ঢাকা ০৮:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জাইমা রহমানকে সামনে আনা বিএনপির কৌশলগত বদল

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৩০:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৯ বার

বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক নেতা তারেক রহমানের পর তার কন্যা জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে সামনে আনছে বিএনপি-এমন ধারণাই দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ। দলীয় কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার উপস্থিতি ও কার্যক্রম ঘিরে দলীয় অঙ্গনে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে কৌতূহল।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর পরিবারের সঙ্গে দেশে ফেরার পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি ও আলোচনায় জাইমা রহমানের নাম উঠে আসছে। যদিও এখন পর্যন্ত তিনি সীমিত কয়েকটি অনুষ্ঠানেই অংশ নিয়েছেন, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি বিএনপির একটি পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে কৌশল।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, জাইমা রহমানকে সামনে এনে বিএনপি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে একটি বার্তা দিতে চাইছে। তাদের ধারণা, তাকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তিনি দলীয় নেতৃত্বে আসতে পারেন-এমন সম্ভাবনাকেই সামনে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণ ও নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই তাকে সামনে আনার কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখেই বিএনপি নতুন বার্তা পৌঁছাতে চাইছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো-জামায়াতে ইসলামীর মতো দলকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনায় রেখে বিএনপি নারীদের কীভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তার একটি প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও জাইমা রহমানকে দেখা হচ্ছে। যদিও নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমানের সঙ্গে মাঝে মাঝে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে দেখা গেলেও এখনো পর্যন্ত জাইমা রহমান সরাসরি কোনো নির্বাচনী মঞ্চে ওঠেননি।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমান ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বারিধারার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে যুক্তরাজ্যে গিয়ে ম্যারি মাউন্ট গার্লস স্কুল এবং কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর ইনার টেম্পল থেকে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন।

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আইন পেশায় কাজ করার ইঙ্গিত দেন। সেখানে তিনি লেখেন, আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে মানুষের জীবনের গল্প এবং সেগুলোর আইনগত সমাধান খোঁজার দায়িত্ব তাকে অনুপ্রাণিত করে। তারেক রহমান ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মুক্তি পেয়ে পরিবারসহ লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে দেশে ফেরেন।

যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে জাইমা রহমানের কোনো পদ নেই, তবুও গত নভেম্বরে প্রবাসী ভোটারদের নিয়ে ইউরোপভিত্তিক একটি ভার্চুয়াল সভায় তার অংশগ্রহণ আলোচনায় আসে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েও তিনি আলোচনায় আসেন। দেশে ফেরার আগে নিজের ‘নিজের গল্প’-শীর্ষক লেখায় তিনি জানান, গণ-অভ্যুত্থানের সময় নেপথ্যে থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন এবং দেশে ফিরে বাবাকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চান।

ঢাকায় ফেরার পর ১৮ জানুয়ারি ‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন’- শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন তিনি। এরপর বিএনপির বিভিন্ন আয়োজনে তার উপস্থিতি এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা নজর কাড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নতুন কিছু নয়। বিএনপির সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরেই এই পরিবারকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করে আসছেন। সে কারণেই জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, জাইমা রহমানকে সামনে আনার মাধ্যমে বিএনপি তরুণ, নারী এবং জেন-জি ভোটারদের কাছে একটি ভিন্ন বার্তা দিতে চাইছে। একই সঙ্গে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিপরীতে দলটির অবস্থানও তুলে ধরা হচ্ছে। তিনি বলেন, পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণ নারী হিসেবে জাইমা রহমানকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে তিনি ভবিষ্যতে নেতৃত্বে কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জাইমা রহমানকে সামনে আনা বিএনপির কৌশলগত বদল

আপডেট টাইম : ১১:৩০:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক নেতা তারেক রহমানের পর তার কন্যা জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে সামনে আনছে বিএনপি-এমন ধারণাই দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ। দলীয় কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার উপস্থিতি ও কার্যক্রম ঘিরে দলীয় অঙ্গনে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে কৌতূহল।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর পরিবারের সঙ্গে দেশে ফেরার পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি ও আলোচনায় জাইমা রহমানের নাম উঠে আসছে। যদিও এখন পর্যন্ত তিনি সীমিত কয়েকটি অনুষ্ঠানেই অংশ নিয়েছেন, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি বিএনপির একটি পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে কৌশল।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, জাইমা রহমানকে সামনে এনে বিএনপি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে একটি বার্তা দিতে চাইছে। তাদের ধারণা, তাকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তিনি দলীয় নেতৃত্বে আসতে পারেন-এমন সম্ভাবনাকেই সামনে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণ ও নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই তাকে সামনে আনার কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখেই বিএনপি নতুন বার্তা পৌঁছাতে চাইছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি আলোচনার বিষয় হলো-জামায়াতে ইসলামীর মতো দলকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনায় রেখে বিএনপি নারীদের কীভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তার একটি প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও জাইমা রহমানকে দেখা হচ্ছে। যদিও নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমানের সঙ্গে মাঝে মাঝে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে দেখা গেলেও এখনো পর্যন্ত জাইমা রহমান সরাসরি কোনো নির্বাচনী মঞ্চে ওঠেননি।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমান ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বারিধারার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে যুক্তরাজ্যে গিয়ে ম্যারি মাউন্ট গার্লস স্কুল এবং কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর ইনার টেম্পল থেকে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন।

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আইন পেশায় কাজ করার ইঙ্গিত দেন। সেখানে তিনি লেখেন, আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে মানুষের জীবনের গল্প এবং সেগুলোর আইনগত সমাধান খোঁজার দায়িত্ব তাকে অনুপ্রাণিত করে। তারেক রহমান ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মুক্তি পেয়ে পরিবারসহ লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে দেশে ফেরেন।

যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে জাইমা রহমানের কোনো পদ নেই, তবুও গত নভেম্বরে প্রবাসী ভোটারদের নিয়ে ইউরোপভিত্তিক একটি ভার্চুয়াল সভায় তার অংশগ্রহণ আলোচনায় আসে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েও তিনি আলোচনায় আসেন। দেশে ফেরার আগে নিজের ‘নিজের গল্প’-শীর্ষক লেখায় তিনি জানান, গণ-অভ্যুত্থানের সময় নেপথ্যে থেকে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন এবং দেশে ফিরে বাবাকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চান।

ঢাকায় ফেরার পর ১৮ জানুয়ারি ‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন’- শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন তিনি। এরপর বিএনপির বিভিন্ন আয়োজনে তার উপস্থিতি এবং সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা নজর কাড়ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নতুন কিছু নয়। বিএনপির সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরেই এই পরিবারকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করে আসছেন। সে কারণেই জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, জাইমা রহমানকে সামনে আনার মাধ্যমে বিএনপি তরুণ, নারী এবং জেন-জি ভোটারদের কাছে একটি ভিন্ন বার্তা দিতে চাইছে। একই সঙ্গে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিপরীতে দলটির অবস্থানও তুলে ধরা হচ্ছে। তিনি বলেন, পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণ নারী হিসেবে জাইমা রহমানকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে তিনি ভবিষ্যতে নেতৃত্বে কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।