আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দেওয়া সাক্ষ্যে উঠে এসেছে গুম, হত্যা ও গোপন অপারেশনের ভয়াবহ বর্ণনা। সাক্ষ্য দেন তার সাবেক রানার ও বর্তমানে সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস, যিনি দাবি করেন—বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজ চোখে ১৫০ থেকে ২০০ মানুষের গুম ও হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছেন। এই জবানবন্দির পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
ইমরুল কায়েস তার জবানবন্দিতে জানান, তিনি ২০০১ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং পরে বিভিন্ন ইউনিটে কাজ করার পর ২০১০–২০১২ সালে র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে প্রেষণে দায়িত্ব পান। সেখানে প্রথমে প্রশাসনিক ইউনিটে কাজ করলেও পরে তাকে ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স জিয়াউল আহসানের ‘রানার’ বা ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পদে থাকার সময় তিনি নিয়মিতভাবে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাতায়াত করতেন।
তার ভাষ্যমতে, তিনি জিয়াউল আহসানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সহকারী হিসেবে কাজ করতেন এবং তার সঙ্গে ডিজিএফআই, সেনা সদর দপ্তর, ডিবি কার্যালয়, সচিবালয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির বাসভবনে যাতায়াত করতেন। তিনি দাবি করেন, ওই সময় তিনি লক্ষ্য করেন বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গে জিয়াউল আহসানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, যার মধ্যে বেশ কয়েকজন আলোচিত রাজনৈতিক নেতারাও ছিলেন।
সাক্ষ্যে আরও বলা হয়, দায়িত্বে যোগ দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই তিনি বিভিন্ন রাতের অভিযানে যুক্ত হন। এসব অভিযানে তাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে আটক ব্যক্তিদের গোপন স্থানে নিয়ে হত্যা করা হতো বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে ইনজেকশন পুশ, গুলি কিংবা পানিতে ফেলে দেওয়ার মতো পদ্ধতিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হতো।
তিনি একটি ঘটনার বর্ণনা দেন যেখানে রাতে র্যাব-১ কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে তাকে নেওয়া হয়। সেখানে একটি বস্তা থেকে মৃতদেহ বের করে রেললাইনের পাশে ফেলে দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। পরে ট্রেন পার হওয়ার পর লাশ সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ঘটনাটি স্বাভাবিক দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানো হয়।
তিনি আরও জানান, সুন্দরবন অঞ্চলে জলদস্যু বিরোধী একটি অভিযানে তিনি অংশ নেন, যেখানে গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে পরে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে।
তার জবানবন্দিতে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে বিডিআর বিদ্রোহ-পরবর্তী ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’-কে ঘিরে। তিনি দাবি করেন, ওই সময় আটক কিছু বিডিআর সদস্যকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে হত্যা করা হয় এবং তাদের লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে সিমেন্টের বস্তা ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এছাড়া তিনি বলেন, ২০১২ সালে জাফলং সীমান্ত এলাকায় দুইজন ব্যক্তিকে হস্তান্তরের পর তাদেরকে পথে গুলি করে হত্যা করা হয়। একইভাবে কাঁচপুর ব্রিজ এলাকায়ও একটি অপারেশনের সময় টার্গেট ব্যক্তিদের গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুম প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, ২০১২ সালের এপ্রিলে মহাখালী এলাকায় একটি অপারেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। পরে তিনি ছুটি থেকে ফিরে জানতে পারেন, ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হয়েছেন এবং সেসময় র্যাব সদর দপ্তরে অস্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছিল।
জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে ইমরুল কায়েস আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং বলেন, ‘আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি, তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসেবে তার সাথে দেখেছি, তিনি ওই সময়ে ১৫০-২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনও সৈনিককে কখনই যেন আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।’
Reporter Name 

























