ঢাকা ০৬:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
সততা ও দক্ষতায় আপসহীন হতে হবে: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী মারা গেছেন আলোচিত সেই ‌‘সিরিয়াল কিলার’ সাইকো সম্রাট গুপ্ত এবং অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে ভোট করতে হয়েছে: পানিসম্পদ মন্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রে জুবাইদা রহমান ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের নতি স্বীকার: ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম থেকে পিছুটান ট্রাম্পের আলোচনার দাবিকে উড়িয়ে দিল ইরান, ‘কোনো আলোচনাই হয়নি’—আরাগচি ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচার, ডক্টরস কেয়ার হাসপাতাল সিলগালা গাবতলী থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত তোরণ-পোস্টার লাগানো নিষেধ শারীরিক অবস্থার উন্নতি কথা বলতে পারছেন মির্জা আব্বাস, দোয়া চেয়েছে পরিবার অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে তারেক রহমানকে ‌অভিনন্দন জানিয়ে প্রস্তাব উত্থাপন

মসজিদে নববীর জুমার খুৎবা পরনিন্দা ঐক্য ছিন্ন করে বিদ্বেষের জন্ম দেয়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৬:৪০:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
  • ৬৬ বার
আলহামদুলিল্লাহ সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য এমন প্রশংসা যা কখনো নিঃশেষ হয় না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি এক তার কোনো শরীক নেই। (আমার এ সাক্ষ্য) সেই ব্যক্তির সাক্ষের মতো যে একমাত্র তাঁরই আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তাঁরই এবাদত করে।

আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল; যিনি সবচেয়ে মর্যাদাবান নবী। আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওপর তাঁর পরিবার পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম এবং যারা এবাদত করে তাদের সবার ওপর সালাত সালাম নাযিল করুন। আম্মাবাদ।যে ব্যক্তি সফলতা ও কল্যাণ লাভ করতে চায় এবং সম্মান ও কামিয়াবী কামনা করে সে যেন তাকওয়া ও মহান মাওলা তায়ালার আনুগত্য অবলম্বন করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِيم‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’
(সুরা: আল-আহযাব, আয়াত : ৭১)

ইসলামের মহান মূলনীতিগুলোর মধ্যে একটি হলো মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সৃষ্টির কারণ হয় এমন সব বিষয় বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। আর মুমিনদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এমন সবকিছু হারাম। এ মূলনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতিকারক হিসেবে চিহ্নিত একটি অত্যন্ত নিন্দনীয় আচরণ ও ঘৃণিত স্বভাব হলো- লোকদের মধ্যে কথাবার্তা চালাচালি করা।

যাতে করে বিভেদ সৃষ্টি হয়, শত্রুতা ও বিদ্বেষের আগুন জ্বলে ওঠে, ফেতনা ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে। শরিয়তের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘নামিমাহ’ বা চোগলখুরি। এটি ভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট করে ঘৃণার সৃষ্টি করে ঐক্য ছিন্নভিন্ন করে এবং সমাজে বিভক্তি আনে। এ মন্দ স্বভাব অসংখ্য মান-সম্মানের পর্দা ছিন্ন করেছে এবং অসংখ্য বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। এজন্যই কোরআন ও সুন্নাহয় একে হারাম করা হয়েছে।
আর ইসলামী স্কলারগণ একে কবিরা গুনাহ এবং মহাপাপগুলোর অন্যতম হিসেবে গণ্য করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَا تُطِعۡ كُلَّ حَلَّافٖ مَّهِينٍ ۝ هَمَّازٖ مَّشَّآءِۭ بِنَمِيمٍ ۝ مَّنَّاعٖ لِّلۡخَيۡرِ مُعۡتَدٍ أَثِيمٍ

‘আর তুমি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির আনুগত্য করো না, যে অধিক শপথকারী, লাঞ্ছিত,
পেছনে নিন্দাকারী, একজনের কথা অপরজনের কাছে লাগায়, কল্যাণে বাধা দানকারী, সীমালঙ্ঘনকারী, পাপিষ্ঠ ‘

(সুরা: আল-কলম, আয়াত: ১০–১২)

এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ চোগলখুরির অধিকারীকে সতর্ক করে বলেছেন-

لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ

‘চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৫৬)

আর মুসলিম শরীফের আরেক বর্ণনা এসেছে-

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ

‘পরনিন্দাকারী কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৫)

নাম্মাম অর্থ পরনিন্দাকারী। আলেমগণ বলেছেন ‘নাম্মাম’ হচ্ছে সে; যে, সরাসরি কথোপকথন শুনে তা প্রচার করে থাকে। আর ‘কাত্তাত’ হচ্ছে সে; যে, অন্য লোকদের অজান্তে চুপি চুপি তাদের কথা শুনে এবং পরে তা বলে বেড়ায়। নামিমা বা পরনিন্দা বহু নিষিদ্ধ বিষয় এবং মহাপাপগুলোর অনেক বড় একটি অংশকে একত্রিত করেছে। এজন্য কোরআন ও হাদিসে খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে যে সব নিষেধাজ্ঞা এসেছে তাই নামিমা হারাম হওয়ার অকাট্য প্রমাণ। কারণ একজন নাম্মাম বা পরনিন্দাকারী যা বলছে তা যদি সত্য হয় তাহলে সে তার সম্পর্কে যা বলেছে আর যার সম্পর্কে বলেছে উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তা আরো নিকৃষ্ট। আর তখন এটি সেই জঘন্য মিথ্যাচার জনিত অপরাধের অন্তর্ভুক্ত যার হারাম হওয়া কোরআন সুন্নাহর প্রমাণ্য দলিল দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِشِرَارِكُمْ؟
قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ.
قَالَ: الَّذِينَ يُمْشُونَ بِالنَّمِيمَةِ، وَيُفَرِّقُونَ بَيْنَ الْأَحِبَّةِ، وَيَلْتَمِسُونَ لِلْبُرَآءِ الْعَيْبَ.

‘আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মধ্যকার নিকৃষ্ট লোকদের সম্পর্কে অবহিত করব না? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম হলো ওই সব লোক যারা বন্ধুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, চোগলখুরি করে এবং পুণ্যবান লোকদের দোষ ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়।

(মুসনাদ আহমাদ , হাদিস : ১৯৫৯৫)

এ হাদিসটি ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ এবং অন্যান্য বর্ণনাকারীগণ সংকলন করেছেন। কারণ এর পরিণতি হচ্ছে বড় ধরনের বিপর্যয়। এর পরিণাম হচ্ছে বহু অকল্যাণ এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ও ফলাফল হচ্ছে ব্যাপক ফাসাদ এবং সুদূর প্রসারী অমঙ্গল।

নামিমা বা পরনিন্দার আরো একটি জঘন্য দিক হলো- এটি আরেকটি মারাত্মক অপরাধকে যুক্ত করে। তা হলো গীবত; যা বড় গুনাহগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই ইসলামী স্কলারগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত নিয়ম স্থির করেছেন। তা হলো প্রতিটি নামিমাই গীবত। কিন্তু প্রতিটি গীবত নামিমা নয়। কেননা নামিমা হলো একজনের কথা অন্যজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যার কথা পৌঁছানো হচ্ছে সে গোপন বিষয়ে প্রকাশ হওয়া পছন্দ করে না। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনিন্দাকারীর শাস্তির একটি চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে-

مَرَّ النَّبِيُّ ﷺ بِقَبْرَيْنِ، فَقَالَ: إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ، وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ، أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ.
ثُمَّ أَخَذَ جَرِيدَةً رَطْبَةً، فَشَقَّهَا نِصْفَيْنِ، فَغَرَزَ فِي كُلِّ قَبْرٍ وَاحِدَةً، فَقِيلَ لَهُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، لِمَ فَعَلْتَ هَذَا؟
قَالَ: لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا.

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, এ দু’জন কবরের বাসিন্দাকে আজাব দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো কঠিন কাজের জন্য তাদেরকে আজাব দেওয়া হচ্ছে না। তাদের একজন চোগলখুরি করত। আর অপরজন তার প্রস্রাব থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতো না। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ডাল ভেঙে দুই ভাগ করলেন এবং প্রতিটি ভাগ একটি কবরের ওপর গেঁথে দিলেন। তারপর বললেন সম্ভবত এ ডাল শুকিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের শাস্তি কিছুটা হালকা করা হবে।’

(বুখারি, হাদিস: ২১৬; মুসলিম, হাদিস ২৯২)

মুসলিম ভাইগণ! ওলামায়ে কেরাম বলেন, যে ব্যক্তির কাছে নামিমাহ বা পরনিন্দার কথা পৌঁছানো হয় তার জন্য ছয়টি কর্তব্য রয়েছে।

(১) সে যেন নাম্মাম তথা পরনিন্দাকারীর কথাকে সত্য মনে না করে।

(২) সে যেন নামিমাকারীকে এ কাজ থেকে নিষেধ করে।

(৩) সে যেন যাচাই বাছাই ও ধৈর্যের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করে।

(৪) সে যেন অনুপস্থিত ভাই সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ না করে।

(৫) সে যেন এই নামিমার ভিত্তিতে গুপ্তচর ভিত্তিতে লিপ্ত না হয়।

(৬) সে যেন এই নামিমার কথা অন্য কারো কাছে বর্ণনা না করে।

বরং আল্লাহর সাহায্য ও তার সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় নিজেকে সংযত রাখে। এ কারণেই বিবেকবান ও দূরদর্শী ব্যক্তিরা এমন পথে চলেন যেটি সালাফদের থেকে প্রমাণিত। বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি খালেদ ইন ওয়ালিদ (রা.)-এর কাছে এসে বলল, অমুক ব্যক্তি আপনাকে গালি দিয়েছে। তিনি বললেন ওটা তো তার নিজের আমলনামা। সে যা ইচ্ছা তা দিয়েই তাকে পরিপূর্ণ করতে পারে।

আরেক ব্যক্তি ইমাম শাফী (রহ.) কাছে এসে বলল; অমুক আপনাকে খারাপ বলেছে। তিনি বললেন, তুমি যদি সত্য বল তবে তুমি নামিমাকারী। আর যদি মিথ্যা বলো তবে তুমি ফাসেক। আমাদের থেকে দূরে থাকো এবং চলে যাও।

এক ব্যক্তি ওহাব ইবনে মুনাব্বে (রহ.)-এর কাছে এসে বলল; অমুক আপনাকে গালি দিয়েছে। তিনি বললেন, শয়তান কি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বার্তা পৌঁছানোর জন্য পেল না?

অন্য একজন যার কাছে তার ব্যাপারে অন্যের করা বদনাম পৌঁছানো হয়েছিল তিনি তা শুনে বললেন: যে কথা বলেছে যে আমার সমালোচনা করেছে সে আমাকে তীর মেরেছে কিন্তু আঘাত করতে পারেনি। তুমি কেন সে তীর তুলে এনে আমার হৃদয় বৃদ্ধ করে দিলে?

অতএব হে আল্লাহর বান্দাগণ! 

