ঢাকা ০৬:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরিকল্পিতভাবে মুসলিম ভোট সরিয়ে কি বিজেপিকে জেতানো হলো

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:১৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
  • ২৫ বার

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের সাক্ষী হলো পশ্চিমবঙ্গ। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জয়লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে হিন্দুত্ববাদী এই দলটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই জয়কে ‘ঐতিহাসিক জনদেশ’ এবং সুশাসনের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এই অভাবনীয় জয়ের পেছনে ৯‌০ লাখ ভোটারের নাম ছাঁটাইয়ের বিষয়টি একটি বড় বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নির্বাচনের ঠিক কয়েক মাস আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া চালায়। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৯‌০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।

নির্বাচন কমিশন এটিকে মৃত ও ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার একটি রুটিন কাজ হিসেবে দাবি করলেও, বিরোধী দল ও নাগরিক অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীগুলো এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতো মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতে ভোটার বাতিলের হার ছিল অনেক বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকার এই পরিবর্তন নির্বাচনের ফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে থাকতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ঐতিহাসিকভাবেই রাজ্যের মুসলিম ভোটারদের (জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ) বড় অংশের সমর্থন পেয়ে থাকে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, যে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের একটি বিশাল অংশই বিজেপি-বিরোধী বা তৃণমূলের সমর্থক ছিলেন। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রক্রিয়াকে ‘অস্বচ্ছ ও অসাংবিধানিক’ উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। অন্যদিকে, বিজেপির তৎকালীন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহার মতো নেতারা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, ভোটার তালিকা থেকে যত নাম বাদ যাবে, জয়ের জন্য তাদের তত কম ভোটের প্রয়োজন হবে।

বিজেপির এই জয়ের পেছনে কেবল ভোটার ছাঁটাই নয়, আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ সক্রিয় ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া, বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক বিস্তার এবং হিন্দু ভোটারদের মেরুকরণ এই ফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচনি প্রচারে ‘হিন্দু সনাতনী’ ভোট একজোট করার কৌশল বিজেপির ৪৬ শতাংশ ভোট শেয়ার নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুল উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও ভোটারদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকায় বড় ধরনের রদবদল এবং ধর্মীয় মেরুকরণের এই মিশেল পশ্চিমবঙ্গের কয়েক দশকের রাজনৈতিক ধারায় এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

পরিকল্পিতভাবে মুসলিম ভোট সরিয়ে কি বিজেপিকে জেতানো হলো

আপডেট টাইম : ১১:১৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের সাক্ষী হলো পশ্চিমবঙ্গ। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জয়লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে হিন্দুত্ববাদী এই দলটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই জয়কে ‘ঐতিহাসিক জনদেশ’ এবং সুশাসনের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এই অভাবনীয় জয়ের পেছনে ৯‌০ লাখ ভোটারের নাম ছাঁটাইয়ের বিষয়টি একটি বড় বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নির্বাচনের ঠিক কয়েক মাস আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া চালায়। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় ৯‌০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।

নির্বাচন কমিশন এটিকে মৃত ও ভুয়া ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার একটি রুটিন কাজ হিসেবে দাবি করলেও, বিরোধী দল ও নাগরিক অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীগুলো এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতো মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতে ভোটার বাতিলের হার ছিল অনেক বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার তালিকার এই পরিবর্তন নির্বাচনের ফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে থাকতে পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ঐতিহাসিকভাবেই রাজ্যের মুসলিম ভোটারদের (জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ) বড় অংশের সমর্থন পেয়ে থাকে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, যে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তাদের একটি বিশাল অংশই বিজেপি-বিরোধী বা তৃণমূলের সমর্থক ছিলেন। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রক্রিয়াকে ‘অস্বচ্ছ ও অসাংবিধানিক’ উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। অন্যদিকে, বিজেপির তৎকালীন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহার মতো নেতারা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, ভোটার তালিকা থেকে যত নাম বাদ যাবে, জয়ের জন্য তাদের তত কম ভোটের প্রয়োজন হবে।

বিজেপির এই জয়ের পেছনে কেবল ভোটার ছাঁটাই নয়, আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ সক্রিয় ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া, বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক বিস্তার এবং হিন্দু ভোটারদের মেরুকরণ এই ফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচনি প্রচারে ‘হিন্দু সনাতনী’ ভোট একজোট করার কৌশল বিজেপির ৪৬ শতাংশ ভোট শেয়ার নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুল উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও ভোটারদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকায় বড় ধরনের রদবদল এবং ধর্মীয় মেরুকরণের এই মিশেল পশ্চিমবঙ্গের কয়েক দশকের রাজনৈতিক ধারায় এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এল।