রাজধানীর রাজপথ আজ আর কোনো সাধারণ পথ ছিল না; তা পরিণত হয়েছিল এক অশ্রুসিক্ত জনসমুদ্রে। পুরো রাজধানী যেন রুপ নিয়েছিল জানাজার নগরীতে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে আসা মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের ঢল আজ কেবল বাংলাদেশকে নয়, পুরো বিশ্বকে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী করল। এটি কেবল একটি বিদায় অনুষ্ঠান ছিল না, বরং ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো কোনো মুসলিম নারীর জানাজা পরিণত হয়েছে এই সর্ববৃহৎ মহাসমাবেশ।
বুধবার দুপুর থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা যেন এক স্থবির জনপদে পরিণত হয়। কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, ফার্মগেট থেকে শুরু করে নীলক্ষেত পর্যন্ত—মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ছিল শোকার্ত মানুষের সারি। সাধারণ পেশাজীবী থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতা—সবাই মাইলের পর মাইল হেঁটে এসেছেন প্রিয় নেত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। বিকাল ৩টা ৩ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যখন জানাজা শুরু হয়, তখন সেই এলাকা পরিণত হয় এক মহা-জনসমুদ্রে। রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে আজ সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন দেশের এক মহাকাব্যের বিদায়ে, যিনি ছিলেন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। যিনি ছিলেন আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এক আপসহীন চরিত্রের ইতিহাস গড়া নাম।
কেউ পাঁচ কিলোমিটার, কেউ সাত কিলোমিটার হেঁটে এসেছেন প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি যে একটি সুশৃঙ্খল দল তা আবারও প্রমাণ হলো আজ। বিশ্বে ইতিহাস গড়া জনস্রোতের এই জানাজা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শেষ হয়েছে। অথচ সপ্তাহ খানেক আগে শহিদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজাতে অংশ নেওয়া কিছু মানুষ সংসদ ভবনে বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি করেন। আজ কেবল বিএনপি নেতা-কর্মী নন, সাধারণ পেশাজীবী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরাও শামিল হয়েছিলেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে। একজন আপসহীন ও অবিসংবাদিত নেত্রীর শেষ বিদায়ে কিভাবে হৃদয় নিঙড়ানো ভালোবাসা জানাতে হয় তা দেখিয়ে দিলো বাংলাদেশের মানুষ।
মহীয়সী এই নারী স্বামী-সন্তান সবকিছু ত্যাগ করে শুধু দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আজীবন লড়ে গেছেন, তাই আজ বিদায়যাত্রা ও জানাজায় শরিক হয়েছিল যেন গোটা দেশ। ফ্যাসিস্ট হাসিনা মিথ্যা মামলা দিয়ে ব্রিটিশদের তৈরি পরিত্যক্ত কারাগারে নির্জন কারাবাসে নিষ্ঠুর নির্যাতন করেছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীকে। স্যাঁতস্যাঁতে মেঝের কক্ষে ইঁদুর ও তেলাপোকার মধ্যে রেখে তীলে তীলে কষ্ট দিয়ে হত্যা করত চেয়েছিল এই খুনি। আপসহীন দেশনেত্রীকে নির্যাতন-নিপীড়ন করে কোটি কোটি মানুষের ঘৃণা নিয়ে ইতিহাসের নিকৃষ্ট গণহত্যাকারী হাসিনা আজ ভারতে পালিয়ে। অন্যদিকে, গোটা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় নিঙড়ড়ানো ভালোবাসায় রাজসিক ও বিশ্বের বুকে ইতিহাস সৃষ্টিকারী শেষ বিদায় নিলেন খালেদা জিয়া।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেরদৌস নাভিদ বা নীলফামারী থেকে আসা কর্মী রিয়াজুল ইসলাম—সবার গন্তব্য ছিল একটিই। ভিড় এতই ছিল যে, মানুষ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে শুরু করে ভবনের ছাদ পর্যন্ত অবস্থান নিয়েছিল। তিল ধারণের জায়গা না থাকায় লাখ লাখ মানুষ সড়কেই কাতারবদ্ধ হয়ে পড়েন।
বিশ্বে কোনো মুসলিম নারীর জানাজায় এত বিশাল জনসমাগম ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তিন বাহিনীর প্রধান, বিদেশি কূটনীতিক এবং দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এই জানাজা এক রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় শোকের আবহে সম্পন্ন হয়। জানাজাস্থলের মাইকে যখন বেজে উঠছিল বেগম জিয়ার সেই পুরোনো ভাষণ—‘‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, এটাই আমার ঠিকানা’’—তখন উপস্থিত লাখ লাখ মানুষের কান্নায় এক ভারী পরিবেশ তৈরি হয়। মানুষ প্রিয়জন হারালে যেভাবে কান্না করে ঠিক সেভাবেই যেন প্রিয় নেত্রীর জন্য কেঁদেছে সবাই।
জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ বলেন, ‘‘এটি কেবল জনসমুদ্র নয়, এটি একটি আদর্শের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার প্রতিফলন। একজন আপসহীন নেত্রীর প্রতি হৃদয় নিঙড়ানো ভালোবাসা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই—বেগম জিয়া ছিলেন সাহসের এক জীবন্ত নাম। আজ রাষ্ট্রীয় সম্মান আর মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি চলে গেলেন চিরনিদ্রায়, শহীদ জিয়ার পার্শ্বে।’’
এই ঐতিহাসিক জানাজা প্রমাণ করে দিল, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা বা না থাকা একজন নেত্রীর জনপ্রিয়তার মানদণ্ড নয়। বরং মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকাই হলো প্রকৃত বিজয়। বেগম খালেদা জিয়া তাঁর জীবনের শেষ বিদায়বেলায় সেই সত্যকেই ধ্রুব করে দিয়ে গেলেন—আপসহীন নেত্রী মরে না, তিনি ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকেন যুগ যুগ ধরে।
স্বজনহীন জীবনে দেশের মানুষকেই স্বজন মনে করা খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল ও জানাজা ঘিরে ফেসবুক এক শোকবইয়ে পরিণত হয়। বছরে একটি স্ট্যাটাসও দেননা এমন ব্যবহারকারীরাও প্রিয় নেত্রীর জন্য শোক ও শ্রোদ্ধা প্রকাশ করেন। অন্তরের গভীর থেকে দোয়া করেন মহা আত্মত্যাগী এই নেত্রীর জন্য।
নেটিজেনরা লিখেছেন, ‘‘বাংলার রাজনীতির এক দীর্ঘ লড়াই ও ত্যাগের মহাকাব্য শেষে আজ নীরব হলেন আপসহীন সেই কণ্ঠস্বর। রাজপথের পরিচিত মুখ, শাড়ির আঁচলে দেশপ্রেম জড়িয়ে রাখা যে মহীয়সী কখনো মাথা নত করেননি, তিনি আজ জীবনের সব কারাপ্রাচীর ভেঙে পাড়ি জমালেন অনন্তের পথে। কোটি মানুষের ভালোবাসা আর নিঃসঙ্গ সংগ্রামের স্মৃতি পেছনে ফেলে আপনার এই প্রস্থান একটি যুগের সমাপ্তি হলেও, রাজনীতির ইতিহাসে আপনার নাম লেখা থাকবে অমোচনীয় কালিতে। হে দেশনেত্রী, এই বাংলার মাটির পরম মমতায় শান্তিতে ঘুমান আপনি; আপনার আদর্শ রয়ে যাবে প্রদীপ্ত শিখা হয়ে। জানাজার এই বিশাল জনসমুদ্রই বলে দিচ্ছে আপনি হারেননি, আপনি জিতেই বিদায় নিলেন। লক্ষ কোটি মানুষের অশ্রুজলে সিক্ত এই মাটি আপনাকে আজীবন মনে রাখবে। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।”
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে আব্দুল্লাহ আল জাবের নামে একজন লিখেছেন, ‘‘কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠ থেকে ইতিহাসের মহানায়ক পর্যন্ত—এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম বেগম খালেদা জিয়া। আজ তাঁর জানাজায় আসা মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের ঢল প্রমাণ করেছে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু মানুষের ভালোবাসা চিরস্থায়ী। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ আজ আর কোনো রাস্তা ছিল না, ছিল এক অশ্রুসজল জনসমুদ্র। বিদায় ‘আপসহীন দেশনেত্রী’। আপনি ইতিহাস হয়ে আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। বিদায় বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। বিদায় রাজপথের লড়াকু সৈনিক। ’’
আব্দুর রহিম সৌরভ লিখেছেন, ‘‘রাজনীতি বুঝিনা, দলও করিনা; শুধু ভালোবাসার নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে আজ মাইল পর মাইল হেঁটে জানাজায় গিয়েছিলাম। মাইকে যখন তাঁর সেই চিরচেনা কণ্ঠ বাজছিল—’দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই’—তখন চারপাশের হাজার হাজার মানুষের চোখ ভেজা। একজন নারী, একজন মা, একজন নেত্রী কীভাবে কোটি মানুষের আবেগ হয়ে উঠতে পারেন, আজ ঢাকার রাজপথ তার সাক্ষী হয়ে রইল। প্রিয় নেত্রী, আপনি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, আপনি একটি আদর্শ আর অনমনীয় সংগ্রামের প্রতীক। আপনার অভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবসময় অনুভূত হবে। শান্তিতে ঘুমান হে গণতন্ত্রের মা।’’
আবু সবুর আকন লিখেছেন,‘‘ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেল এক অবিস্মরণীয় বিদায়ের গল্প। রাজধানীর প্রতিটি গলি, প্রতিটি ছাদ, এমনকি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতেও আজ শুধু মানুষের মাথা। কোনো ঘোষণা ছাড়াই এই নীরব শৃঙ্খলা আর ভালোবাসা শুধু আপনার জন্যই সম্ভব ছিল। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জানাজা আর কোটি মানুষের দোয়া নিয়ে আপনি পাড়ি জমালেন পরপারে। পুরো বাংলাদেশই আজ আপনার জানাজায় হয়েছিল হাজির। জিয়াউর রহমানের পাশে আপনার চিরনিদ্রা এক সংগ্রামের উত্তরাধিকার পূর্ণ করল।’’
Reporter Name 




















