ঢাকা ১০:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
সংবিধানে ফিরছে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা’; জানুয়ারিতে সংশোধন বিল, পাস হলেই গণভোট ধ্বংসস্তূপ থেকে যেভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া মুজতবা খামেনিকে আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গুরুত্বারোপ আইনমন্ত্রীর জুলাই-আগস্টে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার বিদেশি ঋণ পরিশোধ নিয়ন্ত্রণে আসছে রুট-জোনভিত্তিক কোটা জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৪৯ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ নিয়োগপত্র হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন প্রাথমিকের বঞ্চিতরা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ গ্রেপ্তার শেখ হাসিনা আসবেন না, দিল্লিতে বসে ষড়যন্ত্র করছেন: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী চুল হারানোর পর নিজের রূপ নিয়ে যা বললেন সামিয়া

নিয়ন্ত্রণে আসছে রুট-জোনভিত্তিক কোটা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:২৩:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ০ বার

রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে রুট ও জোনভিত্তিক কোটা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন সড়কে কত সংখ্যক অটোরিকশা চলবে, কোন রুটে চলাচলের অনুমতি থাকবে এবং কোথায় দাঁড়ানো বা যাত্রী ওঠানামা করা যাবে- সবই নির্ধারিত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বড় সড়কে অটোরিকশার চলাচল সীমিত বা নিষিদ্ধ করে সংযোগকারী ফিডার সড়কে প্রয়োজন ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী সংখ্যা বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও স্টপেজ, পিক আওয়ার ব্যবস্থাপনা এবং রুটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জিপিএস, জিওফেন্সিং ও ক্যামেরার মাধ্যমে ডিজিটাল নজরদারির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে অটোরিকশা ব্যবস্থাপনায় রুট, জনসংখ্যা, যাত্রী চাহিদা, বিদ্যমান গণপরিবহন, যানজট ও সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কোটা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি অনুমোদিত অটোরিকশাকে দেওয়া হবে ইউনিক ডিজিটাল আইডি; যুক্ত থাকবে মালিক, চালক, রুট, পারমিট, ফিটনেস ও জিপিএসের তথ্য। রুটের বাইরে গেলে ডিজিটাল সতর্কবার্তা এবং বারবার আইন লঙ্ঘন করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। ফলে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে শুধু সড়কে অভিযান নয়, তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ট্রাফিক বিভাগ।

রাজধানীর ফিডার সড়কে অটো রিকশার সংখ্যা নির্ধারণের বিষয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান, ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার আশফিজ্জামান আকতারকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে রুট ও জোনভিত্তিক কোটা, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও স্টপেজ, পিক আওয়ার ব্যবস্থাপনা, জিপিএস ও জিওফেন্সিং, ইউনিক ডিজিটাল আইডি, রঙভিত্তিক পরিচিতি, কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ এবং ধাপে ধাপে আইন প্রয়োগের নানা প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব ফিডার সড়কে সমানসংখ্যক অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে না। সড়কের দৈর্ঘ্য, সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা, সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা, বিদ্যমান গণপরিবহনের সংখ্যা, প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ ও সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে রুটভিত্তিক অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু রাস্তার আকার নয়, যাত্রী চাহিদাকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো এলাকায় যাত্রীর চাপ বেশি হলে সেখানে তুলনামূলক বেশি অটোরিকশা এবং কম চাহিদার এলাকায় কমসংখ্যক অটোরিকশা রাখার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে রুটভিত্তিক কোটা ব্যবস্থার একটি উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। যেমন- একটি রুটে সর্বোচ্চ ২০০টি, অন্য রুটে ২৫০টি এবং আরেকটি রুটে ৩০০টি অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তবে এগুলো কোনো নির্দিষ্ট রুটের চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; রুটভিত্তিক সর্বোচ্চ অনুমোদিত সংখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি বোঝাতে উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

যেসব সড়কে অটোরিকশা চলাচলের কারণে যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কিংবা গণপরিবহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, সেসব সড়কে অটোরিকশা চলাচল সীমিত করার সুপারিশ করেছে কমিটি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে প্রস্তাব করা হয়। আবার প্রয়োজন বিবেচনায় কোনো কোনো সড়কে নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সংখ্যা অথবা নির্দিষ্ট জোনে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। অর্থাৎ একসঙ্গে সব অটোরিকশা উচ্ছেদ বা নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে সড়কভেদে আলাদা নীতির কথা বলা হয়।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সময়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবও রয়েছে প্রতিবেদনে। কারণ সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে যে পরিমাণ অটোরিকশার প্রয়োজন হয়, দিনের অন্য সময়ে একই পরিমাণের প্রয়োজন নাও হতে পারে।

