যুবদলের সভাপতি খসরুজ্জামান শরীফের নজরে আসে। তিনি দ্রুত প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমকে পুরো ঘটনা অবহিত করেন।
বিষয়টি জানার পর প্রতিমন্ত্রী মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার সরাসরি তদারকি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সময়ের মধ্যে মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
মৃত শাকিলের চাচা বুকুল মেম্বার জানান, ২০১৯ সালে পরিবারের অভাব দূর করার আশায় প্রায় চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শাকিল। ঢাকার বনানী এলাকার আলতাব রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তিনি সেখানে যান। কিন্তু সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর নিয়োগকর্তার সঙ্গে আকামা (কাজের অনুমতিপত্র) সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন। একপর্যায়ে কর্মস্থল ছেড়ে অন্যত্র কাজ করতে গেলে তিনি অবৈধ শ্রমিক হিসেবে সৌদি পুলিশের হাতে আটক হন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় শাকিলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, ছেলেকে মুক্ত করতে এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তারা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা সৌদিতে নিযুক্ত আইনজীবীর কাছে পাঠিয়েছিলেন।
শাকিলের ফুফু চায়না বেগম বলেন, ‘মৃত্যুর প্রায় ১০ দিন আগে শাকিল ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিল সে খুব কষ্টে আছে। শরীর শুকিয়ে গেছে। জেলের খাবার খেতে পারে না। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে নিয়ে আসার কথা বলে সে। কিন্তু আমরা তাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারলাম না।’
স্বজনদের দাবি, গত ১৫ মে কারাগারের ভেতরে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্র বিস্ফোরিত হলে সেখানে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় শাকিল তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন এবং পরে কারাগারের ভেতরেই তার মৃত্যু হয়। যদিও এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শাকিলের বাবা ওমর ফারুক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাকে হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। মরদেহ দেশে আনতে যে পরিমাণ টাকা লাগতো, তা আমাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। প্রতিমন্ত্রীর সহযোগিতায় দ্রুত আমার ছেলের মরদেহ বাড়িতে এসেছে। আমরা সরকারের কাছে পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য সহায়তা চাই।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শাকিল অত্যন্ত শান্ত ও পরিশ্রমী একজন যুবক ছিলেন। পরিবারের সুখের আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন, কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর দেশে ফিরতে পারেননি। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এদিকে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করায় প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকাবাসী ও শাকিলের স্বজনরা। তারা সরকারের কাছে পরিবারটির জন্য আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনেরও দাবি জানিয়েছেন।
Reporter Name 

























