ঢাকা ০৬:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ইটনায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্র্যাক সদস্যদের মাঝে হাঁসের বাচ্চা ও সবজি বীজ বিতরণ তালবাহানায় আটকে গভর্নিং বডি নির্বাচন, প্রশ্নের মুখে আইডিয়াল কর্তৃপক্ষ অবহেলায় অনেক স্কুলের অবকাঠামোর বেহাল দশা: জুবাইদা রহমান গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬ দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করা হবে পুরস্কারের গাড়ি মাকে উপহার দেবেন তাওহীদ হৃদয় ইসলামী ব্যাংকে নতুন প্রশাসক নিয়োগ জিয়াউর রহমানের জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষণার আহ্বান ফখরুলের পাখির চোখে সীমান্ত পাহারার ছক, কঠোর নজরদারি বাড়াচ্ছে সরকার বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরে আনন্দিত পরীমণি

উন্নয়নের মাঝে বেঁচে আছেন এম. সাইফুর রহমান

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:২৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬
  • ৫০৭ বার

ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক:

মৃত্যুর একদিন আগেও তিনি বলেছিলেন “আমি সিলেটের মটি দেখে মরতে চাই”। শীর্ষক সংবাদটি দেখে মনে হয়েছিল এম. সাইফুর রহমান যে কতটা সিলেট প্রেমীক ছিলেন। জীবনের শেষ জুম্মার নামাজ বন্দর বাজার মসজিদে আদায় করে সাইফুর রহমান বলেছিলেন, “সিলেট আসলে আমি লাঠি ছাড়া হাটতে পারি আর মৌলভী বাজার গেলে আমাকে লাঠি নিয়ে হাঠতে হয়”। তিনি বলেছিলেন, “যত দিন বেচে থাকব সিলেটকে নিয়েই বাঁচতে চাই-সিলেটই আমার শেষ ঠিকানা”।

আজ ৫ সেপ্টেম্বর সিলেট তথা বাংলাদেশের জন্য একটি দূঃখ গাাঁথা দিন। ২০০৯ সালের এ দিনেই মায়াময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যান শতাব্দির শ্রেষ্ট সিলেট প্রেমিক, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, উন্নয়নের বরপুত্র সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ”সিলেট বন্ধু” এম. সাইফুর রহমান। যাকে আজও খোঁজে বেড়ান বৃহত্তর সিলেটের মানুষ। সুনামগঞ্জের ভাটির জনপদ সেই তাহিরপুর ধর্মপাশা থেকে হবিগঞ্জের আজমীরিগঞ্জ পর্যন্ত বৃহত্তর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ খোঁজে বেড়ান তাদের প্রিয় নেতাকে।

এম. সাইফুর রহমানের জীবদ্দশায় দেখিয়ে গেছেন বড় মনের অনুপম দৃষ্টান্ত । যিনি নিজ হাতে মরহুম স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর নামে ”হুমায়ুন রশীদ চত্বর” নাম করন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন । সিলেটের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আপ্ষেহীন সাইফুর রহমান ছিলেন প্রচলিত রাজনীতিবিদদের চেয়ে ব্যাতিক্রম চরিত্রের। সরকারী দলে থাকেন আর বিরোধী দলে থাকেন সব সময়ই তিনি ছিলেন হরতাল বিরোধী। সিলেট সিটি মেয়র (সাময়িক বরখাস্তকৃত) আরিফুল হক চৌধুরীর কাছ থেকে শুনা সাইফুর রহমান সম্পর্কে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। অর্থমন্ত্রী থাকাবস্থায় তিনি একদিন সিলেট সার্কিট হাউজে অবস্থান করছেন।

খাবার মেন্যুতে ছিল ছোট মাছ আর সাতকরা। দুপুরে সুস্বাদু খাবার খেয়ে অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের বলেছিলেন উদৃত তরকারী রেখে দিতে যেন রাতেও খেতে পারেন। পরে রাতে খাবার টেবিলে বসে সাতকরার তরকারী না পেয়ে তিনি জিজ্ঞেস করণে সাতকরার তরকারী কোথায়? একজন বললেন, স্যার সাতকরা শেষ হয়ে গেছে। সেসময় অর্থমন্ত্রী অনেকটা রাগত সুরে বললেন, ”সবতা খাইতে খাইতে আমার হাতখরাও খাইলিছ নি”? চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে সিলেটে বিএনপির বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন ”তোমাদের হলো শুরু-আমাদের হলো সারা”।

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের সফল অর্থ মন্ত্রী, সিলেট বিভাগের উন্নয়নের রূপকার, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করার গৌরব অর্জন করেন এম. সাই্ফুর রহমান। তিনি অর্থনৈতীক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনিতীকে তলা বিহীন ঝুড়ি থেকে অর্থনিতীর চাকাকে করেছিলেন সচল। এম. সাইফুর রহমানের পেশ করা সর্বশেষ বাজেটে বৈদেশীক নির্ভরতা কমিয়ে আনার যথা সাধ্য চেষ্ঠা চালান। তাই তো ঐ বাজেটে মাত্র ১২% বৈদেশীক সাহায্য আর ৮৮% দেশীয় বা আভ্যন্তরীন সম্পদ ব্যাবহারের গুরোত্বারোপ করেন। আর এরই লক্ষ্যে বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে তার খোলামেলা কথা হত। তিনি স্বপ্ন দেখতেন- গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, বেকার সমস্যা দূর করন, দেশের আভ্যন্তরীন সম্পদের সুষ্ঠো ব্যাবহার, মানব সম্পদকে দক্ষ করে গড়ে তোলা। তার প্রবর্তিত অর্থনৈতীক সংস্কারের বিভিন্ন নিতীমালার কারনেই আজ পোল্ট্রি, হ্যাচারী, দূগ্ধ খামার, গরু মোটা তাজা করন, যুব প্রশিক্ষন সহ অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ দেশের অর্থনিতীর বেহাল দশা, সোনালী ব্যাংক কেলেংকারী, শেয়ার বাজার কেলেংকারী, পদ্মা সেতু, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে যখন বিতর্ক হচ্ছে তখন অনেকেই একজন সাইফুর রহমানের জন্য আফসোস করেন।

সিলেটের উন্নয়নে সাইফুর রহমান ছিলেন এক আপোষহীন পুরুষ। একনেক থেকে শুরু করে কেবিনেটেও ছিলেন স্টেইট কাট। “এই কাজ এ ভাবে হবে, হওয়া উচিৎ-অনুমোদন সমর্থন দিলে দেও না দিলে নাই , ”সব ছেড়ে ছুড়ে মৌলভী বাজার গিয়া বরী বাইমু”। প্রায় প্রোগ্রামেই তিনি সিলেটবাসীর উদ্দেশ্যে বলতেন, ”যা চাইবার চাইলাও,আর আমিও যা দিবার দিলাইয়ার” । একনেক থকে কেবিনেট আর সংসদ যেখানেই যে প্রকল্প পাশ হোক ঐ সংশ্লিষ্ট সিলেটের একটি প্রজক্টে থাকতেই হবে । এটিই ছিল তাঁর সংগ্রাম । সিলেট শহর তথা সিলেট বিভাগের যে দিকে তাকাই সে দিকেই দেখি সাইফুর রহমানের স্মৃতি বিজড়ীত ঐতিহাসিক উন্নয়নের বাস্তব নমুনা।

যে সিলেট নগরীর প্রবেশ পথে সুরমা পারে ছিলো ঝুপড়ি ঘর আর পুরনো সার্কিট হাউস। সেগুলো সাইফুর রহমানের বদৌলতে পাল্টে গেছে সেখানকার পুরো দৃশ্য। ‘পুলের তল’ বলে যে স্থান সিলেটের মানুষের কাছে সবচেয়ে নিন্দিত ছিলো সেই পুলের তলে এখন থাকে ভ্রমন পিয়াসী মানুষের ভীড়। তার ইচ্ছায় সুরমা নদীর উভয় তীরে টেমস নদীর তীরের প্রকল্পে ক্বীনব্রীজের নিচে দু’ধারে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দৃষ্টিনন্দন স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। ভিভিআইপি সার্কিট হাউস নির্মাণ, সংস্কারকৃত শারদা হল, ক্বীনব্রীজ ও আলী আমজাদের ঘড়ি, পাঠাগারের পাশে সুরমা নদীর তীর এখন সিলেটবাসীর জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান।

শুধু এখানেই নয়; সিলেট নগরীর হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার সংস্কার, মানিক পীর (রহ.) মাজার সংস্কার, ভিভিআইপি সার্কিট হাউস থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি, সোডিয়াম বাতি, সিলেট-তামাবিল সড়ক নির্মাণ, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এর উন্নয়ন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা, সিলেট ওসমানী বিমান বন্দর এর উন্নয়ন, এসএমপি প্রতিষ্ঠা, নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপন, টিএন্ডটির নতুন এক্সচেঞ্জ স্থাপন, ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমী,শিল্পকলা একাডেমী, মডেল স্কুল,বিভাগীয় সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা উলে­খযোগ্য। শিক্ষার প্রসারে তার আন্তরিকতার কারণে সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ ছাত্রী নিবাস ও নতুন ভবন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হোস্টেল নির্মাণ, বিকেএসপির আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠা, শাহপরান ব্রীজ, তৃতীয় শাহজালাল সেতু, কাজিরবাজারে সুরমা সেতুর ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন, দক্ষিণ সুরমা টার্মিনালের পরিকল্পনা গ্রহণ ছিলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এছাড়া শত বছরের ঐতিহ্যের স্মারক প্রতিষ্ঠান সিলেট প্রেসক্লাব ভবন নির্মান সহ সিলেটের অধিকাংশ উন্নয়ন এর মাঝে অম্লান হয়ে আছেন এম. সাইফুর রহমান ।

মৌলভী বাজারের একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে রাজনিতীতে অভিষেক হওয়ার পর শুধু বাংলা দেশের সফল অর্থ মন্ত্রীই নন এমনকি আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এম. সাইফুর রহমান। সিলেট বাসীর প্রিয় নেতা এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু সংবাদটি সেদিন যেন কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়েছে মাথায়। কারণ তিনি ছিলেন সিলেটবাসীর আত্বার আত্বীয়। সিলেটের মানুষ সাইফুর রহমানকে কতটা আপন করে নিয়েছিলেন তার প্রমান তাঁর নামাজে জানাজা। লক্ষাধিক মানুষ, শিশু কিশোর ,আবাল বৃদ্ধ বনিতার চেখের পানি আর কান্নার আওয়াজে সিলেটের আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে উঠেছিল সেদিন। গোটা সিলেট শহর যেন যাদুর ছোয়ায় ছবির মত নিশ্চল থেমে গেল। জানাজার নামাজের পর সাইফুর রহমানকে চির বিদায় জানিয়ে হাজারো প্রশ্ন আর হিমালয় সমান বেদনা নিয়ে ধিরে ধিরে ঘরে ফিরে যান সিলেটের সর্ব স্তরের মানুষ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ¯¦র্ণাক্ষরে লিখা থাকবে, যাকে হারিয়ে হৃদয়ের মাঝে এক শূন্যতা আজও অনুভব করছে, তিনি সিলেটবাসীর আপনজন মরহুম এম. সাইফুর রহমান। আর কোন দিন ফিরে আসবেন না। কোর্ট পয়েন্ট কিংবা আলীয়া মাদ্রাসা মাঠ আর সংসদে দাড়িয়ে খাটি সিলেটি, শুদ্ধ বাংলা আর ইংরেজী ভাষা একত্রিত করে বক্তব্য দিবেন না। আমরা তাঁর আত্বার মাগফিরাত কামনা করি। এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু জাতীর অপুরণীয় ক্ষতি।

মরহুম এম. সাইফুর রহমানের উন্নয়নের যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় সিলেটকে এগিয়ে নিতে প্রানপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী সিলেটের আরেক কৃতি সন্তান এ.এম.এ মুহিত। এম. সাইফুর রহমানের শুরু করা কাজির বাজার ব্রীজ, সুনামগঞ্জ সুরমা নদীর উপর ব্রীজের কাজ সহ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী । অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মান করেছেন রিকাবী বাজার-মিরের ময়দান সড়ক সহ অসংখ্য উন্নয়নের মহাযজ্ঞ।

যানজট নিরসনের জন্য জিন্দাবাজার-চৌহাট্ট-আম্বরখানা সড়ক প্রশস্ত করা হোক । কোন ছুঁতোয় বন্ধ নয়, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রমাণ হোক উন্নয়নই সিলেটের রাজনৈতিক দর্শন। উন্নয়নই হোক সিলেটের রাজনীতির মূল শক্তি। এগিয়ে নেয়া হোক মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ও এম. সাইফুর রহমান এর অসমাপ্ত কাজ। তবেই তাঁদের প্রতি জানানো হবে সঠিক সম্মান। আজকের এই দিনে মরহুম এম সাইফুর রহমানের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। সকলের প্রিয় এই মানুষটি যেন পরপারে সুখে থাকেন।

মরহুম স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, মরহুম অর্থ মন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরীয়া. মরহুম পররাষ্ঠ্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু সিলেটবাসীকে অভিভাবক শূন্য করে দিয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের মাঝে স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবেন এম. সাইফুর রহমান। তাই তো বলতে হয় “যত দিন রবে সুরমা,মনু,খোয়াই নদী বহমান- তত দিন তুমি বেঁচে থাকবে এম. সাইফুর রহমান”।

লেখক: সাংবাদিক/ কলামিস্ট

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ইটনায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্র্যাক সদস্যদের মাঝে হাঁসের বাচ্চা ও সবজি বীজ বিতরণ

উন্নয়নের মাঝে বেঁচে আছেন এম. সাইফুর রহমান

আপডেট টাইম : ১২:২৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক:

মৃত্যুর একদিন আগেও তিনি বলেছিলেন “আমি সিলেটের মটি দেখে মরতে চাই”। শীর্ষক সংবাদটি দেখে মনে হয়েছিল এম. সাইফুর রহমান যে কতটা সিলেট প্রেমীক ছিলেন। জীবনের শেষ জুম্মার নামাজ বন্দর বাজার মসজিদে আদায় করে সাইফুর রহমান বলেছিলেন, “সিলেট আসলে আমি লাঠি ছাড়া হাটতে পারি আর মৌলভী বাজার গেলে আমাকে লাঠি নিয়ে হাঠতে হয়”। তিনি বলেছিলেন, “যত দিন বেচে থাকব সিলেটকে নিয়েই বাঁচতে চাই-সিলেটই আমার শেষ ঠিকানা”।

আজ ৫ সেপ্টেম্বর সিলেট তথা বাংলাদেশের জন্য একটি দূঃখ গাাঁথা দিন। ২০০৯ সালের এ দিনেই মায়াময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যান শতাব্দির শ্রেষ্ট সিলেট প্রেমিক, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, উন্নয়নের বরপুত্র সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ”সিলেট বন্ধু” এম. সাইফুর রহমান। যাকে আজও খোঁজে বেড়ান বৃহত্তর সিলেটের মানুষ। সুনামগঞ্জের ভাটির জনপদ সেই তাহিরপুর ধর্মপাশা থেকে হবিগঞ্জের আজমীরিগঞ্জ পর্যন্ত বৃহত্তর সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ খোঁজে বেড়ান তাদের প্রিয় নেতাকে।

এম. সাইফুর রহমানের জীবদ্দশায় দেখিয়ে গেছেন বড় মনের অনুপম দৃষ্টান্ত । যিনি নিজ হাতে মরহুম স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর নামে ”হুমায়ুন রশীদ চত্বর” নাম করন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন । সিলেটের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আপ্ষেহীন সাইফুর রহমান ছিলেন প্রচলিত রাজনীতিবিদদের চেয়ে ব্যাতিক্রম চরিত্রের। সরকারী দলে থাকেন আর বিরোধী দলে থাকেন সব সময়ই তিনি ছিলেন হরতাল বিরোধী। সিলেট সিটি মেয়র (সাময়িক বরখাস্তকৃত) আরিফুল হক চৌধুরীর কাছ থেকে শুনা সাইফুর রহমান সম্পর্কে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। অর্থমন্ত্রী থাকাবস্থায় তিনি একদিন সিলেট সার্কিট হাউজে অবস্থান করছেন।

খাবার মেন্যুতে ছিল ছোট মাছ আর সাতকরা। দুপুরে সুস্বাদু খাবার খেয়ে অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের বলেছিলেন উদৃত তরকারী রেখে দিতে যেন রাতেও খেতে পারেন। পরে রাতে খাবার টেবিলে বসে সাতকরার তরকারী না পেয়ে তিনি জিজ্ঞেস করণে সাতকরার তরকারী কোথায়? একজন বললেন, স্যার সাতকরা শেষ হয়ে গেছে। সেসময় অর্থমন্ত্রী অনেকটা রাগত সুরে বললেন, ”সবতা খাইতে খাইতে আমার হাতখরাও খাইলিছ নি”? চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে সিলেটে বিএনপির বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন ”তোমাদের হলো শুরু-আমাদের হলো সারা”।

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের সফল অর্থ মন্ত্রী, সিলেট বিভাগের উন্নয়নের রূপকার, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করার গৌরব অর্জন করেন এম. সাই্ফুর রহমান। তিনি অর্থনৈতীক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনিতীকে তলা বিহীন ঝুড়ি থেকে অর্থনিতীর চাকাকে করেছিলেন সচল। এম. সাইফুর রহমানের পেশ করা সর্বশেষ বাজেটে বৈদেশীক নির্ভরতা কমিয়ে আনার যথা সাধ্য চেষ্ঠা চালান। তাই তো ঐ বাজেটে মাত্র ১২% বৈদেশীক সাহায্য আর ৮৮% দেশীয় বা আভ্যন্তরীন সম্পদ ব্যাবহারের গুরোত্বারোপ করেন। আর এরই লক্ষ্যে বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে তার খোলামেলা কথা হত। তিনি স্বপ্ন দেখতেন- গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, বেকার সমস্যা দূর করন, দেশের আভ্যন্তরীন সম্পদের সুষ্ঠো ব্যাবহার, মানব সম্পদকে দক্ষ করে গড়ে তোলা। তার প্রবর্তিত অর্থনৈতীক সংস্কারের বিভিন্ন নিতীমালার কারনেই আজ পোল্ট্রি, হ্যাচারী, দূগ্ধ খামার, গরু মোটা তাজা করন, যুব প্রশিক্ষন সহ অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ দেশের অর্থনিতীর বেহাল দশা, সোনালী ব্যাংক কেলেংকারী, শেয়ার বাজার কেলেংকারী, পদ্মা সেতু, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে যখন বিতর্ক হচ্ছে তখন অনেকেই একজন সাইফুর রহমানের জন্য আফসোস করেন।

সিলেটের উন্নয়নে সাইফুর রহমান ছিলেন এক আপোষহীন পুরুষ। একনেক থেকে শুরু করে কেবিনেটেও ছিলেন স্টেইট কাট। “এই কাজ এ ভাবে হবে, হওয়া উচিৎ-অনুমোদন সমর্থন দিলে দেও না দিলে নাই , ”সব ছেড়ে ছুড়ে মৌলভী বাজার গিয়া বরী বাইমু”। প্রায় প্রোগ্রামেই তিনি সিলেটবাসীর উদ্দেশ্যে বলতেন, ”যা চাইবার চাইলাও,আর আমিও যা দিবার দিলাইয়ার” । একনেক থকে কেবিনেট আর সংসদ যেখানেই যে প্রকল্প পাশ হোক ঐ সংশ্লিষ্ট সিলেটের একটি প্রজক্টে থাকতেই হবে । এটিই ছিল তাঁর সংগ্রাম । সিলেট শহর তথা সিলেট বিভাগের যে দিকে তাকাই সে দিকেই দেখি সাইফুর রহমানের স্মৃতি বিজড়ীত ঐতিহাসিক উন্নয়নের বাস্তব নমুনা।

যে সিলেট নগরীর প্রবেশ পথে সুরমা পারে ছিলো ঝুপড়ি ঘর আর পুরনো সার্কিট হাউস। সেগুলো সাইফুর রহমানের বদৌলতে পাল্টে গেছে সেখানকার পুরো দৃশ্য। ‘পুলের তল’ বলে যে স্থান সিলেটের মানুষের কাছে সবচেয়ে নিন্দিত ছিলো সেই পুলের তলে এখন থাকে ভ্রমন পিয়াসী মানুষের ভীড়। তার ইচ্ছায় সুরমা নদীর উভয় তীরে টেমস নদীর তীরের প্রকল্পে ক্বীনব্রীজের নিচে দু’ধারে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দৃষ্টিনন্দন স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। ভিভিআইপি সার্কিট হাউস নির্মাণ, সংস্কারকৃত শারদা হল, ক্বীনব্রীজ ও আলী আমজাদের ঘড়ি, পাঠাগারের পাশে সুরমা নদীর তীর এখন সিলেটবাসীর জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান।

শুধু এখানেই নয়; সিলেট নগরীর হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার সংস্কার, মানিক পীর (রহ.) মাজার সংস্কার, ভিভিআইপি সার্কিট হাউস থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি, সোডিয়াম বাতি, সিলেট-তামাবিল সড়ক নির্মাণ, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এর উন্নয়ন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা, সিলেট ওসমানী বিমান বন্দর এর উন্নয়ন, এসএমপি প্রতিষ্ঠা, নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপন, টিএন্ডটির নতুন এক্সচেঞ্জ স্থাপন, ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমী,শিল্পকলা একাডেমী, মডেল স্কুল,বিভাগীয় সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা উলে­খযোগ্য। শিক্ষার প্রসারে তার আন্তরিকতার কারণে সিলেট সরকারী মহিলা কলেজ ছাত্রী নিবাস ও নতুন ভবন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হোস্টেল নির্মাণ, বিকেএসপির আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠা, শাহপরান ব্রীজ, তৃতীয় শাহজালাল সেতু, কাজিরবাজারে সুরমা সেতুর ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন, দক্ষিণ সুরমা টার্মিনালের পরিকল্পনা গ্রহণ ছিলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এছাড়া শত বছরের ঐতিহ্যের স্মারক প্রতিষ্ঠান সিলেট প্রেসক্লাব ভবন নির্মান সহ সিলেটের অধিকাংশ উন্নয়ন এর মাঝে অম্লান হয়ে আছেন এম. সাইফুর রহমান ।

মৌলভী বাজারের একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে রাজনিতীতে অভিষেক হওয়ার পর শুধু বাংলা দেশের সফল অর্থ মন্ত্রীই নন এমনকি আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এম. সাইফুর রহমান। সিলেট বাসীর প্রিয় নেতা এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু সংবাদটি সেদিন যেন কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়েছে মাথায়। কারণ তিনি ছিলেন সিলেটবাসীর আত্বার আত্বীয়। সিলেটের মানুষ সাইফুর রহমানকে কতটা আপন করে নিয়েছিলেন তার প্রমান তাঁর নামাজে জানাজা। লক্ষাধিক মানুষ, শিশু কিশোর ,আবাল বৃদ্ধ বনিতার চেখের পানি আর কান্নার আওয়াজে সিলেটের আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে উঠেছিল সেদিন। গোটা সিলেট শহর যেন যাদুর ছোয়ায় ছবির মত নিশ্চল থেমে গেল। জানাজার নামাজের পর সাইফুর রহমানকে চির বিদায় জানিয়ে হাজারো প্রশ্ন আর হিমালয় সমান বেদনা নিয়ে ধিরে ধিরে ঘরে ফিরে যান সিলেটের সর্ব স্তরের মানুষ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ¯¦র্ণাক্ষরে লিখা থাকবে, যাকে হারিয়ে হৃদয়ের মাঝে এক শূন্যতা আজও অনুভব করছে, তিনি সিলেটবাসীর আপনজন মরহুম এম. সাইফুর রহমান। আর কোন দিন ফিরে আসবেন না। কোর্ট পয়েন্ট কিংবা আলীয়া মাদ্রাসা মাঠ আর সংসদে দাড়িয়ে খাটি সিলেটি, শুদ্ধ বাংলা আর ইংরেজী ভাষা একত্রিত করে বক্তব্য দিবেন না। আমরা তাঁর আত্বার মাগফিরাত কামনা করি। এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু জাতীর অপুরণীয় ক্ষতি।

মরহুম এম. সাইফুর রহমানের উন্নয়নের যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় সিলেটকে এগিয়ে নিতে প্রানপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী সিলেটের আরেক কৃতি সন্তান এ.এম.এ মুহিত। এম. সাইফুর রহমানের শুরু করা কাজির বাজার ব্রীজ, সুনামগঞ্জ সুরমা নদীর উপর ব্রীজের কাজ সহ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী । অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মান করেছেন রিকাবী বাজার-মিরের ময়দান সড়ক সহ অসংখ্য উন্নয়নের মহাযজ্ঞ।

যানজট নিরসনের জন্য জিন্দাবাজার-চৌহাট্ট-আম্বরখানা সড়ক প্রশস্ত করা হোক । কোন ছুঁতোয় বন্ধ নয়, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রমাণ হোক উন্নয়নই সিলেটের রাজনৈতিক দর্শন। উন্নয়নই হোক সিলেটের রাজনীতির মূল শক্তি। এগিয়ে নেয়া হোক মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ও এম. সাইফুর রহমান এর অসমাপ্ত কাজ। তবেই তাঁদের প্রতি জানানো হবে সঠিক সম্মান। আজকের এই দিনে মরহুম এম সাইফুর রহমানের রুহের মাগফেরাত কামনা করি। সকলের প্রিয় এই মানুষটি যেন পরপারে সুখে থাকেন।

মরহুম স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, মরহুম অর্থ মন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরীয়া. মরহুম পররাষ্ঠ্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু সিলেটবাসীকে অভিভাবক শূন্য করে দিয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের মাঝে স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবেন এম. সাইফুর রহমান। তাই তো বলতে হয় “যত দিন রবে সুরমা,মনু,খোয়াই নদী বহমান- তত দিন তুমি বেঁচে থাকবে এম. সাইফুর রহমান”।

লেখক: সাংবাদিক/ কলামিস্ট