আল্লাহকে ভয় করুন। গীবত নামিমা ও অন্যান্য ঘৃণিত চরিত্র থেকে বেঁচে থাকুন এবং উত্তম গুণাবলির সঙ্গে নিজেকে সুশোভিত করুন। যাতে আপনাদের দুনিয়া সুন্দর হয় ও আখিরাত শান্তিময় হয় এবং আপনারা সর্বদা সুখে শান্তিতে থাকতে পারেন। হে আল্লাহ তুমি তো তওবা কবুলকারী। আমাদের তওবা কবুল করে নাও। তুমি তো অতিব ক্ষমাশীল। আমাদের ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ আমরা যা শুনলাম তাতে আমাদেরকে বারাকা দান করুন এবং আমাদেরকে হেদায়েত ও সঠিক পথের দিশারী বানাও।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সততা ও দক্ষতায় আপসহীন হতে হবে: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী

মসজিদে নববীর জুমার খুৎবা পরনিন্দা ঐক্য ছিন্ন করে বিদ্বেষের জন্ম দেয়

আপডেট টাইম : ০৬:৪০:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
আলহামদুলিল্লাহ সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য এমন প্রশংসা যা কখনো নিঃশেষ হয় না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি এক তার কোনো শরীক নেই। (আমার এ সাক্ষ্য) সেই ব্যক্তির সাক্ষের মতো যে একমাত্র তাঁরই আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তাঁরই এবাদত করে।

আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল; যিনি সবচেয়ে মর্যাদাবান নবী। আল্লাহ তায়ালা তাঁর ওপর তাঁর পরিবার পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম এবং যারা এবাদত করে তাদের সবার ওপর সালাত সালাম নাযিল করুন। আম্মাবাদ।যে ব্যক্তি সফলতা ও কল্যাণ লাভ করতে চায় এবং সম্মান ও কামিয়াবী কামনা করে সে যেন তাকওয়া ও মহান মাওলা তায়ালার আনুগত্য অবলম্বন করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِيم‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’
(সুরা: আল-আহযাব, আয়াত : ৭১)

ইসলামের মহান মূলনীতিগুলোর মধ্যে একটি হলো মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সৃষ্টির কারণ হয় এমন সব বিষয় বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। আর মুমিনদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এমন সবকিছু হারাম। এ মূলনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতিকারক হিসেবে চিহ্নিত একটি অত্যন্ত নিন্দনীয় আচরণ ও ঘৃণিত স্বভাব হলো- লোকদের মধ্যে কথাবার্তা চালাচালি করা।

যাতে করে বিভেদ সৃষ্টি হয়, শত্রুতা ও বিদ্বেষের আগুন জ্বলে ওঠে, ফেতনা ও ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে। শরিয়তের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘নামিমাহ’ বা চোগলখুরি। এটি ভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট করে ঘৃণার সৃষ্টি করে ঐক্য ছিন্নভিন্ন করে এবং সমাজে বিভক্তি আনে। এ মন্দ স্বভাব অসংখ্য মান-সম্মানের পর্দা ছিন্ন করেছে এবং অসংখ্য বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। এজন্যই কোরআন ও সুন্নাহয় একে হারাম করা হয়েছে।
আর ইসলামী স্কলারগণ একে কবিরা গুনাহ এবং মহাপাপগুলোর অন্যতম হিসেবে গণ্য করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَا تُطِعۡ كُلَّ حَلَّافٖ مَّهِينٍ ۝ هَمَّازٖ مَّشَّآءِۭ بِنَمِيمٍ ۝ مَّنَّاعٖ لِّلۡخَيۡرِ مُعۡتَدٍ أَثِيمٍ

‘আর তুমি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির আনুগত্য করো না, যে অধিক শপথকারী, লাঞ্ছিত,
পেছনে নিন্দাকারী, একজনের কথা অপরজনের কাছে লাগায়, কল্যাণে বাধা দানকারী, সীমালঙ্ঘনকারী, পাপিষ্ঠ ‘

(সুরা: আল-কলম, আয়াত: ১০–১২)

এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ চোগলখুরির অধিকারীকে সতর্ক করে বলেছেন-

لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ

‘চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৫৬)

আর মুসলিম শরীফের আরেক বর্ণনা এসেছে-

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ

‘পরনিন্দাকারী কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৫)

নাম্মাম অর্থ পরনিন্দাকারী। আলেমগণ বলেছেন ‘নাম্মাম’ হচ্ছে সে; যে, সরাসরি কথোপকথন শুনে তা প্রচার করে থাকে। আর ‘কাত্তাত’ হচ্ছে সে; যে, অন্য লোকদের অজান্তে চুপি চুপি তাদের কথা শুনে এবং পরে তা বলে বেড়ায়। নামিমা বা পরনিন্দা বহু নিষিদ্ধ বিষয় এবং মহাপাপগুলোর অনেক বড় একটি অংশকে একত্রিত করেছে। এজন্য কোরআন ও হাদিসে খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে যে সব নিষেধাজ্ঞা এসেছে তাই নামিমা হারাম হওয়ার অকাট্য প্রমাণ। কারণ একজন নাম্মাম বা পরনিন্দাকারী যা বলছে তা যদি সত্য হয় তাহলে সে তার সম্পর্কে যা বলেছে আর যার সম্পর্কে বলেছে উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তা আরো নিকৃষ্ট। আর তখন এটি সেই জঘন্য মিথ্যাচার জনিত অপরাধের অন্তর্ভুক্ত যার হারাম হওয়া কোরআন সুন্নাহর প্রমাণ্য দলিল দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِشِرَارِكُمْ؟
قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ.
قَالَ: الَّذِينَ يُمْشُونَ بِالنَّمِيمَةِ، وَيُفَرِّقُونَ بَيْنَ الْأَحِبَّةِ، وَيَلْتَمِسُونَ لِلْبُرَآءِ الْعَيْبَ.

‘আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মধ্যকার নিকৃষ্ট লোকদের সম্পর্কে অবহিত করব না? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম হলো ওই সব লোক যারা বন্ধুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, চোগলখুরি করে এবং পুণ্যবান লোকদের দোষ ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়।

(মুসনাদ আহমাদ , হাদিস : ১৯৫৯৫)

এ হাদিসটি ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ এবং অন্যান্য বর্ণনাকারীগণ সংকলন করেছেন। কারণ এর পরিণতি হচ্ছে বড় ধরনের বিপর্যয়। এর পরিণাম হচ্ছে বহু অকল্যাণ এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ও ফলাফল হচ্ছে ব্যাপক ফাসাদ এবং সুদূর প্রসারী অমঙ্গল।

নামিমা বা পরনিন্দার আরো একটি জঘন্য দিক হলো- এটি আরেকটি মারাত্মক অপরাধকে যুক্ত করে। তা হলো গীবত; যা বড় গুনাহগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই ইসলামী স্কলারগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত নিয়ম স্থির করেছেন। তা হলো প্রতিটি নামিমাই গীবত। কিন্তু প্রতিটি গীবত নামিমা নয়। কেননা নামিমা হলো একজনের কথা অন্যজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যার কথা পৌঁছানো হচ্ছে সে গোপন বিষয়ে প্রকাশ হওয়া পছন্দ করে না। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনিন্দাকারীর শাস্তির একটি চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এসেছে-

مَرَّ النَّبِيُّ ﷺ بِقَبْرَيْنِ، فَقَالَ: إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ، وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ، أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ.
ثُمَّ أَخَذَ جَرِيدَةً رَطْبَةً، فَشَقَّهَا نِصْفَيْنِ، فَغَرَزَ فِي كُلِّ قَبْرٍ وَاحِدَةً، فَقِيلَ لَهُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، لِمَ فَعَلْتَ هَذَا؟
قَالَ: لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا.

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, এ দু’জন কবরের বাসিন্দাকে আজাব দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো কঠিন কাজের জন্য তাদেরকে আজাব দেওয়া হচ্ছে না। তাদের একজন চোগলখুরি করত। আর অপরজন তার প্রস্রাব থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতো না। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ডাল ভেঙে দুই ভাগ করলেন এবং প্রতিটি ভাগ একটি কবরের ওপর গেঁথে দিলেন। তারপর বললেন সম্ভবত এ ডাল শুকিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের শাস্তি কিছুটা হালকা করা হবে।’

(বুখারি, হাদিস: ২১৬; মুসলিম, হাদিস ২৯২)

মুসলিম ভাইগণ! ওলামায়ে কেরাম বলেন, যে ব্যক্তির কাছে নামিমাহ বা পরনিন্দার কথা পৌঁছানো হয় তার জন্য ছয়টি কর্তব্য রয়েছে।

(১) সে যেন নাম্মাম তথা পরনিন্দাকারীর কথাকে সত্য মনে না করে।

(২) সে যেন নামিমাকারীকে এ কাজ থেকে নিষেধ করে।

(৩) সে যেন যাচাই বাছাই ও ধৈর্যের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করে।

(৪) সে যেন অনুপস্থিত ভাই সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ না করে।

(৫) সে যেন এই নামিমার ভিত্তিতে গুপ্তচর ভিত্তিতে লিপ্ত না হয়।

(৬) সে যেন এই নামিমার কথা অন্য কারো কাছে বর্ণনা না করে।

বরং আল্লাহর সাহায্য ও তার সন্তুষ্টি লাভের প্রত্যাশায় নিজেকে সংযত রাখে। এ কারণেই বিবেকবান ও দূরদর্শী ব্যক্তিরা এমন পথে চলেন যেটি সালাফদের থেকে প্রমাণিত। বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি খালেদ ইন ওয়ালিদ (রা.)-এর কাছে এসে বলল, অমুক ব্যক্তি আপনাকে গালি দিয়েছে। তিনি বললেন ওটা তো তার নিজের আমলনামা। সে যা ইচ্ছা তা দিয়েই তাকে পরিপূর্ণ করতে পারে।

আরেক ব্যক্তি ইমাম শাফী (রহ.) কাছে এসে বলল; অমুক আপনাকে খারাপ বলেছে। তিনি বললেন, তুমি যদি সত্য বল তবে তুমি নামিমাকারী। আর যদি মিথ্যা বলো তবে তুমি ফাসেক। আমাদের থেকে দূরে থাকো এবং চলে যাও।

এক ব্যক্তি ওহাব ইবনে মুনাব্বে (রহ.)-এর কাছে এসে বলল; অমুক আপনাকে গালি দিয়েছে। তিনি বললেন, শয়তান কি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বার্তা পৌঁছানোর জন্য পেল না?

অন্য একজন যার কাছে তার ব্যাপারে অন্যের করা বদনাম পৌঁছানো হয়েছিল তিনি তা শুনে বললেন: যে কথা বলেছে যে আমার সমালোচনা করেছে সে আমাকে তীর মেরেছে কিন্তু আঘাত করতে পারেনি। তুমি কেন সে তীর তুলে এনে আমার হৃদয় বৃদ্ধ করে দিলে?

অতএব হে আল্লাহর বান্দাগণ! 

আল্লাহকে ভয় করুন। গীবত নামিমা ও অন্যান্য ঘৃণিত চরিত্র থেকে বেঁচে থাকুন এবং উত্তম গুণাবলির সঙ্গে নিজেকে সুশোভিত করুন। যাতে আপনাদের দুনিয়া সুন্দর হয় ও আখিরাত শান্তিময় হয় এবং আপনারা সর্বদা সুখে শান্তিতে থাকতে পারেন। হে আল্লাহ তুমি তো তওবা কবুলকারী। আমাদের তওবা কবুল করে নাও। তুমি তো অতিব ক্ষমাশীল। আমাদের ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ আমরা যা শুনলাম তাতে আমাদেরকে বারাকা দান করুন এবং আমাদেরকে হেদায়েত ও সঠিক পথের দিশারী বানাও।