সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক কারাবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত বাংলাদেশি প্রবাসী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রহণ করার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই তথ্য তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবেই দণ্ডিত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে ঢাকাকে হালনাগাদ তালিকা পাঠায় এবং বিভিন্ন বিষয়ে অবহিত করে। সরকারের কাছে থাকা সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে সংগৃহীত তথ্য ও তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন শহরের কারাগারে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি আটক বা বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড ভোগ করছেন।
তিনি আরও জানান, এরই মধ্যে সম্প্রতি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর এক মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। গত ১৪ অক্টোবর তাদের শিরচ্ছেদ করা হলেও এই চূড়ান্ত বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্বে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছুই অবহিত করা হয়নি বলে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে জানার পর অবিলম্বে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে ঘটনার বিস্তারিত পটভূমি, আইনি নথি ও রায়ের কপি চেয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে এ বিষয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা ও তথ্য চাওয়া হয়।
ঘটনার বিষয়ে আলোকপাত করে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যেকটি স্বাধীন দেশের নিজস্ব আইনি কাঠামো ও বিচার ব্যবস্থা রয়েছে এবং তারা সেই অনুযায়ী সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে আমাদের কোনো নাগরিক বিদেশের মাটিতে মৃত্যুদণ্ড বা কোনো বড় শাস্তির সম্মুখীন হলে, ভুক্তভোগী রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানার পূর্ণ অধিকার আমাদের রয়েছে।’
‘ভবিষ্যতে এই ধরনের অপ্রত্যাশিত ও মর্মান্তিক ঘটনা যাতে এড়ানো সম্ভব হয়, সেজন্যই আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারিক নথিপত্র ও রায়ের অনুলিপি চেয়ে পাঠিয়ছি,’ বলেন তিনি।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বিগত ও বর্তমান সরকারের দায়-দায়িত্ব প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এই ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৩ সালে। সেই সময়ে ক্ষমতায় ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপরের দেড় বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করেছে এবং বিগত ছয় মাস ধরে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব পালন করছে।
দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যেও সৌদি কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত কোনো আগাম তথ্য বাংলাদেশকে সরবরাহ করেনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বর্তমান সরকার প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভাই-বোনদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ সুরক্ষায় শতভাগ তৎপর রয়েছে এবং যেকোনো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বদ্ধপরিকর। প্রবাসীদের সুরক্ষায় সৌদি সরকারের সাথে সমন্বিত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এ ধরনের দূরবর্তী সমস্যার টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।’
একই সাথে বিদেশি মিশনে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি কূটনৈতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রবাসীদের সুনির্দিষ্ট সেবা প্রদানে কোনো মিশনের কর্তব্যে অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের কারণে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে ফিরে আটকা পড়েছেন, তাদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করা এবং চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যেও সরকার ও বিদেশি মিশনগুলো যৌথভাবে কাজ করছে।
এদিকে, ১০ অক্টোবর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মো. শাহেদ আহম্মেদসহ মোট ১৩ জন নিহত হন। উক্ত ঘটনায় কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরিসহ আরও একজন বাংলাদেশি নিহত হন এবং প্রায় ২৭ জন বাংলাদেশি নাগরিক মারাত্মকভাবে আহত হন।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, নিহত শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ বহনকারী বিমানটি শুক্রবার সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে এসে মরদেহের হস্তান্তরের সব আনুষ্ঠানিকতা পর্যবেক্ষণ করেন এবং স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
Reporter Name 
