এজন্য পিক আওয়ারে প্রবেশ সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত করা এবং অফ-পিক সময়ে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী তুলনামূলক বেশি অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ঈদ, সরকারি ছুটি, বিভিন্ন সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ বিশেষ সময়ের জন্য পৃথক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রতিটি অনুমোদিত রুটে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড, পিক-আপ পয়েন্ট, ড্রপ-অফ পয়েন্ট, ওয়েটিং এরিয়া এবং টার্মিনাল/এন্ড পয়েন্ট নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতাল, স্কুল, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের আশপাশে যত্রতত্র অটোরিকশা দাঁড়ানো বন্ধে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো জিপিএসভিত্তিক ডিজিটাল রুট ম্যানেজমেন্ট। অনুমোদিত অটোরিকশায় জিপিএস সংযুক্ত করা হলে কোন গাড়ি কোথায় রয়েছে, নির্ধারিত রুটে চলছে কি না, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেছে কি না, কোথাও অতিরিক্ত অটোরিকশা জমা হয়েছে কি না- এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া জিও ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্ধারিত এলাকার বাইরে কোনো অটোরিকশা গেলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ কাগজে একটি রুট অনুমোদন দিয়ে বাস্তবে চালক অন্য রুটে চলে যাওয়ার সুযোগ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিটি অনুমোদিত অটোরিকশাকে একটি ‘ইউনিক ডিজিটাল আইডেনটিফিকেশন’ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, মালিকের তথ্য, চালকের তথ্য, রুট, রুট পারমিট, গাড়ির ফিটনেস, পারমিটের অবস্থা এবং জিপিএস ডিভাইসের তথ্য যুক্ত থাকবে। এ ছাড়া গাড়ির গায়ে কিউআর কোড বা ইউনিক আইডি নম্বর ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে তিন ধাপের কৌশল প্রস্তাব করেছে কমিটি। প্রথম ধাপে চালকদের নির্ধারিত রুট ও নিষিদ্ধ এলাকা সম্পর্কে সচেতন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে জিপিএস ও ক্যামেরার মাধ্যমে রুটের বাইরে গেলে ডিজিটাল সতর্কবার্তা দেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে বারবার আইন লঙ্ঘন করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অটোরিকশার কারণে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হয়- এমন স্থানগুলোকে ‘অটো রিকশা হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিটি হটস্পটে দৈনিক অটোরিকশার সংখ্যা, পিক আওয়ারে সংখ্যা, অপেক্ষার সময়, পার্কিং, যাত্রী চাহিদা ও যানজটের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী রুট বা অটোরিকশার সংখ্যা পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে একটি ‘সেন্ট্রাল অটো রিকশা ডেটাবেজ’ তৈরিরও সুপারিশ করেছে কমিটি। সেখানে গাড়ি, মালিক, চালক, রুট, পারমিট, জিপিএস, আইন লঙ্ঘন ও এনফোর্সমেন্ট-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এর ফলে কোন রুটে কতটি অটোরিকশা রয়েছে, কোন রুটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে এবং কোন গাড়ি বা চালক বারবার আইন ভাঙছে- এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে অটোরিকশার পাশাপাশি চালকদের ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, লেন শৃঙ্খলা, যাত্রী নিরাপত্তা, নির্ধারিত স্টপ ব্যবহার, পথচারীদের সঙ্গে আচরণ, জরুরি যানবাহনকে অগ্রাধিকার এবং অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে অভিযানকে শুধু ‘গাড়ি আটক’কেন্দ্রিক না করে ‘টার্গেটেড এনফোর্সমেন্ট’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে- নিষিদ্ধ রুটে চলাচল, নির্ধারিত সংখ্যার বেশি অটোরিকশা চলাচল, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান, ভুল জায়গায় পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো এবং অনুমোদনবিহীন অটোরিকশা।

কমিটির প্রতিবেদনে পুরো ব্যবস্থাটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের একটি কাঠামোও দেওয়া হয়েছে। প্রথমে রুট, জনসংখ্যা, যানবাহন ও যাত্রী চাহিদার তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর অনুমোদিত, নিয়ন্ত্রিত ও নিষিদ্ধ রুট নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তী ধাপে রুটভিত্তিক অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, ইউনিক আইডি/কিউআর/জিপিএস প্রদান, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও পিক-আপ-ড্রপ-অফ পয়েন্ট তৈরি, জিপিএস-ক্যামেরা-জিওফেন্সিংভিত্তিক ডিজিটাল মনিটরিং এবং নিয়মিত টার্গেটেড এনফোর্সমেন্ট চালুর প্রস্তাব রয়েছে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) আ স ম শামসুর রহমান ভূঁঞা আমাদের সময়কে বলেন, প্রধান সড়কে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের নানামুখী পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং বন্ধে বিভিন্ন গ্যারেজে অভিযান চালানো হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সংবিধানে ফিরছে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা’; জানুয়ারিতে সংশোধন বিল, পাস হলেই গণভোট

নিয়ন্ত্রণে আসছে রুট-জোনভিত্তিক কোটা

আপডেট টাইম : ১০:২৩:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে রুট ও জোনভিত্তিক কোটা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোন সড়কে কত সংখ্যক অটোরিকশা চলবে, কোন রুটে চলাচলের অনুমতি থাকবে এবং কোথায় দাঁড়ানো বা যাত্রী ওঠানামা করা যাবে- সবই নির্ধারিত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বড় সড়কে অটোরিকশার চলাচল সীমিত বা নিষিদ্ধ করে সংযোগকারী ফিডার সড়কে প্রয়োজন ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী সংখ্যা বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও স্টপেজ, পিক আওয়ার ব্যবস্থাপনা এবং রুটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জিপিএস, জিওফেন্সিং ও ক্যামেরার মাধ্যমে ডিজিটাল নজরদারির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে অটোরিকশা ব্যবস্থাপনায় রুট, জনসংখ্যা, যাত্রী চাহিদা, বিদ্যমান গণপরিবহন, যানজট ও সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কোটা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি অনুমোদিত অটোরিকশাকে দেওয়া হবে ইউনিক ডিজিটাল আইডি; যুক্ত থাকবে মালিক, চালক, রুট, পারমিট, ফিটনেস ও জিপিএসের তথ্য। রুটের বাইরে গেলে ডিজিটাল সতর্কবার্তা এবং বারবার আইন লঙ্ঘন করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। ফলে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে শুধু সড়কে অভিযান নয়, তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ট্রাফিক বিভাগ।

রাজধানীর ফিডার সড়কে অটো রিকশার সংখ্যা নির্ধারণের বিষয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান, ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার আশফিজ্জামান আকতারকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে রুট ও জোনভিত্তিক কোটা, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও স্টপেজ, পিক আওয়ার ব্যবস্থাপনা, জিপিএস ও জিওফেন্সিং, ইউনিক ডিজিটাল আইডি, রঙভিত্তিক পরিচিতি, কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ এবং ধাপে ধাপে আইন প্রয়োগের নানা প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব ফিডার সড়কে সমানসংখ্যক অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে না। সড়কের দৈর্ঘ্য, সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা, সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা, বিদ্যমান গণপরিবহনের সংখ্যা, প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ ও সড়কের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে রুটভিত্তিক অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু রাস্তার আকার নয়, যাত্রী চাহিদাকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো এলাকায় যাত্রীর চাপ বেশি হলে সেখানে তুলনামূলক বেশি অটোরিকশা এবং কম চাহিদার এলাকায় কমসংখ্যক অটোরিকশা রাখার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে রুটভিত্তিক কোটা ব্যবস্থার একটি উদাহরণও দেওয়া হয়েছে। যেমন- একটি রুটে সর্বোচ্চ ২০০টি, অন্য রুটে ২৫০টি এবং আরেকটি রুটে ৩০০টি অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তবে এগুলো কোনো নির্দিষ্ট রুটের চূড়ান্ত সংখ্যা নয়; রুটভিত্তিক সর্বোচ্চ অনুমোদিত সংখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি বোঝাতে উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

যেসব সড়কে অটোরিকশা চলাচলের কারণে যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কিংবা গণপরিবহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, সেসব সড়কে অটোরিকশা চলাচল সীমিত করার সুপারিশ করেছে কমিটি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে প্রস্তাব করা হয়। আবার প্রয়োজন বিবেচনায় কোনো কোনো সড়কে নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সংখ্যা অথবা নির্দিষ্ট জোনে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। অর্থাৎ একসঙ্গে সব অটোরিকশা উচ্ছেদ বা নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে সড়কভেদে আলাদা নীতির কথা বলা হয়।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সময়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবও রয়েছে প্রতিবেদনে। কারণ সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে যে পরিমাণ অটোরিকশার প্রয়োজন হয়, দিনের অন্য সময়ে একই পরিমাণের প্রয়োজন নাও হতে পারে।

এজন্য পিক আওয়ারে প্রবেশ সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত করা এবং অফ-পিক সময়ে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী তুলনামূলক বেশি অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ঈদ, সরকারি ছুটি, বিভিন্ন সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ বিশেষ সময়ের জন্য পৃথক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রতিটি অনুমোদিত রুটে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড, পিক-আপ পয়েন্ট, ড্রপ-অফ পয়েন্ট, ওয়েটিং এরিয়া এবং টার্মিনাল/এন্ড পয়েন্ট নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতাল, স্কুল, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের আশপাশে যত্রতত্র অটোরিকশা দাঁড়ানো বন্ধে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো জিপিএসভিত্তিক ডিজিটাল রুট ম্যানেজমেন্ট। অনুমোদিত অটোরিকশায় জিপিএস সংযুক্ত করা হলে কোন গাড়ি কোথায় রয়েছে, নির্ধারিত রুটে চলছে কি না, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেছে কি না, কোথাও অতিরিক্ত অটোরিকশা জমা হয়েছে কি না- এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া জিও ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্ধারিত এলাকার বাইরে কোনো অটোরিকশা গেলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ কাগজে একটি রুট অনুমোদন দিয়ে বাস্তবে চালক অন্য রুটে চলে যাওয়ার সুযোগ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিটি অনুমোদিত অটোরিকশাকে একটি ‘ইউনিক ডিজিটাল আইডেনটিফিকেশন’ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, মালিকের তথ্য, চালকের তথ্য, রুট, রুট পারমিট, গাড়ির ফিটনেস, পারমিটের অবস্থা এবং জিপিএস ডিভাইসের তথ্য যুক্ত থাকবে। এ ছাড়া গাড়ির গায়ে কিউআর কোড বা ইউনিক আইডি নম্বর ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে তিন ধাপের কৌশল প্রস্তাব করেছে কমিটি। প্রথম ধাপে চালকদের নির্ধারিত রুট ও নিষিদ্ধ এলাকা সম্পর্কে সচেতন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে জিপিএস ও ক্যামেরার মাধ্যমে রুটের বাইরে গেলে ডিজিটাল সতর্কবার্তা দেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে বারবার আইন লঙ্ঘন করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অটোরিকশার কারণে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হয়- এমন স্থানগুলোকে ‘অটো রিকশা হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিটি হটস্পটে দৈনিক অটোরিকশার সংখ্যা, পিক আওয়ারে সংখ্যা, অপেক্ষার সময়, পার্কিং, যাত্রী চাহিদা ও যানজটের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী রুট বা অটোরিকশার সংখ্যা পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে একটি ‘সেন্ট্রাল অটো রিকশা ডেটাবেজ’ তৈরিরও সুপারিশ করেছে কমিটি। সেখানে গাড়ি, মালিক, চালক, রুট, পারমিট, জিপিএস, আইন লঙ্ঘন ও এনফোর্সমেন্ট-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এর ফলে কোন রুটে কতটি অটোরিকশা রয়েছে, কোন রুটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে এবং কোন গাড়ি বা চালক বারবার আইন ভাঙছে- এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে অটোরিকশার পাশাপাশি চালকদের ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, লেন শৃঙ্খলা, যাত্রী নিরাপত্তা, নির্ধারিত স্টপ ব্যবহার, পথচারীদের সঙ্গে আচরণ, জরুরি যানবাহনকে অগ্রাধিকার এবং অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে অভিযানকে শুধু ‘গাড়ি আটক’কেন্দ্রিক না করে ‘টার্গেটেড এনফোর্সমেন্ট’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে- নিষিদ্ধ রুটে চলাচল, নির্ধারিত সংখ্যার বেশি অটোরিকশা চলাচল, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান, ভুল জায়গায় পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো এবং অনুমোদনবিহীন অটোরিকশা।

কমিটির প্রতিবেদনে পুরো ব্যবস্থাটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের একটি কাঠামোও দেওয়া হয়েছে। প্রথমে রুট, জনসংখ্যা, যানবাহন ও যাত্রী চাহিদার তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর অনুমোদিত, নিয়ন্ত্রিত ও নিষিদ্ধ রুট নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তী ধাপে রুটভিত্তিক অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, ইউনিক আইডি/কিউআর/জিপিএস প্রদান, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও পিক-আপ-ড্রপ-অফ পয়েন্ট তৈরি, জিপিএস-ক্যামেরা-জিওফেন্সিংভিত্তিক ডিজিটাল মনিটরিং এবং নিয়মিত টার্গেটেড এনফোর্সমেন্ট চালুর প্রস্তাব রয়েছে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) আ স ম শামসুর রহমান ভূঁঞা আমাদের সময়কে বলেন, প্রধান সড়কে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের নানামুখী পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং বন্ধে বিভিন্ন গ্যারেজে অভিযান চালানো হচ্ছে।