,

উত্তরায় প্রাইভেটকারে বিআরটির গার্ডার পড়ে নিহত ৫ আহত ২

হাওর বার্তা ডেস্কঃ চরম অবহেলার কারণে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ধূলিসাৎ করে দিল দুইটি পরিবারের স্বপ্ন। বৌ ভাতের অনুষ্ঠান শেষে গতকাল সোমবার বিকেলে নবদম্পতিসহ দুই পরিবারের সদস্যরা উঠেছিলেন একই গাড়িতে। দক্ষিণ খানের কাওলা থেকে তারা গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন সাভারের আশুলিয়ায়। বেলা ৩টায় জসিমউদ্দিন রোডের আড়ং শো-রুমের সামনে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম’র (বিআরটি) প্রকল্পের ক্রেন থেকে গার্ডারটি গাড়িতে তোলার সময় হঠাৎ বিকট শব্দে প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে। এতে প্রাইভেটকারে থাকা একই পরিবারের পাঁচ আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। কী নিষ্ঠুর, কী নির্মম মৃত্যু! এর দায় নেবে কে? আর কতকাল এভাবে সংহার হবে তরুণ-তাজা প্রাণ। স্বজনদের আহাজারি কি থামবে না? দুর্ঘটনার সময় রাস্তা খোলা ছিল, কাজও চলছিল স্বাভাবিকভাবে। ছিল না কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনি। প্রাইভেট কারের পেছনে একটি বাস ছিল, বাসটি দ্রুত ব্রেক কষে বামে সাইড করে ফেলে। তা না হলে আরো বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারতো।
প্রাইভেটকারে মোট ৭ জন আরোহী ছিলেন। দু’জনকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২টি শিশু, দু’জন নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন। রাত ৮টায় প্রাইভেট কারের ভেতর থেকে নিহতদের লাশ উদ্ধার করা হয়।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন- বর হƒদয়ের বাবা নুরুল ইসলাম রুবেল (৫০), কণে রিয়ার মা ফাহিমা (৪০), রিয়ার খালা ঝর্ণা (২৮), ঝর্ণার মেয়ে জান্নাত (৬) ও ছেলে জাকারিয়া (৩)। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। শুধু বেঁচে গেছেন হৃদয় ও রিয়া মনি দম্পতি। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
এর আগে গত ১৫ জুলাই গাজীপুরে এই বিআরটি প্রকল্পের ‘লঞ্চিং গার্ডার’ চাপায় এক নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। ওই দুর্ঘটনায় এক শ্রমিক ও একজন পথচারী আহত হয়েছিলেন।
হতাহতের এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নিহতদের রূহের মাগফিরাত কামনা ও তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
পুলিশ ও নিহতদের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রাইভেটকারটিতে চড়ে নবদম্পতি পরিবারসহ কাওলা থেকে সাভার যাচ্ছিলেন। বিআরটি প্রকল্পের কিছু গার্ডার ক্রেন দিয়ে স্থানান্তর করা হচ্ছিল। এ সময় একটি গার্ডার ক্রেন থেকে চলন্ত ওই প্রাইভেটকারটির ওপর পড়ে। এতে প্রাইভেটকারের সামনের অংশ দুমড়ে মুচড়ে যায়। হƒদয়ের বাবা রুবেল হলেন ওই গাড়ির মালিক। পেশায় বাইং হাউজ ব্যবসায়ী। তিনি নিজেই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। ঘটনার পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে গোটা এলাকার আকাশ বাতাস। দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল বন্ধ থাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে।
তারা আরো জানান, প্রাইভেটকারে করে নবদম্পতি এবং দুই শিশুসহ ৭ জন রওনা দিলেও দুই পরিবারের ৮-১০ জন সদস্য বাসে করে রওনা দিয়েছিলেন। প্রাইভেট কারটি ছিল সামনে। আর বাসের যাত্রীরা ছিলেন পেছনে। বাসে থাকা রিয়া মনির নানা বৃদ্ধ রাশেদুল হক বাচ্চু বলেন, হঠাৎ আমার ছেলে ফোন করে। বলেন, রিয়ামনিদের গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে। আমরা দ্রুত বাস থেকে নেমে প্রাইভেট কারের উদ্দেশে রওনা দিই। সেখানে গিয়ে আমাদের কিছুই করার ছিল না। দেখছিলাম, প্রাইভেটকার থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে। কয়েকজন ধরাধরি করে দু’জনকে গাড়ির ভেতর থেকে বের করে। গাড়ির ভেতরে কয়েকজন আটকা পড়ে। তাদের বের করা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসে। তাদেরও যে কিছু করার নেই। আর উৎসুক জনতা ছিল ছবি তোলা আর ভিডিও করা নিয়ে ব্যস্ত।
রিয়া মনির ভাই ফাহাদ বলেন, দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা প্রাইভেট কারের দরজা ধরে টানাটানি করছিলাম। কিন্তু গার্ডার পড়ে গাড়ি চ্যাপ্টা হয়ে পাওয়ায় দরজা খুলছিল না। বাইরে থেকে ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। তখন বুঝতে পারি সবকিছু শেষ। ঘটনার তিন ঘণ্টা পর গার্ডার সরানো হয়। এরপর বের করা হয় সবার লাশ।
ঘটনাস্থলের পাশের একটি ভবনে রড মিস্ত্রীর সহযোগী ইমরান হোসেন ইমন সাংবাদিকদের বলেন, আমি দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। তখন দেখলাম গার্ডারটিকে ওপরে তোলা হয়েছে। এটাকে একটা বড় গাড়িতে তুলবে। রাস্তা খোলা ছিল, কাজও চলছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে গেল গার্ডারটি। প্রাইভেট কারের পেছনে একটি বাস ছিল, বাসটি দ্রুত ব্রেক কষে বামে সাইড করে ফেলে।
তিনি বলেন, এরপর আমরা ৫-৬ জন রড-শাবল নিয়ে এসে গার্ডার সরানোর চেষ্টা করি। এ সময় এক যুবক গাড়ির ভেতর থেকে বের হন। তার মাথা ফেটে গেছে। এরপর গাড়ির দরজা ভেঙে এক নারীকে উদ্ধার করি। তিনি বের হয়ে কান্নাকাটি করছিলেন। আমরা ভেতরে একটি শিশুকে দেখতে পেয়েছিলাম, শিশুটি বেঁচে ছিল। সে হাত-পা নাড়ছিল। কিন্তু গার্ডার সরাতে পারিনি বলে তাকে বাঁচাতে পারিনি।
ইমরান আরো বলেন, ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা উদ্ধার কাজ শুরু করে। কিন্তু গার্ডার এত ভারী যে, কেউ কিছুই করতে পারছিল না। ঘণ্টা খানেক পর বিভিন্ন বাহিনী এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে। তারাও ২-৩ ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করেও কাউকে বের করতে পারেনি।
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন  বলেন, ক্রেন দিয়ে একটি গার্ডার ওপরে তোলার সময় নিচে পড়ে যায়। গার্ডারটি একটি প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে। উৎসুক জনতা এবং ভিরের কারণে উদ্ধার তৎপরতায় বেগ পেতে হয়েছে। তিনি বলেন, বক্সগার্ডার ওঠানোর সময় ভারসাম্য রাখতে না পারায় বহনকারী ক্রেন একদিকে কাত হয়ে যায়। তখন গার্ডারটি চলন্ত প্রাইভেট কারের ওপর পড়ে গেলে হতাহতের ঘটনা ঘটে। তার অভিযোগ, ঘটনার শুরুতে প্রকল্পের কেউ ঘটনাস্থলে আসেননি। তাদের কোনো ধরনের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছিল না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অবহেলাজনিত কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। যে গার্ডারটি প্রাইভেট কারের ওপর পড়েছে, সেটির ওজন ১৫০ টনের বেশি। আর যে ক্রেন দিয়ে গার্ডারটি সরানো হচ্ছিল সেটির ক্ষমতা ৮০ টন। কম ওজনের ক্রেন দিয়ে বেশি ওজনের গার্ডার সরানোর কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তবে বিআরটি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুল ইসলাম বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, আমাদের গার্ডারটি ক্রেনে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয়ার সময় সম্ভবত ক্রেন কাত হয়ে নিচে পড়ে যায়। ঘটনার জন্য কে দায়ী এবং কীভাবে ঘটলো জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমি না জেনে কিছু বলতে পারবো না। ক্রেন কাত হয়ে গেছে, এটা যান্ত্রিক সমস্যা। এটা নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত না জেনে কিছু বলতে পারবো না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ৩টায় এ ঘটনা ঘটলেও ফায়ার সার্ভিস গার্ডারটি সরাতে রাত ৮টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নেয়ায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
প্রাইভেট কারের ওপর থেকে গার্ডার সরাতে এত দেরি কেন হলো, সে প্রশ্নের মুখে পড়েন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা সাইফুজ্জামান। জবাবে তিনি বলেন, এত বড় গার্ডার সরানোর সক্ষমতা ফায়ার সার্ভিসের নেই। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যারা এখানে কাজটি করছে, তাদের লোকজন আসার পর গার্ডারটি সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাদের আসতে সময় লাগায় দেরি হয়েছে।
রাস্তার পাশে বসে নিহত পাঁচজনের স্বজনদের আহাজারি : উত্তরার জসীমউদ্দীন রোডের মোড়ে বিপণিবিতান আড়ংয়ের সামনে হাজারো মানুষের জটলা। কয়েক ঘণ্টা আগে সামনের সড়কে ঝরে গেছে তাজা পাঁচটি প্রাণ। উৎসুক জনতার ভিড় ছাপিয়ে চোখ আটকে গেল আড়ংয়ের পাশের প্যারাডাইস ভবনের পাশে। সেখান থেকে ভেসে আসছিল আহাজারির শব্দ। ভিড় ঠেলে ভবনটির সিঁড়ির পাশে যেতেই দেখা গেল স্বজনদের কান্নার রোল, যা আশপাশের সবাইকে ভারাক্রান্ত করছিল। আহাজারি করা সবাই নিহত ব্যক্তিদের স্বজন।
স্বজনেরা জানান, রাজধানীর কাওলার বাসিন্দা মো. হৃদয়ের সঙ্গে আশুলিয়ার রিয়া মনির গত শনিবার বিয়ে হয়। গতকাল সোমবার ছিল হৃদয়ের কাওলার বাড়িতে বৌ-ভাত। অনুষ্ঠান শেষে হৃদয়ের শাশুড়ি ফাহিমা, শাশুড়ির বোন ঝর্ণা, ঝর্ণার ছেলে জাকারিয়া ও মেয়ে জান্নাতুল, হৃদয়, তার স্ত্রী রিয়া মনি ও হৃদয়ের বাবা সবুজ একটি প্রাইভেট কারে করে আশুলিয়ায় যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় ফাহিমা, ঝর্ণা, জান্নাতুল, জাকারিয়া ও হৃদয়ের বাবা সবুজ ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। হৃদয় ও তার স্ত্রী রিয়া মনিকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হৃদয়ের খালাতো ভাই মো. রাকিব স্বজনদের হারিয়ে বিলাপ করছিলেন। স্বজনেরা একটু পরপর মাথায় পানি ঢেলে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। এর মধ্যেই আহাজারি করে বলছিলেন, ও আল্লাহ, এইড্যা কী হইল! এতগুলা মানুষের কী দোষ আছিল। আমরা তো নিঃস্ব হইয়্যা গেলাম।
রাকিবের কান্না দেখে পাশে থাকা স্বজনেরাও কাঁদতে থাকেন। মিনিট দশেক পর কিছুটা শান্ত হন রাকিব। তখন কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইলে বলেন, ও ভাই, আপনিই বলেন, আমার ভাইগোর কী দোষ আছিল। তারা রাস্তা দিয়ে ভালা কইরাই তো যাইতাছিল। তারপরও ক্যান এই পরিণতি হইল। এইড্যা কার দোষ। কার কাছে বিচার দিমু।
দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন : গার্ডার পড়ে ৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন-মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আক্তার, সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান এবং ডিএমপির এডিসি মনজুর মোর্শেদ।
বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেমের (বিআরটি) প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, এ মুহূর্তে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ আমরা বলতে পারছি না। সেজন্য আমরা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার অপেক্ষায় আছি। তাদের মঙ্গলবার সকাল ৯টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, মূল বিষয় হচ্ছে কারিগরি ত্রুটি৷ আমাদের প্রকল্পের গার্ডারটি ক্রেন মিস করে প্রকল্প এলাকার বাইরে গিয়ে ছিটকে পড়েছে। কী কারণে এমন ঘটেছে তার ব্যাখ্যা তদন্ত কমিটি দেবে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর