,

নিরাপদ আমের’ জন্য

রস-টসটসে পাকা আম কার না পছন্দ। এই মৌসুমে আমের জন্য অনেকের তো রীতিমতো পারিবারিক বাজেটসহ নানা আয়োজনই থাকে। কে কোথা থেকে, কোন পদ্ধতিতে আম সংগ্রহ করবেন তা নিয়েও শুরু হয় মাতামাতি। অতিলোভনীয় ফল আম নিয়ে যখন এত আয়োজন; তখন এর বিপরীতে সংশয়ও কম নয়। আর এই সংশয় কিছু অসাধু মানুষেরই তৈরি। তারা আমের মতো একটি ফলকে কেমিক্যালে বিষিয়ে ‘অনিরাপদ’ করে তুলেছে।

তবে বিগত কয়েক বছর ধরে ‘বিষাক্ত আমের’ বিরুদ্ধে সচেতন মানুষের মৌনযুদ্ধ চলছে। বর্তমানে প্রশাসনেরও তদারকি বেড়েছে। সব মিলে সবাই সোচ্চার হলে ফের ‘নিরাপদ আম’ খাওয়া যাবে। সেজন্য বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আমে ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধে গত মৌসুমে চলা অভিযান ও মাসব্যাপী চলা প্রচার-প্রচারণায় বাগানি পর্যায়ে সচেতনতা বেড়েছে।

আম সংগ্রহ পরে পুষ্টিগুণ ঠিক রেখে নিরাপদ আম ভোক্তাদের হাতে পৌঁছাতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী অঞ্চলে নিরাপদ আম বাজারজাত করতে চলছে প্রচারণা।

উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বাগানিরা জানান, আম সংগ্রহের পর ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত আম যাতে ক্ষতিকারক ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথিলিন বা ইথেফোন দিয়ে না পাকানো হয়, সে ব্যাপারে প্রধান আম উত্পাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামাঞ্চলগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে চলছে মাইকিং। আয়োজন করা হয়েছে সভা। জুনের ১ তারিখের আগে আম বাজারজাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শরফ উদ্দিন জানান, পাকা আমে সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে পচন শুরু হয়। বাগানি পর্যায়ে আমে ফরমালিন দেওয়ার কোনো নমুনা আমরা পাইনি। কিন্তু বাজারের অসত্ ব্যবসায়ীরা আমে পচন ঠেকাতে ফরমালিন ব্যবহার করতে পারে। তাদেরকে অবশ্যই চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

তবে গত বছর আমে ফরমালিন আছে এমন প্রচারণায় প্রচুর আম নষ্ট করা হয়েছে। চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাতাসের ফরমালিন পরীক্ষা যন্ত্র দিয়ে আমে ফরমালিন পরীক্ষা করাটা ভুল ছিল বলে তিনি জানান। ফলে এ বছর আম বাজারে প্রবেশের আগে এ বিষয়ে চাষি, ব্যবসায়ী, প্রশাসন ও ভোক্তাদের সঠিক তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

সেইসঙ্গে শেষ সময়ে মাছি, পোকার আক্রমণ থেকে আম রক্ষা করতে কীটনাশক স্প্রে না করে ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। চলতি বছর ৮ জেলায় ১ লাখ ২০ হাজারটির বেশি আমে ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১০৫ টন বিষমুক্ত আম ভোক্তারা পাবেন।  চলতি বছর জানুয়ারি মাসে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন কেমিক্যালের মাধ্যমে ফল পাকানো বন্ধের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশে গাইডলাইন প্রণয়ন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

গাইডলাইন অনুযায়ী, কেমিক্যাল দিয়ে ফল পাকানো হচ্ছে কি না তা সার্বক্ষণিক পরিবীক্ষণ করা হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কর্মরত প্রতিষ্ঠান ভোক্তার নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান সজল বলেন, আমের উত্পাদন বাড়াতে ও ফল পাকাতে রাসায়নিক প্রয়োগ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, মৌসুমি ফলে বিষ প্রয়োগ বিষয়ে সতর্কতা বেড়েছে। বিশেষ করে ভোক্তাদের একটি বড় অংশ ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। বাগানি, ব্যবসায়ী, ভোক্তা সর্বপর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য আইন ও ভোক্তা অধিকার আইনের প্রয়োগ হলে এসব বন্ধ হবে।

জানা যায়, মুকুল থেকে শুরু করে আম সংগ্রহ পর্যন্ত ২০ থেকে ৬০ বার ছত্রাকনাশক, কীটনাশক ও হরমোন প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ও আম বাগানিরা  জানিয়েছেন, আম পোকা ও রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করা হয়েছে।

কোনো কোনো বাগানে এক মৌসুমে ৬০ বার পর্যন্ত স্প্রে করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত রাসায়নিক স্প্রের ফলে আমে সেগুলোর প্রভাব থাকছে, যা মানবদেহে ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে পারে। ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শরফ উদ্দিন জানান, আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে মুকুল থেকে পাকা পর্যন্ত আম বাগানে ৬২ বার পর্যন্ত ছত্রাকনাশক, কীটনাশক ও ভিটামিন স্প্রে করা হয়েছে।

এ বছর মৌসুমের শুরু থেকে অতিরিক্ত কীটনাশক স্পে  না করার জন্য বাগানিদের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে। অনেক বাগানে স্প্রে করা কমেছে। তারা কেউ কেউ ২০ থেকে ২২ বারও স্প্রে করেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুর হাট গ্রামে আম বাগানি মো. সেলিম জানান, বালাইনাশক স্প্রে না করলে আম রক্ষা করা যায় না। পোকায় নষ্ট করে, পচে নষ্ট হয়।

তিনি বলেন, ঢাকার বাজারে এখন ক্ষীরসাপাত আম দেখা যাচ্ছে। সেগুলো কার্বাইড দিয়ে পাকানো। গাঢ় হলুদ রং আমগুলো এখনও পাকার সময় হয়নি। এখন বাজারে আসবে গোপালভোগ, হিমসাগর, আরও ১৫ দিন পরে বাজারে আসবে ল্যাংড়া, এরও ১৫ দিন পরে আসবে আম্রপালি ও ফজলি ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাবে চলতি বছর দেশে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে সাড়ে ১০ লাখ টন আম উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সাড়ে ৯ লাখ টন আমের ফলন হয়েছিল। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২৪ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে আম উত্পাদিত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়াও রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর ও রংপুরে। এ ছাড়াও তিন পার্বত্য জেলায়ও কিছু আম রয়েছে।

জাতিসংঘ কৃষি ও খাদ্য সংস্থা এফএও’র হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম আম উৎপাদনকারী দেশ।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর