ঢাকা ০৯:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
‘দেশে যদি তেলই না থাকে, তাহলে লংমার্চের গাড়ি কি তেলে চলে না এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিউইয়র্ক সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হতে পারে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের ফেরার পথ বন্ধ চায় সংসদীয় কমিটি প্রধানমন্ত্রীকে দুই বিষয়ে সতর্ক থাকতে বললেন মির্জা আব্বাস ১১ দলীয় ঐক্যের বিশাল সমাবেশ জনগণের প্রয়োজনে যেকোনো সময় আন্দোলনের ডাক: ডা. শফিকুর রহমান ইতিহাসের সেরা ২ নারী গোয়েন্দা ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তির মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে: প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র, লক্ষ্য কী দক্ষিণখানে অস্ত্র-মাদকসহ কিশোর গ্যাংয়ের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার

জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি কমলো কীভাবে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:১২:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
  • ৩৩ বার

জুলাই মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামায় অর্থনীতির জন্য এটিকে আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির খবরই বলা যায়। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে কমেছে দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুনের ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে জুলাইয়ে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে।

কিন্তু এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাজার-অভিজ্ঞতার যেন কোনও মিল নেই। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা-ময়দা, পেঁয়াজ, রসুন কিংবা অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারে এমন কোনও বড় ধরনের স্বস্তি আসেনি, যার কারণে একজন সাধারণ ক্রেতা বলতে পারেন—‘বাজার তো সস্তা হয়েছে।’

বরং জুলাই শেষ হতে না হতেই আগস্টের শুরুতে পাইকারি বাজারে বেশ কিছু পণ্যের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, মসলা, রসুন ও পেঁয়াজের মতো পণ্যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বিরূপ আবহাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও নতুন করে বাজারে চাপ তৈরি করছে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে— জিনিসপত্রের দাম যদি কমে না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমলো কীভাবে?

এর সহজ উত্তর হলো, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কমে যাওয়া। এই পার্থক্যটিই পরিসংখ্যানের স্বস্তি, আর মানুষের বাজারের কষ্টের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, দাম নয়

মূল্যস্ফীতি বলতে সাধারণভাবে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তর কতটা বেড়েছে, সেটিকে বোঝানো হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হিসাব করে আগের বছরের একই মাসের তুলনায়।

অর্থাৎ জুলাই ২০২৬-এর মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মানে এই নয় যে জুলাই মাসে বাজারের পণ্যগুলোর দাম আগের মাস জুনের তুলনায় ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়েছে বা কমেছে। এর অর্থ হলো, এক বছর আগের জুলাইয়ের তুলনায় পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তর ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। এখানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিসংখ্যানের হিসাবের বড় পার্থক্য।

ধরা যাক, একটি পণ্যের দাম এক বছর আগে ছিল ১০০ টাকা। এক বছরে সেটি বেড়ে ১২০ টাকা হলো। পরের মাসে দাম ১২৫ টাকা না বেড়ে ১২৩ টাকা হলো। অর্থাৎ দাম কিন্তু কমেনি, বরং বেড়েছে। শুধু আগের তুলনায় বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিই কাজ করে।

ফলে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নামলেও বাজারে পণ্যের দাম কমে গেছে— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

তিন মাস পর ৯ শতাংশের নিচে

বিবিএসের সর্বশেষ হিসাবে জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ এপ্রিল, মে ও জুন—টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল।

জুলাইয়ে এসে তা ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। গত আট মাসের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে পতন হয়েছে আরও বেশি। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। অর্থাৎ এক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।

অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। জুনের ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে তা নেমে এসেছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে। কাগজে-কলমে এসব তথ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিলে পুরো চিত্রটি এতটা স্বস্তিদায়ক নয়।

কারণ, আগের উচ্চ দাম থেকেই নতুন হিসাব দীর্ঘ সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকার কারণে পণ্যের দাম ইতোমধ্যেই অনেক বেড়ে গেছে। এখন সেই উচ্চ দামের ওপর যদি নতুন করে দাম বাড়ার হার কিছুটা কমে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কম দেখাতে পারে। কিন্তু বাজারের দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমছে মানেই বাজার আগের মতো সস্তা হয়ে যাচ্ছে— এমন ধারণা ভুল।

গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেল, মসলা, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবার খরচ বেড়েছে। মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও আগের উচ্চ মূল্যস্তরের চাপ থেকে যাচ্ছে। এই কারণে একজন ভোক্তার কাছে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে আসার খবর খুব বেশি স্বস্তির মনে নাও হতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে মূল্যস্ফীতি কমা আর জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়া এক বিষয় নয়।’’

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হওয়ার অর্থ হলো, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনও ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ বাজারে দাম কমেনি; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। এ কারণেই পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে গিয়ে এর সুফল ভোক্তারা সেভাবে অনুভব করছেন না।’’

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘মূল্যস্ফীতির হার কম দেখানোর ক্ষেত্রে ‘ভিত্তি প্রভাব’ও (বেস ইফেক্ট) ভূমিকা রাখতে পারে। আগের বছরের একই সময়ে মূল্যস্তর যদি অনেক বেশি থাকে, তাহলে সেই উচ্চ মূল্যের সঙ্গে চলতি বছরের তুলনা করলে মূল্যস্ফীতির হার তুলনামূলক কম দেখা যেতে পারে। ফলে শুধু নির্দিষ্ট সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমেছে কিনা, তা দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রকৃত চাপ পুরোপুরি বোঝা যায় না।’’

তিনি বলেন, ‘‘চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, আটা-ময়দাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যদি এখনও উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতি কমার পরিসংখ্যান খুব একটা স্বস্তির বার্তা দেবে না। কারণ এসব মানুষের আয়ের বড় একটি অংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই ব্যয় হয়।’’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘তাই জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে আসাকে অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারে এরই মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ শতাংশের ওপরে, অর্থাৎ মানুষের ওপর মূল্যচাপ যথেষ্ট বেশি।’

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মূল্যস্ফীতি কমার বিষয়ে সরকারের দেওয়া তথ্যের বাস্তবতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যেসব পণ্য ও সেবার দাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেগুলোর অধিকাংশের দামই এখনো বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি কমেছে—সরকারের এই দাবির সত্যতা কতটুকু, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।’’

তিনি বলেন, ‘‘আগের সরকারের সময়ের মতো তথ্যকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করে সরকারকে খুশি করার কোনও প্রবণতা আবারও অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান না হলে সেই পরিসংখ্যানের বাস্তব তাৎপর্য থাকে না।’’

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘‘দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতিও এখনো নাজুক। বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, অথচ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানোর পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগের চিত্র বোঝা যাবে না।’’

মানুষের আয় কি দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে?

এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ গড়ে মজুরি বৃদ্ধির হারও মূল্যস্ফীতির নিচে রয়েছে। এর সরল অর্থ হলো, মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, জীবনযাত্রার খরচ তার চেয়ে কিছুটা বেশি বেড়েছে। এতে প্রকৃত আয় বা মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

একজন শ্রমিক বা মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় বছরে ৮ শতাংশ বাড়লেও যদি সংসারের খরচ ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বা তারও বেশি বাড়ে, তাহলে কাগজে আয় বাড়লেও বাস্তবে তার হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকে না। বরং আগের মতো জীবনযাপন করতে গিয়ে তাকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়, ঋণ করতে হয় কিংবা খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হয়।

খাদ্যই যখন পরিবারের সবচেয়ে বড় ব্যয়

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। কারণ দেশের মানুষের ভোগব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যের পেছনে যায়। সিপিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ভোক্তা মূল্যসূচকের ঝুড়িতে খাদ্যের অংশ প্রায় ৫৯ শতাংশ। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে।

সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের প্রায় ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশই খাদ্যের পেছনে যায়। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি আঘাত আসে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।

তাই খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে আসার খবর ইতিবাচক হলেও, বাস্তবে বাজারে পণ্যের দাম কম না হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ খুব একটা কমে না।

বাজারে কেন স্বস্তি নেই?

মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান কমার পাশাপাশি বাজারে আবার নতুন করে দাম বাড়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজার। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সংকট ও পরিবহন ব্যয়। তৃতীয়ত, দেশের সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা। চতুর্থত, দীর্ঘ ও অদক্ষ বিপণন ব্যবস্থা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মজুতদারি, সীমিত প্রতিযোগিতা এবং কিছু ক্ষেত্রে বাজারে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের আমদানিতে উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর কমানো হয়েছিল। সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে তা কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়।

এর ফলে জুনের শেষার্ধ ও জুলাইয়ে পাইকারি বাজারে কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু এই সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

আগস্টের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা নতুন করে পণ্যের দাম বাড়াতে শুরু করেছে।

খাতুনগঞ্জে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ দেশের অন্যতম বড় ভোগ্যপণ্য পাইকারি বাজার। সেখানে গত ৮ থেকে ১০ দিনে গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, মসলা, রসুন ও পেঁয়াজসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।

দেড় মাস আগে পাইকারি বাজারে প্রতি মণ পাম তেলের দাম ছিল ৬ হাজার ২৫০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা। এখন তা বেড়ে ৬ হাজার ৪০০ টাকায় উঠেছে। সুপার পাম তেলের দাম বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৫৫০ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা। সয়াবিন তেলের দামও প্রায় ১৫০ টাকা বেড়ে প্রতি মণ ৭ হাজার ৪০০ টাকায় উঠেছে।

চিনির বাজারেও একই প্রবণতা। কিছুদিন আগে প্রতি মণ চিনি ৩ হাজার ৪৫০ থেকে ৩ হাজার ৪৮০ টাকার মধ্যে থাকলেও এখন তা বেড়ে ৩ হাজার ৬৬০ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাজারে গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আবারও স্পষ্ট হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চাপ গমে

বর্তমানে গমের বাজার পরিস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কয়েক মাস ধরে প্রতি মণ গমের দাম ১ হাজার ২৮০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে ছিল। গত দুই সপ্তাহে তা বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সর্বশেষ সময়ে কিছুটা কমে ১ হাজার ৪৩০ থেকে ১ হাজার ৪৩৫ টাকার মধ্যে থাকলেও আগের তুলনায় দাম এখনও অনেক বেশি। এর প্রভাব পড়েছে আটা-ময়দার বাজারে।

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে খোলা সাদা আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। প্যাকেটজাত আটার দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। খোলা ময়দার দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

এক বছরের হিসাব আরও বড় উদ্বেগের। এ সময়ে খোলা আটার দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত আটার দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

তাহলে একজন ভোক্তার কাছে মূল্যস্ফীতি কমার স্বস্তি কতটা পৌঁছাবে, যদি তার প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় আটা-ময়দার দামই আগের বছরের তুলনায় এত বেশি থাকে?

আন্তর্জাতিক যুদ্ধও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

গমের বাজারে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও স্পষ্ট। রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের গম সরবরাহের বড় অংশ জোগান দেয়। কৃষ্ণসাগর দিয়ে গম রফতানি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ঝুঁকি বেড়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি বুশেল গমের দাম ৫ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ৬ ডলারের মধ্যে ছিল। মে মাস থেকে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা, শুষ্ক আবহাওয়া ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়তে শুরু করে। জুলাইয়ে তা দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

বাংলাদেশ গম আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের এই চাপ শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারেও চলে আসে। শুধু পণ্যের মূল দাম নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাজভাড়া, বিমা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও দেশে এসে বড় আকার ধারণ করতে পারে।

সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় কারণ

শুধু আন্তর্জাতিক বাজার বা যুদ্ধকে দায়ী করলেই দেশের বাজারের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

দাম কমবে’—এই প্রত্যাশাই সমস্যার জায়গা

মূল্যস্ফীতি কমার খবর শুনে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে—বাজারে এবার পণ্যের দাম কমবে। কিন্তু অর্থনীতির হিসাব বলছে ভিন্ন কথা।

মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নামা মানে পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তর আগের তুলনায় কিছুটা ধীর গতিতে বাড়ছে। এর মানে দাম আগের জায়গায় ফিরে গেছে বা কমে গেছে—তা নয়।

এই পার্থক্য না বোঝার কারণে পরিসংখ্যান প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়—‘বাজারে যদি দাম কমেই না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমলো কীভাবে?’ আসলে এই প্রশ্নের উত্তর বাজারের দামের স্তর আর মূল্যস্ফীতির গতির মধ্যে রয়েছে।

সামনে আবার মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি আছে?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা কতটা টেকসই হবে। কারণ আগস্টের শুরুতেই পাইকারি বাজারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। বিরূপ আবহাওয়ায় কিছু খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে যদি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের ঝুঁকি আরও বাড়ে, তাহলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি কমার পর আগস্ট বা পরবর্তী মাসগুলোতে আবার ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সরকারের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্য কতটা বাস্তব?

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নামায় লক্ষ্যটির দিকে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো যথেষ্ট নয়। বাজারে স্থায়ীভাবে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানুষের আয় বাড়ানো এবং ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।

কারণ একজন মানুষের কাছে অর্থনীতির সাফল্য শুধু পরিসংখ্যানের সংখ্যায় নয়; তার কাছে সাফল্যের অর্থ হলো মাসের বাজারের খরচ কমা, একই আয়ে বেশি পণ্য কেনা এবং সংসার চালাতে ঋণ বা সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরতা কমে আসা।

পরিসংখ্যানের স্বস্তি, বাজারে অস্বস্তি

সব মিলিয়ে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে আসা এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হওয়া স্বস্তির বিষয়। তবে এটিকে এখনই বাজারে বড় ধরনের স্বস্তির চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কারণ দাম কমেনি, দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পণ্যের যে উচ্চ মূল্যস্তর তৈরি হয়েছে, সেটি এখনও বহাল রয়েছে। এর সঙ্গে মানুষের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপও রয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষ তখনই বলবে মূল্যস্ফীতি কমেছে, যখন বাজারে গিয়ে কম টাকায় আগের চেয়ে বেশি পণ্য কিনতে পারবে। পরিসংখ্যানের কাগজে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশের স্বস্তি নয়, মানুষের রান্নাঘর ও সংসারের বাজেটে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

‘দেশে যদি তেলই না থাকে, তাহলে লংমার্চের গাড়ি কি তেলে চলে না এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি কমলো কীভাবে

আপডেট টাইম : ১০:১২:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামায় অর্থনীতির জন্য এটিকে আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির খবরই বলা যায়। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে কমেছে দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুনের ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে জুলাইয়ে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে।

কিন্তু এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাজার-অভিজ্ঞতার যেন কোনও মিল নেই। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা-ময়দা, পেঁয়াজ, রসুন কিংবা অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারে এমন কোনও বড় ধরনের স্বস্তি আসেনি, যার কারণে একজন সাধারণ ক্রেতা বলতে পারেন—‘বাজার তো সস্তা হয়েছে।’

বরং জুলাই শেষ হতে না হতেই আগস্টের শুরুতে পাইকারি বাজারে বেশ কিছু পণ্যের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, মসলা, রসুন ও পেঁয়াজের মতো পণ্যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বিরূপ আবহাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও নতুন করে বাজারে চাপ তৈরি করছে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে— জিনিসপত্রের দাম যদি কমে না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমলো কীভাবে?

এর সহজ উত্তর হলো, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কমে যাওয়া। এই পার্থক্যটিই পরিসংখ্যানের স্বস্তি, আর মানুষের বাজারের কষ্টের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, দাম নয়

মূল্যস্ফীতি বলতে সাধারণভাবে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তর কতটা বেড়েছে, সেটিকে বোঝানো হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হিসাব করে আগের বছরের একই মাসের তুলনায়।

অর্থাৎ জুলাই ২০২৬-এর মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মানে এই নয় যে জুলাই মাসে বাজারের পণ্যগুলোর দাম আগের মাস জুনের তুলনায় ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়েছে বা কমেছে। এর অর্থ হলো, এক বছর আগের জুলাইয়ের তুলনায় পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তর ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। এখানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরিসংখ্যানের হিসাবের বড় পার্থক্য।

ধরা যাক, একটি পণ্যের দাম এক বছর আগে ছিল ১০০ টাকা। এক বছরে সেটি বেড়ে ১২০ টাকা হলো। পরের মাসে দাম ১২৫ টাকা না বেড়ে ১২৩ টাকা হলো। অর্থাৎ দাম কিন্তু কমেনি, বরং বেড়েছে। শুধু আগের তুলনায় বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিই কাজ করে।

ফলে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নামলেও বাজারে পণ্যের দাম কমে গেছে— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

তিন মাস পর ৯ শতাংশের নিচে

বিবিএসের সর্বশেষ হিসাবে জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ এপ্রিল, মে ও জুন—টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল।

জুলাইয়ে এসে তা ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। গত আট মাসের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে পতন হয়েছে আরও বেশি। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে। অর্থাৎ এক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।

অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। জুনের ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে তা নেমে এসেছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে। কাগজে-কলমে এসব তথ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিলে পুরো চিত্রটি এতটা স্বস্তিদায়ক নয়।

কারণ, আগের উচ্চ দাম থেকেই নতুন হিসাব দীর্ঘ সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকার কারণে পণ্যের দাম ইতোমধ্যেই অনেক বেড়ে গেছে। এখন সেই উচ্চ দামের ওপর যদি নতুন করে দাম বাড়ার হার কিছুটা কমে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কম দেখাতে পারে। কিন্তু বাজারের দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমছে মানেই বাজার আগের মতো সস্তা হয়ে যাচ্ছে— এমন ধারণা ভুল।

গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেল, মসলা, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবার খরচ বেড়েছে। মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও আগের উচ্চ মূল্যস্তরের চাপ থেকে যাচ্ছে। এই কারণে একজন ভোক্তার কাছে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে আসার খবর খুব বেশি স্বস্তির মনে নাও হতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে মূল্যস্ফীতি কমা আর জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়া এক বিষয় নয়।’’

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হওয়ার অর্থ হলো, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তর এখনও ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ বাজারে দাম কমেনি; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। এ কারণেই পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে গিয়ে এর সুফল ভোক্তারা সেভাবে অনুভব করছেন না।’’

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘মূল্যস্ফীতির হার কম দেখানোর ক্ষেত্রে ‘ভিত্তি প্রভাব’ও (বেস ইফেক্ট) ভূমিকা রাখতে পারে। আগের বছরের একই সময়ে মূল্যস্তর যদি অনেক বেশি থাকে, তাহলে সেই উচ্চ মূল্যের সঙ্গে চলতি বছরের তুলনা করলে মূল্যস্ফীতির হার তুলনামূলক কম দেখা যেতে পারে। ফলে শুধু নির্দিষ্ট সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমেছে কিনা, তা দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রকৃত চাপ পুরোপুরি বোঝা যায় না।’’

তিনি বলেন, ‘‘চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, আটা-ময়দাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যদি এখনও উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতি কমার পরিসংখ্যান খুব একটা স্বস্তির বার্তা দেবে না। কারণ এসব মানুষের আয়ের বড় একটি অংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই ব্যয় হয়।’’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘তাই জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে আসাকে অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারে এরই মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। মূল্যস্ফীতি এখনও ৮ শতাংশের ওপরে, অর্থাৎ মানুষের ওপর মূল্যচাপ যথেষ্ট বেশি।’

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মূল্যস্ফীতি কমার বিষয়ে সরকারের দেওয়া তথ্যের বাস্তবতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যেসব পণ্য ও সেবার দাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেগুলোর অধিকাংশের দামই এখনো বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি কমেছে—সরকারের এই দাবির সত্যতা কতটুকু, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।’’

তিনি বলেন, ‘‘আগের সরকারের সময়ের মতো তথ্যকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করে সরকারকে খুশি করার কোনও প্রবণতা আবারও অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান না হলে সেই পরিসংখ্যানের বাস্তব তাৎপর্য থাকে না।’’

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘‘দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতিও এখনো নাজুক। বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, অথচ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানোর পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগের চিত্র বোঝা যাবে না।’’

মানুষের আয় কি দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে?

এই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ গড়ে মজুরি বৃদ্ধির হারও মূল্যস্ফীতির নিচে রয়েছে। এর সরল অর্থ হলো, মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, জীবনযাত্রার খরচ তার চেয়ে কিছুটা বেশি বেড়েছে। এতে প্রকৃত আয় বা মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

একজন শ্রমিক বা মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় বছরে ৮ শতাংশ বাড়লেও যদি সংসারের খরচ ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বা তারও বেশি বাড়ে, তাহলে কাগজে আয় বাড়লেও বাস্তবে তার হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকে না। বরং আগের মতো জীবনযাপন করতে গিয়ে তাকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়, ঋণ করতে হয় কিংবা খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হয়।

খাদ্যই যখন পরিবারের সবচেয়ে বড় ব্যয়

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। কারণ দেশের মানুষের ভোগব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যের পেছনে যায়। সিপিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ভোক্তা মূল্যসূচকের ঝুড়িতে খাদ্যের অংশ প্রায় ৫৯ শতাংশ। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে।

সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের প্রায় ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশই খাদ্যের পেছনে যায়। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি আঘাত আসে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।

তাই খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে আসার খবর ইতিবাচক হলেও, বাস্তবে বাজারে পণ্যের দাম কম না হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ খুব একটা কমে না।

বাজারে কেন স্বস্তি নেই?

মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান কমার পাশাপাশি বাজারে আবার নতুন করে দাম বাড়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজার। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সংকট ও পরিবহন ব্যয়। তৃতীয়ত, দেশের সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা। চতুর্থত, দীর্ঘ ও অদক্ষ বিপণন ব্যবস্থা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মজুতদারি, সীমিত প্রতিযোগিতা এবং কিছু ক্ষেত্রে বাজারে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের আমদানিতে উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর কমানো হয়েছিল। সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে তা কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়।

এর ফলে জুনের শেষার্ধ ও জুলাইয়ে পাইকারি বাজারে কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু এই সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

আগস্টের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা নতুন করে পণ্যের দাম বাড়াতে শুরু করেছে।

খাতুনগঞ্জে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ দেশের অন্যতম বড় ভোগ্যপণ্য পাইকারি বাজার। সেখানে গত ৮ থেকে ১০ দিনে গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, মসলা, রসুন ও পেঁয়াজসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।

দেড় মাস আগে পাইকারি বাজারে প্রতি মণ পাম তেলের দাম ছিল ৬ হাজার ২৫০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা। এখন তা বেড়ে ৬ হাজার ৪০০ টাকায় উঠেছে। সুপার পাম তেলের দাম বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৫৫০ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকা। সয়াবিন তেলের দামও প্রায় ১৫০ টাকা বেড়ে প্রতি মণ ৭ হাজার ৪০০ টাকায় উঠেছে।

চিনির বাজারেও একই প্রবণতা। কিছুদিন আগে প্রতি মণ চিনি ৩ হাজার ৪৫০ থেকে ৩ হাজার ৪৮০ টাকার মধ্যে থাকলেও এখন তা বেড়ে ৩ হাজার ৬৬০ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাজারে গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আবারও স্পষ্ট হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চাপ গমে

বর্তমানে গমের বাজার পরিস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কয়েক মাস ধরে প্রতি মণ গমের দাম ১ হাজার ২৮০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে ছিল। গত দুই সপ্তাহে তা বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সর্বশেষ সময়ে কিছুটা কমে ১ হাজার ৪৩০ থেকে ১ হাজার ৪৩৫ টাকার মধ্যে থাকলেও আগের তুলনায় দাম এখনও অনেক বেশি। এর প্রভাব পড়েছে আটা-ময়দার বাজারে।

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে খোলা সাদা আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। প্যাকেটজাত আটার দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। খোলা ময়দার দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত ময়দার দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

এক বছরের হিসাব আরও বড় উদ্বেগের। এ সময়ে খোলা আটার দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং প্যাকেটজাত আটার দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

তাহলে একজন ভোক্তার কাছে মূল্যস্ফীতি কমার স্বস্তি কতটা পৌঁছাবে, যদি তার প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় আটা-ময়দার দামই আগের বছরের তুলনায় এত বেশি থাকে?

আন্তর্জাতিক যুদ্ধও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

গমের বাজারে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও স্পষ্ট। রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের গম সরবরাহের বড় অংশ জোগান দেয়। কৃষ্ণসাগর দিয়ে গম রফতানি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ঝুঁকি বেড়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি বুশেল গমের দাম ৫ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ৬ ডলারের মধ্যে ছিল। মে মাস থেকে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা, শুষ্ক আবহাওয়া ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়তে শুরু করে। জুলাইয়ে তা দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

বাংলাদেশ গম আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের এই চাপ শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারেও চলে আসে। শুধু পণ্যের মূল দাম নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাজভাড়া, বিমা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও দেশে এসে বড় আকার ধারণ করতে পারে।

সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় কারণ

শুধু আন্তর্জাতিক বাজার বা যুদ্ধকে দায়ী করলেই দেশের বাজারের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

দাম কমবে’—এই প্রত্যাশাই সমস্যার জায়গা

মূল্যস্ফীতি কমার খবর শুনে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে—বাজারে এবার পণ্যের দাম কমবে। কিন্তু অর্থনীতির হিসাব বলছে ভিন্ন কথা।

মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নামা মানে পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তর আগের তুলনায় কিছুটা ধীর গতিতে বাড়ছে। এর মানে দাম আগের জায়গায় ফিরে গেছে বা কমে গেছে—তা নয়।

এই পার্থক্য না বোঝার কারণে পরিসংখ্যান প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়—‘বাজারে যদি দাম কমেই না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি কমলো কীভাবে?’ আসলে এই প্রশ্নের উত্তর বাজারের দামের স্তর আর মূল্যস্ফীতির গতির মধ্যে রয়েছে।

সামনে আবার মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি আছে?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা কতটা টেকসই হবে। কারণ আগস্টের শুরুতেই পাইকারি বাজারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ঊর্ধ্বমুখী। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। বিরূপ আবহাওয়ায় কিছু খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে যদি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের ঝুঁকি আরও বাড়ে, তাহলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি কমার পর আগস্ট বা পরবর্তী মাসগুলোতে আবার ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সরকারের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্য কতটা বাস্তব?

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নামায় লক্ষ্যটির দিকে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো যথেষ্ট নয়। বাজারে স্থায়ীভাবে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানুষের আয় বাড়ানো এবং ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।

কারণ একজন মানুষের কাছে অর্থনীতির সাফল্য শুধু পরিসংখ্যানের সংখ্যায় নয়; তার কাছে সাফল্যের অর্থ হলো মাসের বাজারের খরচ কমা, একই আয়ে বেশি পণ্য কেনা এবং সংসার চালাতে ঋণ বা সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরতা কমে আসা।

পরিসংখ্যানের স্বস্তি, বাজারে অস্বস্তি

সব মিলিয়ে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে আসা এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হওয়া স্বস্তির বিষয়। তবে এটিকে এখনই বাজারে বড় ধরনের স্বস্তির চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কারণ দাম কমেনি, দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পণ্যের যে উচ্চ মূল্যস্তর তৈরি হয়েছে, সেটি এখনও বহাল রয়েছে। এর সঙ্গে মানুষের আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপও রয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষ তখনই বলবে মূল্যস্ফীতি কমেছে, যখন বাজারে গিয়ে কম টাকায় আগের চেয়ে বেশি পণ্য কিনতে পারবে। পরিসংখ্যানের কাগজে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশের স্বস্তি নয়, মানুষের রান্নাঘর ও সংসারের বাজেটে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।