রপ্তানি সম্ভাবনা ও বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে চট্টগ্রামের চামড়া শিল্প। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স (বিধিমালা) নিশ্চিত করতে না পারা এবং আন্তর্জাতিক মানের সনদের অভাবের কারণে এমনিতেই খাতটি পিছিয়ে ছিল। তার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত চর্মরোগ ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি)-এর কারণে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় এই সংকট আরও বাড়িয়েছে। ফলে আসন্ন কোরবানির ঈদকে ঘিরে বড় ধরনের লোকসান আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।
পাকিস্তান আমল থেকে গড়ে ওঠা চট্টগ্রামের এই শিল্পনগরীতে ওরিয়েন্ট ট্যানারি, মেঘনা ট্যানারি, জুবিলি ট্যানারি, কর্ণফুলী লেদার ও চিটাগাং লেদারসহ ২২টি ট্যানারি একসময় পুরোদমে জমজমাট ব্যবসা পরিচালনা করত। এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ইউরোপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। একইসঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই খাত চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখত।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সময়ের ব্যবধানে চট্টগ্রামের সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মূলত পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে অক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, সরকারি নীতিগত সহায়তার ঘাটতি এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগের কারণে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ ট্যানারি। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কোনোমতে টিকে থাকলেও, একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পরও পরিবেশবান্ধব সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে, যার ফলে দেশীয় চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে গবাদিপশুর চামড়ার মান নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও চামড়া শিল্পের সংকটের অন্যতম বড় কারণ।
আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা চামড়ার দরপতনের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেছেন। তাদের অভিযোগ, সরকার কোরবানির আগে ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬০-৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫০-৫৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও, বাস্তবে কোরবানির পর ট্যানারি মালিকদের কাছে সেই চামড়া ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।
চামড়ার দরপতনের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কোরবানির পর ঢাকার বড় ক্রেতাদের চট্টগ্রামে না আসা। তারা অভিযোগ করেন, গত বছর রীফ লেদার, বায়না লেদার, পানা লেদার, গোল্ডেন গ্রুপ ও ইস্টার্ন লেদার সীমিত পরিসরে কিছু চামড়া কিনলেও বিপুল চামড়া নামমাত্র মূল্যে ছেড়ে দিতে হয়েছে। এমন ধারাবাহিক লোকসানের কারণে চট্টগ্রামে একসময় ১২২ জন চামড়া ব্যবসায়ী সক্রিয় ছিলেন, তা এখন কমে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জনে নেমে এসেছে। এই সংকটে অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেছেন।
আন্তর্জাতিক সনদের অভাব
কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির নেতাদের দাবি, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি ট্যানারি সচল থাকলেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ইটিপি এবং এলডব্লিউজি সনদ রয়েছে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে চট্টগ্রামের রীফ লেদার, যশোরের এএসএফ ট্যানারি, খুলনার সুপারেক্স ট্যানারি, ঢাকার এপেক্স ফুটওয়্যার ও অ্যাপেক্স ট্যানারি অন্যতম।
তাদের দাবি, দেশে আন্তর্জাতিক মানের এই সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
লাম্পি স্কিন রোগে নষ্ট হচ্ছে চামড়ার গুণগত মান
প্রাণি বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় গরু-ছাগলের মধ্যে লাম্পি স্কিন ডিজিজ, অ্যানথ্রাক্স ও ক্ষুরারোগের প্রকোপ তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বর্তমানে এসব রোগের সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই ভাইরাসে সাধারণত এক বছর বয়সী বাছুরগুলোই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে অধিকাংশ গবাদিপশুকে নিয়মিত প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের আওতায় না আনায়, বাছুর থাকা অবস্থাতেই সিংহভাগ পশু লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে আক্রান্ত পশুটি পরবর্তী সময়ে সুস্থ হয়ে উঠলেও তার চামড়ার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও গুণগত মান স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
উপজেলা পর্যায়ের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, গত পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে রোগটি দেশের গবাদিপশুর মধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যেহেতু এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই লাম্পি স্কিন ডিজিজের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার গবাদিপশু এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা দেশের চামড়া খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারিভাবে এই রোগের ভ্যাকসিন বা টিকা অত্যন্ত সীমিত পরিসরে পাওয়া যায়। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে ২ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে ভ্যাকসিন পাওয়া গেলেও, চড়া দামের কারণে প্রান্তিক খামারিরা তা ব্যবহার করতে পারছেন না।
কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্পের (এনএটিপি) দুটি ধাপে দেশের ৫৭টি জেলার ২৭০টি উপজেলায় কৃষি উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয় বাড়াতে যৌথভাবে কাজ করেছে একাধিক সরকারি সংস্থা। তবে দীর্ঘমেয়াদি এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে গবাদিপশুর প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সরবরাহ ও সুরক্ষায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও প্রান্তিক খামারিরা জানান, এনএটিপি প্রকল্প চালু থাকাকালীন মাঠপর্যায়ে শতভাগ গবাদিপশুকে বিভিন্ন রোগের ভ্যাকসিনের আওতায় আনা সম্ভব হতো। তবে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভ্যাকসিনের দাম যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনই খামারিদের মধ্যে সচেতনতার অভাব দেখা দিয়েছে; যার ফলে এখন অনেক পশুকে আর ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় কোরবানির পশুর মোট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৮১টি। এর বিপরীতে স্থানীয় খামারিদের কাছে মজুদ রয়েছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু।
কোরবানির ঠিক আগমুহূর্তে চট্টগ্রামজুড়ে গরুর ভয়াবহ ভাইরাসজনিত চর্মরোগ ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি) ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জেলার আনোয়ারা উপজেলার খামারিরা চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় আড়াই হাজার খামারি ও গরু ব্যবসায়ী হাটে তোলার আগেই পশুর এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। আক্রান্ত গরুর শরীরে গুটি দেখা দেওয়ায় গোটা উপজেলায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলার বারশত ইউনিয়নের পারকি এলাকার আনোয়ার নামে এক খামারির অভিযোগ, সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন না থাকায় এই রোগ প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে চড়া মূল্যে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করিয়েও অনেক গরুকে বাঁচানো যাচ্ছে না।
চামড়া সুরক্ষায় সরকারের বিশেষ প্রস্তুতি
উদ্ভূত পরিস্থিতির মাঝেই চামড়া শিল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গত ১৪ মে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে একটি বিশেষ দিকনির্দেশনামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আয়োজিত এই সভায় বিভাগীয় কমিশনার, সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি জানান, পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোরবানির একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয়, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে একটি জাতীয় দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।
চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, চট্টগ্রামের চামড়াশিল্পের অতীত ইতিহাস ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে আমরা ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়ছি। আমরা এই ধসের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছি, যার মধ্যে এলএসডির মতো রোগের কারণে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাওয়া অন্যতম একটি প্রধান দিক। বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে সরকারকে অবহিত করেছি। সরকার যদি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে চামড়াশিল্পকে এই বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর ঢাকা পোস্টকে বলেন, এলএসডি রোগ এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে টিকা নিয়ে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গবাদিপশু একবার এই রোগে আক্রান্ত হলে তার চামড়ার গুণগত মান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়, যার মধ্যে ছোট বাছুরগুলোই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তবে সরকার এ রোগ প্রতিরোধে নিরলসভাবে কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশীয় ভ্যাকসিন বাজারে এলে এলএসডি প্রতিরোধ করা অনেক সহজ হবে। তখন পশুর চামড়ার গুণগত মানও রক্ষা করা সম্ভব হবে।
Reporter Name 























