কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা : আনআম, আয়াত : ৫৩
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ كَذٰلِكَ فَتَنَّا بَعۡضَهُمۡ بِبَعۡضٍ لِّیَقُوۡلُوۡۤا اَهٰۤؤُلَآءِ مَنَّ اللّٰهُ عَلَیۡهِمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِنَا ؕ اَلَیۡسَ اللّٰهُ بِاَعۡلَمَ بِالشّٰكِرِیۡنَ ﴿۵۳﴾
সরল অনুবাদ
(৫৩) এভাবে তাদের এক দলকে অন্য দল দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যেন তারা বলে যে, ‘আমাদের মধ্যে কি তাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন?’ আল্লাহ কি কৃতজ্ঞগণ সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত নন?
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা আন‘আমের ৫৩ নম্বর আয়াতের প্রেক্ষাপটে আমরা ইসলামের সূচনাকালীন এক বাস্তবতার সাক্ষাৎ পাই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সে সময় অধিকাংশ গরীব, ক্রীতদাস ও সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষই প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মক্কার ধনী ও প্রভাবশালী নেতারা এটিকে নিজেদের জন্য লজ্জার বিষয় মনে করত। তারা অহংকারভরে বলত, ‘এরা কি সেই মানুষ, যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? যদি ইসলাম সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা উত্তম বিষয় হতো, তবে প্রথমে আমাদের মতো নেতৃস্থানীয় ও অভিজাত শ্রেণীর মানুষই তা গ্রহণ করত।
’ কোরআনে তাদের এই মানসিকতাকে তুলে ধরে বলা হয়েছে—
لَوْ كَانَ خَيْرًا مَا سَبَقُونَا إِلَيْه
“যদি এটা উত্তম জিনিস হত, তাহলে তারা আমাদেরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারতো না।” (সুরা আহকাফ, আয়াত : ১১)
এই চিন্তাই তাদের জন্য পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা দুর্বলদের নিয়ে উপহাস-বিদ্রূপ করত, তাদের উপর জুলুম-নির্যাতনের রোলার চালাত এবং ইসলামের দাওয়াতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের চোখে দেখত। কিন্তু বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন।
মহান আল্লাহ কখনোই বাহ্যিক চাকচিক্য, ধন-সম্পদ কিংবা সামাজিক পদমর্যাদাকে মানদণ্ড হিসেবে দেখেন না। তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে অন্তরের উপর—কার অন্তরে ঈমান, বিনয় ও কৃতজ্ঞতা আছে, আর কার অন্তরে অহংকার, হিংসা ও বিরাগ ভর করেছে।এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে হাদিসে বলা হয়েছে—
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও তোমাদের সম্পদের দিকে লক্ষ্য করেন না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও তোমাদের আমলকে দেখেন।” (সহিস মুসলিম, কিতাবুল বির্র্ ওয়াস-সিলাহ ওয়াল-আদাব / كتاب البر والصلة والآداب, হাদিস : ২৫৬৪)
অতএব, ইসলামের প্রথম যুগে যারা সমাজের নিচুতলার মানুষ হিসেবে গণ্য হতো, তারাই প্রকৃত সৌভাগ্যের অধিকারী হয়ে উঠেছিল।
কারণ তাদের অন্তরে ছিল ঈমানের আলো, কৃতজ্ঞতার অনুভূতি ও সত্যকে গ্রহণ করার সাহস। অন্যদিকে, যাদের হাতে ছিল ক্ষমতা ও অর্থবল, তাদের অনেকেই অহংকার ও গর্বের কারণে সেই আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।এখানেই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা নিহিত—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ হয় তার হৃদয়ের অবস্থা ও সৎকর্ম দ্বারা। ধন-সম্পদ, কীর্তি-খ্যাতি কিংবা অভিজাত পরিচয় আল্লাহর কাছে কোনো মর্যাদার কারণ নয়। বরং আল্লাহর নিকট সম্মানিত সে-ই, যে বেশি মুত্তাকি, বিনয়ী ও ঈমানদার।