দেশের রাজনীতির চিত্র ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পাল্টে গেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালানোর পরই ছাত্রশিবিরের গুপ্ত রাজনীতির খবর ছড়িয়ে পড়ে। জামায়াত নিয়ন্ত্রিত এই ছাত্র সংগঠনটির নেতারা নিজেদের পরিচয় গোপন করে ছাত্রলীগের মিশে হেলমেট বাহিনী, লাঠিয়াল বাহিনী হয়েছিল। পরবর্র্তীতে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বে দেয়া শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল এনসিপি গঠন এবং পরবর্তীতে নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করার মধ্যদিয়ে প্রমান মেলে যে এনসিপি ও শিবির কার্যত একই রসুনের কোয়া। সম্প্রতি সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের একটি বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘এতোদিন আওয়ামী লীগ ও জামায়াত একসঙ্গেই ছিল। বিগত বছরগুলোতে সারাদেশে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, এমপি, স্থানীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ অনুগত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীক পাটর্নার গড়ে জামায়াত নেতারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন’। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে মুখোশ ধারী রাজনীতির বিপরীতে বিএনপি মাঠে সক্রিয় ছিল। যার কারণে আওয়ামী লীগের জুলুম-নির্যাতন, খুন, গুম, হামলা-মামলা বিএনপির নেতাকর্মীদের উপর দিয়ে গেছে। বিএনপি দেশের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে যে রাজনীতি করতে অভ্যস্ত সেটা ভোটারদের স্মরণ করিয়ে দিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল শনিবার ‘মায়ের ডাক ও আমরা বিএনপি পরিবার’ সংগঠন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বিএনপির রাজনীতির চিত্র তুলে ধরেন। মুখোশের রাজনীতির বিপরীতে বিএনপির রাজনীতি যে দেশ, দেশের মাটি ও মানুষের রাজনীতি সেটা তিনি আবারও দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিলেন।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করা হয়। আমরা বিএনপি পরিবার ও মায়ের ডাকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অবর্ণনীয় অত্যাচার-নির্যাতন, হামলা-মামলা, গুম-খুনের পরও বিএনপি নেতাকর্মীরা কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্তবেশ ধারণ করেনি। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা কখনো কখনো হয়তো কিছুটা স্তিমিত হয়েছে কিংবা আন্দোলন কখনো তুঙ্গে উঠেছে। এই আন্দোলন করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য গুম-খুন-অপহরণ, মিথ্যা মামলার হয়রানি, নির্যাতনের পরও বিএনপির একজন নেতাকর্মীও কিন্তু রাজপথ ছাড়েনি। একই পরিবারের এক ভাই গুম হয়েছে, আরেক ভাই গিয়ে তার জায়গায় পরের দিন রাজপথে আন্দোলনকে আরও তীব্রতর করার প্রতিজ্ঞার শপথ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্ত বেশ ধারণ করেনি বিএনপির কর্মীরা। তিনি আরো বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে দলের নেতাকর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের আপোষহীন ভূমিকা রাখতে পারে সেই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে কেউ এই দলকে দমন করে রাখতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। অনুষ্ঠানে মরহুমা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
জামায়াতের নাম উল্লেখ না করলেও কেউ কেউ গণতন্ত্রের পথকে বাধা সৃষ্টি করতে বির্তক সষ্টি করছে এবং এজন্য সকলকে সর্তক থাকার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতা প্রিয়, গণতন্ত্র প্রিয় প্রতিটি মানুষের সামনে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। কেউ কেউ বিভিন্ন রকম কথা বলে একটি অবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করছে যেখানে এই গণতন্ত্রের পথ যেটি তৈরি হয়েছে সেটি যাতে বাধাগ্রস্ত হয়। আমি অনুরোধ করব, বাংলাদেশের দল মত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন সেই প্রতিটি মানুষকে আজ সজাগ থাকার জন্য, যারা বিভিন্ন উসিলা দিয়ে বিতর্ক তৈরি করে গণতন্ত্রের পথকে আবার নষ্ট করার বা ব্যহত করার চেষ্টা করছেন তারা যাতে সফল না হয়।
অতীতের সকল অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে আগামীতে গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিষ্ঠা জরুরি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এবার যদি আমরা একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকার গঠনের সুযোগ হাতছাড়া করি তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আমাদের যে শহীদ, সেই শহীদদের প্রতি জুলুম করা হবে। তাদের আত্মত্যাগের প্রতি অমর্যাদা করা হবে, ৭১ সালের যারা শহীদ হয়েছেন এ দেশকে স্বাধীন করার জন্য, ৯০ এর স্বৈরাচারের বিরোধী আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, বিগত ১৬ বছরে যারা গুম-শহীদ হয়েছেন, বিভিন্নভাবে নির্যাতিত পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, ২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, যে হাজারো মানুষ বিভিন্নভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিচারকে যদি প্রতিষ্ঠিত করতে হয় তাহলে আগামী দিনে অবশ্যই বাংলাদেশের একটি গণতান্ত্রিক সরকার দরকার।
তিনি বলেন, আপনারা যারা আজকে সামনে বসে আছেন, এখানে উপস্থিত হয়েছেন শত কষ্ট বুকে নিয়ে, এই মানুষগুলো যাতে ন্যায়বিচার পেতে পারে, দেশের আইন অনুযায়ী যাতে ন্যায়বিচার পেতে পারে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি মাত্র উপায় হচ্ছে বাংলাদেশে আগামী দিনে অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যেই সরকার জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণে কাজ করবে, যারা নির্যাতিত হয়েছেন, অত্যাচারিত হয়েছেন তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, আসুন, আমরা আজকে সেই শপথ গ্রহণ করি, সেই প্রত্যাশা করি। যারা আজকে এখানে উপস্থিত হয়েছেন সেই উপস্থিতি যাতে বৃথা না যায়। আরা যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি হওয়া সেই অন্যায়ের বিচার যাতে হয়, শহীদের পরিবার যাতে ন্যায্যতা পেতে পারেন সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করি। আমরা ধৈর্য ধারণ করি, আমরা সজাগ থাকি, যাতে আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রা যা শুরু হয়েছে তাতে যাতে ব্যাঘাত করতে না পারে।
যারা বিগত দিনে আত্মত্যাগ করেছে রাষ্ট্র তাদের ভুলে যাবে না প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র কখনোই আপনাদেরকে ভুলে যেতে পারে না। সকল শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে আগামী দিনে বিএনপি কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাদকতার কারণে এই মুহূর্তে আমি হয়ত বিস্তারিতভাবে সেই পরিকল্পনা আজকের এই অনুষ্ঠানে তুলে ধরতে পারছি না। কিন্তু তারপর বলতে যদিও কষ্ট হচ্ছে যে আমরা দেখেছি নির্বাচনের কমিশনের রিসেন্ট কিছু বিতর্কিত ভূমিকা বা বিতর্কিত অবস্থান। তাররপরেও রাজনৈতিক একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে চাই।
তিনি বলেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে গণতান্ত্রিক মানুষ যেন এই শহীদদের বা এই গুম হয়ে যাওয়ার সদস্য এখনো যাদের অপেক্ষায় আমরা আছি, এখনো যাদের অপেক্ষায় পরিবাররা রয়েছেন, সেই শহীদদের আত্মত্যাগ থেকে প্রেরণা লাভ করতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আজ থেকে একবছরের বেশি সময় আগে আমি বলেছিলাম, আজ আবারো এই স্বজনহারা মানুষগুলোর সামনে আমি তুলে ধরতে চাই। সেটি হলো ইনশাআল্লাহ আমাদের দল বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমরা শহীদদের নামে রাষ্ট্রে বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিংবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পেশা স্থাপনার নামকরণ করব যাতে যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শহীদদেরকে গৌরবের সাথে স্মরণ রাখতে পারে।
বিএনপি প্রধান বলেন. রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর প্রতি সাধ্যমতো রাষ্ট্রীয় সহায়তার হাত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি।
তারেক রহমান বলেন, গুম-খুন-অপরণের শিকার এইসব মানুষের শোকাতর পরিবারগুলোর আশা, ভাষা হয়ে কাজ করে যাচ্ছে একটি সংগঠন মায়ের ডাক। ফ্যাসিবাদের শিকার মানুষদের প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছে মায়ের ডাকে সানজিদা ইসলাম তুলি। দল হিসেবে সাধ্য এবং সামর্থ্যের সবটুকু নিয়ে নির্যাতিত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে আমরা বিএনপি পরিবার। ফ্যাসিবাদী আমলের নির্যাতনের শিকার আমার সামনে বসা হাজারো প্রিয় মুখ, আপনাদের আত্মত্যাগ, আপনাদের বুক ভরা কষ্ট আমরা যারা আজ পেছনে রয়ে গিয়েছি, আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করব যাতে এটি বৃথা না যায় ইনশাল্লাহ। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে যারা গুম হয়েছেন, যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আগামী দিনে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা আমরা দেখছি। সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকারের অবশ্যই অনেক অনেক দায় এবং দায়িত্ব রয়েছে।
আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সভাপতিত্বে মায়ের ডাকের সভানেত্রী সানজিদা ইসলাম তুলি, আমার বিএনপি পরিবারের সদস্য জাহিদুল ইসলাম রনি ও মোকসেদুল মোমিন মিথুনের যৌথ সঞ্চালনায় এই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে গুম থেকে ফিরে আসা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, গুম থেকে ফিরে আসা হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন, প্রধান উপদেষ্টা উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, গুম হওয়া এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিনীর তাহসিনা রুশদীর লুনাসহ গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা তাদের বেদনা ও কষ্টের কথা তুলে ধরেন।
Reporter Name 





















