মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে অটুট সম্পর্ক হলো মা ও সন্তানের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দান করা এক মহামূল্যবান নিয়ামত, যা কোনো সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা দুনিয়ার মোহ-মায়ার বিনিময়ে কখনো প্রতিস্থাপিত হতে পারে না। ইসলাম এই সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করেছে অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে। এমনকি নবী করিম ﷺ মা-সন্তানের বিচ্ছেদকে অমানবিক অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে বলেছেন-
عَنْ أَبِي أَيُّوبَ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ “ مَنْ فَرَّقَ بَيْنَ الْوَالِدَةِ وَوَلَدِهَا فَرَّقَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَحِبَّتِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ”.
আবূ আইয়ূব (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি; মা ও তার সন্তানদের পরস্পর হতে যে ব্যক্তি পৃথক করে ফেলবে, আল্লাহ্ তা’আলা ঐ ব্যক্তি ও তার প্রিয়জনকে পরস্পর হতে কিয়ামতের দিন পৃথক করে দিবেন।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্য
১. হাদিসের প্রেক্ষাপট
এটি মূলত দাস-প্রথার সময়কার ঘটনা কেন্দ্রিক একটি নির্দেশনা। সেই যুগে দাস-দাসী কেনা-বেচা করা হতো। অনেক সময় মালিকরা মাকে একদিকে বিক্রি করত, সন্তানকে অন্যদিকে, ফলে মা-সন্তানের মধ্যে হৃদয়বিদারক বিচ্ছেদ ঘটত। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করেছেন।
২. ইসলামের মানবিক দিক
ইসলাম এসেছে দাসপ্রথা বিলুপ্ত ও দাসদের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এখানে বিশেষভাবে মা-সন্তানের সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। পরিবার ভাঙন ও হৃদয়হীনতা ইসলাম কোনোভাবেই বরদাশত করে না।
৩. সাধারণ শিক্ষা
এই হাদিস কেবল দাসপ্রথার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শিক্ষা সমগ্র মানবজীবনের জন্য প্রযোজ্য।
কোনো কারণে মা-সন্তানকে আলাদা করে দেওয়া (যেমন অবিচার, দত্তক গ্রহণে প্রতারণা, রাজনৈতিক বা সামাজিক নির্যাতন) আল্লাহর কাছে অত্যন্ত নিন্দনীয়। পরিবার ভাঙন, স্বজন বিচ্ছেদ, সন্তানদের থেকে মাকে আলাদা করা— সবই এই হাদিসের সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত।৪. আখিরাতের শাস্তির ভয়াবহতা
রাসুল (সা.) বলেছেন— যে ব্যক্তি এ ধরনের অন্যায় করবে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন তার প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবেন। এটি শুধু শাস্তিই নয়, বরং ভয়ংকর এক হুঁশিয়ারি— যেভাবে সে অন্যকে কষ্ট দিয়েছে, সেভাবেই তাকে কিয়ামতে ভুগতে হবে।
শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ
১. মা-সন্তানের সম্পর্ক আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ; সেটি নষ্ট করা মারাত্মক অপরাধ।
২. পারিবারিক বন্ধন রক্ষা করা ইসলামি সমাজব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নীতি।
৩. যে যেমন করবে, তাকে তেমনই প্রতিদান দেওয়া হবে।
৪. ইসলাম সবসময় দাসপ্রথা বিলোপ, পরিবার রক্ষা ও মানবিক অধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।এই হাদিস আমাদের শেখায়— আল্লাহর রহমত পেতে হলে আমাদের সর্বদা পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে। মা-সন্তান বা প্রিয়জনদের কষ্ট দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা শুধু দুনিয়ায় নয়, আখিরাতেও ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে।