কয়েক দিন ধরে প্রবল বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে বাঁধ। এ ছাড়া জেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে বৃষ্টির কারণে খেতের ফসল পানির নিচে রয়েছে।
শুধু কিশোরগঞ্জ নেত্রকোণা নয়, পাশের , হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জেও অকাল বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের ফসল। এতে এই কয়েক জেলাজুড়ে কৃষকদের মধ্যে শুধুই হাহাকার বিরাজ করছে।
নেত্রকোণ জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, রবিবার বিকাল পর্যন্ত চারটি উপজেলা মিলে অন্তত সাড়ে চার হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে রয়েছে।
জনপ্রতিনিধি ও এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়ে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের চরম গাফিলতির কারণে বাঁধ ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার থেকে অব্যাহত বর্ষণ ও গত শনিবার থেকে সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে মোহনগঞ্জের চর হাইজদা ফসল রক্ষা বাঁধ রবিবার দুপুরে ভেঙে গেছে।
এ ছাড়া খালিয়াজুরি উপজেলার ধনু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সদর ইউনিয়নের চুনাই বাঁ, গাজীপুর ইউনিয়নের ধৈলং বাঁধ, মাকলাইন বাঁধ, হরিপুর বাঁধ, নালুয়ার বাঁধ, মেন্দিপুর ইউনিয়নের আশাখালি বাঁধ, নাওটানা স্লুইস গেইট বাঁধ, চাকুয়া ইউনিয়নের গঙ্গাঁবদর বাঁধসহ ১০টি বাঁধ ভেঙে সংশ্লিষ্ট হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করছে। পানির চাপ বেড়ে রবিবার দুপুর থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত এই বাঁধগুলো ভাঙে। এতে করে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় এক হাজার একর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, পানি প্রবাহের চাপ অব্যাহত থাকলে এবং উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ আরও বেশ কয়েকটি বাঁধ দুই তিন দিনের মধ্যে মেরামত না করা হলে খালিয়াজুরির প্রায় ৫০ হাজার একর জমির ফসলই পানিতে তলিয়ে যাবে। ঝুঁকিপূর্ণ এ ফসল রক্ষা বাঁধের মধ্যে রয়েছে ঝালখালির বাঁধ, কীর্তনখলা বাঁধ, পাইয়া বাঁধ, আশালিয়াকুড়ির বাঁধ, চতিয়া বাঁধ, মায়ারচর বাঁধ, গঙ্গাবদর বাঁধ, মালিহাতা বাঁধ, চুনাই বাঁধ, নামা চুনাই বাঁধ, গুরস্তানের নামা বাঁধম ফেনির বাঁধ ও বয়রা বাঁধ। ওই সমস্ত বাঁধের কয়েকটিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মাটি ভরাটের মাধ্যমে সংস্কার প্রকল্প কাজ হাতে নিলেও তাতে ঠিক মতো কাজ করেনি। আর স্থানে স্থানে অল্প করে মাটি ফেললেও বাঁধের কাছ থেকে মাটি কাটায় বৃষ্টির পানিতে ওই গর্তেই মাটি চলে গেছে।
খালিয়াজুরি সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছানোয়ারুজ্জামান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো মেরামতে স্থানীয় কৃষকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। এতে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার কৃষক স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রক্ষার সংগ্রাম করছেন।
নেত্রকোণা জেলা পরিষদ সদস্য ও খালিয়াজুরি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম আবু ইছহাক বলেন, এ উপজেলায় পাউবোর কাজে এ বছর বাঁধে বরাদ্দের চার ভাগের এক ভাগ কাজও তারা করেননি। সময় মতো ও সঠিক নিয়মে তারা কাজ না করায় এখানকার সবগুলো বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্বেচ্ছাশ্রমের বাঁধগুলো টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। প্রতি বছরই পাউবো এমন করে থাকে। তা দেখার যেন কেউ নেই।
খালিয়াজুরি কৃষক লীগের সভাপতি তপন বাঙালি ও কৃষক মোহন দেব রায় বলেন, পাউবো যদি এখানে বরাদ্দের শতভাগ কাজ সঠিক সময়ের মধ্যে শুরু ও শেষ করতো তাহলে হাজার হাজার একর ফসল আজ হুমকির মাঝে পড়ত না।
খালিয়াজুরি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, সবেমাত্র বোরো জমির ফাওয়ারিং ও মিল্কিং স্টেজ চলছে। অর্থাৎ ধান পাকতে আরও অনেক সময় বাকি। এরই মধ্যে আগাম বন্যার কারণে কৃষকদের মাঝে চরম হতাশা ও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। আর এক থেকে দুই ফুট পানি বাড়লে উপজেলায় ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি জানান, এ বছর ওই উপজেলায় ২০ হাজার ৭০ হেক্টও জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে।
খালিয়াজুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তোফায়েল বলেন, এ উপজেলায় পাউবো কোথায়, কত টাকার কাজ, কিভাবে করছেন, তা আমি জানি না। আইনগত দুর্বলতায় তাতে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তারা কাজই শুরু করেছে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে। আমার কাছে ওই মাসের ১৯ তারিখ যখন ফাইল আনল তখন আমি বলেছিলাম এটিতো অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের মধ্যে শেষ করার কথা। তিনি আরও বলেন, তদারকির জন্য নেত্রকোণা পাউবোর কাছে এসব তথ্য বারবার চাইলেও তারা তা দেয়নি। তাছাড়া, প্রকল্প স্থানে তারা কাজের বিবরণ, কাজের মেয়াদকাল ও বরাদ্দের পরিমাণ জানিয়ে সাইন বোর্ড ব্যাবহার না করে কাজের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীকে দিচ্ছেন শুভঙ্করের ফাঁকি। এ বিষয়ে জানতে নেত্রকোণা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তাহের মুঠোফোনে বারবার চেষ্টা করলেও তিনি তা ধরেননি। শেষে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তাতে তিনি সাড়া দেননি।
এ ছাড়া কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নের খাগগড়া, লক্ষ্মীপুরসহ পাঁচটি গ্রাম, লেংগুড়া ইউনিয়নের জিগাতলা, রাজনগরসহ ছয়টি গ্রাম, রংছাতি ইউনিয়নের সাতটি ও নাজিরপুর ইউনিয়নের তিনটি গ্রামের নিচু অঞ্চলের ধান থেকে পানি জমে আছে।
কলমাকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বৃষ্টিপাতে কারণে এলাকা প্রায় ৫০০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। তবে আর বৃষ্টি না হলে পানি নদীতে নেমে গেলে ক্ষয় ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক বলেন, উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে প্রায় ৪০০ হেক্টর ফসলি জমি জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। রবিবার থেকে কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
নেত্রকোণা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক বিলাস চন্দ্র পাল বলেন, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলায় কয়েকটি ইউনিয়নে বেশ কিছু জমি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। আর মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরি উপজেলায় কয়েকটি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে।
Reporter Name 



















