ঢাকা ১২:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৯:২৩:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬
  • ১৬ বার

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগকে ঘিরে সর্বত্র আলোচনা শুরু হয়েছে। পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০২ দিনের মাথায় তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগকে কেউ শারীরিক অসুস্থতার ফল হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতা।

স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকে মনে করছেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় দলীয় চাপ এবং নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের দায়িত্বে আনতে না পারার হতাশা তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার কেউ কেউ রাঙ্গামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করলেও জেলা বিএনপির সভাপতি এ ধরনের কোনো কোন্দলের কথা নাকচ করেছেন।

এই ঘটনা অনেকের কাছে নব্বইয়ের দশকের সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যখন রাঙ্গামাটির স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানও পদত্যাগ করেছিলেন।

রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে সরাসরি পার্বত্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া দীপেন দেওয়ানের এই পদত্যাগ নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা দেখা গেছে। তাদের প্রশ্ন—এমন কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে মাত্র চার মাসের মাথায় একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব ছাড়তে হলো?

দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীপেন দেওয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ও নিবেদিত ছিলেন।

স্থানীয় রাজনীতিতে নানা বঞ্চনা, অপমান ও ত্যাগ স্বীকারের কথাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে দলীয় নেতাকর্মীরা উল্লেখ করেন। তাদের মতে, ১/১১-পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আস্থা রেখে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। গত ১৭ বছরে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা-নেতাকর্মী ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকলেও দীপেন দেওয়ান দলকে আগলে রেখে রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন।

তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদান ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়ন দেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন। দলীয় সমর্থন এবং রাঙ্গামাটির মানুষের আস্থায় তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। পরে প্রত্যাশা অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

তবে পার্বত্যমন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব পেলেও সমতল এলাকার নেতা মীর হেলালকে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের আঞ্চলিক দল ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পার্বত্য অঞ্চলের সুশীল সমাজের অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই চাপও দীপেন দেওয়ানকে সামলাতে হয়েছে।

অন্যদিকে, অনেকের ধারণা—পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ায় তাঁর আগ্রহ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। নির্বাচনের তিন মাস পার হলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ গঠনে তেমন কোনো জটিলতা না থাকলেও রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, বিভিন্ন পক্ষের মতামত, সাংগঠনিক ভারসাম্য এবং পারিবারিক চাপ—সবকিছু সামাল দিতে গিয়ে তিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকের মতে, এসব কারণও তাঁর পদত্যাগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তিনি তাঁর পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। তাঁর পদত্যাগের বিষয়ে আমরা বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে আমাদের দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। আমরা সবসময় আমাদের সাবেক সভাপতি দীপেন দেওয়ান এমপি ও মন্ত্রীকে সম্মান করেছি।”

পদত্যাগের বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“স্যার শারীরিক অসুস্থতার কারণেই পদত্যাগ করেছেন। এর বাইরে আর কিছু নেই।”

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের প্রকৃত কারণ নিয়ে আলোচনা চললেও একটি বিষয় স্পষ্ট—পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি, প্রশাসন ও উন্নয়ন প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন নেতার এই সিদ্ধান্ত নতুন করে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। তাঁর পদত্যাগ কেবল একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়; বরং পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রত্যাশা এবং অভ্যন্তরীণ চাপেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ

আপডেট টাইম : ০৯:২৩:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগকে ঘিরে সর্বত্র আলোচনা শুরু হয়েছে। পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০২ দিনের মাথায় তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগকে কেউ শারীরিক অসুস্থতার ফল হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতা।

স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকে মনে করছেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় দলীয় চাপ এবং নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের দায়িত্বে আনতে না পারার হতাশা তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার কেউ কেউ রাঙ্গামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করলেও জেলা বিএনপির সভাপতি এ ধরনের কোনো কোন্দলের কথা নাকচ করেছেন।

এই ঘটনা অনেকের কাছে নব্বইয়ের দশকের সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যখন রাঙ্গামাটির স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানও পদত্যাগ করেছিলেন।

রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে সরাসরি পার্বত্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া দীপেন দেওয়ানের এই পদত্যাগ নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা দেখা গেছে। তাদের প্রশ্ন—এমন কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে মাত্র চার মাসের মাথায় একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব ছাড়তে হলো?

দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীপেন দেওয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ও নিবেদিত ছিলেন।

স্থানীয় রাজনীতিতে নানা বঞ্চনা, অপমান ও ত্যাগ স্বীকারের কথাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে দলীয় নেতাকর্মীরা উল্লেখ করেন। তাদের মতে, ১/১১-পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আস্থা রেখে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। গত ১৭ বছরে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা-নেতাকর্মী ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকলেও দীপেন দেওয়ান দলকে আগলে রেখে রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন।

তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদান ও ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়ন দেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন। দলীয় সমর্থন এবং রাঙ্গামাটির মানুষের আস্থায় তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। পরে প্রত্যাশা অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

তবে পার্বত্যমন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব পেলেও সমতল এলাকার নেতা মীর হেলালকে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের আঞ্চলিক দল ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পার্বত্য অঞ্চলের সুশীল সমাজের অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সেই চাপও দীপেন দেওয়ানকে সামলাতে হয়েছে।

অন্যদিকে, অনেকের ধারণা—পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ায় তাঁর আগ্রহ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। নির্বাচনের তিন মাস পার হলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ গঠনে তেমন কোনো জটিলতা না থাকলেও রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, বিভিন্ন পক্ষের মতামত, সাংগঠনিক ভারসাম্য এবং পারিবারিক চাপ—সবকিছু সামাল দিতে গিয়ে তিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেকের মতে, এসব কারণও তাঁর পদত্যাগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন, সেটি তিনি তাঁর পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। তাঁর পদত্যাগের বিষয়ে আমরা বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে আমাদের দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। আমরা সবসময় আমাদের সাবেক সভাপতি দীপেন দেওয়ান এমপি ও মন্ত্রীকে সম্মান করেছি।”

পদত্যাগের বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“স্যার শারীরিক অসুস্থতার কারণেই পদত্যাগ করেছেন। এর বাইরে আর কিছু নেই।”

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের প্রকৃত কারণ নিয়ে আলোচনা চললেও একটি বিষয় স্পষ্ট—পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি, প্রশাসন ও উন্নয়ন প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন নেতার এই সিদ্ধান্ত নতুন করে নানা প্রশ্ন ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে। তাঁর পদত্যাগ কেবল একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়; বরং পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রত্যাশা এবং অভ্যন্তরীণ চাপেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।