ঢাকা ১২:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
প্রয়াত নেতৃবৃন্দের স্মরণে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতির উদ্যোগে ২০ জুন আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল দুর্ঘটনায় আহত প্রবাসীর চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়ালেন ছাত্রদল নেতা নিরাপত্তা যেন দূরে ঠেলে না দেয় : প্রধানমন্ত্রী ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে ওবামার প্রেসিডেন্সিয়াল সেন্টার উদ্বোধন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস এই সপ্তাহে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দর্শকদের জন্য যা থাকছে সংসদে প্রবেশের সময় মাথা নত করার প্রথা বিলুপ্ত করায় স্পিকারকে মোবারকবাদ মুহিউদ্দীনের শাকিরার প্রেম-বিচ্ছেদের গল্প শিক্ষা খাতে ৮৩ হাজারো মামলার জটে আটকা শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ: শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের সভা অনুষ্ঠিত

শিক্ষা খাতে ৮৩ হাজারো মামলার জটে আটকা শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ: শিক্ষামন্ত্রী

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৪:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
  • ২ বার

দেশের শিক্ষা খাতে মামলার চাপ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিয়োগ-পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বড় একটি অংশ আটকে আছে আদালতের নির্দেশ ও আইনি জটিলতায়। শিক্ষা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৩ হাজারের বেশি মামলার প্রভাবে শিক্ষকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে হাজার হাজার নিয়োগ ঝুলে আছে।

এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে শূন্যপদ এবং সংকটের মুখে পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রম। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সংকটে। দীর্ঘদিনের মামলাজটে বর্তমানে প্রায় ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।

শিক্ষা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৮৩ হাজার ৫০০ মামলা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষা খাতের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। যার মধ্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর, বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৩ হাজার ৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্কুল–কলেজের অ্যাডহক কমিটি বাতিল, নতুন কমিটি অনুমোদন এবং কমিটির বৈধতা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মামলা হয়েছে। এর ফলে অন্তত ৫৭৭টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও নিয়মিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান নেই, কোথাও একাধিক কমিটি নিজেদের বৈধ বলে দাবি করছে।

দেশের শিক্ষা খাতে বর্তমানে প্রায় ৮৩ হাজার ৫০০ মামলা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর, বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৮টি। শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কাঁধেই রয়েছে ৫ হাজার ৮৩১টি মামলা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (ডিপিই) রয়েছে ৩ হাজার ২৮২টি মামলা। এই বিপুলসংখ্যক মামলার ভারে শিক্ষা প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, শিক্ষা খাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মামলাজটের কারণে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৩ হাজার ৫০০ মামলা রয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সমন্বয় করে এসব মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। গত বুধবার (১৭ জুন) সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুক বিষয়টি উত্থাপন করলে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ৩২ হাজার ৫০০ শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াসহ আরও ২ হাজার ৬০০ এবং ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম মামলার কারণে ঝুলে আছে।

মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন মামলার কারণে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এসব মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হলেও অনেক বিষয় এখনো আদালতের প্রক্রিয়ায় অমীমাংসিত। ফলে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি-কাম-নাইটগার্ড নিয়োগ কার্যক্রমও বিভিন্ন মামলার কারণে আটকে রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার নথি অনুযায়ী, শিক্ষা ও প্রাথমিক–গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন তিনটি বিভাগ, ১৬টি দপ্তর, ১১টি শিক্ষা বোর্ড এবং ১৭০টি সরকারি–বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৩ হাজার ৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে এই মামলাগুলোর পাশাপাশি আরও বহু মামলা বিভিন্ন স্তরে শিক্ষা কার্যক্রম, নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ বহন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৯ হাজার ৬৫২। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ৮ হাজার ৪৯৩টি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে ১ হাজার ১৫৯টি মামলা রয়েছে।

অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় মামলা রয়েছে ৩ হাজার ৪২৬টি। এর প্রায় পুরো চাপই পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওপর। ডিপিইতে এককভাবে রয়েছে ৩ হাজার ২৮২টি মামলা। এ ছাড়া উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোতে ৫৪টি, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিটে ৫৪টি এবং শিশুকল্যাণ ট্রাস্টে ১১টি মামলা বিচারাধীন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একার কাঁধে রয়েছে ৫ হাজার ৮৩১টি মামলা, যা সংশ্লিষ্ট বিভাগের মোট মামলার প্রায় ৬৮ শতাংশ। এসব মামলার বড় অংশ নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিও, ইনসিটু, ওএসডি সংযুক্তিকরণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষক নিয়োগ, বেতন–ভাতা ছাড় এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে।

শিক্ষা বোর্ডগুলোতেও একই চিত্র। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে বর্তমানে ১ হাজার ৬৬৩টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১ হাজার ৫৫২টি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১১১টি মামলা রয়েছে।

বোর্ডভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ ২৭৩টি মামলা রয়েছে ঢাকা বোর্ডে। এরপর কুমিল্লা বোর্ডে ২৬৩, রাজশাহীতে ২০৯, দিনাজপুরে ১৮৩ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ১৬৩টি মামলা রয়েছে। সবচেয়ে কম মামলা সিলেট বোর্ডে—৬৯টি। পৃথকভাবে কারিগরি বোর্ডে ৫৪ এবং মাদ্রাসা বোর্ডে ৫৭টি মামলা রয়েছে।

মামলা হয় কমিটির বিরোধে

আইন কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ডের মোট মামলার প্রায় ৭১ শতাংশের উৎস কমিটি ও প্রশাসনিক বিরোধ। ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ, গভর্নিং বডি–সংক্রান্ত মতবিরোধ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এসব মামলা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কমিটি নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজেট অনুমোদন, বেতন–ভাতা ছাড় এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে।

বোর্ড ও অধিদপ্তরের বাইরে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষে (এনটিআরসিএ) ৫৮৫টি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) ২৭৩টি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬৩টি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) ৮৮টি এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

অবশ্য শিক্ষা প্রশাসন ও আইন শাখা মোট ১০৮টি মামলা–সংশ্লিষ্ট খাত চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ ধরনের বিষয়ে নিয়মিত মামলা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মামলা দেখা যাচ্ছে নিয়োগ ও পদোন্নতি জটিলতা, গ্রেডেশন ও জ্যেষ্ঠতা বিরোধ, এমপিও এবং বেতন–ভাতা–সংক্রান্ত বিষয়ে। পাশাপাশি বিভাগীয় শাস্তি, চাকরিচ্যুতি, কোটা, জাতীয়করণ, ভর্তি, অতিরিক্ত ফি আদায়, জাল সনদ, ভুয়া নিয়োগ, পেনশন, অডিট আপত্তি, আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ এবং পাবলিক পরীক্ষা–সংক্রান্ত বিষয়েও নিয়মিত মামলা হচ্ছে।

মামলার ভারে সবকিছুতে ধীরগতি 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা প্রশাসনের বড় একটি অংশের সময় এখন আদালত–সংশ্লিষ্ট নথি, জবাব প্রস্তুত, শুনানি এবং আইনি পরামর্শ নিয়েই ব্যয় হচ্ছে। ফলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে। কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, ফল প্রকাশ, প্যানেল অনুমোদন কিংবা পদোন্নতির সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়—এমন পদ ও প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তাদের মতে, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে যোগ্য প্রার্থী থাকলেও নিয়োগ দেওয়া যায় না। ফলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান, শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদে দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত রুটিন কার্যক্রমের বাইরে বড় কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে পারছে না।

নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মাউশির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মামলার প্রভাব শুধু নিয়োগে সীমাবদ্ধ নয় বরং বেতন–ভাতা অনুমোদন, এমপিওভুক্তি, পদ সৃজন, বদলি, পদায়ন, কমিটি অনুমোদন এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও এর প্রভাব পড়ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে কমিটি নিয়ে বিরোধ থাকলে বাজেট অনুমোদন, ব্যাংক লেনদেন, ক্রয়প্রক্রিয়া ও উন্নয়ন কাজও স্থবির হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেক কর্মকর্তা ফাইল অনুমোদনে ধীরগতি দেখান কিংবা অতিরিক্ত মতামত চান। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় বাড়ে এবং মাঠপর্যায়ের কাজ পিছিয়ে যায়।

মাউশির আইন শাখার আরেক কর্মকর্তা জানান, আগে যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কয়েক সপ্তাহ লাগত, এখন অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় লাগছে। নিয়োগ অনিশ্চয়তা, কমিটি বিরোধ এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষক–কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাঠদান, শিক্ষার্থী উপস্থিতি এবং শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশে।

মামলার জটে শূন্য ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ

মামলার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষায়। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া আটকে থাকায় দেশের হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এতে বিদ্যালয় পরিচালনা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং শিক্ষার মান ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৮টি। বিদ্যমান নীতিমালা অনুসারে প্রধান শিক্ষক পদের ৩৫ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের কথা।

বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তবে ২০১৭ সালে চলতি দায়িত্ব পাওয়া ১৮ হাজার প্রধান শিক্ষকের একটি বড় অংশ অবসরে চলে যাওয়ায় বর্তমানে প্রধান শিক্ষক পদের শূন্যতা দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ১০৬টিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দীর্ঘদিনের মামলাজট ও আদালতের নিষেধাজ্ঞাই এই শূন্যতার প্রধান কারণ। ২০০৯ সাল থেকে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যত বন্ধ রয়েছে।

প্রধান শিক্ষক সংকট নিরসনে ৪৩তম বিসিএস থেকে ২৭৪ জনকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নন-ক্যাডার হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু মামলাজনিত জটিলতায় তারা এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি।

সূত্র জানায়, একটি প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষকগোষ্ঠী চাকরির শুরু থেকে জ্যেষ্ঠতার দাবিতে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করে। ওই মামলার পর আদালত বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। এরপর থেকেই নিয়মিত পদোন্নতি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সরকার ১৮ হাজার সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়ের ২৮৪ জন সহকারী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক পদ সংরক্ষণের দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট করলে নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি হয় এবং পদোন্নতি আবারও আটকে যায়।

২০২১ সালে আদালতের অনুমতির ভিত্তিতে নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ী এবং লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ কয়েকটি উপজেলায় সীমিত পরিসরে পদোন্নতি কার্যক্রম চালু করা হলেও পরে নতুন আইনি জটিলতার কারণে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অনেকেই পুরো চাকরিজীবন সহকারী শিক্ষক হিসেবেই শেষ করার আশঙ্কায় রয়েছেন। অথচ বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সাত বছর চাকরি শেষে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মু. মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব বিদ্যালয় পরিচালনাতেও পড়ছে।

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুরো বিষয়টি আদালতের বিবেচনাধীন। সরকার সরাসরি মন্তব্য করতে পারছে না, তবে সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা চলছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রয়াত নেতৃবৃন্দের স্মরণে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতির উদ্যোগে ২০ জুন আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল

শিক্ষা খাতে ৮৩ হাজারো মামলার জটে আটকা শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ: শিক্ষামন্ত্রী

আপডেট টাইম : ১০:৪৪:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

দেশের শিক্ষা খাতে মামলার চাপ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিয়োগ-পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বড় একটি অংশ আটকে আছে আদালতের নির্দেশ ও আইনি জটিলতায়। শিক্ষা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৩ হাজারের বেশি মামলার প্রভাবে শিক্ষকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে হাজার হাজার নিয়োগ ঝুলে আছে।

এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে, বাড়ছে শূন্যপদ এবং সংকটের মুখে পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রম। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সংকটে। দীর্ঘদিনের মামলাজটে বর্তমানে প্রায় ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।

শিক্ষা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৮৩ হাজার ৫০০ মামলা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষা খাতের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। যার মধ্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর, বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৩ হাজার ৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্কুল–কলেজের অ্যাডহক কমিটি বাতিল, নতুন কমিটি অনুমোদন এবং কমিটির বৈধতা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মামলা হয়েছে। এর ফলে অন্তত ৫৭৭টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও নিয়মিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান নেই, কোথাও একাধিক কমিটি নিজেদের বৈধ বলে দাবি করছে।

দেশের শিক্ষা খাতে বর্তমানে প্রায় ৮৩ হাজার ৫০০ মামলা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর, বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৮টি। শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কাঁধেই রয়েছে ৫ হাজার ৮৩১টি মামলা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (ডিপিই) রয়েছে ৩ হাজার ২৮২টি মামলা। এই বিপুলসংখ্যক মামলার ভারে শিক্ষা প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, শিক্ষা খাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মামলাজটের কারণে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৩ হাজার ৫০০ মামলা রয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সমন্বয় করে এসব মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। গত বুধবার (১৭ জুন) সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুক বিষয়টি উত্থাপন করলে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ৩২ হাজার ৫০০ শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াসহ আরও ২ হাজার ৬০০ এবং ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম মামলার কারণে ঝুলে আছে।

মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন মামলার কারণে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এসব মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হলেও অনেক বিষয় এখনো আদালতের প্রক্রিয়ায় অমীমাংসিত। ফলে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি-কাম-নাইটগার্ড নিয়োগ কার্যক্রমও বিভিন্ন মামলার কারণে আটকে রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার নথি অনুযায়ী, শিক্ষা ও প্রাথমিক–গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন তিনটি বিভাগ, ১৬টি দপ্তর, ১১টি শিক্ষা বোর্ড এবং ১৭০টি সরকারি–বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৩ হাজার ৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে এই মামলাগুলোর পাশাপাশি আরও বহু মামলা বিভিন্ন স্তরে শিক্ষা কার্যক্রম, নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ বহন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৯ হাজার ৬৫২। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ৮ হাজার ৪৯৩টি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে ১ হাজার ১৫৯টি মামলা রয়েছে।

অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় মামলা রয়েছে ৩ হাজার ৪২৬টি। এর প্রায় পুরো চাপই পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওপর। ডিপিইতে এককভাবে রয়েছে ৩ হাজার ২৮২টি মামলা। এ ছাড়া উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোতে ৫৪টি, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিটে ৫৪টি এবং শিশুকল্যাণ ট্রাস্টে ১১টি মামলা বিচারাধীন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একার কাঁধে রয়েছে ৫ হাজার ৮৩১টি মামলা, যা সংশ্লিষ্ট বিভাগের মোট মামলার প্রায় ৬৮ শতাংশ। এসব মামলার বড় অংশ নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিও, ইনসিটু, ওএসডি সংযুক্তিকরণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষক নিয়োগ, বেতন–ভাতা ছাড় এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে।

শিক্ষা বোর্ডগুলোতেও একই চিত্র। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে বর্তমানে ১ হাজার ৬৬৩টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১ হাজার ৫৫২টি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১১১টি মামলা রয়েছে।

বোর্ডভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ ২৭৩টি মামলা রয়েছে ঢাকা বোর্ডে। এরপর কুমিল্লা বোর্ডে ২৬৩, রাজশাহীতে ২০৯, দিনাজপুরে ১৮৩ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ১৬৩টি মামলা রয়েছে। সবচেয়ে কম মামলা সিলেট বোর্ডে—৬৯টি। পৃথকভাবে কারিগরি বোর্ডে ৫৪ এবং মাদ্রাসা বোর্ডে ৫৭টি মামলা রয়েছে।

মামলা হয় কমিটির বিরোধে

আইন কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষা বোর্ডের মোট মামলার প্রায় ৭১ শতাংশের উৎস কমিটি ও প্রশাসনিক বিরোধ। ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন, পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ, গভর্নিং বডি–সংক্রান্ত মতবিরোধ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এসব মামলা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কমিটি নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজেট অনুমোদন, বেতন–ভাতা ছাড় এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে।

বোর্ড ও অধিদপ্তরের বাইরে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষে (এনটিআরসিএ) ৫৮৫টি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) ২৭৩টি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬৩টি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) ৮৮টি এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে ৭৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

অবশ্য শিক্ষা প্রশাসন ও আইন শাখা মোট ১০৮টি মামলা–সংশ্লিষ্ট খাত চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ ধরনের বিষয়ে নিয়মিত মামলা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মামলা দেখা যাচ্ছে নিয়োগ ও পদোন্নতি জটিলতা, গ্রেডেশন ও জ্যেষ্ঠতা বিরোধ, এমপিও এবং বেতন–ভাতা–সংক্রান্ত বিষয়ে। পাশাপাশি বিভাগীয় শাস্তি, চাকরিচ্যুতি, কোটা, জাতীয়করণ, ভর্তি, অতিরিক্ত ফি আদায়, জাল সনদ, ভুয়া নিয়োগ, পেনশন, অডিট আপত্তি, আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ এবং পাবলিক পরীক্ষা–সংক্রান্ত বিষয়েও নিয়মিত মামলা হচ্ছে।

মামলার ভারে সবকিছুতে ধীরগতি 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা প্রশাসনের বড় একটি অংশের সময় এখন আদালত–সংশ্লিষ্ট নথি, জবাব প্রস্তুত, শুনানি এবং আইনি পরামর্শ নিয়েই ব্যয় হচ্ছে। ফলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে। কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, ফল প্রকাশ, প্যানেল অনুমোদন কিংবা পদোন্নতির সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়—এমন পদ ও প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তাদের মতে, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে যোগ্য প্রার্থী থাকলেও নিয়োগ দেওয়া যায় না। ফলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান, শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদে দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত রুটিন কার্যক্রমের বাইরে বড় কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে পারছে না।

নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মাউশির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মামলার প্রভাব শুধু নিয়োগে সীমাবদ্ধ নয় বরং বেতন–ভাতা অনুমোদন, এমপিওভুক্তি, পদ সৃজন, বদলি, পদায়ন, কমিটি অনুমোদন এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও এর প্রভাব পড়ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে কমিটি নিয়ে বিরোধ থাকলে বাজেট অনুমোদন, ব্যাংক লেনদেন, ক্রয়প্রক্রিয়া ও উন্নয়ন কাজও স্থবির হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেক কর্মকর্তা ফাইল অনুমোদনে ধীরগতি দেখান কিংবা অতিরিক্ত মতামত চান। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় বাড়ে এবং মাঠপর্যায়ের কাজ পিছিয়ে যায়।

মাউশির আইন শাখার আরেক কর্মকর্তা জানান, আগে যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কয়েক সপ্তাহ লাগত, এখন অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় লাগছে। নিয়োগ অনিশ্চয়তা, কমিটি বিরোধ এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষক–কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাঠদান, শিক্ষার্থী উপস্থিতি এবং শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশে।

মামলার জটে শূন্য ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ

মামলার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষায়। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া আটকে থাকায় দেশের হাজার হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এতে বিদ্যালয় পরিচালনা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং শিক্ষার মান ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৮টি। বিদ্যমান নীতিমালা অনুসারে প্রধান শিক্ষক পদের ৩৫ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের কথা।

বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তবে ২০১৭ সালে চলতি দায়িত্ব পাওয়া ১৮ হাজার প্রধান শিক্ষকের একটি বড় অংশ অবসরে চলে যাওয়ায় বর্তমানে প্রধান শিক্ষক পদের শূন্যতা দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ১০৬টিতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দীর্ঘদিনের মামলাজট ও আদালতের নিষেধাজ্ঞাই এই শূন্যতার প্রধান কারণ। ২০০৯ সাল থেকে সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যত বন্ধ রয়েছে।

প্রধান শিক্ষক সংকট নিরসনে ৪৩তম বিসিএস থেকে ২৭৪ জনকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নন-ক্যাডার হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু মামলাজনিত জটিলতায় তারা এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি।

সূত্র জানায়, একটি প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষকগোষ্ঠী চাকরির শুরু থেকে জ্যেষ্ঠতার দাবিতে ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করে। ওই মামলার পর আদালত বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। এরপর থেকেই নিয়মিত পদোন্নতি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সরকার ১৮ হাজার সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়ের ২৮৪ জন সহকারী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক পদ সংরক্ষণের দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট করলে নতুন করে আইনি জটিলতা তৈরি হয় এবং পদোন্নতি আবারও আটকে যায়।

২০২১ সালে আদালতের অনুমতির ভিত্তিতে নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ী এবং লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ কয়েকটি উপজেলায় সীমিত পরিসরে পদোন্নতি কার্যক্রম চালু করা হলেও পরে নতুন আইনি জটিলতার কারণে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অনেকেই পুরো চাকরিজীবন সহকারী শিক্ষক হিসেবেই শেষ করার আশঙ্কায় রয়েছেন। অথচ বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সাত বছর চাকরি শেষে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মু. মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব বিদ্যালয় পরিচালনাতেও পড়ছে।

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, পুরো বিষয়টি আদালতের বিবেচনাধীন। সরকার সরাসরি মন্তব্য করতে পারছে না, তবে সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা চলছে।