ঢাকা ১১:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

শেখ হাসিনার ‘৪০০ কোটির পিয়ন’ জাহাঙ্গীরের ফ্ল্যাট সাম্রাজ্য এখন কার হাতে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:০৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩ বার

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তার কাজের লোক জাহাঙ্গীর ৪শ কোটি টাকার মালিক। অথচ শুধুমাত্র মিরপুরেই তার ছিলো হাজার কোটি টাকার বাড়ি-ফ্লাট এবং স্থাবর সম্পদ।

মিরপুর-২ এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন সম্পদের এক বলয়। এই এলাকার প্রায় প্রতিটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনেই তার নামে ছিলো একাধিক ফ্ল্যাট। শুধু তাই নয়, জমি দখল থেকে বহুতল ভবনের মালিক হওয়া জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্যে পিষ্ট ছিলো মিরপুরের বাসিন্দারা। পট পরিবর্তনের পর এসব ফ্ল্যাট ও ভবনের মালিকানা রাতারাতি বদলে গেছে কয়েকজনের হাত ধরে!

স্কুলের গন্ডি না পেরোনো নোয়াখালীর জাহাঙ্গীর ভাগ্যের সন্ধানে ঢাকায় এসে এক উঠতি মডেলের ড্রাইভার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট  আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার দিন আহত হন জাহাঙ্গীর। পরে তাকে দেখতে হাসপাতালে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। সেই থেকে লাইমলাইটে আসেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্টাফ জাহাঙ্গীর।

২০০৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্টাফ হিসাবে নিয়োগ পান তিনি। তখন তাকে শেখ হাসিনার খাবার, পানি-টিস্যু বহন করতে দেখা যেতো বলে একসময় ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে পরিচিতি পান।

প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে থাকার সুবিধা কাজে লাগিয়ে নানা তদবির বাণিজ্য করে শত শত কোটি টাকার মালিক হন জাহাঙ্গীর। তার দাপট এতোটাই ছিলো যে সচিব এমনকি এমপি-মন্ত্রীরাও জাহাঙ্গীরের নেক নজর পেতে নগদ অর্থের পাশাপাশি শত শত কোটি টাকার ব্যবসা দিয়েছেন তার পছন্দের লোকদের। এভাবেই নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে এতো সম্পদের মালিক হন যে গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে যেতেন হেলিকাপ্টারে করে, যা শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে তার বিপুল সম্পদের কথা জানান। এরপর জাহাঙ্গীরের সম্পদ অনুসন্ধানে নামে দুদক ও সিআইডি। বেরিয়ে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তবে, এসব তথ্যের আড়ালে রয়ে যায় তার আরও কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের গল্প। সেই গল্পের ঘাঁটি মিরপুর দুই। সেখানে তার নামে রয়েছে অসংখ্য ফ্ল্যাট ও বাড়ি। ফ্ল্যাটগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে ভয়ে তটস্থ স্থানীয়রা ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে নারাজ।

স্থানীয়দের দাবি, এ কে রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকায় একের পর এক ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনগুলোর প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে একাধিক ফ্ল্যাট নিতেন জাহাঙ্গীর। তাদের দাবি, শুধু মিরপুর-২ এলাকাতেই তার ২০ থেকে ২৫টি ফ্ল্যাট, একটি বহুতল ভবন ও দামি জমি রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, জাহাঙ্গীর যুক্তরাষ্ট্রে আত্মগোপনে গেলে তার এসব ফ্ল্যাটের মধ্যে বেশ কিছু বিক্রি হয়ে যায় কম দামে। কিছু ফ্ল্যাট আত্মীয়দের মাধ্যমে আর কিছু ফ্ল্যাট তার কোম্পানিতে একসময় সামান্য বেতনে কাজ করা আব্দুল হান্নান, মাহফুজ হাসনাত কামরুল, পিচ্চি কামালসহ একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে বিক্রি করেন জাহাঙ্গীর।
জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠানে একসময় সামান্য বেতনে কাজ করা হান্নান এখন নিজেই নতুন রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান গড়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকার কাজ চালাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। এছাড়া মুদি দোকানি কামরুলও এখন জাহাঙ্গীরের হাত ধরে কোটি টাকার মালিক। তবে, অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কামরুল ও কামালকে পাওয়া না গেলেও মুঠোফোনে আব্দুল হান্নান জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়, তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। তবে জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কথা স্বীকার করেন তিনি।

মিরপুরে নিজের সাম্রাজ্য গড়তে ও প্রভাব ধরে রাখতে বিরোধী মতের ওপর নির্যাতন চালানো জাহাঙ্গীরের অত্যাচারে মিরপুরের বহু মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীরের স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে রয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার সম্পদ। ধানমন্ডিতে একটি ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যবসায় ৭৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ। ব্যাংক হিসাব নম্বরে কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া জাহাঙ্গীরের নামে ৪ কোটি টাকার জমি, রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও নিউমার্কেটে দুটি দোকান, মিরপুরে সাততলা ভবন ও অসংখ্য ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে একতলা ভবন এবং চাটখিলে চারতলা বাড়ি রয়েছে। নোয়াখালীর মাইজদী শহরের হরিনারায়ণপুর এলাকায় তার পরিবারের একটি আটতলা বাড়ি রয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হওয়ার ভয়ে এসব সম্পদের বেশিরভাগ তার শ্বশুর ও আত্মীয়দের নামে লিখে দিয়েছেন তিনি।

গেল একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলম নোয়াখালী-১, চাটখিল-সোনাইমুড়ী আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তিনি চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের নাহারখিল গ্রামের বাসিন্দা।

জনমনে প্রশ্ন- মিরপুরে জাহাঙ্গীরের নামে গড়ে ওঠা সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও মূল্য কতো? পটপরিবর্তনের পর কাদের হাতে এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

পণ্য খালাসের সময় ও ব্যয় কমাতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার তাগিদ বাণিজ্যমন্ত্রীর

শেখ হাসিনার ‘৪০০ কোটির পিয়ন’ জাহাঙ্গীরের ফ্ল্যাট সাম্রাজ্য এখন কার হাতে

আপডেট টাইম : ১১:০৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তার কাজের লোক জাহাঙ্গীর ৪শ কোটি টাকার মালিক। অথচ শুধুমাত্র মিরপুরেই তার ছিলো হাজার কোটি টাকার বাড়ি-ফ্লাট এবং স্থাবর সম্পদ।

মিরপুর-২ এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন সম্পদের এক বলয়। এই এলাকার প্রায় প্রতিটি বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনেই তার নামে ছিলো একাধিক ফ্ল্যাট। শুধু তাই নয়, জমি দখল থেকে বহুতল ভবনের মালিক হওয়া জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্যে পিষ্ট ছিলো মিরপুরের বাসিন্দারা। পট পরিবর্তনের পর এসব ফ্ল্যাট ও ভবনের মালিকানা রাতারাতি বদলে গেছে কয়েকজনের হাত ধরে!

স্কুলের গন্ডি না পেরোনো নোয়াখালীর জাহাঙ্গীর ভাগ্যের সন্ধানে ঢাকায় এসে এক উঠতি মডেলের ড্রাইভার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট  আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার দিন আহত হন জাহাঙ্গীর। পরে তাকে দেখতে হাসপাতালে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। সেই থেকে লাইমলাইটে আসেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্টাফ জাহাঙ্গীর।

২০০৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্টাফ হিসাবে নিয়োগ পান তিনি। তখন তাকে শেখ হাসিনার খাবার, পানি-টিস্যু বহন করতে দেখা যেতো বলে একসময় ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে পরিচিতি পান।

প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে থাকার সুবিধা কাজে লাগিয়ে নানা তদবির বাণিজ্য করে শত শত কোটি টাকার মালিক হন জাহাঙ্গীর। তার দাপট এতোটাই ছিলো যে সচিব এমনকি এমপি-মন্ত্রীরাও জাহাঙ্গীরের নেক নজর পেতে নগদ অর্থের পাশাপাশি শত শত কোটি টাকার ব্যবসা দিয়েছেন তার পছন্দের লোকদের। এভাবেই নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে এতো সম্পদের মালিক হন যে গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে যেতেন হেলিকাপ্টারে করে, যা শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে তার বিপুল সম্পদের কথা জানান। এরপর জাহাঙ্গীরের সম্পদ অনুসন্ধানে নামে দুদক ও সিআইডি। বেরিয়ে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তবে, এসব তথ্যের আড়ালে রয়ে যায় তার আরও কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদের গল্প। সেই গল্পের ঘাঁটি মিরপুর দুই। সেখানে তার নামে রয়েছে অসংখ্য ফ্ল্যাট ও বাড়ি। ফ্ল্যাটগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে ভয়ে তটস্থ স্থানীয়রা ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে নারাজ।

স্থানীয়দের দাবি, এ কে রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকায় একের পর এক ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনগুলোর প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে একাধিক ফ্ল্যাট নিতেন জাহাঙ্গীর। তাদের দাবি, শুধু মিরপুর-২ এলাকাতেই তার ২০ থেকে ২৫টি ফ্ল্যাট, একটি বহুতল ভবন ও দামি জমি রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, জাহাঙ্গীর যুক্তরাষ্ট্রে আত্মগোপনে গেলে তার এসব ফ্ল্যাটের মধ্যে বেশ কিছু বিক্রি হয়ে যায় কম দামে। কিছু ফ্ল্যাট আত্মীয়দের মাধ্যমে আর কিছু ফ্ল্যাট তার কোম্পানিতে একসময় সামান্য বেতনে কাজ করা আব্দুল হান্নান, মাহফুজ হাসনাত কামরুল, পিচ্চি কামালসহ একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে বিক্রি করেন জাহাঙ্গীর।
জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠানে একসময় সামান্য বেতনে কাজ করা হান্নান এখন নিজেই নতুন রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান গড়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকার কাজ চালাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। এছাড়া মুদি দোকানি কামরুলও এখন জাহাঙ্গীরের হাত ধরে কোটি টাকার মালিক। তবে, অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কামরুল ও কামালকে পাওয়া না গেলেও মুঠোফোনে আব্দুল হান্নান জানান, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়, তাকে ফাঁসানো হচ্ছে। তবে জাহাঙ্গীরের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কথা স্বীকার করেন তিনি।

মিরপুরে নিজের সাম্রাজ্য গড়তে ও প্রভাব ধরে রাখতে বিরোধী মতের ওপর নির্যাতন চালানো জাহাঙ্গীরের অত্যাচারে মিরপুরের বহু মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীরের স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে রয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার সম্পদ। ধানমন্ডিতে একটি ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যবসায় ৭৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ। ব্যাংক হিসাব নম্বরে কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া জাহাঙ্গীরের নামে ৪ কোটি টাকার জমি, রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও নিউমার্কেটে দুটি দোকান, মিরপুরে সাততলা ভবন ও অসংখ্য ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে একতলা ভবন এবং চাটখিলে চারতলা বাড়ি রয়েছে। নোয়াখালীর মাইজদী শহরের হরিনারায়ণপুর এলাকায় তার পরিবারের একটি আটতলা বাড়ি রয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হওয়ার ভয়ে এসব সম্পদের বেশিরভাগ তার শ্বশুর ও আত্মীয়দের নামে লিখে দিয়েছেন তিনি।

গেল একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলম নোয়াখালী-১, চাটখিল-সোনাইমুড়ী আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তিনি চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের নাহারখিল গ্রামের বাসিন্দা।

জনমনে প্রশ্ন- মিরপুরে জাহাঙ্গীরের নামে গড়ে ওঠা সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও মূল্য কতো? পটপরিবর্তনের পর কাদের হাতে এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ?