,

Untitled-1-7

বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ছিলো স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ রোপন ক্ষেত্র

গোলসান আরা বেগমঃ বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ রোপন ক্ষেত্র ছিলো ভাষা আন্দোলন,ঐতিহাসিক ভাবে তা স্বীকৃত সত্য তত্ত্ব। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র সমাজের ভুমিকা ও একুশের অর্জনের পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। মহান একুশের বিজয় অর্জনেয়ারা জীবন দিয়ে রক্ত স্নানে উপেক্ষিত বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা চিনিয়ে এনেছে, তারা অবশ্যই সাহসী সূর্য সন্তান। তাদের অবদান বাংলাদেশের ছাব্বিশ হাজার বর্গমাইলের বুক জুড়ে স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে আমতলায় দাঁড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলনের স্থিরচিত্র হিসেবে জাতীয় সহিদ মিনার।তার আদলেই প্রায় সকল স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়,রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্টানে দেশে বিদেশে তৈরী করা হয়েছে একুশের স্মরণে শহিদ মিনার।ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ দেশের ছাত্র,তরুণ,ও শিল্পী- সাহিত্যিত-বুদ্ধিজীবিদের আন্দোলন দ্ধারা দুই দশকের মধ্যে জাতীয় জাগরণ ঘটিয়ে বাঙালির মুক্তির চেতনাকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে নিয়ে যায়।যার ধারাবাহিক আন্দোলনের পর নয় মাস ব্যাপি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ পেরিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।
যে স্লোগান নিয়ে সর্বদলীয় বাংলা ভাষা সংগ্রাম পরিষদ মাঠে নেমেছিলো– রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই,রাংলা ভাষার রাষ্ট্র চাই,তা স্বপ্নের সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে বাস্তবে পরিণত হয়। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারী ভাষা বিজয়ীদের রক্তে ধুয়ে বাংলা ভাষা পায় রাস্ট্রীয় স্বীকৃতি। সে দিন পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিলো ভাষা আন্দোলন প্রতিহত করতে।। ছাত্র ও ছাত্রী সমন্নয়ে ১০ জন করে দলে দলে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের বটতলা থেকে রাজ পথে নেমে আসে মার্শাল আইন ভঙ্গ করতে। পাকিস্তান সরকার সেই মিছিলে গুলি চালায়, রক্ত বন্যায় ভেসে যায় রফিক,সালাম, শফিক, ববরকত সহ অজানা তাজা প্রাণ। উত্থাল রাজপথের আন্দোলনে সরকার তারপর বাধ্য হয় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে।অতঃপর ১৯৯৬ সালে জাতিসংজ্ঞের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো অমর একুশকে দেয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা।
আজকের প্রজন্ম যাদের চোখে একটি সুন্দর সমাজ, সভ্যতা গড়ার স্বপ্ন দেখি, তারা ভুলতে বসেছে ভাষাবিজয়ী সৈনিক রফিক, সফিক, সালাম, বরকত ও তদসংশ্লিস্ট ইতিহাস। যারা ১৯৫২ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শুধু রক্ত নয় জীবন দিয়ে প্রতিষ্টিত করে বাঙালির মুখের ভাষা,মায়ের ভাষা, বাংলা ভাষার অধিকার। পরিশেষে স্বাধীনতার পথ পেরিয়ে আজকের সুখী সম্পৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্ম হয়।
১৯৪৭ এ দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ শাসিত ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তানের জন্ম হলেও রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রসঙ্গটি মিমাংসিত ছিলো না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ৪৭ এর পর পূর্ব পাকিস্তানে এসে ঘোষণা দেন — উর্দূই হবে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। তাৎক্ষনিক ভাবে এদেশের ছাত্রসমাজ ভাষার প্রসঙ্গে জিন্নাহর দাবিটি নাকজ করে দেয় ও প্রতিবাদমুখর হয়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা ভাষার দাবীতে উত্তাল আন্দোলন শুরু করে।এখানে উল্লেখ থাকে যে,৪৭ এর পূর্ব থেকেই এ দেশের বাঙালি বুদ্ধিজীবিরা সভা, সেমিনার, প্রবন্ধ নিবন্ধ জাতীয় দৈনিকে লিখে বাংলা ভাষার দাবিটি স্পষ্ট করে আসছিলো। পার্লামেন্ট সদস্য এডভোকেট ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দূর পাশাপাশি বাংলা ভাষা চালু করার দাবিটি সংসদে উত্থাপন করেছিলেন।কিন্তু তার পক্ষে অন্যান্য সাংসদের ইতিবাচক জুড়ালো ভুমিকা না থাকায় বিষয়টি বেশী দুর আগাতে পারেনি।
ব্রিটিশরা বাঙালিকে আড়াই শত বছর শোষণ নির্যাতনের মাধ্যমে শিক্ষা সংস্কৃতিতে অন্ধকার জাতিগোষ্টিতে পরিনত করেছিলো।সেখান থেকে মুক্ত হলেও নতুন কায়দায় পাকিস্তানের শোষণের গ্যাড়াকলে পড়ে বাঙালি। পাকিস্তানীরা মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে বাঙালিকে চেয়েছিলো অজ্ঞ,বোবা, বধির,বিবশ জাতিতে পরিণত করতে। তাই তারা ৫৬% বাঙালির বাংলা ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করে চেয়েছিলো ২৫% জনগণের উর্দুকে জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দিতে।না, বাঙালি তা হতে দেয়নি। ১৯৫৬ সালে সাংবিধানিক ভাবে বাংলা এবং উর্দূ ভাষা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। তারপরও ৬২ সালে রোমান হরফে বাংলা ভাষা চালু করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। সেই সময়ে জমির দলিল রেজিষ্ট্রি কারার স্টাম্প, মানিঅর্ডার করার ফর্ম উর্দূতে প্রিন্ট করা ছিলো, যা ব্যাবহার করা হতো জন স্বার্থে।
এতো রক্ত ঝরিয়ে বাংলা ভাষার বিজয় অর্জন সত্যি সাফল্যের, গর্বের,অহংকারের অর্জন। তারপরও স্কুলগামী ছেলেরা যখন একটি প্রশ্নের জবাবে বলে-” রফিক,সালাম, বরকত, প্রাণ দিয়ে স্বাধীনতা এনেছিলো এবং ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল”(২১ ফেব্রুয়ারী ২০২১, দৈনিক সংবাদ)। তখন আমাদের বিবেক বোধ তমকে দাঁড়ায়।আমরা জানি প্রাক প্রাথমিক শ্রেণি থেকে জাতীয় অর্জনগুলোর সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটানো হয়।তারপরও এই বেহাল অবস্থা কেন।
আরো অবাক হই– ৭০ বছর পর হাই কোর্ট বলছে, ভাষা সংগ্রামীদের তালিকা তৈরী করতে। এতো বছর পেরিয়ে এসে এখন নির্ভুল তালিকা করা কি সম্ভব হবে? আমাদের ভাষা আন্দোলনের ৪টি দাবি ছিলো।১।রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই২। রাজবন্দিদের মুক্তি চাই ৩। সর্বস্তরে বাংলা চালু কর এবং ৪।শহিদ স্মৃতি অমর হউক। আমাদের সেই দাবী পুর্ণাঙ্গরুপে পূর্ণ হয়নি। মাতৃভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষা শিক্ষার সর্বজনিন মাধ্যম হওয়া উচিত ছিলো। তা না হয়ে শিক্ষার সর্ব নিম্ন স্তর থেকেই বাংলা,ইংরেজী,কওমী,আরবি,নৃগোষ্টির ভাষাভাষিদের নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা ইত্যাদি শ্রেণি বৈষম্য সৃস্টিকারী শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রশ্ন হলো এ জন্যই কি জীবন দিয়ে ভাষার দাবী প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। আমরা জানি পৃথিবীতে যে সব অগ্রসর জাতি রয়েছে তারা কেউ মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে অন্যের ভাষায় বিদ্যা চর্চা করে না। তবে অামরা কেন তা পারি না।
না পারার পেছনে যুক্তি সঙ্গত কারণও রয়েছে। যেমন,আমাদের দেশের শ্রমিকরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রম বিক্রি করতে যায়।সে দেশের ভাষা না জানলে কাজ করবে কি করে।বাধ্য হয়েই বিদেশী ভাষা আত্মস্থ করে বিদেশ যাওয়ার ওয়ার্ক পারমিশান সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে ।অতঃপর বিদেশ গমন করে ও তাদের অর্জিত মুদ্রা আমাদের রাজ ভান্ডারকে চাঙ্গা করে।
ডিজিটাল বিপ্লবের বদৌলতে বাংলাদেশ হয়েছে গ্লোবাল ভিলেজের সদস্য। উন্নত জীবন মান গঠনের লক্ষ্যে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। বিশ্বশিক্ষায় আমাদের অংশ গ্রহন করতে হবে। ফলে জানতে হবে অন্যান্য দেশের ভাষা।এক মাত্র বাংলা ভাষায় অর্জিত উচ্চ স্তরের শিক্ষা দ্বারা জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব হয়ে ওঠবে না। তা ছাড়া উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে ঐ সমস্ত দেশের ভাষা সংস্কৃতির সম্পর্কে জানতে হবে। ফলে অন্য দেশের ভাষায়ও শিক্ষিত হতে হবে।
আমাদের শিক্ষাব্যাস্থায় রয়েছে নানা ভাষার জটিলতা। বাংলা,ইংরেজী,ইংরেজি ভার্সন, আরবি,এলেভেল,ওলেবেল,কওমি,নৃগোষ্টির ভাষা ইত্যাদি বহু ভাষার শিক্ষার প্রচলন। ফলে সুষম বাংলা ভাষার শিক্ষা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। কোর্টের আদেশ থাকা সত্ত্বেও উচ্চ বিচারিক কার্যাবলিতে বাংলা ব্যবহারের প্রচলন হচ্ছে না।
একুশে ফেব্রুয়ারী আসলেই শোক প্রকাশ, আলোচনা অনুষ্ঠান, শহিদ মিনারে ফুল দেয়া ইত্যাদি সহ নানা কর্মসুচি উদযাপন করি। গুণীজনদের কদর করে একুশে পদকে সন্মানিত করি। গদ্যে,পদ্যে,গানে,কবিতায়, সভা – সেমিনা,অলোচনাসভা, জাতীয় দৈনিকে প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে,একুশে বই মেলার আয়োজনসহ আরো বহু কায়দায় মহান একুশ ও আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবসকে করি উজ্জল অবস্থানে অধিষ্টিত। যেখানে শহিদ মিনার নেই,অবুঝ শিশুরা কলাগাছ দিয়ে শহিদ মিনার বানিয়ে দিবসটি উদযাপন করে। অথচ তারা জানে না কেন একুশে ফেব্রুয়ারীর এতো গুরুত্ব, এর পেছনের রক্ত ঝরা ইতিহাস কি।
অতঃপর প্রমিত ও শুদ্ধ বাংলা চর্চা করার কথা ভুলে যাই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রয়েছে বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ভাষার প্রচলন।সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুস্টিয়া, নৃগোষ্টিসহ বহু আঞ্চলিক ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এই আঞ্চলিক ভাষার বিভ্রাট দুর হবে কি ভাবে।অনেক সময় এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলের গালিতে পরিনত হতেও দেখা যায়।
আমরা মানুষের বোবাকাহিনীর কথাও জানি। সৃষ্টির ঊষালগ্নে মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করলেও মনের আবেগ,অনুভুতি,প্রেমপ্রীতি,সুখ দুঃখ,মনের চাহিদা বন্টন করতে পারতো না বাক্য বা কথা ধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে। একে অপরের দিকে বোবা প্রাণীর মতো ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকতো। বহু পথ ঘাট পেরিয়ে ধ্বনি সৃস্টি, ইশারা ঈঙ্গিত, শব্দ ইত্যাদির মাধ্যমে ভাব প্রকাশ করতে থাকে মানুষ। কথা বলার চেস্টা থেকে স্বরকম্পন এবং তা থেকে ধ্বনির সৃষ্টি ও হয় শব্দের গঠন। শব্দ থেকে লিপি ও বর্ণমালার উদ্ভব ঘটে। এর পেছনে ছিলো পাথর বা মাটির ফলকে, দেয়ালে আঁকা চিক্রাঙ্কনের মাধ্যমে ভাব প্রকাশের প্রচেস্টা।
বর্ণমালার আর্বিভাব কাল হিসেবে খ্রিস্টপূর্ব ১৭৩০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৫৮০ অব্দ পর্যন্তকে গণ্য করা হয়(২১ ফেব্রুয়ারী ২০২১ দৈনিক সংবাদ)। ৫২ টি ভাষার বর্ণ ব্যবহার করে মা শব্দটি সংযোজন করে সিলেটে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে নান্দনিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শহিদ মিনার স্থাপন করা হয়েছে। পরিশেষে বলবো বাঙালি বুকের রক্ত বিলিয়ে দিয়ে যে আন্দোলনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্টিত করে। সেই বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিলো স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ রোপণ ক্ষেত্র। আমাদের প্রতিঞ্জা থাকবে সর্ব স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার হবে বাস্তবায়িত।
জাতি সংঘের দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের যে প্রচেষ্টা, তাও অচিরেই বাস্তবতা পাবে।
Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর