অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সন্ত্রাসীদের হাতে হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র মাঠে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লুটের অস্ত্রসহ অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ অভিযান জোরদার রয়েছে। প্রয়োজনে আরও জোরদার করা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩ মাসে (জুন-আগস্ট) সারা দেশে অস্ত্র আইনে ৪২৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে আগস্ট মাসে সর্বাধিক মামলা হয়েছে ১৫৯টি। ডিএমপি সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ওই ৩ মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অস্ত্র আইনে ৪০টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ৭৮ জন। উদ্ধার করা হয়েছে ৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র। এর মধ্যে অত্যাধুনিক বিদেশি রিভলভার ও পিস্তল, দেশি রিভলভার, বন্দুক, শুটারগান, পাইপগানসহ বিভিন্ন অস্ত্র রয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন মাস থেকে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে মামলা, গ্রেপ্তার ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা। অর্থাৎ গত ৩ মাসে ক্রমান্বয়ে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, গত আগস্ট মাসে সারা দেশে ৫১টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এদিকে সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নাশকতা তৎপরতা ঠেকাতে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলে ডিএমপি। ৩ শতাধিক চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো শুরু হয়। বাড়ানো হয় প্যাট্রোলিং। এরপরও অবৈধ অস্ত্রধারীদের দাপট থেমে থাকেনি। গত সোমবার রাতে দক্ষিণ বাড্ডা আলাতুন্নেছা স্কুলের পিছনের রাস্তায় দুই পক্ষের গোলাগুলি মাঝে পড়ে গুলিবিদ্ধ হন আলআমিন নামে এক পথচারী। একই রাতে মেরুল বাড্ডা বাজার গলিতে দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হন সাইফুল নামে এক ব্যক্তি। গত ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিম মাটিকাটায় নিউগিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের প্রকল্প এলাকায় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় তারা এলোপাতাড়ি কমপক্ষে ৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। অস্ত্রধারীদের মধ্যে মিরপুরের ফোর স্টার গ্রুপের সদস্যরা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র। শুধু এই ঘটনাগুলোই নয়- মাদক ব্যবসার দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যে নিয়মিতই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
যেভাবে আসছে অবৈধ অস্ত্র : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ২০টি রুট দিয়ে দেশে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র। চোরাচালান কারবারিরা নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে এসব অস্ত্র সীমান্ত পার করে দেশীয় কারবারিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরাও মিয়ানমার থেকে রাতের অন্ধকারে দেশে অস্ত্র নিয়ে আসছে। পরে এই অস্ত্র অর্ডার করা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যে কিছু অস্ত্রের চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশ আগ্নেয়াস্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে ঢোকে। এর মধ্যে সাব মেশিনগান (এসএমজি), রিভলভার, পিস্তল ও রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রও রয়েছে। পরে এসব অস্ত্রই সহিংসতা, খুনাখুনি থেকে শুরু করে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজিতে ব্যবহার করা হয়। অনলাইন অর্ডারেও এখন অবৈধ অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অনলাইনে অর্ডার করেই সম্প্রতি অস্ত্র বিক্রিতে জড়িত কয়েকজন কারবারিকে গ্রেপ্তার করে।
লুটের অস্ত্রও সন্ত্রাসীদের হাতে : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৬০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ১ হাজার ৩০৩টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে- শতাধিক চায়না রাইফেল, ৩০টি এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২ শতাধিক ৭.৬২ চায়না পিস্তল, প্রায় সাড়ে ৪ শ ৯ এমএম পিস্তল, প্রায় ৪ শ ১২ বোর শটগানসহ বিপুল গোলাবারুদ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের সময় লুট হওয়া এসব অস্ত্র সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করতেছে। বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছ থেকে অনেক অস্ত্র উদ্ধারও হয়েছে। এখনো উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলো সন্ত্রাসীদের হাতেই রয়েছে। যা নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনশৃঙ্খলার বড় হুমকি অবৈধ অস্ত্র : অবৈধ অস্ত্রের হুমকির বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, কঠোর অভিযান শুরু করেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ অস্ত্রের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। উল্টো নিয়মিতই দেশে অবৈধ অস্ত্রের চালান ঢুকছে। কোন কোন ক্ষেত্রে এসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে সেটির তালিকা করে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধুমাত্র অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের প্রশ্নে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান দরকার। কেননা- দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, এখনো উদ্ধার না হওয়া লুটের অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতেই রয়েছে। এগুলো আইনশৃঙ্খলায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
প্রয়োজনে অভিযান আরও জোরদার : লুটের অস্ত্র উদ্ধারে মুখ্য ভূমিকা পালন করা স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লুটের অস্ত্র উদ্ধারের পরিসংখ্যান আগের তুলনায় বেড়েছে। অভিযানও আগের তুলনায় ত্বরান্বিত হয়েছে। দেশের সবাই সহযোগিতা করলে উদ্ধার না হওয়া লুটের অস্ত্রগুলোও পর্যায়ক্রমে উদ্ধার হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে একটি অভিযান চলমান রয়েছে। তবে বড় সংখ্যক অবৈধ অস্ত্র এখনো বাইরে রয়েছে। সেগুলো উদ্ধারে প্রয়োজনে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, কোথাও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
Reporter Name 
























