,

রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি ও সম্পাদকের অপকর্মে তোলপাড়

হাওর বার্তা ডেস্কঃ এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটি গঠনের সাত মাস না পেরোতেই বেপরোয়া হয়ে উঠেন রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এ দুই শীর্ষ নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দেশব্যাপী চলছে সমালোচনার ঝড়। তাদের অপকর্ম নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে তোলপাড়।

নারী নেত্রীর সঙ্গে সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানার আপত্তিকর অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়েছে। তার বিরুদ্ধে হয়েছে প্রতারণার মামলা। তিনি ছিলেন একসময় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন অমির ফেনসিডিল সেবনের ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

এ দুই নেতার সাম্প্রতিক সময়ের অপকর্মে বিব্রত নেতাকর্মীরা। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজি এবং নিজ দলের নেতাকর্মীদের মারধরেরও অভিযোগ। এ দুই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, চাকরি ও কমিটি দেওয়ার নামে তারা মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এসব অপকর্মে লিপ্ত থাকায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এছাড়া কমিটির অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে মাদকসেবন, নিষ্ক্রিয়তা এবং জামায়াত-বিএনপি কানেকশনের অভিযোগ রয়েছে।

সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানা একসময় রাজশাহী কলেজের ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০১৬ সালে কলেজ ছাত্রদলের মুসলিম ছাত্রাবাস কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন এখনকার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রানা। রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি মুর্ত্তজা ফামিন বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, রানা রাজশাহী কলেজে আমাদের সঙ্গে ছাত্রদলের মিটিং-মিছিল করতেন। এখন দেখছি তিনি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি।

গত ফেব্রুয়ারিতে রানা ছাত্রলীগ সভাপতি হওয়ার পরেই এক নারীর সঙ্গে তার আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া এক সপ্তাহ আগে রানার সঙ্গে এক ছাত্রীর ফোনালাপের অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়েছে। ইতোমধ্যে সেটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। সেই চার মিনিট ১০ সেকেন্ডের অডিও ক্লিপে নানান আপত্তিকর কথাবার্তার পাশাপাশি ওই নারীকে অনৈতিক প্রস্তাব এবং ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। ওই অডিও ক্লিপে রানা বলেছেন, ‘বহুত চিটার-বাটপাড়ি করে আমি প্রেসিডেন্ট হইছি। সব চিটারের দলের সর্দার আমি।’ রানার ভিডিও ক্লিপের এ বক্তব্যে চলছে তোলপাড়।

এদিকে সভাপতি রানার বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেলার উপজেলা কমিটিগুলো ভেঙে দেওয়ার নাম করে বর্তমান নেতাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সভাপতি। আবার টাকার বিনিময়ে নতুন কমিটি দিচ্ছেন। জেলার দুর্গাপুর উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি সম্প্রতি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অথচ কমিটি ভাঙা হবে না-এই প্রলোভন দেখিয়ে কয়েকজন নেতার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন জেলার সভাপতি রানা।

এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নেওয়ার অভিযোগে সভাপতি রানার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। জেলার দুর্গাপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর দুর্গাপুর থানা আমলি আদালতে রানার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আদালত সভাপতি রানার বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন। তাকে ১২ ডিসেম্বর সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, সভাপতি রানা মাদকসেবন করেন। মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি করেন রাস্তায়। সম্প্রতি গভীর রাতে রাজশাহী মহানগরীর ঘোষপাড়া মোড়ে মাতলামি করার সময় স্থানীয়রা রানাকে ধাওয়া দেন। সেসময় তিনি এবং তার সহযোগীরা দুটি মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মোটরসাইকেল দুটি বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ উদ্ধার করে। থানা থেকে মোটরসাইকেল দুটি ছাড়িয়ে আনেন রানা এবং তার সহযোগীরা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাকিবুল ইসলাম রানা বলেন, সবই ষড়যন্ত্র। চাকরি দেওয়ার নাম করে আমি কারও কাছে টাকা নিইনি। এছাড়া ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। এগুলো ভিত্তিহীন। আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। সাংগঠনিকভাবেই এগুলো মোকাবিলা করা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন অমির বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল বিভাগের ছাত্র। নিয়ম ভেঙে তিনি কলেজ হোস্টেলে এসি লাগিয়েছেন। এ কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে শোকজ করেছে। সম্প্রতি নিজের হোস্টেলেই পুঠিয়ার এক কলেজছাত্রকে আটকে রেখে রাতভর নির্যাতন করেন অমি। ব্যক্তিগত সহকারীর কাজ করতে না চাওয়ায় ওই ছাত্রকে নির্যাতন করা হয়। তারপর ওই ছাত্রের কাছ থেকে হোটেলের ৫০ হাজার টাকা চুরির মিথ্যা স্বীকারোক্তি নিয়ে ভিডিও করে রাখা হয়। এ ঘটনায় ওই ছাত্রের বাবা থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও চাপে পড়ে সেটি প্রত্যাহার করে নেন। তবে তার আগে ওই ছাত্রের বাবা বলেছিলেন, মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তার ছেলের কাছ থেকে টাকা চুরির স্বীকারোক্তি আদায় করেছিলেন অমি।

এছাড়া ছাত্রলীগ সম্পাদক হওয়ার আগে থেকেই অমির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ সংক্রান্ত কিছু নথিপত্রও গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে। তাছাড়া ছাত্রলীগের সম্পাদক হওয়ার আগে মহানগরীর একটি বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকার পর কয়েক মাসের ভাড়া না দিয়েই পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও অমির বিরুদ্ধে রয়েছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর জাকির হোসেন নিজ সংগঠনের এক নেতাকে পিটিয়ে আহত করেন। রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে এ ঘটনা ঘটে। মারধরের পর আমিনুল ইসলাম সবুজ নামের ওই ছাত্রলীগ নেতা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। অমির দেওয়া কয়েকটি থাপ্পড়ের কারণে তিনি একটি কানে শুনছেন না বলে জানিয়েছেন। প্রকাশ্যে এভাবে মারধরের আগে ফোনে সবুজের কলিজা টেনে বের করার হুমকি দিয়েছিলেন অমি। অশ্লীল ভাষায় করেছিলেন গালাগাল। এর অডিও ফাঁস হয়েছে।

সর্বশেষ গত ১৪ সেপ্টেম্বর বুধবার ফাঁস হয়েছে অমির ফেনসিডিল সেবনের ভিডিও চিত্র। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশব্যাপী তোলপাড় চলে। রাজশাহীর কাটাখালীতে এক নেতার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে সম্প্রতি এই ভিডিওটি মোবাইল ফোনে গোপনে ধারণ করা হয় বলে জানা গেছে।

তবে ছাত্রলীগ নেতা অমি সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ফেনসিডিল সেবনের ভিডিওটি এডিট করে বানানো হয়েছে। চাকরি দেওয়ার নামে কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সঠিক না। পদবঞ্চিতরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। বর্তমান জেলা ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। একটি মহল সুপরিকল্পিতভাবে এটি করছে। নেতাকর্মীরা আমাদের সঙ্গে আছেন। সময় হলেই এসব অভিযোগ যে সঠিক না, সেটি প্রমাণ করা হবে।

এদিকে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানা ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন অমির নানা অপকর্ম তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ বৃহস্পতিবার রাতে তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটি করেছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ কতিপয় নেতার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের অধিকতর তদন্তের স্বার্থে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হলো।

কমিটির সদস্যরা হলেন শেখ শামীম তূর্য, আপন দাস ও তানভীর আব্দুল্লাহ। সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলে জমা দিতে বলা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর