মানব ইতিহাসে এমন কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো কেবল দুই হৃদয়ের মিলন নয়; বরং যুগের পর যুগ মানবতার জন্য দিশারী হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খাদীজা (রা.)-এর বিবাহ সেই মহিমান্বিত সম্পর্কগুলোর সেরা সম্পর্ক। এটি ছিল এক পবিত্র বন্ধন, যেখানে সততা, আস্থা, শ্রদ্ধা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এক সুতোয় গাঁথা হয়েছিল। বাণিজ্য সফরে মহানবী (সা.)-এর চরিত্রের দীপ্তি যেমন উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছিল, তেমনি খাদীজা (রা.)-এর হৃদয়ে জন্ম নিয়েছিল গভীর শ্রদ্ধা ও প্রশান্ত ভালোবাসা।
সিরিয়া থেকে যুবক মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রত্যাবর্তনের পর ব্যবসা বাণিজ্যের হিসাব করা হল। হিসাব নিকাশ করে আমানতসহ এত বেশী পরিমাণ অর্থ তিনি পেলেন খাদীজাহ (রা.)-এর অন্তর তৃপ্তির আমেজে ভরে ওঠে। সেই সাথে দাস মায়সারার বর্ণনায় মুহাম্মাদ (সা.)-এর মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, উন্নত চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি বিষয় অবগত হওয়ার পর তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই বৃদ্ধিহতে থাকে।
বিবাহে নবী (সা.) এবং খাদীজাহ (রা.) কে মোহরানা স্বরূপ ২০টি উট প্রদান করেন। ঐ সময় খাদীজাহ (রা.)-এর বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। বংশ-মর্যাদা, সহায়-সম্পদ, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমাজের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়া। তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের এক অনুপমা মহিলা এবং নবী (সা.)-এর প্রথমা সহধর্মিনী।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তানদের মধ্যে ইবরাহীম ব্যতীত সকলেই ছিলেন খাদীজাহ (রা)-এর গর্ভজাত। নবী দম্পতির প্রথম সন্তান ছিলেন কাসেম, তাই উপনাম হয় ‘আবুল কাসেম’। তারপর যথাক্রমে জন্মগ্রহণ করেন যায়নাব, রুকাইয়্যাহ, উম্মে কুলসুম, ফাত্বিমাহ ও আব্দুল্লাহ।
নবী (সা.)-এর সকল পুত্র সন্তানই বাল্যাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে কন্যাদের মধ্যে সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছেন, মুসলিম হয়েছেন এবং মুহাজিরের মর্যাদাও লাভ করেছেন। কিন্তু ফাত্বিমাহ (রা.) ব্যতীত কন্যাগণ সকলেই পিতার জীবদ্দশাতেই মৃত্যু বরণ করেন। ফাত্বিমাহ (রা.)-এর মৃত্যু হয়েছিল নবী (সা.)-এর ছয় মাস পর।
রাসুলুল্লাহ (সা.) পঁয়ত্রিশ বছরে পদার্পণ করলে কুরাইশগণ ক্বাবা’হ গৃহের পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নিলেন। ক্বাবা তখন চতুর্দিকে দেওয়াল দ্বারা বেষ্টিত, কিন্তু ছাদহীন। এই সুযোগে কিছু চোরগোষ্ঠী প্রবেশ করে অমূল্য ধন ও অলঙ্কার চুরি করে নিয়ে যায়। ইসমাঈল (আ.)-এর আমলে নির্মিত এই ঘরের উচ্চতা ছিল মাত্র নয় হাত। বহু প্রাচীনতার কারণে দেয়ালগুলোতে ফাটল ধরে ছিল, যে কোনো মুহূর্তে তা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
এই নাজুক পরিস্থিতি দেখেও কুরাইশগণ সংকল্পবদ্ধ ছিলেন—ক্বাবা’হের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং তা পুনর্নির্মাণের জন্য। সকল গোত্র মিলিত হয়ে নির্মাণের নীতি নির্ধারণ করল: শুধু বৈধ অর্থ ব্যবহার করা হবে, কোনো ধরনের অবৈধ বা হক-নষ্ট অর্থ কাজে লাগানো যাবে না। এই নীতির প্রতি একযোগে সমর্থন জানিয়ে নির্মাণ শুরু হলো।
প্রথমে সমস্যা হলো পুরাতন ইমারত ভাঙা নিয়ে। কেউ সাহস করছিল না আঘাত করতে, শেষমেষ ওয়ালীদ ইবনে মুগীরাহ মাখযুমী ভাঙার কাজের প্রাথমিক উদ্যোগ নিলেন। যখন তিনি কোনো বিপদ ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করলেন, তখন বাকি সবাই ভীত-সম্ভ্রান্ত মনে অংশ নিতে লাগলেন। ইবরাহীম (আ.)-এর ভিত্তি পর্যন্ত ভাঙা হলে নির্মাণ শুরু হলো। প্রতিটি গোত্রের জন্য পূর্বনির্ধারিত অংশ অনুযায়ী কাজ ভাগ করা হয়েছিল। রোমীয় মিস্ত্রি বাকূমের তত্ত্বাবধানে কাজ এগিয়ে চলছিল।
কিন্তু ‘হাজারে আসওয়াদ’, স্থাপন করার বিষয়টি সকলের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করল। চার-পাঁচ দিন বিতর্ক চলল। প্রত্যেকেই দাবি করল, শুধুমাত্র তার গোত্রই এই মহাকাব্যিক কাজটি সম্পন্ন করবে। রেষারেষি তীব্র আকার নিল, যা সহজেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নিতে পারতো।
এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে বর্ষীয়ান নেতা আবু উমাইয়া মাখযুমী এক চমৎকার সমাধান বের করলেন—পরের দিন সকালে যে ব্যক্তি মসজিদুল হারামে প্রথম প্রবেশ করবে, তিনি বিবাদ মীমাংসার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। আর আল্লাহর অপার মহিমা! সকল আরবের প্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি, আল-আমিন উপাধী প্রাপ্ত মুহাম্মদ (সা.) প্রথম প্রবেশ করলেন। উপস্থিত সকলেই বলল:
هٰذَا الْأَمِيْنُ، رَضَيْنَاهُ، هٰذَا مُحَمَّدٌ
‘আমাদের বিশ্বাসী, আমরা সন্তুষ্ট, তিনিই মুহাম্মদ (সা.)।”
নবী (সা.) চাদর চেয়ে আনালেন, তা মেঝেতে বিছিয়ে নিজের হাতে তাতে হাজরে আসওয়াদ রাখলেন করলেন। এরপর উপস্থিত সকলকে আহবান জানিয়ে চাদরের চারপাশে ধরতে বললেন। অতপর সকলে মিলে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করলেন। এই সহজ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় সমাধানে সকলের খুশি হলেন।
নির্মাণ চলাকালীন কুরাইশগণের বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিল।
Reporter Name 

























