ঢাকা ১২:০২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অনন্তে অম্লান আপসহীন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৫৪ বার

মা-বাবার প্রিয় কন্যা খালেদা খানম সেনা অফিসার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর হয়ে গেলেন খালেদা জিয়া। পুরোদস্তুর গৃহিণী। ঘটনাপরম্পরায় সেই গৃহিণীই হয়ে ওঠেন কঠিন নীতি ও মূল্যবোধের পরিণত রাজনীতিবিদ। স্বৈরাচারের পতন আর গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী ওই খালেদা জিয়াই ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা, ভালোবাসা আর গ্রহণযোগ্যতায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হন।

নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে ‘আপসহীন নেত্রী’র অভিধা। দেশ, মানুষ আর নীতির প্রশ্নে অদমনীয় এই নেত্রী দীর্ঘ ৪৪ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কখনো নির্যাতন ও হয়রানির মুখেও মাথা নত করেননি। সজ্জন, মিতভাষী এই নেত্রী ইতিবাচক ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বগুণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বহুগুণে মহিমান্বিত দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এখন অনন্তযাত্রায়, সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
গতকাল মঙ্গলবার তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। কিন্তু তাঁর জীবনদর্শন, সংগ্রাম ও নীতি-আদর্শের পর্যালোচনা বলে, তিনি তাঁর কৃতকর্মের জন্য অমর, চিরভাস্বর ও অম্লান।

জানা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড এক শোকস্তব্ধ নারীর জীবন আমূল বদলে দেয়। ইস্পাত কঠিন মনোবলে বলীয়ান হয়ে ওই নারী খালেদা জিয়া সংগ্রামী এক নেত্রীরূপে আবির্ভূত হন

ব্যক্তিগত বেদনা আর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন গণতন্ত্রের লড়াইয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য নাম, একটি অধ্যায়, একটি ইতিহাস। রাজনৈতিক সহযাত্রী, বন্ধু-স্বজন ও গবেষকদের লেখায় তাঁর জীবনকে শুধুই একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার গল্প হিসেবে নয়, বরং তাঁকে দেখা হয় সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অবিচল দৃঢ়তার এক অনুকরণীয় প্রতীক হিসেবে।

বাংলাদেশের সেই আপসহীন নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর গতকাল ভোর ৬টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। তিনি রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

গতকাল এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এই সংবাদটা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। আমরা এবারও ভেবেছিলাম, তিনি আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি, আজ (গতকাল মঙ্গলবার) ভোর ৬টায়, গণতন্ত্রের মা, আমাদের অভিভাবক, জাতির অভিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’

মৃত্যুর সময় খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে ছিলেন তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় হাসপাতালে আরো উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি।

স্বজনদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তাঁর স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও শেষ সময়ে হাসপাতালে ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতে শুধু রাষ্ট্র বা দল নয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হারিয়ে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষও। কোরআন তিলাওয়াত, দোয়াসহ নানাভাবে খালেদা জিয়ার প্রতি শোক-শ্রদ্ধা জানাচ্ছে তারা। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। পাশাপাশি আজ বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে বিএনপি।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন ছেলে তারেক রহমান। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে খোলা শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আরো শোক প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শোকবার্তায় তিনি বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের ভোটাধিকার এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

অন্যদের মধ্যে শোক প্রকাশ করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রমুখ। রাজনৈতিক বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও শোক প্রকাশ করেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুকে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো।’

জানাজা আজ দুপুর ২টায় : আজ দুপুর ২টায় সংসদ ভবনের সামনের মাঠে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে জানাজার এই সিদ্ধান্তের কথা জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই জানাজা পড়াবেন আমাদের জাতীয় মসজিদের খতিব অর্থাৎ বায়তুল মোকাররমের খতিব। আর এই জানাজায় পুরো বিষয়টাকে নিয়ে যিনি সঞ্চালন করবেন তিনি হচ্ছেন আমাদের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এরপর আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বাংলাদেশের আরেক কিংবদন্তি নেতা, যাঁকে রাখাল রাজা বলে এই দেশের মানুষ, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধি, তাঁরই পাশে আমাদের মহান নেত্রীকে সমাধিস্থ করা হবে, দাফন করা হবে।’

খালেদা জিয়ার দাফন প্রস্তুতি : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দাফন প্রস্তুতি গতকাল দুপুরের পর থেকেই শুরু হয়। বিকেলে জিয়া উদ্যান এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দাফনের জন্য স্থান নির্ধারণ ও পরিমাপের কাজ চলছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকায় কড়া নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছেন। বর্তমানে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়া সাধারণ কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কবর খননের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও শ্রমিকদেরও সেখানে উপস্থিত হতে দেখা গেছে।

জানাজা-দাফন ঘিরে থাকবে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মরদেহ এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে নেওয়া হবে মানিকমিয়া এ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে। জানাজার আগে সেখানে নেওয়ার সময় মরদেহবাহী গাড়ির নিরাপত্তায় ১০ হাজার পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য মাঠে থাকবেন বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্বে থাকবেন বলে জানান তিনি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভা শেষে গতকাল শফিকুল আলম বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফনের পুরো প্রক্রিয়াটি পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও কূটনীতিকরা উপস্থিত থাকবেন।

জানাজায় শৃঙ্খলা মানার আহবান : বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় সবাইকে শৃঙ্খলা মানার আহবান জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে এই জানাজায় অংশগ্রহণ করব এবং তারপর তাঁকে দাফনে অংশগ্রহণ করব। তবে দাফনে যাঁদের দায়িত্ব তাঁরাই অংশগ্রহণ করবেন। অনুরোধ থাকবে, আপনারা কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করে শুধু ছবি তোলার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন না এবং ব্যাহত করবেন না এই পুরো কর্মসূচিকে।’

সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা : বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আপনারা জানেন যে এরই মধ্যে সরকারের তরফ থেকে তিন দিন শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে, বুধবার ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আপনারা এরই মধ্যে জানেন যে প্রধান উপদেষ্টা, তিনি বাণী দিয়ে কথা বলেছেন, জাতির সামনে কথা বলেছেন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে দলের পক্ষ থেকে আপনারা জানেন যে সাত দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এই সাত দিন আমাদের কালো পতাকা আমরা ধারণ করব, কালো ব্যাজ ধারণ করব। কালো পতাকা উঠবে আমাদের দলীয় কার্যালয়ে এবং প্রতিটি কার্যালয়ে দোয়া পড়া হবে, কোরআন তিলাওয়াত হবে।’

শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায় বিএনপি : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায় দলটি। স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পরে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, তাঁরা খালেদা জিয়ার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান।

মহাসচিব বলেন, ‘আজ এমন একটা সময়ে তিনি চলে গেলেন যখন তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। যখন গণতন্ত্রের উত্তরণের জন্য একটা নির্বাচনের দিকে জাতি যাচ্ছে, যখন সমস্ত জাতি তৈরি হয়েছে নির্বাচন করে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করতে, সেই সময় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এই শোক, এই বেদনা আমাদের পক্ষে ধারণ করা খুব কঠিন। তার পরও আমরা এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চাই। আমরা দেশনেত্রীর নির্দেশিত যে পথ সেই পথকে অনুসরণ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আমরা একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই এবং সেই পথকে লক্ষ্য করে একটা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

আড়াই ঘণ্টার বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান ও এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

এভারকেয়ারে ভর্তি হন ২৩ নভেম্বর : আপসহীন নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যাচার এবং কারাগারে বিনা চিকিৎসায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি দীর্ঘদিন থেকে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি কিডনি, ফুসফুস, হার্ট ও চোখের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও ছিল তাঁর। হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড তাঁর চিকিৎসা তদারকি করে। এই মাসের শুরুতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে তা সম্ভব হয়নি। টানা ৩৮ দিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টায় জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

৪১ বছর ধরে বিএনপি চেয়ারপারসন : বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে তাঁর জন্ম। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।

১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৪১ বছর তিনি দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

অনন্তে অম্লান আপসহীন

আপডেট টাইম : ১০:৪৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

মা-বাবার প্রিয় কন্যা খালেদা খানম সেনা অফিসার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর হয়ে গেলেন খালেদা জিয়া। পুরোদস্তুর গৃহিণী। ঘটনাপরম্পরায় সেই গৃহিণীই হয়ে ওঠেন কঠিন নীতি ও মূল্যবোধের পরিণত রাজনীতিবিদ। স্বৈরাচারের পতন আর গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী ওই খালেদা জিয়াই ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা, ভালোবাসা আর গ্রহণযোগ্যতায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হন।

নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে ‘আপসহীন নেত্রী’র অভিধা। দেশ, মানুষ আর নীতির প্রশ্নে অদমনীয় এই নেত্রী দীর্ঘ ৪৪ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কখনো নির্যাতন ও হয়রানির মুখেও মাথা নত করেননি। সজ্জন, মিতভাষী এই নেত্রী ইতিবাচক ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বগুণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বহুগুণে মহিমান্বিত দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এখন অনন্তযাত্রায়, সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
গতকাল মঙ্গলবার তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। কিন্তু তাঁর জীবনদর্শন, সংগ্রাম ও নীতি-আদর্শের পর্যালোচনা বলে, তিনি তাঁর কৃতকর্মের জন্য অমর, চিরভাস্বর ও অম্লান।

জানা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড এক শোকস্তব্ধ নারীর জীবন আমূল বদলে দেয়। ইস্পাত কঠিন মনোবলে বলীয়ান হয়ে ওই নারী খালেদা জিয়া সংগ্রামী এক নেত্রীরূপে আবির্ভূত হন

ব্যক্তিগত বেদনা আর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন গণতন্ত্রের লড়াইয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য নাম, একটি অধ্যায়, একটি ইতিহাস। রাজনৈতিক সহযাত্রী, বন্ধু-স্বজন ও গবেষকদের লেখায় তাঁর জীবনকে শুধুই একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার গল্প হিসেবে নয়, বরং তাঁকে দেখা হয় সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অবিচল দৃঢ়তার এক অনুকরণীয় প্রতীক হিসেবে।

বাংলাদেশের সেই আপসহীন নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর গতকাল ভোর ৬টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। তিনি রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

গতকাল এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এই সংবাদটা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। আমরা এবারও ভেবেছিলাম, তিনি আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি, আজ (গতকাল মঙ্গলবার) ভোর ৬টায়, গণতন্ত্রের মা, আমাদের অভিভাবক, জাতির অভিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’

মৃত্যুর সময় খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে ছিলেন তাঁর বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় হাসপাতালে আরো উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি।

স্বজনদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তাঁর স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও শেষ সময়ে হাসপাতালে ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতে শুধু রাষ্ট্র বা দল নয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হারিয়ে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষও। কোরআন তিলাওয়াত, দোয়াসহ নানাভাবে খালেদা জিয়ার প্রতি শোক-শ্রদ্ধা জানাচ্ছে তারা। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। পাশাপাশি আজ বুধবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে বিএনপি।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন ছেলে তারেক রহমান। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে খোলা শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আরো শোক প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শোকবার্তায় তিনি বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের ভোটাধিকার এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

অন্যদের মধ্যে শোক প্রকাশ করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রমুখ। রাজনৈতিক বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও শোক প্রকাশ করেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুকে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান অপরিসীম। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো।’

জানাজা আজ দুপুর ২টায় : আজ দুপুর ২টায় সংসদ ভবনের সামনের মাঠে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে জানাজার এই সিদ্ধান্তের কথা জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই জানাজা পড়াবেন আমাদের জাতীয় মসজিদের খতিব অর্থাৎ বায়তুল মোকাররমের খতিব। আর এই জানাজায় পুরো বিষয়টাকে নিয়ে যিনি সঞ্চালন করবেন তিনি হচ্ছেন আমাদের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এরপর আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বাংলাদেশের আরেক কিংবদন্তি নেতা, যাঁকে রাখাল রাজা বলে এই দেশের মানুষ, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধি, তাঁরই পাশে আমাদের মহান নেত্রীকে সমাধিস্থ করা হবে, দাফন করা হবে।’

খালেদা জিয়ার দাফন প্রস্তুতি : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দাফন প্রস্তুতি গতকাল দুপুরের পর থেকেই শুরু হয়। বিকেলে জিয়া উদ্যান এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দাফনের জন্য স্থান নির্ধারণ ও পরিমাপের কাজ চলছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকায় কড়া নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছেন। বর্তমানে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়া সাধারণ কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কবর খননের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও শ্রমিকদেরও সেখানে উপস্থিত হতে দেখা গেছে।

জানাজা-দাফন ঘিরে থাকবে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মরদেহ এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে নেওয়া হবে মানিকমিয়া এ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে। জানাজার আগে সেখানে নেওয়ার সময় মরদেহবাহী গাড়ির নিরাপত্তায় ১০ হাজার পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য মাঠে থাকবেন বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্বে থাকবেন বলে জানান তিনি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভা শেষে গতকাল শফিকুল আলম বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফনের পুরো প্রক্রিয়াটি পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা ও কূটনীতিকরা উপস্থিত থাকবেন।

জানাজায় শৃঙ্খলা মানার আহবান : বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় সবাইকে শৃঙ্খলা মানার আহবান জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে এই জানাজায় অংশগ্রহণ করব এবং তারপর তাঁকে দাফনে অংশগ্রহণ করব। তবে দাফনে যাঁদের দায়িত্ব তাঁরাই অংশগ্রহণ করবেন। অনুরোধ থাকবে, আপনারা কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করে শুধু ছবি তোলার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন না এবং ব্যাহত করবেন না এই পুরো কর্মসূচিকে।’

সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা : বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আপনারা জানেন যে এরই মধ্যে সরকারের তরফ থেকে তিন দিন শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে, বুধবার ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আপনারা এরই মধ্যে জানেন যে প্রধান উপদেষ্টা, তিনি বাণী দিয়ে কথা বলেছেন, জাতির সামনে কথা বলেছেন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে দলের পক্ষ থেকে আপনারা জানেন যে সাত দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এই সাত দিন আমাদের কালো পতাকা আমরা ধারণ করব, কালো ব্যাজ ধারণ করব। কালো পতাকা উঠবে আমাদের দলীয় কার্যালয়ে এবং প্রতিটি কার্যালয়ে দোয়া পড়া হবে, কোরআন তিলাওয়াত হবে।’

শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায় বিএনপি : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায় দলটি। স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পরে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, তাঁরা খালেদা জিয়ার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান।

মহাসচিব বলেন, ‘আজ এমন একটা সময়ে তিনি চলে গেলেন যখন তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। যখন গণতন্ত্রের উত্তরণের জন্য একটা নির্বাচনের দিকে জাতি যাচ্ছে, যখন সমস্ত জাতি তৈরি হয়েছে নির্বাচন করে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করতে, সেই সময় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এই শোক, এই বেদনা আমাদের পক্ষে ধারণ করা খুব কঠিন। তার পরও আমরা এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চাই। আমরা দেশনেত্রীর নির্দেশিত যে পথ সেই পথকে অনুসরণ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আমরা একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই এবং সেই পথকে লক্ষ্য করে একটা সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

আড়াই ঘণ্টার বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান ও এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

এভারকেয়ারে ভর্তি হন ২৩ নভেম্বর : আপসহীন নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যাচার এবং কারাগারে বিনা চিকিৎসায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি দীর্ঘদিন থেকে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি কিডনি, ফুসফুস, হার্ট ও চোখের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও ছিল তাঁর। হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড তাঁর চিকিৎসা তদারকি করে। এই মাসের শুরুতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে তা সম্ভব হয়নি। টানা ৩৮ দিন হাসপাতালে থেকে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টায় জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

৪১ বছর ধরে বিএনপি চেয়ারপারসন : বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে তাঁর জন্ম। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।

১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৪১ বছর তিনি দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন।