রাজপথের লড়াইয়ে, স্লোগানে-মিছিলে সামনের কাতারে থাকেন নারীরা। দেশে নারী-পুরুষ ভোটার সংখ্যা প্রায় সমান। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সে তুলনায় এবারও নারী প্রার্থী কম। সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন ভয়, রাজনৈতিক দলের কঠোর সিদ্ধান্তের অভাবসহ নানা কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দেশের ৩০০ আসনে দুই হাজার ৫৮২টি মনোনয়ন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ছিল ১০৭টি, যা মোট প্রার্থীর তুলনায় ৪.২৬ শতাংশ। এদের মধ্যে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর ৩৯ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। শেষমেশ নির্বাচনী প্রতিযোগিতার জন্য এখন পর্যন্ত টিকে আছেন ৬৮ নারী প্রার্থী।
৫ শতাংশ হিসাবে প্রতিটি দল থেকে ১৫ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়নপত্র দাখিলকারী ১০৭ নারীর ৪০ জনই স্বতন্ত্র। বিএনপি থেকে ১০ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) থেকে ১০ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল থেকে ছয়জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব থেকে ছয়জন, জাতীয় পার্টি থেকে পাঁচজন, বাসদ থেকে পাঁচজন, গণসংহতি আন্দোলন থেকে পাঁচজন এবং অন্যান্য দল থেকে ২০ জন মনোনয়ন পান।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরীর মতে, নারীদের শুধু ভোটার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা যে ভোট পেতে পারেন, প্রার্থী হতে পারেন, সেই জায়গায় সংশ্লিষ্টদের মনমানসিকতার পরিবর্তন ঘটেনি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে উঠে আসা দল এনসিপিও তাদের মনোনয়নের চিত্রে দেখাতে পারেনি উপযুক্ত নারী প্রতিনিধিত্ব। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের দলগুলোর মধ্যে শুধু এনসিপিই তিনজন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এনসিপি নেত্রী মাহমুদা মিতু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এনসিপি ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। আমার মনে হয় এনসিপি যদি ৩০০ আসনে মনোনয়ন দিত, সে ক্ষেত্রেও তারা নারীর পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারত। আর জোটের কথা যদি বলতেই হয়, আমরা যেহেতু সংস্কার প্রশ্নে জোটে গিয়েছি, সে ক্ষেত্রে সংস্কার হলে জোট থেকে ১০০ সংরক্ষিত নারী প্রার্থী থাকবে।’
চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন পাঁচজন : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনে ১৪৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী পাঁচজন, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৩.৪৯ শতাংশ। মনোনয়নপত্র দাখিলকারী এই পাঁচ নারী প্রার্থীর মধ্যে আবার দুজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। জেলায় এবার বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে কোনো নারী প্রার্থী নেই। এর আগে দ্বাদশ, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম থেকে একজন করে নারী ভোটে লড়াই করেছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে তিনজনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-খুলশী-পাহাড়তলী) আসনে আসমা আক্তার (বাসদ-মার্ক্সবাদী), ইনসানিয়াত বিপ্লবের প্রার্থী সাবিনা খাতুন এবং চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর) আসনের দীপা মজুমদার (বাসদ-মার্ক্সবাদী)। বতিল করা হয়েছে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়তে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী জিন্নাত আক্তার এবং চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার শাকিলা ফরজানার মনোনয়ন। তাঁরা প্রার্থিতা ফেরত পেতে আপিল করবেন বলে জানা গেছে।
নারী প্রার্থীরা বলছেন, দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় রাজনীতিতে তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন। অনেকে সাইবার বুলিংয়ের ভয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাননি। চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর) আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) থেকে ভোটে লড়তে চান দলটির চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সদস্য ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাবেক নগর সভাপতি দীপা মজুমদার। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীদের অনেক অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু নির্বাচনে মেয়েদের অংশগ্রহণ একেবারেই কম। নারী নেত্রী ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতির (চট্টগ্রাম) সাধারণ সম্পাদক জেসমিন সুলতানা পারু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিরাপত্তার কারণে অনেক নারী নির্বাচন করতে আসেন না। এ ছাড়া দল থেকে নারীদের সরাসরি নির্বাচন করার জন্য সুযোগ দেওয়া হয় না। দল থেকে নারীদের নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হলে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ত।’
গাজীপুরের পাঁচটি আসনে ৩২ পুরুষের সঙ্গে লড়বেন দুই নারী : গাজীপুর জেলার পাঁচটি আসনে ৩২ পুরুষ প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের মাঠে লড়বেন দুই নারী প্রার্থী। তাঁরা হলেন গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর) আসন থেকে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) তসলিমা আক্তার এবং গাজীপুর-২ (সদর-টঙ্গী) আসন থেকে ইনসানিয়াত বিপ্লব দলের সরকার তাসিলিমা আফেরাজ। দেখা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় জেলায় এবার নারী প্রার্থী অর্ধেক।
জেলা নিবার্চন অফিস সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন নিবার্চনে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তিন নারীসহ ৫৩ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে বাদ পড়েছেন এক স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীসহ ১৯ জন। এযাবৎ বৈধ প্রার্থী দুই নারীসহ ৩৪ জন। গাজীপুর-১ আসনে তসলিমা আক্তারসহ মোট বৈধ প্রার্থী ছয়জন। অন্যদিকে গাজীপুর-২ আসনে সরকার তাসিলিমা আফেরাজসহ বৈধ প্রার্থী ১০ জন।
গাজীপুর আদালতের সিনিয়র আইজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় মোট ভোটার ২৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৮ এবং নারী ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬৭ জন। পুরুষের চেয়ে নারী ভোটার বেশি ৯ হাজার ৫১৯ জন। নারী ভোটার বেশি হলেও জেলায় নারী প্রার্থী কমেছে। নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিতে আরো অধিকসংখ্যক নারীর নিবার্চনে অংশগ্রহণ প্রয়োজন ছিল।
Reporter Name 



















