বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট ও পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হককে নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে। অভিযোগ উঠেছে, ফ্যাসিস্ট পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন নাজমুল। এখন মুখোশ পাল্টে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বিএনপি কর্মীর লেবাস ধরে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের জ্বালানি খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাত জাতীয় অর্থনীতি ও জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাই এই খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার যেকোনো অপচেষ্টা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের শামিল।
পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের দালাল নাজমুল হক বর্তমানে ফিলিং স্টেশনের কিছু মালিককে ঐক্যবদ্ধ করে সমাবেশ ও সভার মাধ্যমে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন। আর তাঁর মূল উদ্দেশ্য হলো—দেশে
বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করা। তিনি যে সংগঠনের সভাপতি হিসেবে এখনো পরিচয় দিচ্ছেন, সেই কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে অনেক আগেই। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও নির্বাচন আয়োজন হয়নি।
অভিযোগ আছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের হস্তক্ষেপে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে ২০১১ সাল থেকে টানা সভাপতির পদ ধরে রেখেছিলেন। সংগঠনের গঠনতন্ত্রের নিয়ম হলো, পর পর দুই মেয়াদের বেশি কেউ সভাপতির পদে থাকতে পারবেন না।
তেল চুরি করে শত কোটি টাকা লুট : সিলেট গ্যাস ফিল্ড থেকে তেল বহনে (তেল ক্যারিং) নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বেও রয়েছেন নাজমুল হক। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি তেল চুরি করে নিজের পারিবারিক পাম্পসহ দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে সরবরাহ করে আসছেন। এভাবে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নাজমুল হক সিলেট গ্যাস ফিল্ড থেকে আসা ১০টি গাড়ির তেলের মধ্যে অন্তত দুটি গাড়ির তেল চুরি করে সরাসরি নিজের ও অন্যান্য পাম্পে পাঠিয়ে দেন। এতে সরকারি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে শত শত কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন। বিপিসির কর্মকর্তারা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।
নেই ফিলিং স্টেশন, তার পরও সংগঠনের সভাপতি : পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাম্পের মালিক হতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, নাজমুল হক যে ‘রমনা পেট্রল পাম্পের মালিক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচয় দিয়ে আসছেন, সেটির মালিক তিনি নন। ‘রমনা পেট্রল পাম্প’ (হাইকোর্টের উল্টো দিকে অবস্থিত) মূলত তাঁর মায়ের নামে রয়েছে। অভিযোগ আছে, তিনি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় (আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালে) পরিবারের এই সম্পত্তি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর ভাইয়েরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন এবং তাঁদের আপত্তির কারণে পাম্পটি দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া আগে ফাতেমা নাজ নামে যাত্রাবাড়ীতে সরকারি জায়গার ওপর নাজমুল হকের একটি পেট্রল পাম্প ছিল, সেটি তিনি গত ১০ বছর আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন। পাম্পটি তিনি বিক্রি করলেও ডিলারশিপটি নিজের নামে ধরে রেখেছেন।
সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ : নাজমুল একসময় আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী হিসেবে (হাজি সেলিমের বিপরীতে) ঢাকা-৭ আসন থেকে নির্বাচন করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণাও করেছিলেন। এমনকি মনোনয়ন পেতে নানা জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করেন। শেষে ব্যর্থ হন।
অবৈধ সভা বন্ধে রমনা থানা ও ডিআইজি অফিসে আহ্বায়ক কমিটির চিঠি : নাজমুলের আহ্বানে আজ শনিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর স্কাই সিটি হোটেলে কিছু পেট্রল পাম্প মালিকের গুরুত্বপূর্ণ সভা হওয়ার কথা রয়েছে। এই সভা বন্ধে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম, ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল স্বাক্ষরিত দুটি চিঠি রমনা থানা এবং ডিআইজি অফিসে পাঠানো হয়েছে। দুটি চিঠিতে বলা হয়, ‘নাজমুল হক অত্র অ্যাসোসিয়েশনের তথাকথিত সভাপতিকে গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় সারা বাংলাদেশ থেকে আগত পেট্রল পাম্প মালিকদের সর্বসম্মতিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, নাজমুল হক মালিবাগ সিআইডি অফিসের বিপরীতে অবস্থিত স্কাই সিটি হোটেলে শনিবার সকাল ১০টায় একটি সভা আহবান করেছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এই সভা আহবান করার কোনো এখতিয়ার তাঁর নেই। এই সভা আহবানকে কেন্দ্র করে অত্র অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের মধ্যে সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই সভা আহ্বানের মাধ্যমে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেশে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ও জ্বালানি সেক্টরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। আমাদের এই আহ্বায়ক কমিটির মুখ্য উদ্দেশ্য একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত বৈধ কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।’
চিঠি দুটিতে আরো বলা হয়, উনি (নাজমুল হক) বিগত আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিলেন এবং মুজিব কোট পরিধান করে ঘুরে বেড়াতেন এবং এখন তিনি রং পাল্টেছেন। গত ১৭ বছর এই সংগঠনের কোনো নির্বাচন করতে দেননি, এমনকি পুরো সংগঠনটিকে কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। তদন্ত করলে বিগত সরকারের আমলে তাঁর কাজকর্ম সম্পর্কে অবগত হতে পারবেন। শনিবার অনুষ্ঠিত ওই সভা বন্ধ করে জ্বালানি সেক্টরে যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করতে পারে, তার ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম, ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাঁরা ১৭ বছর একবারও নির্বাচন দেওয়ার কথা চিন্তা করেননি, তাঁদের কাছ থেকে আমরা ভালো কিছু আশা করতে পারি না। সংগঠন কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এটা বাংলাদেশের দুই হাজার ৩০০ পেট্রল পাম্প মালিকের সংগঠন। এখানে স্বচ্ছ নির্বাচন হবে, মানুষ ভোট দেবেন, তাঁরা তাঁদের মনোনীত যোগ্য প্রার্থীকে নিয়ে আসবেন। নাজমুল হক কেন এটা করতে ভয় পান আমার জানা নেই। তবে একটা জিনিস খুবই পরিষ্কার, তিনি কখনো ইলেকশনের পক্ষে না, ইলেকশনের বিপক্ষে এবং স্বচ্ছতা তাঁর ভেতরে অনুপস্থিত।’
সাজ্জাদুল করিম কাবুল আরো বলেন, ‘আমি তাঁর (নাজমুল হক) বিভিন্ন দোষত্রুটির কথা বলব না, শুধু একটি কথাই তাঁকে বলব, আসুন, আমরা নির্বাচন দিচ্ছি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। আপনি এত পপুলার, আপনি নির্বাচিত হয়ে সংগঠনের হাল ধরুন। আপনার কাজ হলো শুধু বিপিসির দালালি করা। তিনি কথায় কথায় শুধু বিপিসির চেয়ারম্যানের রেফারেন্স দেন। তিনি হলেন মালিক সমিতির সভাপতি কিন্তু তাঁর সঙ্গে মালিক সমিতির কোনো সদস্যের যোগাযোগ নেই। তিনি যখন যেখানে যেভাবেই পারেন এই মালিক সমিতিকে বিক্রি করে তাঁর প্রাধান্য বিস্তার করতে চান। এটা আমরা মোটেও পছন্দ করি না। আমরা চাই, এই সংগঠন স্বচ্ছতার মধ্যে আসুক। কোনো প্রকার দালালের স্থান এখানে নেই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মোহাম্মদ নাজমুল হক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করছি কি না সেটা বিপিসির (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন। এই সরকারকে বিব্রত করার মতো বিন্দুমাত্র কোনো কাজ করছি না। আওয়ামী লীগ ও তার কোনো অঙ্গসংগঠনে আমার কোনো পদ-পদবি নেই। আমি ব্যবসায়ী মানুষ, ব্যবসার প্রয়োজনে অনেক সময় চাঁদাবাজদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক রাখতে হয়েছে। তবে আমি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হতে নমিনেশন চেয়েছিলাম, সেটা তো দোষের কিছু না। এর আগে একসময় বিএনপিতে থেকেও আমি নমিনেশন চেয়েছিলাম।’ তেল চুরির অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, “আমি তেল চুরির সঙ্গে কখনো যুক্ত ছিলাম না। আমার বিরুদ্ধে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড থেকে তেল বহনকারী কন্ট্রাক্টরদের মধ্যে একমাত্র আমার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ নেই। আমিই একমাত্র ‘এ প্লাস’ প্রাপ্ত কন্ট্রাক্টর।”
Reporter Name 




















